প্রকাশিত : ১০:৩০
০১ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৮
০১ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস মূলত আস্থার উত্থান-পতনের ইতিহাস। এখানে সূচক যতবার বেড়েছে, তার চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, নীতিনির্ধারকদের সক্ষমতা এবং বাজারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। তাই কয়েক সপ্তাহের ইতিবাচক লেনদেন কিংবা কয়েক মাসের ঊর্ধ্বমুখী সূচককে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো এই পরিবর্তনের ভিত্তি কতটা বাস্তব, কতটা টেকসই এবং কতটা প্রাতিষ্ঠানিক।
সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে যে গতিশীলতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। লেনদেন বেড়েছে, সূচক শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং বাজার মূলধনও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের প্রকৃত পরিচয় কেবল সংখ্যার উল্লম্ফনে নয়; বরং সেই সংখ্যার পেছনে থাকা অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে সাম্প্রতিক প্রবণতা নতুন আশাবাদের ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই আশাবাদের সবচেয়ে বড় ভিত্তি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ইতিবাচক আর্থিক ফলাফল। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ, উৎপাদনশিল্প এবং কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধির তথ্য বাজারে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে সব প্রতিষ্ঠান সংকটে নেই; বরং দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং কার্যকর ব্যবসায়িক কৌশল এখনো মূল্য সৃষ্টি করতে সক্ষম। বিনিয়োগকারীরাও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন। গুজবনির্ভর লেনদেনের পরিবর্তে মৌলিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি একটি পরিণত বাজারের লক্ষণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজারে এখন খাতভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ তারল্য প্রবাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। একসময় একটি নির্দিষ্ট খাতে অতিরিক্ত জল্পনা পুরো বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলত। এখন দেখা যাচ্ছে, কোনো একটি খাতে মূল্যবৃদ্ধি হলে বিনিয়োগকারীরা পুরো বাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন না; বরং অপেক্ষাকৃত সম্ভাবনাময় অন্য খাতে বিনিয়োগ স্থানান্তর করছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘সেক্টর রোটেশন’। এর অর্থ, বাজার ধীরে ধীরে আবেগের পরিবর্তে বিশ্লেষণনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।
তবে এখানেই আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো একাধিক চাপের মুখে রয়েছে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। রপ্তানি ও বিনিয়োগের পরিবেশেও সতর্কতা রয়ে গেছে। এসব বাস্তবতা তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয়কে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে কেবল বর্তমান মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়াও বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নীতিগত স্থিতিশীলতা। একটি পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; বরং বিশ্বাস। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত যদি ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য না হয়, তাহলে শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন বাজারও আস্থার সংকটে পড়তে পারে। আবার বিপরীতভাবে, স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক নীতিমালা অনেক দুর্বল বাজারকেও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা নতুন নয়।
আগামী কার্যদিবসে বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সীমার মুখোমুখি হবে। সূচক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, এমন পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত মুনাফা তুলে নিতে আগ্রহী হন। ফলে কিছু বিক্রিচাপ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সেটিকে বাজারের দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং একটি সুস্থ বাজারে মূল্য সংশোধন একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। অবিরাম ঊর্ধ্বগতি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নিয়ন্ত্রিত মূল্য সংশোধন বাজারকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বিনিয়োগকারীদেরও এ সময় দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব, কৃত্রিম প্রচারণা কিংবা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ছুটলে অতীতের ভুল আবারও ফিরে আসতে পারে। বরং যেসব প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ছে, নগদ প্রবাহ শক্তিশালী, করপোরেট সুশাসন গ্রহণযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিই নজর দেওয়া উচিত। পুঁজিবাজারে দ্রুত লাভের কোনো স্থায়ী শর্টকাট নেই; দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি হয় ধৈর্য, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের পুঁজিবাজার কেবল তার অর্থনীতির প্রতিফলন নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিরও পূর্বাভাস। যদি বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, করপোরেট সুশাসন আরও শক্তিশালী হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটুট থাকে, তাহলে আজকের এই ইতিবাচক প্রবণতা আগামী দিনের টেকসই প্রবৃদ্ধির দৃঢ় ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
সূচকের প্রতিটি ঊর্ধ্বগতি তাই সাফল্যের ঘোষণা নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন সেই উত্থানের ভিত্তি হবে উৎপাদনশীল অর্থনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আস্থাভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্কৃতি। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজন শুধু লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়; প্রয়োজন সুসংহত নীতি, বাজারশৃঙ্খলা এবং আস্থার ধারাবাহিক বিকাশ।