প্রকাশিত : ১৮:৫৫
১০ জুলাই ২০২৬
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আসসালামু আলাইকুম।
আমি করিম চাচা। আমার কোনো বড় পরিচয় নেই, কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পদবি নেই, নেই কোনো ক্ষমতা বা মঞ্চ। নামের পাশে যুক্ত করার মতো কোনো ডিগ্রিও সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেননি। আমি এই দেশের লাখো-কোটি খেটে খাওয়া ব্রাত্য মানুষের একজন—যাদের হাতের কড়া, কপালের ঘাম আর বুকের দীর্ঘশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে রাজকীয় শহরগুলো জেগে ওঠে; অথচ সন্ধ্যা নামলে আমাদের নামটুকু মনে রাখার মতো ফুরসত কারও থাকে না।
আজ আমি কোনো নালিশ নিয়ে আসিনি। নালিশ করার অধিকারটুকুও যেন আমাদের জন্মসনদের সঙ্গেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমি শুধু কিছু কথা রেখে যেতে চাই। যদি কোনোদিন এই চিঠি কোনো মন্ত্রীর টেবিলের কোণে পৌঁছায়, কোনো অর্থনীতিবিদের গবেষণাপত্রের ভাঁজে জায়গা পায়, কোনো বিচারকের চোখ ছুঁয়ে যায় কিংবা কোনো সন্তানের বুক কাঁপিয়ে দেয়—তাহলেই জানব, আমার এই ভাঙা কলমের আঁচড় বৃথা যায়নি।
কয়েক দিন আগে আমার আজন্মের বন্ধু মোহর আলী চলে গেল। না, সংবাদপত্রের ভেতরের পাতাতেও তার মৃত্যুর খবর ছাপা হয়নি; টেলিভিশনের স্ক্রিনে কোনো ‘ব্রেকিং নিউজ’ হয়ে ভেসে ওঠেনি তার নাম। কারণ, গরিব মানুষের চলে যাওয়া কখনো জাতীয় সংবাদ হয় না। কিন্তু আমি জানি, সেদিন শুধু একজন মানুষ মারা যায়নি, আমাদের সামষ্টিক বিবেকের একটা অংশও নিঃশব্দে চিতা বা কবরের আঁধারে তলিয়ে গেছে।
মোহর আলী মৃত্যুর আগে আমার কাছে একটা প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল—“দেশের উন্নয়নের জন্য যে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়, সেই ঋণের বোঝা কি আমার রতনের কাঁধেও চাপবে?”
আমি সেই প্রশ্নের উত্তর জানি না। হয়তো আপনারা জানেন, কিংবা হয়তো আপনারাও জানেন না। তবে একটা রূঢ় সত্য আমি জানি—ঋণের কিস্তি শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যাংক শোধ করে না; কখনো কখনো তা শোধ হয় একজন রিকশাচালকের ক্ষয়ে যাওয়া হাঁটু, একজন দিনমজুরের ভাঙা কোমর, একজন কৃষকের বিনিদ্র রাত, একজন মায়ের না-খেয়ে থাকা অন্ধকার আর একটা শিশুর অপূর্ণ শৈশব দিয়ে।
আপনারা যখন বলেন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা বিশ্বাস করতে চাই। আমরাও তো চাই এই দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। নতুন সেতু হোক, নতুন বন্দর হোক, নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠুক—এ তো আমাদেরও স্বপ্ন। কিন্তু উন্নয়নের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ভাগ্যে যদি শুধু অবহেলা আর কষ্টই জমা হয়, তবে সেই ঝলমলে পথের পাশে একটু থমকে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার—রাষ্ট্র কি শুধু ইট-পাথরের ভবন বানায়? রাষ্ট্র কি শুধু মসৃণ রাস্তা আর জিডিপির পরিসংখ্যানের হিসাব রাখে? না। রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব মানুষের স্বপ্ন রক্ষা করা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র তো হওয়ার কথা ছিল একজন বৃদ্ধ বাবার শেষ আশ্রয়স্থল।
আমি জীবনের তাগিদে অনেক বাবা দেখেছি। কেউ ইটভাটায় পুড়ছে, কেউ রিকশার প্যাডেল ঘোরাচ্ছে, কেউ রোদে পুড়ে মাঠে লাঙল ধরেছে, কেউবা নদী-সাগরে জাল ফেলছে। দিন শেষে তাদের সবার অবয়ব একই—ফাটা তালু আর সন্তানের জন্য বুকভরা অশেষ দোয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই দেশ যত আধুনিক হচ্ছে, আমরা যেন ততই আমাদের শেকড় থেকে, আমাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের বিত্ত বাড়ছে, কিন্তু চিত্ত কি বড় হচ্ছে? আমরা ধনী হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতরের কৃতজ্ঞতাবোধটুকু কি বেঁচে আছে?
মোহর আলীর ছেলে মানিক শেষ মুহূর্তে এসে বাবার হাতটা ধরেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সেই হাত বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে গেলে ফিরিয়ে আনা যায়—হারানো টাকা ফিরে আসে, দেউলিয়া ব্যবসা আবার দাঁড়ায়, ভেঙে যাওয়া ঘরও নতুন করে তৈরি করা যায়। কিন্তু বাবার শেষ নিঃশ্বাসটা আর কোনোদিন, কোনো উপায়েই ফিরিয়ে আনা যায় না।
তাই আমার দেশের তরুণদের উদ্দেশে বলতে চাই—যদি বাবা ফোন করেন, ব্যস্ততার অজুহাতে কলটা কেটে দিও না। যদি মা পথ চেয়ে বসে থাকেন, তাঁকে অপেক্ষার নিষ্ঠুর শাস্তি দিও না। একদিন তোমরাও বাবা হবে, তোমাদের চুলও সাদা হবে। সেদিন বুঝবে—অপেক্ষারও একটা নিজস্ব শব্দ আছে, যা শুধু নিঃসঙ্গ বাবা-মায়ের বুকেই প্রতিধ্বনিত হয়।
আর রাষ্ট্রের সম্মানিত কর্ণধারদের বিনীতভাবে বলতে চাই—একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জিডিপির অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না, তা লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির ঠোঁটের হাসিতে। যে দেশে একজন বৃদ্ধ মানুষ সামান্য ওষুধ কিনতে না পেরে নীরবে কাঁদে, সেই দেশের উন্নয়নের গল্প চিরকাল অসম্পূর্ণই থেকে যায়। যে দেশে একজন প্রতিবন্ধী সন্তান চিকিৎসার অভাবে বিছানায় পচে মরে, সেখানে শুধু গগনচুম্বী সেতু নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। যে দেশে একজন শ্রমিক নিজের পেশার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে, সেখানে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ সবার কাছে পৌঁছায়নি।
আমি জানি, সব সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু একটি সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত, একটি ন্যায়সঙ্গত নীতি আর সামান্য একটু মানবিক আচরণ হাজারো মানুষের অন্ধকার জীবনকে বদলে দিতে পারে। মনে রাখবেন—ক্ষমতা, চেয়ার কিংবা সম্পদ—কোনোটিই স্থায়ী নয়। যুগে যুগে স্থায়ী হয়ে থাকে শুধু মানুষের জন্য করা কল্যাণকর কাজ। আর জেনে রাখুন, মজলুমের দীর্ঘশ্বাস ও অভিশাপ কিন্তু বহুদূর পর্যন্ত গিয়ে আঘাত করে। আজ যদি আপনারা একজন আর্ত মানুষের কান্না এড়িয়ে যান, কাল ইতিহাস আপনাদের এই নীরবতার নির্মম হিসাব রাখবে।
পরিশেষে একটি কথাই বলতে চাই—যেদিন এই দেশের কোনো শিশু ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদবে না, যেদিন কোনো মা হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় মারা যাবেন না, যেদিন কোনো বৃদ্ধ বাবাকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বাঁচতে হবে না এবং যেদিন একজন শ্রমিক তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগে ন্যায্য মজুরি পাবে—সেদিনই আমরা সত্যিকারের উন্নত দেশ হব। সেদিনই কেবল ওপারে থাকা মোহর আলীর আত্মা তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাবে।
আর যদি সেই দিন না আসে, তবে হাজারো সেতু, লাখ কোটি টাকার মেগাপ্রজেক্ট, সুউচ্চ দালান আর ঝকঝকে আধুনিক শহরও আমাদের আত্মিক ও বিবেকের শূন্যতা ঢাকতে পারবে না। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ইট-পাথরের উচ্চতা মাপে না; ইতিহাস মাপে—একটি জাতি তার সবচেয়ে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষটির সঙ্গে কতটা ন্যায়বিচার করেছে।
আল্লাহ আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ দান করুন, যেখানে উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং সহমর্মিতা সমানভাবে প্রতিফলিত হবে।
ইতি,