প্রকাশিত : ০৮:৪৮
০৫ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫৫
০৫ আগষ্ট ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন গতি ও সম্ভাবনার সঞ্চার হয়েছে। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন খ্যাতনামা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও অভিজ্ঞ করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খান। বিদায়ী নেতৃত্বের পদত্যাগের পর ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩’-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী পরবর্তী চার বছরের জন্য নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ সুগম করতে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে পূর্বে নির্ধারিত ৬৫ বছরের বয়সসীমা রহিত করা হয়। একই সঙ্গে চারজন নবনিযুক্ত কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান সিপিএ, অ্যাডভোকেট নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক সিএফএ এবং হোসেন সাদাত এফসিএস কমিশনে যোগ দেওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিতে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের এক শক্তিশালী সমন্বয় ঘটেছে। অতীতে বিএসইসির শীর্ষ পদে মূলত আমলা ও শিক্ষাবিদদের প্রাধান্য থাকলেও, প্রথমবারের মতো কোনো অভিজ্ঞ সিএফও ও প্রথিতযশা করপোরেট ব্যক্তিত্বকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান করা হয়েছে। এটি নীতি নির্ধারণে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ব্যবসায়িক বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত করেছে।
৪৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা
মাসুদ খানের দীর্ঘ ৪৫ বছরের পেশাগত জীবন দেশের আর্থিক খাত ও করপোরেট পরিচালনায় অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করার পর ১৯৭৭ সালে নিখিল ভারত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (সিএ) পরীক্ষায় রৌপ্যপদক অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ) সনদ লাভ করেন এবং সিএমএ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ফেলো সদস্য হন। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে তাঁর কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে (বিএটি) বাংলাদেশ ও বিদেশে অর্থ বিভাগে ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডে টানা ১৮ বছর চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে নিয়োজিত থেকে কোম্পানিটির শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি গড়ে তোলেন। বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়ার পূর্বে তিনি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের বোর্ড চেয়ারম্যান এবং ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। পাশাপাশি সিঙ্গার বাংলাদেশে, কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশে ও বিএটি বাংলাদেশে স্বতন্ত্র পরিচালক এবং অডিট ও নমিনেশন অ্যান্ড রিমুনারেশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশে (আইসিএবি) দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাদার হিসাবরক্ষক তৈরিতেও তিনি ধারাবাহিক ভূমিকা রেখে আসছেন।
তাঁর এই বিস্তৃত আন্তর্জাতিক হিসাবরক্ষণ মান–সংক্রান্ত জ্ঞান ও দীর্ঘ করপোরেট অভিজ্ঞতা তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালনাগত সমস্যা গভীরভাবে অনুধাবনে সহায়তা করছে। “প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ, সম্ভব হলে সহজীকরণ”—এই নীতিকে সামনে রেখে তিনি অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় হ্রাসের পদক্ষেপ নিয়েছেন। চার বছরের নির্ধারিত আইনি মেয়াদ পাওয়ায় তাঁর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নীতি প্রবর্তন ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
প্রথাগত সংস্কার থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর
একটি অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর বাজারের দায়িত্ব নিয়ে মাসুদ খান সাময়িক প্রথাগত সংস্কারের পরিবর্তে গভীর কাঠামোগত আধুনিকায়নে জোর দিয়েছেন। একজন প্রাক্তন সিএফও হিসেবে কমপ্লায়েন্স নীতি বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত জটিলতা ও অর্থনৈতিক ব্যয় তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক বিবরণী তৈরিতে ‘আইএএস ৩৪’ (IAS 34) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জটিল শর্তসমূহ পুনর্মূল্যায়ন ও সহজীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। আইপিও অনুমোদন, বন্ড ও সুকুক ইস্যু এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর কাজ শুরু হয়েছে। উপরন্তু, আইপিও থেকে প্রাপ্ত মূলধনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা শিথিল বা বাতিলের বিষয়ে পর্যালোচনা চলছে, যা বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করবে।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যবসা সুগম করতে এবং বাজারে গতিশীলতা আনতে ব্যবসাবান্ধব নতুন মার্জিন বিধি প্রবর্তন ও সরাসরি তালিকাভুক্তির (Direct Listing) পথ উন্মুক্ত করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্পষ্ট কর সুবিধা, দ্রুত কর নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ দেবে। বাজারে সাধারণ খুচরা (রিটেইল) বিনিয়োগকারীদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে পেনশন ফান্ড, বিমা তহবিল ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোই তাঁর এই সংস্কার পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
৮ হাজার পয়েন্টের গাণিতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাবনা
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স (DSEX) দীর্ঘদিন ধরে ৪,৬০০ থেকে ৫,৯০০ পয়েন্টের নির্দিষ্ট পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমান সংস্কারগুলো সফলভাবে কার্যকর হলে সূচক ৮,০০০ পয়েন্টের মাইলফলকে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত। অর্থনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, জিডিপির বিপরীতে পুঁজিবাজারের বাজার মূলধনের অনুপাত বৃদ্ধি পেলে এবং মানসম্পন্ন বহুজাতিক ও বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাজারে এলে সূচক জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মাধ্যমে কমপ্লায়েন্স ব্যয় কমানো সম্ভব হলে তা সরাসরি কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়ে (ইপিএস) ধনাত্মক প্রভাব ফেলে, যা মূল্য-আয় অনুপাতকে (P/E Ratio) আকর্ষণীয় স্তরে রেখে শেয়ারের দাম বাড়াতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে, রাজস্ব প্রণোদনার মাধ্যমে অতালিকাভুক্ত লাভজনক বহুজাতিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনা গেলে বাজার মূলধন বহুগুণ বাড়বে। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত উপস্থিতিতে দৈনন্দিন লেনদেন বৃদ্ধি পাবে এবং গুজবভিত্তিক দরপতন রোধ করা সম্ভব হবে। বাজার মূলধনের বিস্তার ও স্বচ্ছ নীতিমালার ওপর ভর করে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (এফআইআই) অংশগ্রহণ বাড়লে ডিএসইএক্স অনায়াসেই ৮,০০০ পয়েন্টের লক্ষ্যমাত্রার দিকে ধাবিত হবে। বর্তমানে ৫,৮৮৫ থেকে ৫,৯০০ পয়েন্টের মধ্যে থাকা প্রধান সূচকটি আমলাতান্ত্রিক ও কাগজভিত্তিক অনুমোদন ব্যবস্থার পরিবর্তে ডিজিটাল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে দ্রুত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারে। খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর বাজার থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড-চালিত বাজার এবং জটিল কর কাঠামোর বদলে ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ চালুর উদ্যোগ এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
সমন্বিত প্রচেষ্টায় সমৃদ্ধ পুঁজিবাজার
বিএসইসির শীর্ষে মাসুদ খানের মতো অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক পেশাজীবীর আগমন দেশের মূলধন বাজারের জন্য এক নতুন মাইলফলক। তাঁর নীতি ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো পুঁজিবাজারকে জল্পনা-কল্পনার স্থান থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে উন্নীত করতে সক্ষম। তবে এই বৃহৎ লক্ষ্য অর্জন কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; এর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, স্টক এক্সচেঞ্জ, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োপযোগী আর্থিক নীতি, এনবিআরের কর প্রণোদনা এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের পেশাদারিত্ব বজায় থাকলে ডিএসইএক্স সূচকের ৮,০০০ পয়েন্ট অতিক্রম করা একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় পরিণত হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।