প্রকাশিত :  ১২:৩০
০৩ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:১৫
০৩ আগষ্ট ২০২৬

সূচক যা বলছে, তারল্য বলছে অন্য কথা

সূচক যা বলছে, তারল্য বলছে অন্য কথা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

পুঁজিবাজারকে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হয়তো সূচকের দিকে তাকানো। কিন্তু সব সময় সূচকই পুরো গল্প বলে না। অনেক সময় বাজারের প্রকৃত ভাষা লুকিয়ে থাকে লেনদেনের পরিমাণে, বিনিয়োগকারীদের আচরণে এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে মূলধনের চলাচলে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চিত্রও তেমনই একটি বার্তা দিচ্ছে।

দিন শেষে প্রধান সূচক কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে শরিয়াহভিত্তিক ও ব্লু-চিপ সূচকেও পতন এসেছে। শুধু সূচকের এই চিত্র দেখলে মনে হতে পারে বাজার দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু লেনদেনের পরিমাণ ভিন্ন কথা বলছে। ১,২১০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন এমন সময়ে হয়েছে, যখন বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক বা মূলধন প্রত্যাহারের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং বোঝা যাচ্ছে, অর্থ বাজারেই আছে; কেবল তার অবস্থান বদলাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি সাধারণত তখনই তৈরি হয়, যখন বিনিয়োগকারীরা একটি খাত থেকে মুনাফা তুলে অন্য খাতে চলে যান। অর্থাৎ বাজার থেকে অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে না, বরং বাজারের ভেতরেই নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। এটিকে বাজারের স্বাভাবিক পুনর্বিন্যাস বলাই যথাযথ।

দিনের শুরুতে সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ডিএসইএক্স ১০.০৯ পয়েন্ট কমে ৫,৮৮৫.৬৯ পয়েন্টে নেমে আসে। ডিএসইএস ও ডিএসই-৩০ সূচকও একই প্রবণতা অনুসরণ করেছে। তবে এই পতন ছিল সীমিত; কোনোভাবেই তা আতঙ্কের ইঙ্গিত দেয় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাজারে দর বেড়েছে ১৬৪টি কোম্পানির, আবার সমান সংখ্যক কোম্পানির দর কমেছে। এই বিরল ভারসাম্য বলছে, বাজারে এখনো ক্রেতা ও বিক্রেতার শক্তি প্রায় সমান। অর্থাৎ বাজার এমন এক অবস্থায় রয়েছে, যেখানে সিদ্ধান্তহীনতা আছে, কিন্তু আস্থার সংকট এখনো প্রকট হয়ে ওঠেনি।

খাতভিত্তিক লেনদেনের চিত্রও তা-ই বলে। টেক্সটাইল, ওষুধ ও রাসায়নিক, প্রকৌশল, সাধারণ বীমা এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল বেশি। অন্যদিকে ব্যাংক, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাত কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল। এটি স্পষ্ট করে যে, বাজারে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটছে। বড় মূলধনের কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে পিছিয়ে থাকলেও মধ্যম ও তুলনামূলক কম মূলধনের অনেক কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়েছিল, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে অনেক ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার এখনো তুলনামূলক আকর্ষণীয় দামে রয়েছে। ফলে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

তবে এটিও সত্য, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। তাই তারা বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগে কিছুটা সতর্ক থাকলেও বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন না।

সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন উদ্যোগ এবং বাজার সংস্কারের আলোচনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রত্যাশাকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো, শক্তিশালী নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনা এবং বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহুবার প্রমাণ করেছে, আস্থাই এর সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। সূচকের দৈনন্দিন ওঠানামা সেই আস্থার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। বরং বাজারে তারল্যের উপস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মৌলভিত্তির কোম্পানির প্রতি আগ্রহই দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

তাই দিনের শেষে সূচক সামান্য কমেছে বলেই বাজারকে দুর্বল বলা যাবে না। আবার লেনদেন বেশি হয়েছে বলেই সব অনিশ্চয়তা কেটে গেছে এ কথাও বলা যাবে না। বাস্তবতা হলো, বাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময় সঠিক নীতি, কার্যকর তদারকি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান তারল্যই ভবিষ্যতের টেকসই ঊর্ধ্বমুখী বাজারের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর