প্রকাশিত : ১৫:৪৩
০৩ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:২৫
০৩ জুলাই ২০২৬
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্পাত খাতের কোম্পানি ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনে এবার পর্ষদের কর্তৃত্ব নিচ্ছে আকিজ রিসোর্স।শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তরের জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) আবেদন করেছে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত লোকসানি এই কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা তাঁদের হাতে থাকা ৩০ শতাংশ শেয়ারের পুরোটাই বিক্রি করে দিতে চান শিল্পগোষ্ঠী আকিজ রিসোর্সেসের কাছে। গত ২৫ এপ্রিল কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির এই সিদ্ধান্ত হয়।
বিএসইসি ও শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শেয়ার বিক্রির জন্য এরই মধ্যে দুই পক্ষের চুক্তিও হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর এই কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। এ জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছে আবেদন করা হয়েছে। বিএসইসি এ বিষয়ে ডমিনেজ স্টিল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছে। বিএসইসির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কোম্পানিটির পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
ডমিনেজ স্টিলের পর্ষদ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা ৩ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার আকিজ রিসোর্সেস, প্রতিষ্ঠানটির মালিক শেখ জসিমউদ্দিন ও ফারিয়া হোসেনের কাছে বিক্রি করা হবে। শেয়ারবাজারের বাইরে এই শেয়ার হস্তান্তর কার্যক্রম সম্পন্ন করবে দুই পক্ষ। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা যে শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে, তা কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে শেয়ারবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হাতে।
শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দুই পক্ষের চুক্তি অনুযায়ী ডমিনেজ স্টিলের বর্তমান উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা হাতে থাকা প্রতিটি শেয়ার ১৩ টাকায় বিক্রি করছেন। যার মধ্যে ১০ টাকা কোম্পানিটির শেয়ারের অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালু। আর ৩ টাকা শেয়ারের প্রিমিয়াম বা অধিমূল্য। সেই হিসাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনতে লোকসানি এই কোম্পানিতে আকিজ রিসোর্সেস বিনিয়োগ করছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। যদিও শেয়ার কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগের অর্থ সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে শেয়ারের বিক্রয়মূল্যের বিষয়টি শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা বিক্রির উদ্যোগকে কেন্দ্র করে গত ছয় মাসে ঢাকার বাজারে লোকসানি কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৫২ টাকা বা প্রায় ১৮২ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮০ টাকা। অথচ বছরের শুরুতে গত ৪ জানুয়ারি এটির শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ২৮ টাকা ৪০ পয়সা। সেখান থেকে মালিকানা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে এটির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যদিও মালিকানা বদলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয় গত এপ্রিলে কোম্পানির পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তের পর। তার আগেই বাজারে এটির মালিকানা বদলের বিষয়টি একপক্ষ জেনে গিয়েছিল। আর আগাম সেই তথ্য জেনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়িয়ে বড় অঙ্কের মুনাফার চেষ্টায় যুক্ত ছিল ওই পক্ষ। তাতে তারা সফলও হয়েছে প্রাথমিকভাবে।
অস্বাভাবিক এই মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসইর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্থাটির একটি দল কোম্পানিটির সাভারের আশুলিয়া ও নরসিংদীর পলাশের কারখানা পরিদর্শন করে দেখেছে, সাভারের কারখানাটির কার্যক্রম চললেও নরসিংদীর কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া কোম্পানিটি সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে এই তিন মাসে ডমিনেজ স্টিল প্রায় ৭২ লাখ টাকা লোকসান করেছে। ২০২০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানি বর্তমানে ‘বি’ শ্রেণিভুক্ত। সর্বশেষ গত অর্থবছরে কোম্পানি শেয়ারধারীদের শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোম্পানিটির সম্পদ রয়েছে প্রায় ১৭৪ কোটি টাকার।
আকিজ রিসোর্সেসের ডেপুটি সিএফও রায়হান কবির গণমধ্যমকে জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই আকিজ রিসোর্সেস কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সাভার ও নরসিংদীর কারখানা দুটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা। আকিজ রিসোর্সেস মনে করে, সঠিক নেতৃত্ব এবং পুঁজির যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে ডমিনেজ স্টিলকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব। পর্যায়ক্রমে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তারা এই খাত থেকে আরও বেশি রাজস্ব আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে।
শিল্প মালিকদের এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মানসিকতাকে উৎসাহিত করবে এবং ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারে আস্থার জায়গাটি আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা যায়।
ডমিনেজ স্টিলের এই মালিকানা পরিবর্তন কেবল দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি মৃতপ্রায় শিল্প ইউনিটকে বাঁচিয়ে তোলার প্রচেষ্টাও বটে। দেশের শিল্প খাতে আকিজ রিসোর্সেসের অতীত ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং তারা যেকোনো চ্যালেঞ্জিং ব্যবসায়িক ইউনিটকে সফল করার সামর্থ্য রাখে। তবে শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন তাকিয়ে আছেন বিএসইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। মালিকানা বদলের পর ডমিনেজ স্টিলের ব্যবসায়িক গতিপথ কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই তার হারানো গৌরব ফিরে পায় কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।