প্রকাশিত :  ১৬:০০
০৪ আগষ্ট ২০২৬

যে ভোরের জন্য এতদিন অপেক্ষা

যে ভোরের জন্য এতদিন অপেক্ষা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

​অন্ধকারেরও একটি নির্দিষ্ট আয়ু থাকে। দীর্ঘতম রাতও একসময় ক্লান্তি মেনে নিয়ে নিজের ছায়া গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তারপর পুবের আকাশে ভেসে ওঠে আলোর প্রথম রেখা যে রেখা ধরে হেঁটে একদিন সূর্য তার পূর্ণ রূপ পায়। মানুষের জীবন যেমন এই নিয়মের বাইরে নয়, দেশের অর্থনীতিও তাই। আর পুঁজিবাজার? সে তো মূলত গণমানুষের মনস্তত্ত্ব ও বিশ্বাসের এক আয়না।

​বহুদিন সেই বিশ্বাস চরমভাবে আহত ছিল। প্রতিদিন নিয়ম করে সূচক উঠত-নামত, বাজার খুলত আর বন্ধ হতো; কিন্তু লাখো বিনিয়োগকারীর স্বপ্ন যেন এক অদৃশ্য দেয়াল আটকে রেখেছিল। ডিজিটাল পর্দায় সংখ্যার ওলটপালট ঘটলেও মানুষের মুখে হাসির রেখা ফেরেনি। মূলধনের ক্রমাগত ক্ষয় দেখতে দেখতে অনেকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। কেউ নিঃশব্দে বাজার ছেড়েছেন, কেউ-বা বুকে ক্ষত নিয়েই আঁকড়ে ধরে রেখেছেন আস্থার প্রদীপ।

​ইতিহাস আসলে তাদের জন্যই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার জমা রাখে, যারা ঝড়ের রাতেও ভোরের অপেক্ষা ছাড়েন না।

​আজকের পুঁজিবাজারের পানে তাকালে সেই অপেক্ষার সমাপ্তির একটা গুঞ্জন শোনা যায়। এটি কোনো সস্তা উল্লাস বা ক্ষণিকের উন্মাদনা নয়; এটি ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ধ্বনি। সূচকের ঊর্ধ্বমুখী গতি, লেনদেনের প্রাণচাঞ্চল্য আর মৌলভিত্তির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে স্থবির অর্থনীতিতে যেন রক্তসঞ্চার হতে শুরু করেছে। এটি হয়তো এখনো পূর্ণ জোয়ার নয়, তবে ভাটা পেরিয়ে নদী যে আবার সমুদ্রের টানে বইতে শুরু করেছে, তার স্পষ্ট বার্তা মিলছে।

​এই নতুন স্রোতে বড় জ্বালানি জুগিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত। নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা কেবল কোনো গাণিতিক পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতির জন্য এক বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস। রাষ্ট্র যেন বার্তা দিচ্ছে স্থবিরতার দিন শেষ, উৎপাদনে গতি ফিরবে, উদ্যোগ আবার সাহস পাবে।

​ব্যাংক ঋণের খরচ কমলে কেবল হিসাবের খাতা বদলায় না, বদলে যায় উদ্যোক্তার সিদ্ধান্তও। এতদিন যিনি নতুন বিনিয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তিনি আবার নকশা ছড়ান টেবিলজুড়ে। কারখানার স্থগিত সম্প্রসারণ আবার সচল হয়। ঋণের অর্থ যখন ব্যাংক থেকে বেরিয়ে শিল্পে, কর্মসংস্থানে আর বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তার ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটে পুঁজিবাজারেও। তাই আজকের সূচকের উত্থানকে কেবল একদিনের লেনদেন দিয়ে মাপা ভুল হবে; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পরিবর্তনের শুভ সূচনা।

​তবে মনে রাখা প্রয়োজন, সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অস্থিরতা ও আবেগ। পুঁজিবাজার কোনো জুয়ার টেবিল নয়; এটি প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার আঙিনা। গুজবের পেছনে ছুটে যাওয়া বিনিয়োগকারী দিনশেষে পরাজিত হন, আর যিনি কোম্পানির সুশাসন, আয় এবং মৌলভিত্তির ওপর ভরসা রাখেন সময় তার পক্ষেই রায় দিতে বাধ্য।

​মাটির নিচে দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকা বীজকে দেখে কেউ যদি তাকে মৃত মনে করে, তবে সে ভুল করবে। কারণ নীরবতার অন্তরালে সে প্রস্তুত হয় এক মহীরুহ হওয়ার জন্য। পুঁজিবাজারের নীরবতার দিনগুলোও মূলত ভবিষ্যতের গতি সঞ্চয়ের সময়। আজকের পরিবর্তন সেই সুপ্ত শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।

​ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফার্মা বা প্রকৌশলের মতো মৌলভিত্তিসম্পন্ন খাতে বিনিয়োগকারীদের এই ফেরা নিছক কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে আস্থা ফেরার প্রতিফলন। এই ধারা যদি ধারাবাহিক নীতিগত স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার অভিভাবকত্ব পায়, তবে দেশের পুঁজিবাজার কেবল অতীতের ক্ষতিই পুষিয়ে নেবে না, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গতিশীল বাজার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করবে।

​আমাদের মনে রাখতে হবে, আবেগ দিয়ে নয়, ইতিহাস লেখা হয় ধৈর্য ও দূরদর্শিতা দিয়ে। বিনিয়োগও এক দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা যেখানে তাৎক্ষণিক মুনাফার চেয়ে প্রজ্ঞার মূল্য অনেক বেশি। ধৈর্য এখানে দুর্বলতা নয়, বরং সবচেয়ে বড় শক্তি।

​আজকের এই ইতিবাচক সংকেত তাই কেবল পুঁজিবাজারের নয়; এটি পুরো অর্থনীতির, আস্থার এবং আগামী দিনের বাংলাদেশের। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে অর্থনীতি তার নিজস্ব ছন্দ ফিরে পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

​ভোর কখনো হঠাৎ করে আসে না। সে আসে ধীরে, নীরবে আলোর প্রতি মানুষের অবিচল বিশ্বাসকে সঙ্গী করে। আর যারা সেই আলোকে চিনতে ভুল করেন না, ভবিষ্যৎ সূর্যোদয় শেষপর্যন্ত তারাই দেখেন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আজ সেই আলোর প্রচ্ছায় স্পষ্ট। এখন কেবল প্রয়োজন জ্ঞানের সংযম, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল আস্থা।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর