প্রকাশিত : ১৬:০১
২৫ জুলাই ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় বিপন্ন প্রজাতির একটি মুখপোড়া হনুমান (Capped Leaf Monkey) মারা গেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরের পর কোনো একসময় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভানুগাছ–শ্রীমঙ্গল সড়কের মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিকেল পাঁচটার দিকে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী কাজল হাজরা মোটরসাইকেলে ওই সড়ক দিয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে হনুমানটিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তিনি বিষয়টি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে জানান।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বিট অফিসের বনকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে মৃত হনুমানটি উদ্ধার করেন। পরে সেটি জানকিছড়া বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টারের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কটি চলে গেছে। ফলে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া এ সড়কটি বন্যপ্রাণীদের চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে গেছে। প্রতিবছরই এ সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
শুধু সড়কপথ নয়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গেছে আখাউড়া–সিলেট রেলপথও। ফলে সড়ক ও রেল—দুই ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে বন্যপ্রাণীদের চলাচলের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ রেলপথে মাঝেমধ্যে মানুষও ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের অভিযোগ, বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কটিতে অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। ফলে বন্যপ্রাণীরা সড়ক পার হওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাঁদের মতে, সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণী চলাচলের এলাকাগুলোতে কার্যকর নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।
লাউয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী সাজু মারচিয়াং মৃত হনুমানটির ছবি ও ঘটনার তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
মুখপোড়া হনুমান বাংলাদেশের একটি বিপন্ন বন্যপ্রাণী। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) বাংলাদেশের রেড লিস্টে এ প্রজাতিটি অন্তর্ভুক্ত। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থলে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে এ প্রজাতির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বন্যপ্রাণীপ্রেমীরা বলছেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি রেলপথে বন্যপ্রাণীর চলাচল বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, দুর্ঘটনার পর মৃত প্রাণী উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; লাউয়াছড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।