প্রকাশিত : ১২:১৬
০৪ জুলাই ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও বৈপরীত্যময় সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। একদিকে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন খেলাপি ঋণের সংকট, ডলারের বাজারে অস্থিরতা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো নেতিবাচক ঘটনা অভ্যন্তরীণ বাজারকে চরম চাপে রেখেছে। অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্সের জোয়ার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বহু মাস পর স্বস্তির নিঃশ্বাস এবং দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দা কেটে আকস্মিক ও নাটকীয় পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। ২০২৬ সালের শেষে এসে এই জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেমন সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের আশা জাগাচ্ছে, তেমনি কাঠামোগত সংস্কারে ব্যর্থ হলে এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার সতর্কবার্তাও দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের প্রাক্কালে সামষ্টিক অর্থনীতির এই দ্বিমুখী স্রোত নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পুঁজিবাজারে অভূতপূর্ব জোয়ার: দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বিস্ময়কর দিনবদল
দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে অবদমিত ও আস্থার সংকটে ধুঁকতে থাকা দেশের পুঁজিবাজার সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক অবিশ্বাস্য ও যুগান্তকারী ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং তীব্র সংকোচনশীল মুদ্রানীতির মধ্যেও দেশের শেয়ারবাজার যে গতিশীলতা দেখিয়েছে, তা গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
নতুন অর্থবছরের প্রাক্কালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯ শতাংশ বা ৯২৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫,৭৬২ পয়েন্টে এসে স্থির হয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২,১৭৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সূচকের এই দ্রুত উত্থানের চেয়েও বড় আশার আলো দেখিয়েছে বাজারে বিনিয়োগকারীদের রেকর্ড অংশগ্রহণ ও দৈনিক লেনদেনের উল্লম্ফন। অর্থবছরের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ১,৫৭৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৪৬৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামগ্রিক বাজার মূলধন ৩৬,৪২১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯৮ লাখ কোটি টাকায়। খাতভিত্তিক লেনদেনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেক্সটাইল খাত ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ লেনদেনের অংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে; এর পরেই ব্যাংকিং খাত ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাত ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।
আঞ্চলিক বাজারে অন্যান্য সমকক্ষদের তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের এই পারফরম্যান্স বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের বেঞ্চমার্ক সূচক ডিএসইএক্স ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ রিটার্ন দিয়ে এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারফর্মার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা কেবল থাইল্যান্ডের এসইটি সূচকের ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ রিটার্নের পেছনে রয়েছে। একই সময়ে ভিয়েতনামের ভিএনইনডেক্স মাত্র ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানের কেএসই সূচক ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ লাভ করতে পেরেছে। অন্যদিকে ভারতের বিএসই সেনসেক্স ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার জেইসিআই সূচক রেকর্ড ৩৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ সংকোচনের শিকার হয়েছে। ৯ দশমিক ১ শতাংশের আকর্ষণীয় মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) এবং ৫ দশমিক ১৭ শতাংশের উচ্চ লভ্যাংশ ফলন (ডিভিডেন্ড ইয়েল্ড) বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদী মূল্য-সন্ধানী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক করে তুলেছে।
শেয়ারবাজারের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে মূলত নতুন সরকারের সংস্কারমুখী জোরালো পদক্ষেপ ও নীতিগত প্রণোদনা কাজ করেছে। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকার পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাত ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয় এবং দীর্ঘ ৪০ বছরের করপোরেট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মাসুদ খানকে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন নেতৃত্ব পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের গলার কাঁটা 'ফ্লোর প্রাইস' বা কৃত্রিম মূল্যসীমা সম্পূর্ণ তুলে দিয়ে বাজারকে উন্মুক্ত করে দেয়, যার ফলে তারল্য সংকট কেটে যায়।
এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে করনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর হ্রাস, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর আরও ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের সীমা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং জিরো কুপন বন্ড থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত রাখার মতো যুগান্তকারী প্রণোদনা সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের বিশেষ ব্যাংক হিসাব (নিটা) পরিচালনার জটিল নিয়ম সহজীকরণ করে এবং দেশের প্রধান দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নিজেদের সার্কিট ব্রেকার ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মাপকাঠি নির্ধারণের স্বায়ত্তশাসন দেয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির প্রবাহ বাড়িয়েছে।
পুঁজিবাজারের এই চাঙা ভাবকে টেকসই করতে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বাকি। বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের তীব্র ঘাটতি রয়েছে, যা মৌলভিত্তিহীন দুর্বল বা বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে কারসাজির ঝুঁকি তৈরি করে। বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে ১২৫টি (প্রায় ৩৫ শতাংশ) অনিয়মিত লভ্যাংশ ও সাধারণ সভা করতে ব্যর্থ হওয়ায় 'জেড' শ্রেণীতে পড়ে রয়েছে এবং ৩৩টি কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। বন্ধ ও অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দিতে ডিএসই ইতোমধ্যে একটি বাধ্যতামূলক ডিলিস্টিং (তালিকাচ্যুতি) নীতিমালা অনুমোদনের জন্য বিএসইসিতে পাঠিয়েছে, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় স্পন্সর পরিচালকদের শেয়ার পুনঃক্রয় (বাইব্যাক) বাধ্যবাধকতা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তদুপরি, সূচকের বড় উন্নতির পর বাজার স্বাভাবিকভাবে মুনাফা তুলে নেওয়ার (প্রফিট টেকিং) কারণে কিছুটা সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের বিপুল মূলধনী শেয়ার থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে নেওয়ায় সূচকে সাময়িক পতন ঘটেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই বাজার গঠনের স্বাভাবিক ও সুস্থ প্রক্রিয়া।
সামষ্টিক অর্থনীতির ধূসর আকাশ: মূল্যস্ফীতির থাবা ও প্রবৃদ্ধির মন্থরতা
পুঁজিবাজারের নাটকীয় উল্লম্ফন অর্থনীতিতে ইতিবাচক আবহ তৈরি করলেও বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সূচকগুলো এখনো বড় ধরনের টানাপোড়েন ও ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাহ্যিক খাতের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সচল রাখলেও অভ্যন্তরীণ বাজারের তীব্র সংকট সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের জোয়ারে দেশের বাহ্যিক খাতে এক বড় প্রতিরক্ষামূলক প্রাচীর গড়ে উঠেছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। এই উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং মুদ্রাবাজারের তারল্য নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৪ বিলিয়নেরও বেশি ডলার বাজার থেকে ক্রয়ের ফলে গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চার বছর পর আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে ৩৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া জুন মাসে রফতানি আয় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে ৪২০ কোটি ২৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে; তাতে তৈরি পোশাকের অবদান ছিল ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।
তবে বাহ্যিক খাতের এই অগ্রগতির সুফল অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনো স্বস্তি আনতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অনড়, যেখানে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম (ডিজেল ১১৫ টাকা ও অকটেন ১৪৫ টাকা প্রতি লিটার) বৃদ্ধি এবং এলপিজি গ্যাসের দাম গত তিন মাসে ১,৩৪১ টাকা থেকে বেড়ে ১,৮৮৫ টাকায় পৌঁছানোর কারণে পরিবহন ও কৃষি-শিল্পের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, কারণ শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের মজুরি বৃদ্ধির গড় হার মাত্র ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির গতির চেয়ে অনেক পিছিয়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে: প্রতি কেজি পাইজাম চাল ৬০ টাকা, মাঝারি মসুর ডাল ১১৮ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া স্বর্ণের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৪১ বার দাম বাড়ানো এবং ৪২ বার কমানো হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদী চাপে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যার ফলে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আমদানি ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে।
আর্থিক খাতের গভীরে ক্ষত: খেলাপি ঋণের বেড়াজাল ও ঋণপ্রবাহের মন্দা
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল ও সংবেদনশীল ফাটল রয়ে গেছে ব্যাংকিং ও সামগ্রিক আর্থিক খাতে। বছরের পর বছর সুশাসনের অভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ এক বিধ্বংসী স্তরে পৌঁছেছে।
সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে। যদিও এই হার পূর্ববর্তী বছরের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কম, তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, এটি কোনো প্রকৃত আদায় বা ব্যাংকিং স্বাস্থ্যের উন্নতির প্রতিফলন নয়। বরং ব্যাপক ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও রাইট-অফের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক বিবরণী আকর্ষণীয় দেখানোর চেষ্টা করেছে। প্রোভিশন সমন্বয়ের পর নিট খেলাপি ঋণের প্রকৃত হার এখনো ১৫ দশমিক ০১ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মান ৩-৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। বিপুল সম্পদ খেলাপি ঋণের পেছনে আটকে থাকায় ব্যাংকগুলো চরম তারল্য সংকট ও ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততার সম্মুখীন, যা তাদের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে।
এই তারল্য সংকটে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বকালের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। উৎপাদনশীল খাতে ঋণ সরবরাহ বন্ধ হলে নতুন কর্মসংস্থান বা শিল্পায়ন সম্ভব হয় না, যা দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে ক্ষুণ্ন করে। তাছাড়া, গত দুই বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে প্রায় ৪৫৭টি শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১৭০টি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের এবং ২৮৭টি অন্যান্য খাতের। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় দেড় লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যা শ্রমবাজারে বেকারত্ব ও সামাজিক অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট: বিশাল ঘাটতি ও দুর্বল কর-ভিত্তি
কঠিন সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার পটভূমিতে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন টাকার (প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার) বিশাল ও উচ্চাভিলাষী জাতীয় বাজেট পাস করেছে। এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির এই সংকটকালে এত বড় প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি হ্রাসের লক্ষ্য সম্পূর্ণ অবাস্তব ও স্ববিরোধী। নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে কেবল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আদায় করতে হবে ৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন টাকা। দেশের কর আদায়ের দুর্বল চিত্র (জিডিপির মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ) বিবেচনায় এনবিআরের জন্য এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দরকার, যা এককথায় অসম্ভব। ফলে বাজেটের বিশাল ঘাটতি (২ দশমিক ৪৩ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ) মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ দশমিক ২৭ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ নিতে হবে, যা বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণ সরবরাহ আরও সংকুচিত করবে।
মুদ্রানীতির ক্ষেত্রেও গভীর অসামঞ্জস্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখে সংকোচনশীল মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যা ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। এই চড়া সুদে নতুন বেসরকারি উদ্যোগ বা বিনিয়োগে গতি আসছে না, অথচ সরকার ব্যাংক থেকে ব্যাপক ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটাচ্ছে। উপরন্তু, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার মাত্র ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে; স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে তা মাত্র ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, আর রেলওয়ে ও বিদ্যুৎ বিভাগে ২১ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
জ্বালানি খাতের সংস্কারেও নীতিগত ত্রুটি দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান এবং সানেমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ গত বছরের ২ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ (১৭৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন টাকা) করা হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের স্লোগান থাকলেও উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ; বিপরীতে কয়লা আমদানি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা দেশকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল করবে।
নভেম্বর ২০২৬-এর এলডিসি উত্তরণ: শুল্ক প্রাচীর ও রফতানি সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাস এক অবিসংবাদিত ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারণ তখন দেশ এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের গ্রুপে প্রবেশ করবে। এই রূপান্তর জাতীয় গৌরবের প্রতীক হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রফতানির প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের সামনে এক বিশাল ট্যারিফ ক্লিফ সৃষ্টি করবে। এলডিসি উত্তরণের পর ইইউ’র শুল্কমুক্ত সুবিধা (এভরিথিং বাট আর্মস) হারাতে হবে, যদি না জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। ফলে পোশাক রফতানিতে ৯-১২ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হবে, যা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ১ জুলাই প্রকাশিত নতুন শ্রেণিবিন্যাসে দেখা যায়, তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ৪,৯৭০ ডলারে উন্নীত হয়ে তারা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, অথচ বাংলাদেশ এখনো নিম্ন-মধ্যম আয়ের স্তরেই আটকে রয়েছে। ভিয়েতনাম শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও মোবাইল পার্টসের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে; অথচ বাংলাদেশ এখনো রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি একক খাতের ওপর নির্ভরশীল। পণ্য সরবরাহের সময়েও (লিড টাইম) বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে সবচেয়ে ধীরগতির। চীন ৩০-৪৫ দিনে, ভিয়েতনাম ৪৫-৬০ দিনে এবং তুরস্ক ২০-৩০ দিনে পণ্য সরবরাহ করতে পারে, যেখানে কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশের গড় লিড টাইম ৯০-১২০ দিন। সস্তা শ্রমের একক সুবিধা এলডিসি উত্তরণের পর আর কার্যকর থাকবে না, যদি না প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন ঘটে।
আগামী দিনের পথরেখা: টেকসই অর্থনীতি বিনির্মাণের অগ্রাধিকার
সামগ্রিক বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ০ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ দশমিক ০ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করবে। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও টেকসই মধ্যমেয়াদী প্রবৃদ্ধি অর্জনে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে অনতিবিলম্বে সংস্কার জরুরি:
প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন পুনরুদ্ধার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কঠোর আইনি ট্রাইব্যুনাল গঠন, নিয়ম ভঙ্গকারী স্পন্সর পরিচালকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা, কৃত্রিম ঋণ পুনঃতফসিল বন্ধ করে প্রকৃত ক্ষত স্বীকার এবং আমানতকারীদের আস্থা রক্ষায় বিশ্বব্যাংক সমর্থিত ব্যাংক রেজোলিউশন ও সংস্কার নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কর সংগ্রহ ব্যবস্থার পূর্ণ অটোমেশন ও কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে হবে। ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমাতে বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদী করপোরেট অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যা ব্যাংকের ওপর চাপ কমাবে।
তৃতীয়ত, এলডিসি উত্তরণের পর বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে রফতানি বহুমুখীকরণ ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা এবং লজিস্টিকস খাতের আধুনিকায়ন জরুরি। সস্তা শ্রমের পরিবর্তে শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, বন্দর ও শুল্ক স্টেশনগুলোর হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধ এবং বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে, পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক চাঙা ভাব ও রেমিট্যান্সের জোয়ার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যে রূপান্তর করতে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা সাময়িক জোড়াতালি যথেষ্ট নয়; বরং আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিয়ম নির্মূলের জন্য নীতিনির্ধারকদের সাহসী ও কার্যকর সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে।