প্রকাশিত :  ১৪:৫৫
১৯ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:৩৩
১৯ জুলাই ২০২৬

ঋণের লাগাম নাকি আস্থার ভিত্তি? নতুন মার্জিন বিধিমালা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে?

ঋণের লাগাম নাকি আস্থার ভিত্তি? নতুন মার্জিন বিধিমালা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে?
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসে, যার প্রভাব কেবল শেয়ারের দর ওঠানামার মধ্যেই আটকে থাকে না; বরং তা বিনিয়োগকারীর মনস্তত্ত্ব, বাজারের তারল্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ভিতকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর যে খসড়া সংশোধনী জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে, তা নিছক কোনো আইনি রদবদল নয়। এটি আসলে ভবিষ্যতের পুঁজিবাজারকে ঠিক কোন দর্শনের ওপর দাঁড় করানো হবে, তারই এক দূরগামী ইঙ্গিত।

সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, কমিশন এই সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আহ্বান করেছে। উন্নত বিশ্বের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতো এমন জনপরামর্শভিত্তিক নীতিনির্ধারণ একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের অপরিহার্য শর্ত। এতে আইনি কাঠামো যেমন বাস্তবসম্মত হয়, তেমনি বাজারের অংশীজনদের আস্থা বাড়ে এবং ভবিষ্যতে বিধিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।
আমাদের পুঁজিবাজারে ‘মার্জিন ঋণ’ বরাবরই এক সংবেদনশীল অধ্যায়। কারণ, এই ঋণ যেমন বিনিয়োগকারীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়, তেমনি বাজারের পিঠে চেপে বসে অতিরিক্ত ঝুঁকি। ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনার প্রবণতা বাজার যখন চাঙা থাকে, তখন দ্রুত মুনাফার জোয়ার আনে বটে; তবে বাজার নিম্নমুখী হলেই সেই একই ঋণ বিনিয়োগকারীর জন্য ডেকে আনে চরম বিপর্যয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ দেশে অতিরিক্ত লিভারেজ (ঋণসুবিধা) অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে; আবার পতনের দিনে সেই লিভারেজই ক্ষতির অঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় অবধারিতভাবেই প্রশ্ন উঠছে প্রস্তাবিত সংশোধনী কি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সুরক্ষার ঢাল হবে, নাকি বাজারে তাঁদের বিনিয়োগের সুযোগকেই সংকুচিত করে তুলবে?

ঝুঁকি বনাম প্রবৃদ্ধি: ভারসাম্যের খোঁজে বিএসইসি

খসড়া সংশোধনীটি নিবিড়ভাবে পাঠ করলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তা হলো বিএসইসি এখন আর ‘যেকোনো মূল্যে লেনদেন বাড়ানো’র স্রোতে ভাসতে চাইছে না। বরং ‘ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে একটি টেকসই বাজার গড়ে তোলা’ই তাদের অগ্রাধিকার। নীতিগত জায়গা থেকে এটি নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক রূপান্তর। কারণ, পুঁজিবাজারের প্রকৃত শক্তি কখনো কৃত্রিম ঋণনির্ভর লেনদেনের চোরাবালিতে থাকে না; তা থাকে সুশাসন, স্বচ্ছতা আর মৌলভিত্তিক বিনিয়োগের শক্ত জমিনে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় মার্জিন অর্থায়নের সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট করার পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়নের বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকিং ও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের ব্যাপক বিস্তার বিবেচনায় এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এর ফলে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি হবে। একই সঙ্গে কমিশন মার্জিন অর্থায়নকারীর পরিধিও বেঁধে দিয়েছে। এখন থেকে নিবন্ধিত স্টক ব্রোকার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার এবং পূর্ণাঙ্গ সেবাদানকারী মার্চেন্ট ব্যাংকাররাই শুধু এই সেবা দিতে পারবেন, যা তাঁদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিকে আরও সুনির্দিষ্ট করবে।

তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীর চোখ দিয়ে দেখলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো এই পরিবর্তন কি বাজারে তাঁদের প্রবেশাধিকার সহজ করবে, নাকি আরও দুর্গম করে তুলবে? এখানেই মূলত আসল বিতর্কের সূত্রপাত।

আমাদের পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই সীমিত মূলধন নিয়ে আসেন। অনেকেই ধীরে ধীরে পোর্টফোলিও গড়ে তোলেন এবং প্রয়োজনে মার্জিন সুবিধা ব্যবহার করেন। যদি নতুন বিধিমালায় মার্জিন পাওয়ার শর্ত অতিরিক্ত কঠোর করা হয়, তবে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এই সুবিধার বাইরে চলে যেতে পারেন। আবার এর অন্য পিঠও আছে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে জুয়াড়িসুলভ বিনিয়োগের প্রবণতাও এতে কমবে। অর্থাৎ, একই সিদ্ধান্তের দুটি বিপরীতমুখী প্রভাব রয়েছে। নীতিনির্ধারণে ঠিক এই ভারসাম্যটুকু রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোতে মার্জিন ঋণকে কখনো গলা টিপে ধরা হয় না; বরং কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার শিকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। কারণ, মার্জিন অর্থায়ন বাজারে তারল্য জোগায়, লেনদেন সচল রাখে এবং দক্ষ বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এটি এমন এক দোদুল্যমান তলোয়ার, যার অপব্যবহার পুরো বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। আমাদের দেশের বাস্তবতা আরও সংবেদনশীল। এখানে এখনো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মৌলিক বিশ্লেষণের চেয়ে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা স্বল্পমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির মোহে পড়ে অন্ধ বিনিয়োগ করেন। এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্ক অবস্থানকে কোনোভাবেই অযৌক্তিক বলা যায় না।

তবে সতর্কতা যেন আবার অতিরিক্ত রক্ষণশীলতার বেড়াজালে রূপ না নেয়, সেটিও মাথায় রাখা সমান জরুরি। একটি সুস্থ পুঁজিবাজারে ঝুঁকি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়; বরং ঝুঁকিকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হয়, যাতে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ ব্যাহত না হয়। অতিরিক্ত বিধিনিষেধ যদি বাজারের স্বাভাবিক তারল্যই শুষে নেয়, তবে ভালো উদ্দেশ্য থেকেও দিনশেষে নেতিবাচক ফল আসতে পারে।

খসড়া সংশোধনীতে পৃথক ব্যাংক হিসাব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি, গবেষণা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, মূলধনের বিপরীতে অর্থায়নের সীমা এবং একক শেয়ারে এক্সপোজারের সীমার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছে যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিও কমবে।

কিন্তু আইন যত ভালোই হোক না কেন, তার আসল সফলতা নির্ভর করে প্রয়োগের ওপর। এ দেশের পুঁজিবাজারের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নিয়মের অভাবের চেয়ে নিয়ম প্রয়োগের শিথিলতা ও দুর্বলতাই এখানে বড় সংকট। তাই নতুন বিধিমালার ক্ষেত্রেও একই সংশয় থেকে যায় কাগজে-কলমের এই কড়াকড়ি বাস্তবে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে তো? নাকি কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য এক নিয়ম আর অন্যদের জন্য ভিন্ন আচরণ দেখা যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা। কারণ, পুঁজিবাজারে আস্থা কোনো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তৈরি করা যায় না; এটি গড়ে ওঠে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে।

অনুপাত ও শর্তের কড়াকড়ি: কার লাভ, কার ক্ষতি?

পুঁজিবাজারে একটি প্রচলিত সত্য আছে ঋণ বাজারকে যেমন রকেটের গতিতে উঁচুতে তুলতে পারে, তেমনি পতনের সময় পতনের গতিকে করে তুলতে পারে দ্বিগুণ বিধ্বংসী। বিএসইসির প্রস্তাবিত সংশোধনীও মূলত এই দ্বৈত বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সাজানো হয়েছে।

খসড়া বিধিমালার সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ অনুপাত ১:১ নির্ধারণ করা। অর্থাৎ, একজন বিনিয়োগকারীর নিজস্ব ইক্যুইটির সমপরিমাণের বেশি ঋণ আর দেওয়া যাবে না। নীতিগতভাবে এটি অত্যন্ত সতর্ক ও রক্ষণশীল অবস্থান। এই পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর জল্পনা-কল্পনার সুযোগ কমে যাবে, যা অতীতে অনেক বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করেছে। তবে অভিজ্ঞ ও নিয়মানুবর্তী বিনিয়োগকারীরা, যাঁরা মার্জিন সুবিধা ব্যবহার করে পোর্টফোলিও দক্ষভাবে পরিচালনা করতেন, তাঁদের নমনীয়তা এতে কিছুটা কমে যাবে। ফলে বাজারে লেনদেনের গতি কিছুটা শ্লথ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আরও বড় পরিবর্তন এসেছে ‘মেইনটেন্যান্স মার্জিন’ বা সংরক্ষিতব্য মার্জিন নিয়ে। খসড়া অনুযায়ী, গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ৭০ শতাংশের নিচে নামলে মার্জিন কল করতে হবে। আর তিন কার্যদিবসের মধ্যে সেই ঘাটতি পূরণ করা না হলে নতুন কোনো অর্থায়ন দেওয়া যাবে না। এখানে নিয়ন্ত্রকের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বাজারে লোকসানের পাহাড় জমতে না দেওয়া। কারণ, লোকসান দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে তা শুধু বিনিয়োগকারী নয়, ব্রোকারেজ হাউস ও পুরো বাজারকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে।

তবে আমাদের বাজারে প্রতিদিনের দর ওঠানামা অনেক সময় মৌলিক কারণের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক হুজুগে বেশি নির্ধারিত হয়। এমন অস্থির বাজারে ৭০ শতাংশের এই সীমা তুলনামূলক কঠোর হয়ে গেলে, স্বল্পমেয়াদি ওঠানামার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী অপ্রয়োজনীয় মার্জিন কলের ফাঁদে পড়ে যেতে পারেন।

সবচেয়ে কঠোর বিধানটি হলো ৫০ শতাংশ ইক্যুইটি সীমা। খসড়া অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের ইক্যুইটি যদি মার্জিন অর্থায়নের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তাঁর হিসাবে থাকা প্রয়োজনীয় শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার অধিকার থাকবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে—এই যুক্তিতে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় উন্নত বাজারেও এমন ফোর্স সেলের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু এ দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ ঠিক এখানেই। আমাদের বাজারে সাময়িক আতঙ্কে অনেক সময় ভালো কোম্পানির শেয়ারের দামও হুড়মুড় করে কমে যায়। এমন মুহূর্তে বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি বিনিয়োগকারীর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। পরে বাজার ঘুরে দাঁড়ালেও তিনি আর সেই সুফল পান না।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক বিক্রির আগে প্রযুক্তির সহায়তায় (যেমন: এসএমএস, মোবাইল অ্যাপ নোটিফিকেশন, ডিজিটাল অ্যালার্ট) গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাটি আরও নিরেট করা প্রয়োজন।

খসড়ার আরেকটি বড় বিতর্কিত শর্ত হলো মার্জিন সুবিধা পেতে হলে ন্যূনতম তিন লাখ টাকার নিজস্ব বিনিয়োগ থাকতে হবে। এই বিধানটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। এর পক্ষের যুক্তি হলো, ক্ষুদ্র মূলধনের বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিয়ে ঝুঁকিতে ফেলা ঠিক নয়। কিন্তু বিপরীত যুক্তিটিও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়; আমাদের পুঁজিবাজারের সিংহভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের ওপর ভর করে টিকে আছে। তিন লাখ টাকার এই দেয়াল তাঁদের একটি বড় অংশকে মার্জিন সুবিধার বাইরে ঠেলে দেবে, যা বাজারে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করবে এবং একধরনের বৈষম্যমূলক আবহ তৈরি করতে পারে।

একইভাবে, পিই (P/E) অনুপাত ৩০-এর বেশি কিংবা ঋণাত্মক ইপিএস (EPS) থাকা কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো দুর্বল মৌলভিত্তির বা অতিমূল্যায়িত কোম্পানিতে ঋণনির্ভর জুয়াড়ি বিনিয়োগ বন্ধ করা। নীতিগতভাবে এটি অত্যন্ত যৌক্তিক হলেও, বাস্তব বাজারে প্রবৃদ্ধিশীল অনেক ভালো কোম্পানির পিই অনুপাত সাময়িকভাবে বেশি হতে পারে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে ভিত্তি ধরলে কিছু সম্ভাবনাময় কোম্পানিও মার্জিন তালিকা থেকে ছিটকে যেতে পারে। তবে জি, এন, জেড ক্যাটাগরি, এসএমই, এটিবি এবং ওটিসি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিকিউরিটিজে মার্জিন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবটি বেশ বাস্তবসম্মত।

পাশাপাশি, একক শেয়ারে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ এক্সপোজারের যে সীমা দেওয়া হয়েছে, তা অতীতে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অতিরিক্ত অর্থায়নের কেন্দ্রীভূত ঝুঁকিকে সুচারুভাবে দূর করতে সাহায্য করবে।

পুঁজিবাজারের ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় কোনো বাজার কেবল কঠোর আইন দিয়ে বড় হয় না, আবার কেবল উদার নীতির ওপরও টিকে থাকতে পারে না। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে ওঠে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা আর আস্থার সুষম মেলবন্ধনে। বিএসইসি এখন আর লেনদেনের ভলিউমকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি না ভেবে একটি টেকসই ও মৌলভিত্তিক বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে যা দীর্ঘমেয়াদে প্রশংসনীয়।

তবে আমাদের বাজারটি এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি; এখানে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্যই বেশি। তাই এমন কোনো নীতি হুট করে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের বাজারবিমুখ করে তোলে। তিন লাখ টাকার বিনিয়োগের শর্ত কিংবা নোটিশ ছাড়া বাধ্যতামূলক বিক্রির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। উন্নত বিশ্বের মতো বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা, লেনদেনের ইতিহাস ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে একটি ‘ঝুঁকিভিত্তিক মার্জিন ব্যবস্থা’ (Risk-based margin system) প্রবর্তনের কথা ভাবা যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, শুধু মার্জিন বিধিমালা সংশোধন করলেই বাজারের সব রোগ ভালো হবে না। ভালো মানের নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। কারণ, একজন বিনিয়োগকারী তখনই মার্জিন ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারবেন, যখন তিনি ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হবেন। আর সচেতন বিনিয়োগকারী তৈরি হয় শিক্ষা, সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি এবং স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে; কেবল বিধিনিষেধের বেড়াজালে নয়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীরা যখন বিশ্বাস করবেন যে নিয়মকানুন তাঁদের শুধু বেঁধে রাখার জন্য নয়, বরং তাঁদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হয়েছে তখনই বাজারে সুদিন ফিরবে। মার্জিন বিধিমালার এই খসড়া সেই আস্থার ভিত্তি গড়ার এক মোক্ষম সুযোগ। এখন দায়িত্ব বিএসইসির জনমতের আলোকে এমন একটি চূড়ান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধিমালা উপহার দেওয়া, যা একদিকে বাজারকে ঝুঁকিমুক্ত করবে, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতিকে করে তুলবে আরও শক্তিশালী।

Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর