প্রকাশিত :  ০৫:৩৭
১৫ জুলাই ২০২৬

শিকারির বন্দুক থেকে অরণ্যের অভিভাবক: সীতেশ রঞ্জন দেবের অসমাপ্ত গল্প

শিকারির বন্দুক থেকে অরণ্যের অভিভাবক: সীতেশ রঞ্জন দেবের অসমাপ্ত গল্প

সংগ্রাম দত্ত: এক সময় তাঁর হাতে ছিল বন্দুক। পরে সেই হাতই আহত উল্লুকের মাথায় স্নেহের স্পর্শ দিয়েছে, রক্তাক্ত মেছোবাঘকে কোলে তুলে নিয়েছে, বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে থাকা একটি বনরুইকে ফিরিয়ে দিয়েছে বাঁচার আশা।

জীবনের এই বিরল রূপান্তরের নাম সীতেশ রঞ্জন দেব।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এই পথিকৃৎ। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শ্রীমঙ্গলের পাহাড়, বন আর চা-বাগানের শহরে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। কারণ, এখানকার মানুষ জানেন—এ শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; শেষ হয়ে গেল এক দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন্ত অধ্যায়।

শিকারির পরিবারেই জন্ম সীতেশ রঞ্জন দেবের। ১৯৪৮ সালে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী নোয়াগাঁও গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা শ্রীশ চন্দ্র দেব ছিলেন তৎকালীন সময়ের পরিচিত শিকারি। কিন্তু তিনি শুধু শিকার করেই থেমে থাকেননি। আহত বন্যপ্রাণীর জন্য নিজের বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছিলেন একটি ছোট আশ্রয়কেন্দ্র। সেই উঠোনেই বড় হয়েছেন সীতেশ।

শৈশবেই তিনি শিখেছিলেন বনের ভাষা। কোন প্রাণী কীভাবে চলে, কীভাবে ভয় পায়, কীভাবে আঘাত পেলে আচরণ বদলায়—এসব তাঁর কাছে বইয়ের জ্ঞান ছিল না, ছিল জীবনের অভিজ্ঞতা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেই ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর আবার নতুন করে শুরু। শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাড়ির আঙিনায় কয়েকটি আহত প্রাণীকে নিয়ে শুরু হয় নতুন পথচলা।

এরই মধ্যে জীবনের আরেক অধ্যায়ে তিনি পেশাদার শিকারিও হয়েছেন। সে সময় প্রচলিত আইন মেনেই শিকার করতেন। কিন্তু বনই তাঁকে একদিন নতুন শিক্ষা দেয়।

তিনি বুঝেছিলেন, বনের প্রাণীরা মানুষের শত্রু নয়; বরং মানুষেরই সবচেয়ে অসহায় প্রতিবেশী।

সেই উপলব্ধিই বদলে দেয় তাঁর জীবন।

বন্দুক ধীরে ধীরে নেমে আসে। হাতে উঠে আসে ওষুধের বাক্স, দুধের বোতল, ব্যান্ডেজ আর ভালোবাসা।

এরপর শুরু হয় বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এক অনন্য অধ্যায়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আহত, অসুস্থ কিংবা বিপন্ন প্রাণী আসতে শুরু করে তাঁর কাছে। বন বিভাগ, প্রশাসন কিংবা সাধারণ মানুষ জানতেন—শেষ ভরসার জায়গা যদি কোথাও থাকে, তবে সেটি শ্রীমঙ্গলের সেই মানুষটির কাছে।

শুধু বন বিভাগ বা স্থানীয় মানুষের মধ্যেই তাঁর পরিচিতি সীমাবদ্ধ ছিল না। মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। বিশেষ করে সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যাংকার এবং সামরিক বাহিনীর অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ফাউন্ডেশনের প্রয়োজনীয় সহায়তার ক্ষেত্রে এই সম্পর্কগুলো নানা সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় মানুষ জায়গাটির নাম দিয়েছিলেন ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’।

কিন্তু তিনি আপত্তি করতেন।

বলতেন, "এটা চিড়িয়াখানা নয়। এটা আহত প্রাণীদের হাসপাতাল, পুনর্বাসনকেন্দ্র। সুস্থ হলেই ওদের আবার বনে ফিরে যেতে হবে।"

পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গলের রূপসপুরে নিজের সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।

আজ এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র।

এখানে আশ্রয় পেয়েছে মেছোবাঘ, সোনালি বিড়াল, ভল্লুক, উল্লুক, চশমা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, বনরুই, গন্ধগোকুল, অজগর, ধনেশ, শঙ্খিনীসহ অসংখ্য বিরল প্রাণী।

এখানেই একাধিকবার অজগরের ডিম ফুটেছে। জন্ম হয়েছে সোনালি বিড়াল ও মেছোবাঘের শাবকের। সুস্থ হওয়ার পর অনেক প্রাণীকেই আবার বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সীতেশ রঞ্জন দেব বলতেন, গত এক দশকেই অন্তত এক হাজার আহত বন্যপ্রাণী চিকিৎসার পর আবার প্রকৃতিতে ফিরে গেছে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আসে ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি।

কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা-বাগানে বন্য শূকরের উপদ্রবের খবর পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু গভীর ছনবনের ভেতর আচমকাই মুখোমুখি হন একটি বিশাল ভালুকের।

এক মুহূর্তের মধ্যে সব বদলে যায়।

ভালুকের থাবায় তাঁর মুখের ডান পাশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি চোখ। রক্তাক্ত অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হন তিনি।

এরপর দীর্ঘ চিকিৎসা।

ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সাতবার অস্ত্রোপচার, ২৯ ব্যাগ রক্ত, পরে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও সেই ক্ষতচিহ্ন সারাজীবন বহন করেছেন।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছিল তাঁর ভেতরে।

এরপর তিনি আর কখনও শিকারির পরিচয়ে ফিরতে চাননি।

প্রায়ই বলতেন, "এক সময় শিকার করেছি। এখন মনে করি, আগামী প্রজন্মের জন্য বন্যপ্রাণী বাঁচিয়েই যেতে হবে।"

ফাউন্ডেশন পরিচালনা সহজ ছিল না।

প্রতিদিন প্রাণীদের খাদ্য, চিকিৎসা, ওষুধ আর পরিচর্যায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতো। একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সীতেশ রঞ্জন দেব কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর সেই সহযোগিতার কথা স্মরণ করতেন।

শেষ বয়সেও তিনি প্রায় নিয়মিত ফাউন্ডেশনে যেতেন।

কর্মীরা বলেন, প্রাণীগুলো যেন তাঁকে চিনত। তিনি ঢুকলেই কেউ খাঁচার কাছে ছুটে আসত, কেউ ডাক দিত, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে থাকত। তিনি সন্তানের মতো তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন।

আজ সেই দায়িত্ব বহন করছেন তাঁর দুই ছেলে—স্বপন দেব সজল ও সঞ্জিত দেব। বাবার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

সীতেশ রঞ্জন দেবের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের সম্পর্ক ছিল কেবল সংবাদকর্মীর নয়।

তিনি ছিলেন পরিবারের মানুষ।

আমার বাবাকে তিনি স্নেহভরে ‘কাকাবাবু’ বলে ডাকতেন। আমাদের দুই পরিবারের শিকড় একই গ্রাম—নোয়াগাঁও।

শেষবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর।

অনেক দিন পর তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। শরীর ভালো ছিল না। বিদায় নিতে চাইলে হেসে বলেছিলেন,"এত দিন পর এসেছ, চা খেয়ে যেও।"

চা আসতে কিছুটা সময় লেগেছিল। সেই ফাঁকে গল্প করেছিলেন নানা বিষয় নিয়ে।

বিদায়ের সময় বলেছিলেন,"একদিন সময় করে এসো। তোমার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করব।"

সেদিন জানতাম না, সেই কথাই থেকে যাবে অসমাপ্ত।

আজ তিনি নেই।

তবু তিনি হারিয়ে যাননি।

যখন কোনও আহত উল্লুক আবার লাউয়াছড়ার গাছে ফিরে যাবে, যখন কোনও মেছোবাঘ আবার রাতের বনে নিঃশব্দে হাঁটবে, যখন কোনও আহত শকুন আবার আকাশে ডানা মেলবে—সেই প্রতিটি ফিরে পাওয়ার গল্পে, প্রতিটি মুক্তির মুহূর্তে বেঁচে থাকবেন সীতেশ রঞ্জন দেব।

মানুষের মৃত্যু হয়।

কিন্তু কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও একটি অরণ্যের শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে বেঁচে থাকেন।

সীতেশ রঞ্জন দেব তাঁদেরই একজন।




Leave Your Comments




ভ্রমণ এর আরও খবর