প্রকাশিত :  ১১:৩৩
১৮ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:১০
১৮ জুলাই ২০২৬

অর্থনীতির মোড়ে বাংলাদেশ: সংস্কারের সাহসই কি ফিরিয়ে আনবে আস্থা?

অর্থনীতির মোড়ে বাংলাদেশ: সংস্কারের সাহসই কি ফিরিয়ে আনবে আস্থা?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের নতুন বাস্তবতা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা—এই দুই বাস্তবতার সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পথচলা। তাই প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও সমানভাবে শক্তিশালী করতে পারব?

২০২৬–২৭ অর্থবছরের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। সরকার ‘রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’—এই তিনটি অগ্রাধিকারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা সময়োপযোগী। তবে অর্থনীতির বাস্তবতা কেবল ঘোষণার মাধ্যমে বদলে যায় না; কার্যকর নীতি, সুশাসন, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সমন্বয়ের মাধ্যমেই তা পরিবর্তিত হয়।

সরকার ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস তুলনামূলকভাবে সংযত। এই পার্থক্য কেবল পরিসংখ্যানগত নয়; এটি নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ, রাজস্ব আহরণে সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের কার্যকর সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।

তবে অর্থনীতির সব সূচকই হতাশাজনক নয়। রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে ক্রলিং পেগভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে। কিন্তু বাহ্যিক এই স্বস্তি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারেনি।

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। খাদ্য ও অখাদ্য—উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার ইতিবাচক প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হয়।

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে। ব্যাংকগুলো যখন নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক হয়ে পড়ে, তখন শিল্পে বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেসরকারি খাতের অর্থায়নের সুযোগ আরও সীমিত করে দিতে পারে।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেশের পুঁজিবাজারেও স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে বাজার আস্থার সংকটে ভুগছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এখনো অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বল্পতা, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম বাজারের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কয়েকটি উদ্যোগ নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা উৎসাহিত করা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং বাজারে তারল্য বৃদ্ধির উদ্যোগ—এসব পদক্ষেপ সঠিক দিকেই এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে কেবল নীতিগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়নই হবে প্রকৃত পরীক্ষার বিষয়।

সাম্প্রতিক লেনদেনে সূচকের সাময়িক সংশোধনকে তাই অস্বাভাবিক বলে দেখার কারণ নেই। ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বরং এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অংশগ্রহণ। মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাজার আরও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর নির্ভর করছে। রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এই চারটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি অপরিহার্য।

অর্থনীতির ইতিহাস আমাদের শেখায়, সংকট কোনো জাতির শেষ কথা নয়; সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাই একটি জাতির প্রকৃত শক্তি। বাংলাদেশের সামনে এখনো সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের মোহ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথেই অবিচল থাকতে হবে। অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। সেই ভিত্তি যত দৃঢ় হবে, ততই শক্তিশালী হবে দেশের পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থা।


Leave Your Comments




জাতীয় এর আরও খবর