প্রকাশিত : ০৭:০৯
১৪ জুলাই ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এক অনন্য নাম সীতেশ রঞ্জন দেব আর নেই। শিকারি থেকে বন্যপ্রাণীর রক্ষকে পরিণত হওয়া এই মানুষটি মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা এবং সুস্থ হওয়ার পর আবার বনে অবমুক্ত করার কাজে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন তিনি। শ্রীমঙ্গলের রূপসপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’ দেশের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তি উদ্যোগের বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এখনও ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামেই বেশি পরিচিত।
সীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে শুধু শ্রীমঙ্গল নয়, দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অঙ্গন হারাল এক অগ্রদূতকে—যিনি নিজের জীবন, সম্পদ ও সময় উৎসর্গ করেছিলেন এমন সব প্রাণীর জন্য, যাদের অনেকেরই আর কোনো আশ্রয় ছিল না।
শিকারের পরিবারে জন্ম, পথচলার শুরু
১৯৪৮ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সীতেশ রঞ্জন দেব। তাঁর পিতা প্রয়াত শ্রীশ চন্দ্র দেব ছিলেন একসময়কার সুপরিচিত শিকারি ও প্রকৃতিপ্রেমী। ষাটের দশকে তিনি নিজ উদ্যোগে বাড়ির আঙিনায় একটি ছোট্ট বন্যপ্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লালন-পালন ও পরিচর্যা করা হতো।
শৈশব থেকেই বাবার সঙ্গে বন-জঙ্গল ঘুরে পশুপাখি চেনা, তাদের আচরণ বোঝা এবং পরিচর্যার মধ্য দিয়েই বড় হন সীতেশ।
তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়াগাঁও গ্রামের সেই প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে নিজের বাড়ির আঙিনায় আবারও ছোট পরিসরে প্রাণী পরিচর্যার কাজ শুরু করেন তিনি।
শিকারির জীবন থেকে সংরক্ষকের পথে
তরুণ বয়সে বাবার মতোই শিকারের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। দীর্ঘ সময় তিনি পেশাদার শিকারি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উপলব্ধি বদলে যায়।
যে মানুষ একসময় অস্ত্র হাতে বনে প্রবেশ করতেন, তিনিই পরে আহত ও বিপন্ন প্রাণীদের আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠেন।
নিজেই একাধিকবার বলেছিলেন “একসময় শখের বশে শিকার করেছি। এখন মনে করি, বন্যপ্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আগামী প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করতেই হবে।”
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা
সীতেশ রঞ্জন দেবের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি।
কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা-বাগানে বন্য শূকরের উপদ্রব ঠেকাতে গিয়ে গভীর ছনবাগানে একটি বিশালাকৃতির ভালুকের মুখোমুখি হন তিনি। অপ্রস্তুত অবস্থায় ভালুকটি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ভালুকের আক্রমণে তাঁর মুখের ডান পাশ, একটি চোখ ও চোয়াল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তাক্ত অবস্থায়ও আত্মরক্ষার্থে তিনি ভালুকটিকে গুলি করেন।
পরে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। সাতটি অস্ত্রোপচার, ২৯ ব্যাগ রক্ত এবং পরে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে প্রাণে বাঁচলেও তাঁর মুখে সেই আঘাতের স্থায়ী চিহ্ন রয়ে যায়।
এই ঘটনার পর তাঁর জীবনদর্শনে আরও বড় পরিবর্তন আসে। শিকার ছেড়ে পুরোপুরি প্রাণী সংরক্ষণেই নিজেকে নিয়োজিত করেন।
একটি আশ্রয়কেন্দ্রের জন্ম
প্রথমে নিজের বাড়ির আঙিনায় গড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রটি সময়ের সঙ্গে বড় হতে থাকে।
২০০৯ সালে এটি শ্রীমঙ্গল শহরতলির রূপসপুর গ্রামের প্রায় সাড়ে পাঁচ বিঘা জমির খামারবাড়িতে স্থানান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে সরকারের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সীতেশ রঞ্জন দেব সবসময় তাঁর এই অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতেন।
আহত প্রাণীদের শেষ আশ্রয়
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সাধারণ মানুষ আহত বা বিপন্ন প্রাণী উদ্ধার করে এই ফাউন্ডেশনে নিয়ে আসতেন।
এখানে প্রাণীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সুস্থ হলে আবার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ দেশের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করা হতো।
স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে সীতেশ রঞ্জন দেব এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে অবমুক্তির জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এটি দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া গত এক দশকে অন্তত এক হাজার আহত ও অসুস্থ বন্যপ্রাণী চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে পুনরায় প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব।
যেসব প্রাণী আর বনে টিকে থাকতে সক্ষম নয়, তাদের স্থায়ীভাবে ফাউন্ডেশনেই পরিচর্যা করা হতো।
বিরল প্রাণীর নিরাপদ আবাস
ফাউন্ডেশনটিতে বর্তমানে অর্ধশতাধিক বিরল ও বিপন্ন প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেছো বিড়াল (মেছো বাঘ), সোনালি বিড়াল, ভল্লুক, উল্লুক, চশমা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, বনরুই, গন্ধগোকুল, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, অজগর, ধনেশ, শকুন, পেঁচা, শঙ্খিনীসহ নানা প্রজাতির সাপ এবং অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখি।
উত্তরাধিকার
বয়সের ভারে শেষ কয়েক বছরে তিনি নিয়মিত কাজ করতে না পারলেও সপ্তাহে কয়েক দিন ফাউন্ডেশনে গিয়ে প্রাণীদের খোঁজ নিতেন।
বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে—স্বপন দেব সজল ও সঞ্জিত দেব—ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁরা বাবার স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
প্রকৃতি সংরক্ষণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে সীতেশ রঞ্জন দেব একটি ব্যতিক্রমী নাম।
একসময় যিনি ছিলেন শিকারি, শেষ জীবনে তিনিই হয়ে ওঠেন আহত প্রাণীদের আশ্রয়দাতা।
শ্রীমঙ্গলের বন, পাহাড় আর হাওরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটি আজ নেই। কিন্তু তাঁর হাতে গড়া বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা প্রায় দুই হাজারের বেশি উদ্ধার করা বন্যপ্রাণী, সুস্থ হয়ে প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়া অসংখ্য প্রাণী এবং সংরক্ষণের যে দর্শন তিনি রেখে গেলেন—সেটিই হয়ে থাকবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।