প্রকাশিত :  ১৬:০২
২৬ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:৩৬
২৬ জুলাই ২০২৬

পুঁজিবাজারের আস্থার সংকট: সূচকের পতনের চেয়ে বড় যে প্রশ্ন

পুঁজিবাজারের আস্থার সংকট: সূচকের পতনের চেয়ে বড় যে প্রশ্ন

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সূচকের প্রতিদিনের ওঠানামার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব। একটি বাজার তখনই সুস্থ থাকে, যখন সেখানে লাভের পাশাপাশি আস্থা থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই আস্থাই সবচেয়ে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। সূচক কমেছে, বাজার মূলধন কমেছে, লেনদেন কমেছে এসব দৃশ্যমান লক্ষণ। কিন্তু এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণকারী সবাইকে গ্রাস করেছে।

পুঁজিবাজার কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক দ্বীপ নয়। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং করপোরেট খাতের বাস্তব চিত্র সবকিছুর সম্মিলিত প্রতিফলনই দেখা যায় শেয়ারবাজারে। তাই বর্তমান মন্দাকে কেবল একটি ঘটনার ফল বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং একাধিক সংকট একই সময়ে এসে বাজারকে এমন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে বিচক্ষণতা, ধারাবাহিকতা এবং নীতিগত স্থিরতা তিনটিই জরুরি।

বিশ্বপরিস্থিতিও এখন অনুকূলে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের অনেক দেশের আর্থিক বাজারকে চাপে ফেলেছে। বাংলাদেশও সেই অভিঘাতের বাইরে নয়। দেশের শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সামান্য শঙ্কাও উৎপাদন ব্যয়, করপোরেট মুনাফা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। সেই উদ্বেগের প্রতিফলন শেষ পর্যন্ত দেখা যায় শেয়ারবাজারেই।

তবে সব দায় বাইরের পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অভ্যন্তরীণ নীতিগত অনিশ্চয়তাও বাজারের বর্তমান অবস্থার অন্যতম কারণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব বাজারে দ্রুত পড়ে। বিশেষ করে মার্জিন ঋণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও প্রস্তুতি ছাড়া কোনো বার্তা বাজারে এলে তা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই বাস্তবতাই দেখা গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ বেড়েছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমেছে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতির ভার বহন করতে হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

আরও একটি বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে। দেশের বড় ও প্রভাবশালী তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল আশানুরূপ না হওয়ায় বাজারে নেতিবাচক বার্তা গেছে। ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোকে সাধারণত বাজারের ভরসার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ও লভ্যাংশ কমে গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরপতন শুধু একটি কোম্পানির সমস্যা নয়; তা পুরো বাজারের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে।

তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ব্যাংক আমানত ও সরকারি সঞ্চয়মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি মুনাফার সুযোগ এবং বিকল্প বিনিয়োগের আকর্ষণ এসব কারণে পুঁজিবাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ কমে গেছে। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের যে নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবও এখনো কাটেনি। বাজারে একবার আস্থা ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে; এই বাস্তবতা আমরা বারবার দেখেছি।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

সবার আগে প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা। বাজারে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো অনিশ্চয়তা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, যুক্তিনির্ভর এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া। বিনিয়োগকারীদের এমন আস্থায় রাখতে হবে যে নীতির পরিবর্তন হবে, কিন্তু তা হবে পূর্বঘোষিত, যৌক্তিক এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বিবেচনায় রেখে।

একই সঙ্গে করপোরেট সুশাসনের বিকল্প নেই। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্য প্রকাশ এবং পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীই দীর্ঘমেয়াদে আস্থা রাখতে পারবেন না। ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য কর-প্রণোদনা এবং বাস্তবসম্মত নীতি-সহায়তাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। শক্তিশালী কোম্পানি ছাড়া শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে না।

তারল্য সংকট মোকাবিলায় বাজার সহায়তা তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। তবে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানোর চেষ্টা নয়; বরং বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ও আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে তালিকাভুক্ত উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলোর ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আগামী দিনের বাজার নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ারও কারণ নেই, আবার অকারণ হতাশারও সুযোগ নেই। টানা দরপতনের পর অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের মূল্য আকর্ষণীয় পর্যায়ে এসেছে। তাই স্বল্পমেয়াদে অস্থিরতা থাকলেও নির্বাচিত কিছু শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তবে সেটি তখনই টেকসই হবে, যখন নীতিগত অনিশ্চয়তা কমবে এবং বাজারে আস্থার পরিবেশ ফিরবে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আতঙ্ক কখনো বিনিয়োগের কৌশল হতে পারে না। বাজারের প্রতিটি পতন যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি প্রতিটি উত্থানও চিরস্থায়ী নয়। গুজব, আবেগ কিংবা ক্ষণিকের আতঙ্কে সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বাড়ে। বরং কোম্পানির মৌলভিত্তি, দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে শুধু সূচক বাড়ালেই হবে না; ফিরিয়ে আনতে হবে মানুষের বিশ্বাস। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের পুঁজিবাজারের প্রকৃত শক্তি সূচকের সংখ্যায় নয়, বিনিয়োগকারীর আস্থায়।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর