প্রকাশিত : ১৮:৩২
০২ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নীতিগত সুদের হার (রিপো রেট) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দেশের মূলধন বাজারে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে। একই সাথে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে ব্যাংক ব্যবস্থার তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় হ্রাস পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা কঠোর তারল্য সংকটের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ইতিবাচক পদক্ষেপ বাজার অংশীদারদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। ঋণের সুদের হার কমার সম্ভাবনায় তালিকাভুক্ত ম্যানুফ্যাকচারিং ও শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন ব্যয় কমবে, যা কর-পরবর্তী শুদ্ধ মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সাধারণ আমানতের সুদের হার কমে আসার আশঙ্কায় অনেক বিনিয়োগকারী তাদের অলস মূলধন ফিক্সড ডিপোজিট থেকে সরিয়ে পুঁজিবাজারের মতো তুলনামূলক উচ্চ-রিটার্নসম্পন্ন ইক্যুইটি বাজারে পুনঃবরাদ্দ করতে সক্রিয় হয়ে উঠছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বশেষ লেনদেন চিত্রে নীতিগত সিদ্ধান্তের সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সেশনের শুরুতেই কেনাবেচার ইতিবাচক চাপে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫,৯০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করলেও শেষ ঘণ্টার প্রফিট টেকিং বা মুনাফা তোলার প্রবণতায় সূচকটি ০.২ পয়েন্ট বেড়ে ৫,৮৯৬ পয়েন্টে অবস্থান নেয়। তবে সূচকের ধীরগতির আড়ালে লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি বাজারে মূলধনের জোরালো প্রবাহ নির্দেশ করে। একদিনের ব্যবধানে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ২০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৬ বিলিয়ন টাকায় (১,২৬০ কোটি টাকা) উন্নীত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী সেশনে ছিল ১০.৪ বিলিয়ন টাকা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হাতবদল হওয়া তহবিলের এই বড় লাফ প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা বাজারে পুনর্বিন্যাস শুরু করেছেন। মোট লেনদেনকৃত ৩৯৭টি কোম্পানির মধ্যে ১৯২টির দর বৃদ্ধি, ১৪৯টির হ্রাস এবং ৫৪টির দর অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, সামগ্রিক বাজারের ভিত্তি এখনও ইতিবাচক।
সূচকের সম্ভাব্য গতিপথ ও প্রযুক্তিগত স্তরের বিশ্লেষণ
আগামীকালের লেনদেনে ডিএসইএক্স সূচকের জন্য ৫,৯০০ পয়েন্টের রেজিস্ট্যান্স লেভেলটি অতিক্রম করাই হবে প্রধান অনুঘটক। কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সূচকটি গত কয়েকটি সেশন ধরে একটি সীমিত সীমার মধ্যে ওঠানামা করে একীভূতকরণ বা কনসোলিডেশন সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নমনীয় নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণার পর বাজারের সেন্টিমেন্ট বা মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আগামীকালের লেনদেনের প্রথমার্ধে সূচকটি ৫,৯১০ থেকে ৫,৯২৫ পয়েন্টের ব্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী চেষ্টা চালাতে পারে। প্রারম্ভিক এই গতি বজায় থাকলে ট্রেডারদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
তবে সেশনের দ্বিতীয়ার্ধে স্বল্পমেয়াদী গেইনারদের কাছ থেকে কিছুটা বিক্রয়চাপ আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেসব বিনিয়োগকারী পূর্ববর্তী নিম্ন মূল্যে শেয়ার ক্রয় করেছিলেন, তারা ৫,৯১০ পয়েন্টের উপরে সূচক পৌঁছালে মুনাফা তুলে নিতে সচেষ্ট হতে পারেন। এই সাময়িক বিক্রেতাদের চাপ সামলে যদি টার্নওভার ১২ বিলিয়ন টাকার উপরে ধরে রাখা যায়, তবে দিনশেষে সূচকটি ৫,৯০০ পয়েন্টের উপরে ইতিবাচক ঘরে বন্ধ হতে সমর্থ হবে। অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত দিনে অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স (ক্যাসপি) ৩৩.৮ পয়েন্ট এবং সিএসসিএক্স ১৬.৪ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু বন্দরনগরীর এই বাজারে লেনদেনের গতি কিছুটা কম থাকলেও প্রধান বাজার ডিএসইর গতিশীলতা আগামীকাল সিএসই-তেও ইতিবাচক সুবাতাস ছড়িয়ে দেবে।
খাতভিত্তিক পারফরম্যান্স ও সম্ভাবনাময় খাতের পূর্বাভাস
আগামীকালের বাজারে মূলধন প্রবাহের বণ্টন এবং সেক্টরভিত্তিক গতিশীলতা কেমন হবে তা বিগত সেশনের টার্নওভার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়। বস্ত্র বা টেক্সটাইল খাত বর্তমানে বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা ডিএসইর মোট টার্নওভারের ২১.৪ শতাংশ এককভাবে দখল করে নিয়েছে। সুদের হার হ্রাসের সিদ্ধান্ত এবং দেশের সার্বিক রপ্তানি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের প্রেক্ষাপটে আগামীকালও বস্ত্র খাতে লেনদেনের প্রাধান্য থাকবে। বিশেষ করে যেসব বড় রপ্তানিমুখী বস্ত্র কোম্পানির ব্যাংক ঋণ বেশি রয়েছে, সেগুলো সুদের ব্যয় কমার সরাসরি সুবিধা পাবে বলে বিনিয়োগকারীদের নজর এই শেয়ারগুলোর দিকে বেশি থাকবে।
ফার্মাসিউটিক্যালস ও রসায়ন খাত এবং সাধারণ বীমা খাত উভয়ই মোট টার্নওভারের ১১.৯ শতাংশ করে অবদান রেখে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। ফার্মাসিউটিক্যালস খাতকে একটি ঐতিহ্যগত ডিফেন্সিভ বা নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। কাঁচামালের আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক হওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের সাময়িক স্থিতিশীলতা এই খাতের মার্জিন উন্নত করছে। আগামীকালের লেনদেনে ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের লার্জ-ক্যাপ শেয়ারগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিকদের নিরাপদ বাইং সাপোর্ট বজায় থাকবে। অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাতে বিগত কয়েকদিন ধরে চলা গতিশীলতা অব্যাহত থাকতে পারে, কারণ ট্রেডাররা এই খাতের কম মূলধনী শেয়ারগুলোতে দ্রুত মূলধন খাটাতে আগ্রহী।
মিউচুয়াল ফান্ড খাত সম্প্রতি ৫.৬ শতাংশের এক অসামান্য রিটার্ন দিয়ে খাতভিত্তিক দরবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে। ফান্ডগুলোর সিংহভাগ শেয়ার তাদের সম্পদ মূল্যের (এনএভি) তুলনায় বেশ ছাড়ে লেনদেন হওয়ায় এবং সুদের হার কমার কারণে মানি মার্কেট থেকে ইক্যুইটিতে মূলধন সরার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আগামীকালও মিউচুয়াল ফান্ড খাতে দরবৃদ্ধি বজায় থাকতে পারে। একই সাথে পাট খাত ১.৬ শতাংশ এবং সেবা ও আবাসন খাত ১.৫ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। আবাসন ও নির্মাণ খাতের কোম্পানিগুলো ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমার ফলে পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে, যা আগামীকাল সেবা ও আবাসন খাতের শেয়ার দরকে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত গত সেশনে ০.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সিমেন্ট ও জীবন বীমা খাত ০.৮ শতাংশ করে দর হারিয়েছে। নীতিগত সুদের হার কমানোর তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে ব্যাংকগুলোর স্প্রেড বা সুদের ব্যবধান কিছুটা চেপে যাওয়ার মানসিক শঙ্কা তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে আমানত ও ঋণের বিস্তার ব্যাংকিং খাতের ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী করবে। ফলে আগামীকাল ব্যাংকিং খাতের শেয়ার দর লেনদেনের শুরুর দিকে কিছুটা নামলেও শেষের দিকে ক্রয়ের চাপে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সিমেন্ট খাতে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় সংক্রান্ত উদ্বেগে সাময়িক দর সংশোধন হলেও আগামীকালের বাজারে মূলধনের পুনর্বিন্যাসের কারণে এই খাতটি স্থিতিশীলতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বহুজাতিক খাতের মধ্যে মারিকো বাংলাদেশ প্রথম প্রান্তিকে মুনাফায় ১২.৩৮ শতাংশ পতন রিপোর্ট করলেও ৫০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ৫০০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বহুজাতিক ও মৌলিক খাতের কোম্পানিগুলোর ক্যাশ ফ্লো কতটা মজবুত। আগামীকালের লেনদেনে এই ধরনের ক্যাশ-রিচ এবং উচ্চ লভ্যাংশ প্রদানকারী স্টকগুলোতে পতন ঠেকানোর জন্য ডিফেন্সিভ বাইং দেখা যাবে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কৌশল ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ
আগামীকাল বাজারে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত নির্ণায়ক। বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রলিং পেগ পদ্ধতির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সুসংহত করায় এবং সার্বিক নীতিগত সংস্কার আনায় বিদেশি ও দেশি প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল পুনরায় পুঁজিবাজারে প্রবেশের গতি বাড়িয়েছে। সুদের হার কমার বর্তমান মুহূর্তে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মূলত তাদের পোর্টফোলিও থেকে ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজের অনুপাত সামান্য কমিয়ে ইক্যুইটি-নির্ভরতা বাড়াতে চাইবে।
তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনও বাজারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ততার পরিবেশ তৈরি করতে দেয়নি। এই কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষুদ্র মূলধনী শেয়ারে দীর্ঘ মেয়াদে ফান্ড আটকে না রেখে লার্জ-ক্যাপ ও ডিভিডেন্ড-ইয়েল্ডিং শেয়ারগুলোতে বেশি নজর দিচ্ছেন। ব্যক্তিশ্রেণির ট্রেডাররা মূলত বস্ত্র, সাধারণ বীমা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মতো অধিক লেনদেন হওয়া খাতে স্বল্পমেয়াদী মুনাফার সুযোগ খুঁজবেন। এই দুই ভিন্নধারার বিনিয়োগ কৌশলের পারস্পরিক ক্রিয়ায় বাজারে লেনদেনের মোট পরিমাণ ইতিবাচক সীমানায় থাকবে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন ও পরামর্শমূলক রূপরেখা
সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন এবং ডিএসইর বাজার পরিসংখ্যান সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগামীকাল পুঁজিবাজার একটি আশাব্যঞ্জক কিন্তু পরিমিত গতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত বাজারে যে অতিরিক্ত তারল্যের সংকেত দিয়েছে, তা দৈনিক লেনদেনকে ১২ বিলিয়ন টাকার উপরে ধরে রাখতে সহায়তা করবে। ডিএসইএক্স সূচকটি ৫,৯০০ পয়েন্টের বাধা অতিক্রম করে একটি নতুন সাপোর্ট লেভেল তৈরির চেষ্টা করবে।
খাতভিত্তিক দিক থেকে বস্ত্র, মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং সাধারণ বীমা খাত আগামীকালের বাজারে শক্তিশালী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করবে। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণ করে সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে। কেবল খবরের ওপর ভিত্তি করে কোনো শেয়ারে অতিরিক্ত চড়া দামে প্রবেশ করার বদলে নীতিগত সুবিধাপ্রাপ্ত এবং মজবুত ক্যাশ-ফ্লো সংবলিত কোম্পানিগুলোতে ক্রমান্বয়ে অবস্থান নেওয়াই হবে আগামীকালের বাজারের জন্য সবচেয়ে লাভজনক কৌশল।