প্রকাশিত :  ১৬:৫৪
০১ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:১০
০১ আগষ্ট ২০২৬

জেনেভা ক্যাম্প: যে শিশুর শৈশব কখনো সূর্যের আলো দেখেনি

জেনেভা ক্যাম্প: যে শিশুর শৈশব কখনো সূর্যের আলো দেখেনি

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

​রাতে যখন ঢাকা শহরের আলো একে একে নিভে আসে, তখনও জেনেভা ক্যাম্পের সরু গলিতে একটি ছোট্ট ছেলে ঘুমাতে পারে না। তার নাম রাফি, বয়স মাত্র নয় বছর। সে জানে না স্বাধীনতা কী, নাগরিকত্ব কী কিংবা রাজনীতি কী। সে শুধু জানে—তার ঘরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, গলির ড্রেনের দুর্গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, আর তার মায়ের চোখের পানি কোনোদিন শুকায় না।

​রাফি কখনো খোলা মাঠে দৌড়ায়নি।

সে কখনো বিকেলের রক্তিম সূর্যকে গাছের ফাঁক দিয়ে ডুবে যেতে দেখেনি।

তার পৃথিবী মাত্র কয়েক ফুটের একটি অন্ধকার ঘর; যেখানে একই বিছানায় বাবা-মা, দুই বোন আর সে গাদাগাদি করে ঘুমায়। ঘুম ভাঙলেই সামনে নোংরা গলি, মাথার ওপরে জট পাকানো বৈদ্যুতিক তার, আর চারপাশে মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

​রাফির মা প্রায়ই বলেন, "বাবা, একটু পড়াশোনা কর। বড় হয়ে মানুষ হবি।"

ছেলেটি চুপ করে থাকে।

সে জানে না, মানুষ হতে গেলে আগে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হয়।

​ক্যাম্পের সেই অন্ধকার গলিতে জন্ম নেওয়া হাজারো শিশুর মতো সেও প্রতিদিন বুঝতে শেখে—তার ঠিকানাটাই যেন তার সবচেয়ে বড় অপরাধ।

​কিন্তু সে তো কোনো অপরাধ করেনি!

তার জন্মের আগেই ইতিহাস লেখা হয়েছে।

দেশভাগ হয়েছে।

যুদ্ধ হয়েছে।

রাজনীতি হয়েছে।

চুক্তি হয়েছে।

আদালতের রায় হয়েছে।

রাষ্ট্র বদলেছে।

সরকার বদলেছে।

শুধু বদলায়নি তার ঠিকানা!

​পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে "অস্থায়ী" শব্দটি এখানে স্থায়ী হয়ে গেছে।

একদিন যে আশ্রয়শিবির কয়েক মাসের জন্য গড়ে উঠেছিল, সেখানে আজ কয়েকটি প্রজন্ম বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

​রাফির দাদা একদিন বলেছিলেন, "আর কয়েক দিন পরই সব ঠিক হয়ে যাবে।"

সেই "কয়েক দিন" শেষ হতে হতে তাঁর জীবনই শেষ হয়ে গেছে।

রাফির বাবাও একই কথা বলেন।

হয়তো একদিন রাফিও নিজের সন্তানকে একই কথা বলবে।

কী ভয়াবহ এক উত্তরাধিকার!

​একটি শিশু যখন জন্মের পর থেকেই সূর্যের আলোহীন গলিতে বড় হয়, তার স্বপ্নও ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায়।

যে বয়সে হাতে বই থাকার কথা, সে বয়সে অনেক শিশুর ঘাড়ে চেপে বসে শ্রমের বোঝা।

যে বয়সে মাঠে ফুটবল খেলার কথা, সে বয়সে তারা দেখে ভাঙা জীবন, দারিদ্র্য, অপমান আর প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।

​তবু তারা বাঁচতে চায়।

তাদেরও ঈদের নতুন জামা ভালো লাগে।

তাদেরও জন্মদিনে কেক কাটতে ইচ্ছে করে।

তাদেরও মা অসুস্থ হলে ভয় লাগে।

তাদেরও বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাতে ভালো লাগে।

​তারা আমাদের মতোই মানুষ।

তবু সমাজ তাদের দিকে আঙুল তুলে বলে—"ওরা জেনেভা ক্যাম্পের মানুষ।"

​একটি ঠিকানা কীভাবে একটি শিশুর পরিচয় হয়ে যায়?

একটি জন্মস্থান কীভাবে তার ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে পারে?

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি?

​জেনেভা ক্যাম্পের নাম শুনলেই আমরা অনেক সময় অপরাধের খবর মনে করি।

কিন্তু কেউ কি খবর রাখে, প্রতিদিন কত মা না খেয়ে সন্তানকে খাইয়ে ঘুমিয়ে পড়েন?

কেউ কি গুনে দেখেছে, কত বাবা অপমান লুকিয়ে দিনমজুরি শেষে বাড়ি ফেরেন?

কেউ কি শুনেছে, কত মেয়ে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে ছোট ভাইবোনদের মানুষ করার চেষ্টা করে?

​এই গল্পগুলো কখনো সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় আসে না।

কারণ চোখের জল দিয়ে তো আর প্রধান শিরোনাম লেখা যায় না!

​অপরাধ অবশ্যই দমন করতে হবে।

যে অপরাধী, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে।

কিন্তু কয়েকজন অপরাধীর জন্য একটি পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া কি ন্যায়বিচার?

​যেখানে বছরের পর বছর শিক্ষা নেই, কর্মসংস্থান নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই, নিরাপদ আবাসন নেই—সেখানে অপরাধচক্র শেকড় গাড়বেই।

অপরাধ জন্মগত নয়;

অবহেলা তাকে জন্ম দেয়,

বঞ্চনা তাকে লালন করে,

আর নীরবতা তাকে শক্তিশালী করে।

​আমরা দূরে দাঁড়িয়ে বলি—"ওরা তো অপরাধী।"

কিন্তু কখনো কি ভেবেছি, সেই "ওরা"-র ভেতরেও একজন রাফি আছে?

যে এখনো স্বপ্ন দেখে—একদিন তার নিজের একটি ছোট ঘর হবে;

যেখানে বৃষ্টির পানি পড়বে না,

যেখানে জানালা খুললে সূর্যের আলো ঢুকবে,

যেখানে তার মা আর কাঁদবেন না।

​একটি রাষ্ট্রের মহত্ত্ব কেবল উঁচু সেতু, আধুনিক শহর কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পরিমাপ করা যায় না।

একটি রাষ্ট্রের আসল শক্তি বোঝা যায় তখনই, যখন সে সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুটির হাত ধরে বলে—

"তুমিও আমাদেরই সন্তান।"

​জেনেভা ক্যাম্পের শিশুরা দয়া চায় না,

তারা ভিক্ষা চায় না;

তারা শুধু চায়—একটি স্বাভাবিক জীবন,

একটি স্কুল,

একটি নিরাপদ ঘর,

আর একটি পরিচয়, যা তাদের লজ্জা নয়, মর্যাদা দেবে।

​আমরা যদি আজও তাদের শুধু "ক্যাম্পের মানুষ" বলেই দূরে সরিয়ে রাখি, তাহলে ইতিহাস একদিন আমাদেরই প্রশ্ন করবে—

অপরাধী আসলে কে?

সেই শিশুটি, যে জন্মের আগেই অবহেলার কারাগারে বন্দি হয়ে গেছে?

নাকি আমরা, যারা পাঁচ দশক ধরে তার কান্না শুনেও শুনিনি?

​জেনেভা ক্যাম্প অপরাধের জন্মভূমি নয়;

এটি আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলার সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।

আর যতদিন না এই অবহেলার অবসান হবে, ততদিন সেই অন্ধকার গলির প্রতিটি শিশুর চোখে একই প্রশ্ন জ্বলতে থাকবে—

"আমি কি সত্যিই এই দেশের সন্তান?"


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর