প্রকাশিত : ১১:৪২
১৭ জুলাই ২০২৬
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে লিওনেল মেসিকে বিবেচনা করা হয়। আর তারই সাবেক ক্লাব বার্সেলোনায় ডান প্রান্তে খেলেই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে চলেছেন লামিনে ইয়ামাল, যাকে অনেকেই মেসির যোগ্য উত্তরসূরি বলে মনে করছেন।
তবে এবারই প্রথম মাঠের লড়াইয়ে একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। আগামী রবিবার বিশ্বকাপের ফাইনালে শিরোপা নির্ধারণী মহারণে নামছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন।
মেসির বর্তমান বয়স ৩৯, আর ইয়ামালের মাত্র ১৯। একজনের অবিশ্বাস্য দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং অন্যজনের বিস্ময়কর প্রতিভার যুগলবন্দিতেই ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একই ম্যাচে দেখা যাচ্ছে দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকাকে।
তবে ফুটবল বিশ্বের জন্য এটিই প্রথম হলেও, তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল আরো ১৯ বছর আগে। ২০০৭ সালে ২০ বছর বয়সী মেসি যখন বার্সেলোনার মূল একাদশে নিজের জায়গা পাকা করছেন, লামিনে ইয়ামালের বয়স তখন মাত্র পাঁচ মাস।
বার্সেলোনার তৎকালীন মাঠ ক্যাম্প ন্যুর অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ত। ২০২৪ সালে স্পেনকে ইউরো জেতাতে ইয়ামাল অবিশ্বাস্য ভূমিকা রাখার পর তার বাবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ছবিগুলোর একটি প্রকাশ করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘দুই কিংবদন্তির সূচনা।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, হাসিমুখে ছোট্ট এক শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করছেন এবং গোসল করিয়ে দিচ্ছেন মেসি। সেই শিশুই যে পরবর্তীতে মেসির পথ অনুসরণ করে বিশ্ব কাঁপাবে, তা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বিবিসি স্পোর্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফটোগ্রাফার মনফোর্ত বলেন, ‘এটি সত্যিকার অর্থেই নিয়তির এক অলৌকিক ঘটনা। এমন এক কাকতালীয় ঘটনা, যা আপনি কল্পনার বাইরেও ভাবতে পারবেন না। যদি এটি কোনো সিনেমার গল্প হতো, তাহলে মানুষ বিশ্বাসই করত না।
মেসি খুবই শান্ত ও লাজুক স্বভাবের মানুষ। ড্রেসিংরুমে এসে হঠাৎ একটি ছোট্ট শিশুকে দেখে কী করতে হবে, তিনি বুঝতেই পারছিলেন না। তবে ইয়ামাল ছিল খুব হাসিখুশি শিশু।’
ইয়ামালের বাবা মরক্কো বংশোদ্ভূত মুনির নাসরাউই এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির শেইলা এবানা। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে কাতালোনায় চলে আসা এই দম্পতির প্রথম সন্তান ইয়ামাল। আর তার জন্মের কিছুদিন পরই তার পরিবার কাতালান সংবাদপত্র স্পোর্ট, বার্সেলোনার জার্সি স্পন্সর এবং ইউনিসেফের যৌথ আয়োজিত একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বার্সার প্রথম দলের খেলোয়াড়ের সাথে ফটোশুটের সুযোগ পায়।
দলের ১২ জন ফুটবলারকে ক্যালেন্ডারের জন্য বছরের ১২টি মাসের প্রতীক করে একেকটি শিশুর সঙ্গে জুটি গড়ে দেওয়া হতো। অনেক পরিবার অংশ নিয়েছিল সেই আয়োজনে। আর ভাগ্যক্রমে ইয়ামালের পরিবারের জন্য লটারি জেতার মতো করে নির্ধারিত হন মহাতারকা লিওনেল মেসি।
অনেকেই মনে করেন, ‘ইয়ামাল’ তার পারিবারিক পদবি, যা আসলে ভুল। তার পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। আর্থিক সংকটের সময় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো দুই বন্ধুর সম্মানে তার বাবা নাম রেখেছিলেন লামিনে (আরবিতে যার অর্থ সৎ বা বিশ্বস্ত) ও ইয়ামাল (যার অর্থ সৌন্দর্য বা মাধুর্য)। বার্সেলোনা থেকে প্রায় ২০ মাইল উত্তরে মাতারোর শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায় বেড়ে ওঠা ইয়ামাল গোল করার পর আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ ইশারা করে নিজ এলাকার পোস্টকোডের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এল পাইসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মা-বাবার ত্যাগের কথা স্মরণ করে আবেগঘন কণ্ঠে ইয়ামাল বলেন, ‘অর্থ না থাকলে সন্তানের ফুটবল খেলার স্বপ্ন পূরণ করা খুব কঠিন। কিন্তু আমার বাবা-মা সেটা সম্ভব করেছেন। তাদের এই ঋণ আমি কোনো দিন শোধ করতে পারব না।’
কাতালান ও বার্সেলোনা সমর্থক জোয়ান মনফোর্তের কাছে বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসি ও ইয়ামালের মুখোমুখি হওয়া প্রায় দুই দশক আগে শুরু হওয়া এক অসাধারণ গল্পের পরিপূর্ণ সমাপ্তি।
১৯ বছর বয়সে মেসির ক্যারিয়ারে গোল ছিল ১১টি, জিতেছিলেন একবার করে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। অন্যদিকে, সোমবার ১৯ বছরে পা রাখা লামিনে ইয়ামাল ইতোমধ্যেই ৫৬টি গোল করার পাশাপাশি তিনবার লা লিগা, একবার কোপা দেল রে এবং ইউরো ২০২৪ জিতেছেন।
মনফোর্তে বলেন, ‘আমার মনে হয়, তাদের গল্পের চক্রটি এখন সম্পূর্ণ হতে যাচ্ছে। মেসি যদি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারেন, সেটাই হবে সবচেয়ে উপযুক্ত বিদায়। তবে ইয়ামাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লামিনের সামনে এখনো অনেক সময় আছে। তবে স্পেন ও ইয়ামাল এখন দারুণ ছন্দে আছে। যদি এবারই বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে সেটি তার অন্য সব শিরোপার চেয়েও বেশি মূল্যবান হবে।’ সব শেষে মনফোর্তের কণ্ঠে ঝরে পড়ল আবেগ, ‘আমার জন্য বিষয়টি খুব কঠিন। মনে হচ্ছে, আমার হৃদয় যেন দুই টুকরো হয়ে যাচ্ছে।’