প্রকাশিত : ১০:৪৪
০৩ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩৬
০৩ জুলাই ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
মনসুর আলী চৌধুরী যখন নব্বই বছরের স্মৃতির পুঁথি উল্টাতে বসেন—হাতের আঙুলে সময়ের ছাপ, চোখের তারায় অতীতের প্রতিচ্ছবি—তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক রক্তাক্ত-আলোকিত ক্যানভাস। কখনো রাজপথে গুলির শিস, কখনো গ্রামের মসজিদে সন্ধ্যার আযানে মিশে যাওয়া কুরআনের সুর, কখনো বুকফাটা কান্না—আবার কখনো আগুনের হল্কায় পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন। তাঁর দেহটা যেন সময়ের এক জীবন্ত পাণ্ডুলিপি; প্রতিটি বলিরেখায় লেখা আছে বাংলার একশ বছরের ইতিহাস। কোনো অধ্যায় রক্তাক্ত, কোনো পৃষ্ঠায় আশার আলো, আর কোথাও যেন ইনসাফের জন্য চুপিসারে ডাক।
গভীর রাতে তিনি তাঁর কাঠের চেয়ারটিতে বসেন। ডান হাতলের অংশ—সত্তর বছরের ঘষায় মসৃণ হয়ে গেছে—যেন নিজের হাতের তালুর মতো চেনা। জীর্ণ গালিচার ওপর কুরআনের একটি পুরনো কপি। পৃষ্ঠাগুলো নিস্তেজ হলুদ, কোণগুলো ছেঁড়া, কিন্তু অক্ষরগুলো আজও জ্বলজ্বল করে। জানালার বাইরে চাঁদের আলো মসজিদের মিনারে পড়ে এক অপার্থিব আভা ছড়ায়। গ্রামের রাত ঘন অন্ধকার, কিন্তু আকাশে তারারা এমন উজ্জ্বল যে মনে হয় আল্লাহ যেন হাত বাড়িয়ে নিজের আঙুলের মণি ছড়িয়ে দিয়েছেন। মনসুর আলী আঙুল চালান কুরআনের পাতায়। খুঁজে নিতে সময় লাগে না—এই কপি তিনি চোখ বুঝেও চেনেন, যেন নিজের হাতের পাঁচ আঙুলের মতো।
"আলিফ-লাম-মীম। সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ।"
আয়াতটি পড়ার সময় তাঁর গায়ে শিহরণ খেলে যায়। এই আয়াতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নব্বই বছরের। প্রথম পড়েছিলেন সাত বছর বয়সে, মা রহিমা খাতুনের কোলে। মায়ের গলা তখন মিষ্টি, চুলে পাক ধরেনি, মুখে ছিল ফুটফুটে হাসি। মনসুর আলী তখন বুঝতেন না অর্থ, কিন্তু শব্দের মাধুর্য গেঁথে গিয়েছিল মনে, চুনকালির মতো। আজও যখন আয়াতটি পড়েন, মায়ের কণ্ঠ কানে বাজে—যেন সময়ের ব্যবধান মুছে গেছে, যেন তিনি আবার সেই ছোট্ট ছেলে, মায়ের কোলে, পৃথিবীর সব কষ্টের ঊর্ধ্বে।
সেই ১৯৪৩ সালের কথা। মন্বন্তরের আগুনে গ্রাম পুড়ছিল, মানুষ মরছিল, কিন্তু মা তাঁকে কুরআনের আয়াত শোনাচ্ছিলেন। পৃথিবীর সব কষ্টের মাঝেও তিনি যেন নিশ্চিন্ত ছিলেন, কারণ মায়ের কোলে কুরআনের সুর শুনতে শুনতে তিনি বিশ্বাস করতেন—একজন মহান সত্তা আছেন যিনি সব দেখেন, সব জানেন; হয়তো তিনিই মায়ের কণ্ঠে কথা বলেন।
অতঃপর ১৯৪৬ সালের কথা। দেশভাগের আগের সময়। বাংলার আকাশে বিভাজনের বিভীষিকা ভাসছিল। দাঙ্গার আগুনে পুড়ছিল গ্রাম-গঞ্জ। মনসুর আলী তখন গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করছিলেন। বাবা আবদুল খালেক চৌধুরী—একজন সাধারণ কৃষক, হাতের কলসি আর কাঁধের লাঙল যার পরিচয়। মা রহিমা খাতুন—গৃহিণী, দরিদ্র, কিন্তু তাঁর কোলে ছিল অমিয় সম্পদ। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ধর্মীয় আবহে বেড়ে ওঠা মনসুরের মনে আধ্যাত্মিকতার প্রথম বীজ বপন হয়েছিল মায়ের কাছে।
রহিমা খাতুন সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিতেন কুরআনের আয়াত শোনিয়ে। মুখস্থ ছিল কয়েকটি সুরা—'সুরা আল-ফাতিহা' থেকে 'সুরা আল-ইখলাস'—এগুলোই ছিল তাঁর অস্ত্র। মনসুর আলী যখন ঘুমাতে যেতেন, মা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সুরা আল-ফাতিহা পড়তেন। মাথার তলায় খড়ের বালিশ, শরীরের নিচে চটের বিছানা; তবু মনসুরের মনে হতো যেন জান্নাতের নরম বিছানায় শুয়ে আছেন। কারণ মায়ের সুর ছিল অমৃতের মতো, যেন ফেরেশতারা গান গাচ্ছে।
"বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম... আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন..."
মনের গহীনে তখন কী যে ঢেউ উঠত, তা ভাষায় বলা যায় না। বুঝতেন না অর্থ, কিন্তু অনুভব করতেন অলৌকিক কিছু—যেন আকাশ থেকে আলো নেমে আসছে। আধ্যাত্মিকতার সেই প্রথম প্রভা তাঁর সমগ্র জীবনের দিশা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। যত বড় হয়েছেন, ততই বুঝেছেন—মায়ের সেই সুরা ফাতিহা পড়া ছিল তাঁর জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর, যার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ঝড়-ঝাপটা সহ্য করেছেন একে একে।
যৌবনের প্রথম দিকে তিনি ভেবেছিলেন, আধ্যাত্মিকতা মানে গ্রামের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, কুরআন তেলাওয়াত করা। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি টের পেলেন, এর চেয়েও গভীর কিছু আছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক ইনসাফ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার—সবকিছুর সঙ্গেই আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক। যখন প্রথম এই উপলব্ধি করলেন, বয়স তখন ষোলো। গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব বলেছিলেন, "নামাজ পড়ো, রোজা রাখো, কুরআন তেলাওয়াত করো—এইটুকুই ইসলাম।" কিন্তু মনসুর আলী প্রশ্ন করেছিলেন, "ইমাম সাহেব, যদি আমার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে এবং আমি তার খাবারের ব্যবস্থা না করি, তাহলে আমার নামাজ কি কবুল হবে?" ইমাম সাহেব উত্তর দিতে পারেননি। মনসুর আলী তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলেন—ইসলাম কেবল মসজিদের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র জীবন ব্যবস্থা।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হলে মনসুর আলীর বয়স এগারো। নিজ চোখে দেখেছিলেন কীভাবে ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে খুন করছে। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় বাংলার মাটি রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল। তিনি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আব্বা, ধর্ম কি মানুষকে এভাবে হত্যা করতে শেখায়?"
আবদুল খালেক চৌধুরী তখন চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছিলেন, "বাবা, ধর্ম মানুষকে হত্যা করতে শেখায় না। মানুষ নিজের লোভ, ক্ষমতা আর অহংকারের বশে ধর্মকে অস্ত্র বানায়। প্রকৃত ধর্ম তো ভালোবাসার, ইনসাফের।"
শব্দগুলো বজ্রাঘাতের মতো এসে আঘাত করেছিল তাঁর বুকে। সে রাতে তিনি ঘুমাতে পারেননি; ভেবেছিলেন, আব্বা একজন সাধারণ কৃষক, কিন্তু কী গভীর কথা বলেছেন! তখন থেকেই নিজেকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—বড় হয়ে এমন সমাজ গড়বেন, যেখানে ধর্ম অস্ত্র নয়, ধর্ম হবে ভালোবাসার বন্ধন। বুঝতে শুরু করেছিলেন, আধ্যাত্মিকতা আর সামাজিক ইনসাফ এক সিক্কার দুই পিঠ। কোনো মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ হতে পারে না, যদি সে সামাজিক অবিচার দেখেও চুপ থাকে। আর কোনো সমাজ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, যদি তার নেতৃত্ব আধ্যাত্মিকভাবে পতিত হয়।
সে সময় থেকে তাঁর দ্বৈত পথ চলা শুরু—একদিকে কুরআনের গভীর তাফসির, অন্যদিকে সমাজের ভেতর মিশে যাওয়া। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, নারী, শিশু—সবার সঙ্গে কথা হতো। তাদের সমস্যা শুনতে শুনতে তাঁর হৃদয় ভারী হয়ে উঠত। তিনি তাদের বলতেন, "তোমরা এত কষ্ট সহ্য করো কেন? তোমাদের তো অধিকার আছে!" কৃষকেরা অবাক হয়ে তাকাত; 'অধিকার' শব্দটা তাদের কাছে নতুন। মনসুর আলী বুঝতেন—এখানে অভাব শুধু অর্থের নয়, অভাব চেতনারও। মানুষ জানে না তাদের কী পাওয়া উচিত, তাই তারা শোষণ সহ্য করে।
এই মনন ও সমাজচেতনার মধ্যেই বাড়তে থাকে তাঁর জ্ঞানের পিপাসা। গ্রামের মক্তবের প্রাথমিক পাঠ শেষ করে তিনি ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে—বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আইনি দিকটি গভীরভাবে বুঝতে তিনি আইন বিষয়েও পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল মেধা ও নিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; তিনি মোট পাঁচবার বৃত্তি লাভ করেছিলেন। এই উচ্চশিক্ষা তাকে কুরআনের গভীর তাফসির ও বাস্তব সমাজবিজ্ঞানের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করতে শেখায়, যা পরবর্তীকালে তাঁর লেখালেখি ও গবেষণার ভিত্তি গড়ে দেয়।
এমনি করে কেটে গেল ১৯৬০-এর দশক। তিনি ইসলামি সাহিত্য ও দর্শনের ওপর কয়েকটি বই লিখলেন, কিন্তু খুব একটা জনপ্রিয়তা পেল না। কারণ তিনি লিখতেন কঠিন, দুর্বোধ্য ভাষায়। স্ত্রী জোবেদা খাতুন তাকে বলতেন, "তোমার লেখা মানুষ পড়ে? ও তো সব এত কঠিন যে শুধু তুমি নিজেই বুঝো!" মনসুর আলী হাসতেন; তিনি জানতেন, স্ত্রীর কথা সত্যি। জোবেদা খাতুন খুব ব্যবহারিক মনের নারী; তিনি বলতেন, "তুমি যদি মানুষকে কিছু বুঝাতে চাও, তাহলে তাদের ভাষায় বলো। তারা 'নফসে আম্মারা' আর 'নফসে মুতমাইন্না' বুঝবে না, তারা বুঝবে ক্ষুধা, অবিচার, ভালোবাসা, ঘৃণা।" মনসুর আলী স্ত্রীর কথায় মুগ্ধ হতেন; ভাবতেন, জোবেদা আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা করেনি, কিন্তু মেধা অসাধারণ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় কুরআনের শিক্ষা লিখবেন। কিন্তু তার আগে আরেকটি বড় সংকটে পড়তে হলো তাঁকে।
১৯৭১ সালের মার্চ। বাংলাদেশের আকাশে যুদ্ধের আগুনের গন্ধ। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মনসুর আলী তখন গ্রামে; শুনলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। তাঁর অনেক শিক্ষক-বন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি মর্মাহত হলেন; সে রাতে ঘুমাতে পারেননি। বারবার ভাবছিলেন, যাদের তিনি চিনতেন, যাদের সঙ্গে বসে কুরআন নিয়ে আলোচনা করতেন, তারা আজ আর নেই। ডায়েরিতে লিখলেন: "শিক্ষক ইয়াকুব সাহেবের কথা মনে পড়ছে, যিনি আমাকে বলেছিলেন, 'সমাজের মাটির সঙ্গে মিশতে হবে।' তিনিও হয়তো আজ আর নেই।"
যখন জেলা শহরে গেলেন, দেখলেন স্বাধীনতার জন্য মানুষ পাগল হয়ে গেছে। লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে মিছিল; পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে রাস্তায়; গুলি, মৃত্যু, আর্তনাদ। মনসুর আলী এই ঘটনাকে কুরআনের আলোয় বিশ্লেষণ করলেন। পাকিস্তানি শাসকরা তো সবাই মুসলিম; তাহলে কীভাবে তারা মুসলিম ভাইদের হত্যা করছে? স্মরণ করলেন সুরা আল-হুজুরাতের ১০ম আয়াত: "মুমিনরা তো পরস্পর ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।"
বুঝলেন, মুসলিম হওয়ার পরিচয় কেবল নামাজে নেই, আছে মানুষের সঙ্গে আচরণে। পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেছে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করেছে—তাই তারা প্রকৃত মুসলিম নয়, মুখোশধারী জালেম। ভাবলেন, এই যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিকও—জুলুমের বিরুদ্ধে ইনসাফের লড়াই।
মনসুর আলী ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জানালেন। মনে করলেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ইনসাফের সংগ্রাম, কুরআন সমর্থিত। তখনই বুঝলেন, আধ্যাত্মিকতা আর রাজনৈতিক স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক—একটি জাতি প্রথমে রাজনৈতিকভাবে মুক্ত হবে, তারপর সে আধ্যাত্মিকভাবে মুক্ত হতে পারবে।
যুদ্ধ শেষ, বাংলাদেশ স্বাধীন। মনসুর আলী চৌধুরী ভাবলেন, এবার শুরু হবে সত্যিকার ইনসাফের যুগ। কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতে দেখলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন কীভাবে ধুলিসাৎ হচ্ছে। নতুন দেশে লুণ্ঠন, দুর্নীতি, অরাজকতা; রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে দেশকে বিভক্ত করে ফেললেন; ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হলো না, নতুন অবিচার তৈরি হলো।
মনের মধ্যে গভীর বিষাদ নেমে এল। ভাবতে লাগলেন, কীভাবে একটি জাতি তার নিজের ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কিছু শেখে না? কেন মানুষ বারবার একই ভুল করে? রাতে জেগে কুরআন পড়তেন, কিন্তু মন বসত না। ডায়েরিতে লিখলেন:
"আমরা পাকিস্তানের জুলুম থেকে মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু নিজেদের ভেতরের জুলুম থেকে মুক্তি পাইনি। যে মানুষ নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ ও ক্রোধকে জয় করতে পারে না, সে কখনো প্রকৃত স্বাধীনতা পায় না। বাইরের ফেরাউন তাকে ছেড়ে দিলেও ভেতরের ফেরাউন তাকে বন্দি রাখে।"
এই সময় তিনি এক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন: একজন আধ্যাত্মিক সাধকের কর্তব্য কী? কীভাবে সমাজের জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন? তিনি কি কেবল মসজিদে বসে নামাজ পড়বেন, নাকি রাস্তায় নেমে ইনসাফের দাবি করবেন?
উত্তর পেলেন সুরা আল-আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে: "আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।" রসুলের রহমত কোনো নিষ্ক্রিয় অনুভূতি নয়—এটি সক্রিয়; যা ইনসাফ প্রতিষ্ঠায়, জুলুম দমনে, দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে কাজ করে। একজন প্রকৃত মুমিন হতে হলে সমাজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, ইনসাফ কায়েম করতে হবে।
এই চেতনা নিয়ে তিনি কাজ শুরু করলেন। স্থানীয় মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হলেন; কিন্তু শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে থামলেন না। গ্রামের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করলেন। বললেন, "তোমরা শুধু নামাজ পড়লে হবে না; তোমাদের অধিকার সম্পর্কেও জানতে হবে। জমিদার, মহাজন, রাজনৈতিক নেতারা কীভাবে তোমাদের শোষণ করে, সেটাও বুঝতে হবে।"
কিছু মানুষ শুনলেন, কিন্তু অনেকেই বিরুদ্ধে গেলেন; বললেন, "ইমাম সাহেব, আপনাকে তো ধর্ম শেখাতে হবে, রাজনীতি শেখাতে হবে না।" মনসুর আলী হাসলেন; বললেন, "ধর্ম আর রাজনীতি যদি আলাদা হয়, তাহলে সেটা বিকৃত ধর্ম। ইসলাম সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা; এখানে পৃথক কোনো কিছু নেই।"
এমনি করে তাঁর জীবনের পঞ্চাশ বছর কেটে গেল। তিনি অবসর নিলেন মসজিদের ইমাম পদ থেকে; কিন্তু সাধনা থামল না। এখন পুরো সময় কুরআনের তাফসির নিয়ে গবেষণা করতে লাগলেন, বিশেষ করে 'আল-ইনসান আল-কামিল' বা পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার তত্ত্ব নিয়ে। আবিষ্কার করলেন, পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার প্রধান বাধা হলো অহংকার। অহংকারই মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সমাজে অন্যায়ের জন্ম দেয়। ইবলিসও অহংকারের কারণেই জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। অহংকার যেখানেই থাকে—ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র—সেখানেই শুরু হয় জুলুম।
এরপর সমাজের প্রতি স্তরে অহংকারের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। ব্যক্তিজীবনে কীভাবে অহংকার মানুষকে ভুল পথে চালিত করে, পরিবারে কীভাবে সম্পর্ক নষ্ট করে, সমাজে কীভাবে বৈষম্য তৈরি করে, রাষ্ট্রে কীভাবে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়—এসব নিয়ে গভীর চিন্তা করলেন।
এই বিশ্লেষণের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল; শুরুতে মনে হয়েছিল ন্যায়বিচার আসবে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাও স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করল। ক্ষমতার বিষবাষ্প, অহংকারের হল্কা ছড়িয়ে পড়ল রাজনৈতিক অঙ্গনে।
মনসুর আলী চৌধুরী তখন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ; কিন্তু দৃষ্টি ছিল প্রখর। দেখতে পাচ্ছিলেন, কীভাবে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ধীরে ধীরে একনায়কতান্ত্রিক চেহারা নিচ্ছে। বলতেন, "যে নেতা মানুষের কথা শোনে না, যে নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করে, সে শীঘ্রই পতনের মুখে পড়ে। এটি আল্লাহর নিয়ম।" উল্লেখ করতেন সুরা আল-কাসাসের ৮৩ নম্বর আয়াত: "আখেরাতের সেই গৃহ আমরা তাদের জন্য নির্ধারণ করব, যারা পৃথিবীতে অহংকার করে না এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করে না। আর পরিণতি তো মুত্তাকীদের জন্যই।"
এই আয়াত ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র। বলতেন, অহংকারী শাসকদের পতন অনিবার্য; ইতিহাস সাক্ষী—ফেরাউনের পতন হয়েছে, হামানের পতন হয়েছে, নমরুদের পতন হয়েছে। আজকের স্বৈরাচারীদের পতনও হবে—এটি কেবল রাজনৈতিক নিয়ম নয়, আধ্যাত্মিক নিয়ম। প্রায়ই ছাত্রদের বলতেন, "ইতিহাস পড়ো, দেখো অহংকারীদের কী অবস্থা হয়েছে। ফেরাউনের দেহ আজও সমুদ্রের তলায়, অথচ মুসার নাম আজও মানুষের মুখে। অহংকার ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইনসাফ চিরন্তন।"
২০২৪ সালের প্রথম দিকে মনসুর আলী রেডিও শুনতেন, টেলিভিশনে খবর দেখতেন। তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন—সরকার বিরোধী দলগুলোর ওপর নির্যাতন বাড়ছে, সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, বিচার বিভাগ দুর্বল করা হচ্ছে, পুলিশ রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। কুরআনের দিকে ফিরে গেলেন; সুরা আল-আরাফের ১৪৬ নম্বর আয়াত: "পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার নিদর্শনাবলী থেকে বিমুখ করে রাখব।"
বুঝতে পারছিলেন, একটি ফেরাউনী ব্যবস্থা গড়ে উঠছে; কিন্তু যখন অহংকারের সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন আল্লাহর নিয়মে তার পতন ঘটে। তিনি ধৈর্য ধরলেন। স্ত্রী জোবেদাকে বলেছিলেন, "দেখো জোবেদা, শিগগিরই বড় কিছু ঘটতে চলেছে। আল্লাহ যাকে অহংকার দেন, তাকে তিনি ধ্বংস করেন। আমি নব্বই বছর দেখলাম, কখনো অহংকার টেকেনি।"
জুলাই মাসে কোটা আন্দোলন শুরু হলে প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেননি—ভাবলেন সাধারণ ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখলেন, এটি স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হচ্ছে। রাজপথে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ছে, পুলিশ গুলি করছে, মানুষ মরছে, তবু থামছে না।
এই দৃশ্য দেখে শিহরিত হলেন। বুঝলেন, মানুষের 'নফসে লাউয়ামা' বা বিবেক জাগ্রত হয়েছে; তারা আর অন্যায় সহ্য করছে না, রুখে দাঁড়িয়েছে। এটি কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ: "তোমরা জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াও; জালেমদের পাশে থেকো না।"
১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর—পুলিশের বুলেটে—শুনে তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়ল। বললেন, "আল্লাহর কসম, এই ছেলেটি শহীদ হয়েছে। সে ইনসাফের জন্য নিজের জীবন দিয়েছে। কুরআন বলে, যারা ইনসাফের পথে শহীদ হয়, তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে জীবন্ত।" সেদিন সন্ধ্যায় ছাত্রদের ডেকে বললেন, "তোমরা আবু সাঈদের মতো হও; সে নিজের জীবন দিয়ে আমাদের শেখালো, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা যায় না।"
এরপর ৪ আগস্ট ভয়াবহ সংঘর্ষে একদিনেই ৯১ জনের বেশি মানুষ নিহত হলে মনসুর আলী তাঁর বিছানায় শুয়ে কাঁদতে থাকেন। জোবেদা তাঁকে সান্ত্বনা দিতে চাইলে তিনি বলেন, "জোবেদা, আমি কাঁদছি না এই জনতার জন্য—তারা শহীদ হয়ে জান্নাতে যাবে। আমি কাঁদছি এই শাসকদের জন্য, যারা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংস করছে। আল্লাহর নিয়মে কাউকে রেহাই দেওয়া হয় না।"
৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা পালিয়ে যান, তখন মনসুর আলী শান্তভাবে কুরআন পাঠ শুরু করেন; সুরা আল-ফাজরের ২৭তম আয়াত: "হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাও, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।"
বুঝলেন, একটি অহংকারী শাসনের পতন ঘটেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ভাবলেন, এটাই কি শেষ? নাকি নতুন কোনো ফেরাউনের আবির্ভাব হবে? মানুষের ভেতরের অহংকার কি শেষ হয়েছে? তিনি জানতেন, না; অহংকার কখনো শেষ হয় না। মানুষ যতদিন নিজের অহংকারকে জয় করতে না পারে, ততদিন নতুন নতুন জালিমের জন্ম হবে। তাই এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে লাগলেন; কীভাবে জাতি এগিয়ে যেতে পারে, কীভাবে আধ্যাত্মিকতা ও ইনসাফ একত্রিত করতে পারে—এ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। এই গবেষণা আমাদের সামনে উন্মোচিত করল এক অনন্য জীবনদর্শন।
তিনি জানতেন, বাংলাদেশের মানুষ হয়তো এই শিক্ষাগুলো এখনই বুঝবে না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বুঝবে; ইনসাফের বীজ একদিন অঙ্কুরিত হবেই।
পবিত্র কুরআনে মনসুর আলী চৌধুরীর সবচেয়ে প্রিয় সুরা হলো 'আল-ফুরকান'—বিশেষ করে শেষের আয়াতগুলো, 'ইবাদুর রহমান'-এর গুণাবলী বর্ণনা করে। তিনি প্রায় প্রতিদিন পড়তেন; তাঁর মতে, এই বারোটি আয়াতে একজন পরিপূর্ণ মানুষের সম্পূর্ণ রূপরেখা ফুটে আছে। বলতেন, "যদি কোনো ব্যক্তি এই আয়াতের সকল গুণাবলী ধারণ করতে পারে, তাহলে সে 'আল-ইনসান আল-কামিল'-এর নিকটবর্তী হবে। কুরআনের এই বারোটি আয়াত যেন একখানা মানবিক আয়না, যাতে নিজেকে দেখে মানুষ নিজের ভুল-ত্রুটি শুধরে নিতে পারে।"
বিকেল বেলা তিনি তাঁর ছোট ঘরে বসে কুরআন খুলে এই আয়াতগুলো পড়তেন; চারপাশে থাকত তাঁর কিছু ছাত্র-শিষ্য—তরুণ, মধ্যবয়সী, কেউ কেউ তাঁর সমবয়সীও। সবার চোখে একই আগ্রহ। তিনি তাদের বলতেন, "এই আয়াতগুলো শুধু মুখস্থ করলেই হবে না, জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। আয়াতগুলোর অর্থ বোঝো এবং প্রতিদিন নিজেকে যাচাই করো—তোমার মধ্যে এই গুণগুলো আছে কিনা। মনে রেখো, কুরআন পড়ার অর্থ কেবল তেলাওয়াত নয়, কুরআন হলো জীবন-পথের মানচিত্র।"
প্রথম গুণ—বিনয়। সুরা আল-ফুরকানের ৬৩ নম্বর আয়াত: "পরম করুণাময়ের বান্দা তারাই, যারা যমীনে নম্রভাবে চলাফেরা করে।"
মনসুর আলী এই আয়াত নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতেন। বলতেন, "আল্লাহ এখানে 'হাওনা' শব্দ ব্যবহার করেছেন; এর অর্থ কেবল নম্রভাবে হাঁটা নয়, বরং স্থিরতা, গাম্ভীর্য এবং অহংকারহীন আত্মমর্যাদার সমন্বয়। যখন তুমি রাস্তায় হাঁটো, তখন দৃষ্টি রাখো কারো প্রতি অহংকার নিয়ে তাকিয়ে না যেতে। মনে রেখো, অহংকার শয়তানের পতনের মূল কারণ। ইবলিস যখন আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করল, তার যুক্তি ছিল, 'আমি আগুনের তৈরি, আর সে মাটির তৈরি; তাই আমি তার চেয়ে উত্তম।' এই অহংকারই তাকে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করল।"
একদিন এক যুবক ছাত্র প্রশ্ন করল, "হুজুর, কিন্তু সম্মান তো সবার দরকার। আমরা যদি অতিরিক্ত নম্র হই, তাহলে কি মানুষ আমাদের দুর্বল মনে করবে না?"
মনসুর আলী হাসলেন। "দুর্বলতা আর নম্রতা এক জিনিস নয় বাবা। শক্ত মানুষই নম্র হতে পারে; দুর্বল মানুষ অহংকার করে, কারণ ভেতরের শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের স্বীকৃতি দরকার। কিন্তু যে নিজেকে জানে, সে জানে সে আল্লাহর বান্দা—তাই অহংকারের প্রয়োজন নেই। তুমি যদি নম্র হও, মানুষ তোমাকে সম্মান করবে; আর অহংকার করলে ঘৃণা করবে।"
দ্বিতীয় গুণ—অসীম সহনশীলতা। একই সুরার ৬৩ নম্বর আয়াতের দ্বিতীয় অংশ: "অজ্ঞ ও মূর্খরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে 'সালাম'।"
মনসুর আলী এই আয়াত পড়ে বলতেন, "এখানে 'সালাম' বলতে কেবল অভিবাদন বোঝায় না, বরং গভীর অর্থ—আমি তোমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাই না; তুমি হয়তো আমার কাছে কিছু চাও, কিন্তু আমি জানি সেটা অনর্থক। তাই সালাম দিয়ে বিদায়।"
তিনি বলতেন, "আমাদের সমাজে অনর্থক বিতর্কে লিপ্ত হয় অনেক; জানে না কী বলছে, অথচ তর্ক করতে চায়। পরিপূর্ণ মানুষ সময় ও শক্তি অনর্থক কাজে নষ্ট করে না। কিছু মানুষ যুক্তি বোঝে না; তাদের সঙ্গে তর্ক সময়ের অপচয়।"
ছাত্রদের একজন জিজ্ঞেস করল, "হুজুর, কিন্তু অনেক সময় তো সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যও বিতর্ক করতে হয়?"
মনসুর আলী মাথা নাড়লেন। "সত্য প্রতিষ্ঠার বিতর্ক অন্য জিনিস। কিন্তু যখন দেখবে কেউ বিতর্ক করছে শুধু বিতর্কের জন্য, সত্য খোঁজে না বরং নিজেকে প্রমাণ করতে চায়—সেখানে থামো। কারণ সেই বিতর্ক আর ইনসাফে পৌঁছায় না, শুধু অহংকারে পৌঁছায়।"
তৃতীয় গুণ—রাতের নিভৃত ইবাদত। সুরা আল-ফুরকানের ৬৪ নম্বর আয়াত: "তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের সামনে সেজদারত ও দণ্ডায়মান অবস্থায়।"
মনসুর আলী এই আয়াত পড়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। বলতেন, "রাত হলো সেই সময়, যখন সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, দুনিয়ার কোলাহল থেমে যায়; তখনই সত্যিকার সাধক তার প্রভুর কাছে নিবেদিত হয়। সে দাঁড়ায়, সেজদা করে, কান্না করে।"
ছাত্রদের বলতেন, "তোমরা রাতে একটু সময় বের করো; ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর কাছে দোয়া করো। শুধু নামাজের জন্য নয়, আত্মশুদ্ধির জন্য; যে মানুষ রাত জেগে কান্না করতে পারে, সে দিনে সমস্ত কষ্ট সহ্য করতে পারে—কারণ জানে আল্লাহ তার কান্না দেখছেন।"
চতুর্থ গুণ—অর্থনৈতিক মধ্যপন্থা। সুরা আল-ফুরকানের ৬৭ নম্বর আয়াত: "তারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না, বরং এই দুইয়ের মধ্যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।"
মনসুর আলী বলতেন, "আমাদের সমাজে দুটি সমস্যা—অপচয় ও কৃপণতা। সম্পদ পেলে বিলাসবহুল জীবন, আবার কেউ অতি কৃপণ, নিজের প্রয়োজনের চেয়েও কম খরচ করে। কুরআন উভয়কে নিষেধ করেছে; সম্পদ আল্লাহর আমানত, সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে।"
পঞ্চম গুণ—ন্যায়পরায়ণতা ও জীবনের সুরক্ষা। সুরা আল-ফুরকানের ৬৮ নম্বর আয়াত: "যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যাকে নিষেধ করেছেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না।"
মনসুর আলী এই আয়াত পড়ে গম্ভীর হয়ে যেতেন। বলতেন, "শিরক, অন্যায় হত্যা, ব্যভিচার—তিনটি প্রধান পাপ। শিরক সবচেয়ে বড়, কিন্তু অন্যায় হত্যাও তার কাছাকাছি। কুরআন মানুষের জীবনকে কী মূল্য দেয়! সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'যে কেউ একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।'"
ষষ্ঠ গুণ—মিথ্যা ও অসারতা বর্জন। সুরা আল-ফুরকানের ৭২ নম্বর আয়াত: "যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন অসার ও অমূলক কাজের কাছে যায়, তখন মর্যাদার সঙ্গে চলে যায়।"
মনসুর আলী বলতেন, "আমাদের সমাজে মিথ্যা মহামারি; মানুষ কাজে, ব্যবসায়, আদালতে সর্বত্র মিথ্যা বলে। অথচ রসুল বলেছেন, 'সত্যবাদিতা পুণ্যের দিকে নিয়ে যায়, আর মিথ্যা পাপের দিকে।' বিশেষত রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা মিথ্যা বললে সমাজের খুব ক্ষতি হয়; গত ১৫ বছরে দেখেছি কীভাবে সরকারি মুখপাত্ররা মিথ্যা ছড়িয়েছে, সত্য চাপা দেওয়া হয়েছে।"
তিনি বলতেন, "এই গুণগুলো কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতা নয়, সামগ্রিক জীবনদর্শন। যখন সমাজের মানুষ এই গুণ ধারণ করে, সমাজ ইনসাফপূর্ণ হয়; যখন শাসকরা ধারণ করে, তারা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে; যখন সাধারণ মানুষ ধারণ করে, তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।"
কিন্তু তিনি আরও গভীরে যেতেন: "এই গুণগুলোর বিপরীতে অহংকার, লোভ, ক্ষমতার দম্ভ, মিথ্যাচার—এই চারটি মনস্তাত্ত্বিক রোগ। ব্যক্তি বা রাষ্ট্র যখন এতে আক্রান্ত হয়, সেখানে ইনসাফ থাকে না; শুরু হয় জুলুম, লুণ্ঠন, অন্যায় হত্যা।"
উল্লেখ করতেন সুরা আল-আলাকের ৬-৭ নম্বর আয়াত: "মানুষ নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করেই অবাধ্য হয়। নিশ্চয়ই তোমার প্রভুর কাছে সবকিছু ফিরে যাবে।"
"দেখো," মনসুর আলী বলতেন, "মানুষ যখন মনে করে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ, তখন অহংকার জন্মে; ভাবে কারো প্রয়োজন নেই; তখন জুলুম শুরু করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে; সেখানে সব অহংকার, সব জুলুমের জবাব দিতে হবে।"
মনসুর আলী চৌধুরী প্রায়ই তাঁর ছাত্রদের এটা স্মরণ করিয়ে দিতেন। বলতেন, "আমরা যদি প্রকৃত 'ইবাদুর রহমান' হতে চাই, প্রথমেই ভেতরের অহংকার নির্মূল করতে হবে। অহংকার যেখানে, কুরআনের শিক্ষার প্রবেশ নেই; অহংকার মানুষকে অন্ধ করে, ভুল দেখতে পায় না।"
তিনি উদাহরণ দিতেন নিজের জীবনের। "একবার এক ব্যক্তির সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ হয়েছিল; রাস্তায় দেখা হলে তিনি সালাম দিলেন না। বুঝলাম, রাগ করে আছেন। প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল রাগ—কিন্তু থামলাম; ভাবলাম, রাগ করলে সম্পর্ক আরও খারাপ হবে। তাই তাঁর কাছে গিয়ে সালাম দিলাম, কুশল বিনিময় করলাম। তিনি অবাক হয়ে গেলেন; পরে এসে ক্ষমা চাইলেন। আমি বললাম, 'ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই; আমরা সবাই মানুষ, ভুল করি।'"
"এটিই বিনয়—নিজের অহংকার জয় করা; নিজের ego দমন করা। যখন অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে পারো, কিন্তু না নিয়ে ক্ষমা করো, তখনই প্রকৃত পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পথে এগোও।"
তিনি শেষ জীবনে এসে কুরআনের 'ইবাদুর রহমান'-এর গুণাবলী নিয়ে গ্রন্থ রচনা করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বয়স ও স্বাস্থ্য আর সহায়তা করছিল না। তবে মুখে মুখে ছাত্রদের কাছে এই শিক্ষা পৌঁছে দিতে থাকেন। বলতেন, "আমি হয়তো বই লিখতে পারছি না, কিন্তু এই শিক্ষাগুলো যদি তোমরা ধারণ করো, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় লেখা হবে।"
একদিন বিকেলে প্রিয় ছাত্র আসিফ বলল, "হুজুর, আপনি তো অনেক জানেন, অনেক দেখেছেন; যদি লিখতেন, আমাদের মতো তরুণরা বুঝতে পারত।"
মনসুর আলী হাসলেন। "আমার লেখা তো কেউ পড়ে না আসিফ; তোমার উস্তানী জোবেদা বলে কঠিন। কিন্তু আমি তোমাদের মাধ্যমে এই শিক্ষা ছড়াতে চাই। তোমরা যখন ইনসাফের পথে চলবে, মানুষ দেখবে আর শিখবে; লেখার চেয়ে চলা বেশি শেখায়।"
ছাত্ররা চুপ হয়ে গেল। তারা গুরুকে হয়তো লেখক নয়, কিন্তু একজন জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে পেল—যিনি নিজেই ইনসাফের পথে হেঁটেছেন নব্বই বছর ধরে।
মনসুর আলী চৌধুরী যখন আত্মবিশ্লেষণে বসেন, মনে হয় যেন এক গভীর সমুদ্রের তলায় ডুব দিচ্ছেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর আধঘণ্টা সময় বের করেন শুধু নিজের ভেতর তাকানোর জন্য। বলেন, "বাইরের জগৎ বোঝার আগে ভেতরের জগৎ বোঝো।" এই এক কথায় তাঁর সমগ্র আধ্যাত্মিক যাত্রার সারসংক্ষেপ। নফসের জগৎ যেন বিশাল অজানা দেশ—প্রতিদিন নতুন নতুন পথ আবিষ্কার হয়।
আজ সকালেও বসেছেন ঘরের কোণে; কুরআন সামনে, কিন্তু চোখ বন্ধ। গভীর শ্বাস; প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে নিজের অনুভূতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মন অস্থির—গত রাতে স্বপ্ন দেখেছেন: ছোটবেলার গ্রামে ফিরে গেছেন; মা ডাকছেন, কিন্তু যেতে পারছেন না; মা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। ঘুম থেকে উঠে দেখেন চোখ ভিজে। বুঝতে পারেন, বয়স এখন এমন পর্যায়ে—মৃত্যুর ছায়া দূরত্বে নয়, ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। তাই আত্মবিশ্লেষণ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ—জানতে চান, তাঁর আত্মা কোন স্তরে দাঁড়িয়ে।
এই প্রক্রিয়াকে তিনি বলেন 'মুহাসাবা'—আত্ম-সমালোচনা। বলেন, "হাশরের ময়দানে আল্লাহ আমাদের হিসাব নেবেন; কিন্তু তার আগে নিজেরা যদি হিসাব নেই, তাহলে জবাবদিহি সহজ হবে। যারা দুনিয়ায় আত্মসমালোচনা করে, তারা আখেরাতে সফল হয়।"
একসময় নিজেকে প্রশ্ন করেন: "মনসুর আলী, গতকাল তুমি কারও সঙ্গে রেগে হয়েছ? কেন? কারণ সে তোমার কথা শোনেনি? তুমি ভেবেছিলে তোমার কথাই সঠিক? এই অহংকার কোথা থেকে এল?"
তিনি জানেন, নফসের স্তর বুঝতে হলে ভেতরের অনুভূতির স্বীকৃতি দিতে হবে; আত্মস্বীকৃতি ছাড়া আত্মশুদ্ধি অসম্ভব।
ছাত্রদের বলতেন, "আমরা অন্যায় করলে অজুহাত দিই—'পরিস্থিতি ওরকম ছিল', 'আমাকে ওইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতেই হয়েছিল'—এই অজুহাতগুলো 'নফসে আম্মারা' থেকে আসে।"
নফসে আম্মারা—মন্দ প্ররোচনাকারী আত্মা; সুরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াত: "নিশ্চয় মানুষের নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, একমাত্র ওই ব্যক্তি ছাড়া যার প্রতি আমার প্রতিপালক অনুগ্রহ করেন।"
মনসুর আলী বলেন, "এই স্তরটি আমাদের ভেতরের পশু—কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার। যখন মানুষ এই স্তরে থাকে, পশুপ্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হয়; যা চায় তাই করে, কারও কথা শোনে না; যুক্তি-তর্ক কাজ করে না, অহংকারের মোহনায় আটকে।"
উদাহরণ দেন: "ধরো, রাস্তায় কেউ তোমাকে ধাক্কা দিল; প্রথম প্রতিক্রিয়া—রাগ, ধাক্কা দিতে চাও, গালি দিতে চাও, মারতে চাও—এটাই নফসে আম্মারা। কিন্তু মুমিন এখানে থামে না; নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে; থামে, ভাবে, বলে, 'মাফ করে দাও।'"
ফেরাউনের কথা বলেন—নফসে আম্মারার মূর্ত প্রতীক; বলেছিল, "আমি তোমাদের সর্বোচ্চ প্রভু"—অহংকার এত বেড়েছিল যে নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করল। সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে সেই কথা বলছিল, মাথায়ও আসেনি কয়েক মুহূর্ত পর সমুদ্রের জল তাকে গ্রাস করবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা বিশ্লেষণ করেও দেখেন, শেখ হাসিনার সরকার ছিল নফসে আম্মারার শিকার—নিজেদের সঠিক মনে করত, জনগণকে ভুল; ক্ষমতা চিরস্থায়ী ভাবত, কিন্তু আল্লাহর নিয়মে টিকল না।
দ্বিতীয় স্তর—নফসে লাউয়ামা। সুরা আল-কিয়ামার ২ নম্বর আয়াত: "শপথ করি সেই নফসের, যা নিজেকে ধিক্কার দেয়।"
মনসুর আলী যখন এই স্তরের কথা বলেন, কণ্ঠে আবেগ আসে। "এটি বিবেকের স্তর; যখন ভুল করি, ভেতরে অপরাধবোধ তৈরি হয়; নিজেকে দোষ দিই, তিরস্কার করি—এই অনুভূতি আল্লাহর মহান উপহার। কারণ এই অনুভূতিই ভুল সংশোধন করতে সহায়তা করে। যে নিজেকে ধিক্কার দিতে জানে না, সে কখনো পরিবর্তিত হতে পারে না।"
তিনি বলেন, "আমাদের সমাজে এই স্তর দুর্বল; অন্যায় দেখেও চুপ থাকি, ভাবি 'আমার কী?' অথচ কুরআন বলে 'তোমরা পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দাও।' ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল—ভেতর থেকে অনুভব করেছিল আর জুলুম সহ্য করতে পারে না; এটি ছিল সমষ্টিগত নফসে লাউয়ামার জাগরণ।"
তৃতীয় স্তর—নফসে মুতমাইন্না। সুরা আল-ফাজরের ২৭ নম্বর আয়াত: "হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাও, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।"
মনসুর আলী যখন এই আয়াত পড়েন, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বলেন, "এই হলো আত্মার সর্বোচ্চ স্তর—যেখানে মানুষ লোভ, ক্রোধ, অহংকার থেকে মুক্ত; আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা; জানে যা হচ্ছে, আল্লাহর ইচ্ছায়; তাই সন্তুষ্ট, প্রশান্ত।"
নিজের জীবনের উদাহরণ দেন: "মন্বন্তর দেখেছি, দাঙ্গা দেখেছি, যুদ্ধ দেখেছি, স্বৈরাচার দেখেছি—কিন্তু আল্লাহর ওপর আস্থা হারাইনি। জানি, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য। ১৯৪৭ সালে খেলার সাথী মিনা মারা গেলে কয়েক মাস কথা বলতে পারিনি; মা বলেছিলেন, 'আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন'—তখন বুঝিনি, এখন বুঝি। সব কষ্টের পেছনে wisdom আছে।"
তবে মনসুর আলী রোগ নির্ণয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। বলেন, "নফসের রোগ চিহ্নিত না করলে নিরাময় সম্ভব নয়; ডাক্তার যেমন রোগ শনাক্ত না করে ঔষধ দিতে পারে না, তেমনি আত্মার ডাক্তারকেও রোগ চিহ্নিত করতে হয়।"
প্রথম রোগ—অহংকার। সুরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াত: "অহংকারবশত মানুষের প্রতি মুখ ফিরিয়ে রেখো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও আত্মগর্বী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।"
মনসুর আলী বলেন, "অহংকার হলো অন্তরের ক্যান্সার; ধীরে ধীরে গ্রাস করে; অহংকারী নিজের ভুল দেখে না, নিজেকে সঠিক মনে করে, অন্যদের ভুল। যখন নেতা অহংকারী হয়, জনগণের কথা শোনে না; ব্যক্তি অহংকারী হলে পরিবার-বন্ধু হারায়।"
নিজের ঘটনা বলেন: "একবার এক ব্যক্তির সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ; রাস্তায় দেখা হলে সালাম দিলেন না; প্রথমে রাগ হলো, কিন্তু থামলাম; ভাবলাম রাগ করলে সম্পর্ক আরও খারাপ হবে; তাঁর কাছে গিয়ে সালাম দিলাম; পরে তিনি ক্ষমা চাইলেন; সম্পর্ক আরও দৃঢ় হলো। অহংকার দূর না করলে সম্পর্ক টেকে না।"
দ্বিতীয় রোগ—দুনিয়াপ্রীতি। সুরা ইবরাহীমের ৩ নম্বর আয়াত: "যারা ইহকালীন জীবনকে আখেরাতের চেয়ে বেশি পছন্দ করে এবং আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে এবং সেটাকে বক্র করতে চায়, তারাই ঘোর বিপথগামী।"
তিনি বলেন, "দুনিয়াকে আখেরাতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিলে চিন্তা বদলে যায়; শুধু সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি নিয়ে ব্যস্ত থাকি; ইনসাফের কথা মনে থাকে না; জুলুম করতে দ্বিধা হয় না। যখন মানুষ জানে মরবে ও হিসাব দিতে হবে, জুলুম করে না; কিন্তু মৃত্যু ভুলে গেলে সব করতে পারে।"
তৃতীয় রোগ—সত্য প্রত্যাখ্যান। সুরা আল-আরাফের ১৪৬ নম্বর আয়াত: "পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার নিদর্শনাবলী থেকে বিমুখ করে রাখব।"
মনসুর আলী বলেন, "যখন অহংকারের বশে সত্য প্রত্যাখ্যান করে, আল্লাহ সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেন; সত্য দেখে না, কুরআন পড়েও বুঝে না, অন্তর অহংকারে আবৃত।"
এই রোগগুলোর সমাধান—তিনটি পথ: মুহাসাবা (প্রতিদিন নিজেকে যাচাই), মৃত্যুচিন্তা (মৃত্যুর স্মৃতি অহংকার দমন করে), হালাল উপার্জন (হারাম উপার্জন মন অন্ধ করে দেয়)।
তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন:
"মানুষ যখন বাহ্যিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা পায়, মনে করে সমস্ত শিকল ভেঙে গেছে; কিন্তু ভুলে যায়—বাইরের শিকল ভাঙার চেয়ে ভেতরের লোভ আর অহংকারের শিকল ভাঙা অনেক কঠিন। আমরা স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হয়ে আরেকটি স্বৈরাচারের দাসত্বে জড়িয়ে পড়ি, কারণ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারিনি। বাইরের স্বৈরাচার চিনতে পারি, কিন্তু ভেতরের স্বৈরাচার চিনতে পারি না।"
এই ডায়েরি পড়ে তিনি নিজেও কাঁদেন; জানেন, কথাগুলো সত্য। বাংলাদেশ বহুবার স্বৈরাচার উৎখাত করেছে, কিন্তু নতুন স্বৈরাচার আবার আসে—কেন? মানুষ ভেতর থেকে পরিবর্তিত হয়নি; যখন একটি ফেরাউনের পতন দেখে আনন্দিত হয়, খেয়াল করে না নিজেদের ভেতরে আরও কত ফেরাউন বসবাস করছে।
ছাত্রদের বলেন, "আমি হয়তো বেশি দিন থাকব না; কিন্তু শিক্ষাগুলো তোমাদের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে। তোমরা যদি নফসের জগৎ বুঝো ও নিজেদের পরিশুদ্ধ করো, আমি স্বার্থক। কারণ তখন তোমরা কেবল বাইরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেই নয়, ভেতরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেও লড়াই করবে—আর সেই লড়াইয়েই আসল জয়।"
ছাত্ররা অশ্রুসিক্ত হয়; তারা জানে, মনসুর আলীর শিক্ষা কোনো সাধারণ শিক্ষা নয়—জীবন বদলে দেওয়ার শিক্ষা। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি বলেন, "তোমরা যখন বাইরে যাও, মনে রেখো—নফসের লড়াই কখনো শেষ হয় না। প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করো, আজ আমি কোন নফসের অধীনে ছিলাম? আম্মারা, লাউয়ামা নাকি মুতমাইন্না? আম্মারায় থাকলে লাউয়ামায় যাওয়ার চেষ্টা করো; লাউয়ামায় থাকলে মুতমাইন্নার দিকে এগোও। এটাই জীবনের চিরন্তন যাত্রা।"
---
২০২৪ সালের গ্রীষ্ম। বাংলাদেশের আকাশ উত্তপ্ত—শুধু তাপমাত্রা নয়, রাজনৈতিক বাতাসও আগুনের মতো। মনসুর আলী চৌধুরী তখন তাঁর পুরনো বসতঘরে রেডিও শুনছিলেন; ডায়াল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন স্টেশন ধরতেন। প্রায় চল্লিশ বছরের রেডিও, তারের জোড়া—এখনও কাজ করে, ঠিক যেমন মনসুর আলী নিজেও কাজ করেন, সময়ের স্রোতে টিকে আছেন।
প্রতিদিন সকালে স্থানীয় রেডিওর খবর শুনতেন; খবর শুনে মন ভারী। কোটা আন্দোলনের শুরুটা ছোট, কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নেতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের 'পাকিস্তানি' বলে আখ্যা দিচ্ছেন শুনে বুকটা ধক করে উঠল। ডায়েরিতে লিখলেন: "ওই শব্দটার মধ্যে কত অবজ্ঞা! যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বড় হয়েছেন, তাদের তিনি 'পাকিস্তানি' বলছেন! এই অহংকারের সীমা নেই। ফেরাউনও মুসাকে জাদুকর বলেছিল, কিন্তু সত্যের কাছে হার মানতে হয়েছিল।"
ছাত্ররা কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করল; প্রথমে শুধু দাবি—সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। কিন্তু সরকারি প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক; ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা, পুলিশ গুলি—পরিস্থিতি দ্রুত বেগ পেল।
মনসুর আলী এই ঘটনা বিশ্লেষণ করলেন; কুরআনের 'অহংকার' সম্পর্কিত আয়াত স্মরণ করলেন—সুরা আল-আরাফের ১৪৬ নম্বর আয়াত। বুঝতে পারলেন, সরকারি প্রতিক্রিয়ার মধ্যে অহংকারের গন্ধ; প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন "আন্দোলনকারীরা পাকিস্তানি", "তারা রাষ্ট্রবিরোধী", তখন তিনি অহংকারের প্রকাশ করছেন; নিজেকে সঠিক মনে করছেন, জনগণের দাবি ভুল; অহংকারের রোগ তাকে অন্ধ করে দিচ্ছে—জনগণের দাবি কত যুক্তিসঙ্গত তা দেখতে পাচ্ছেন না।
ডায়েরিতে লিখলেন: "অহংকার কখনো মানুষকে সঠিক পথে রাখে না। ফেরাউন যখন মুসাকে দাওয়াত দিতে এলো, বলেছিল, 'তুমি কি এই পৃথিবীতে আমাদের কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছ?' মুসা বলেছিল, 'আমি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছি।' কিন্তু ফেরাউনের অহংকার তাকে সত্য গ্রহণ করতে দেয়নি; আর অহংকারের কারণেই পতন ঘটেছিল।"
সে রাতে ঘুমাতে পারেননি; ভেবেছিলেন, যিনি নব্বই বছর ধরে বাংলার ইতিহাস দেখছেন, তিনি জানেন অহংকার কোথায় নিয়ে যায়; শেখ হাসিনার সরকারের এই অহংকার তাদের পতন ডেকে আনবে—এটা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন।
ডায়েরিতে আরও লিখলেন: "শেখ হাসিনা সরকারও সেই ফেরাউনের পথে চলছে। তারা ভাবছে সব করতে পারে, জনগণ কিছু করতে পারে না, ক্ষমতা চিরস্থায়ী। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, অহংকারের কোনো প্রাসাদ টেকে না; আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।"
জুলাইয়ের মাঝামাঝি রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর—রেডিওতে শুনলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশ গুলি চালিয়েছে; তরুণ শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ। তরুণটি নিরস্ত্র, হাতে শুধু প্ল্যাকার্ড; পুলিশ গুলি চালালে পিছায়নি, বরং সামনে এগিয়েছিল; বুকে বুলেট, মাটিতে পড়ে।
মনসুর আলী কুরআন খুলে সুরা আল-ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াত পড়লেন: "যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে জীবিকা প্রাপ্ত।"
বললেন, "এই ছেলেটি শহীদ হয়েছে; তার রক্ত বৃথা যাবে না, আল্লাহর পথে যে রক্ত ঝরে তা সমাজে পরিবর্তন আনে।" ছবি দেখে চোখ দিয়ে জল পড়ল; বললেন, "এই ছেলেটি আমার নাতির বয়সী; এত কম বয়সে এত সাহস! আমি যখন তার বয়সী ছিলাম, ভাষা আন্দোলনে গিয়েছিলাম, কিন্তু বুলেটের মুখে পড়িনি; এই ছেলেটি বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছে।"
এরপর সরকার কীভাবে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে—ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, নির্বিচারে গুলি, সংবাদপত্র বন্ধ—দেখে অবাক হলেন। ভাবলেন, এত অন্যায় করেও এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে চায়? স্ত্রীকে বললেন, "জোবেদা, দেখো, অহংকার মানুষকে কত অন্ধ করে দেয়; তারা মনে করছে এইভাবে আন্দোলন থামবে, কিন্তু বুলেট কখনো সত্যকে থামাতে পারে না; বুলেট কেবল শহীদ তৈরি করে, আর শহীদের রক্ত সমাজে বিপ্লব আনে।"
সুরা আল-কাসাসের ৮৩ নম্বর আয়াত স্মরণ করলেন: "আখেরাতের সেই গৃহ আমরা তাদের জন্য নির্ধারণ করব, যারা পৃথিবীতে অহংকার করে না এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করে না। আর পরিণতি তো মুত্তাকীদের জন্যই।"
বললেন, "আল্লাহর নিয়ম অটুট; যারা অহংকার করে, বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাদের জন্য আখেরাতে জাহান্নাম; দুনিয়াতেও পতন অনিবার্য।" তাঁর কথা কেবল ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না—নব্বই বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস।
মনসুর আলী তখনই বুঝলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন হবে; কারণ তারা অহংকারের সীমা অতিক্রম করেছে; সাধারণ মানুষ হত্যা করছে, সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে, বিচার বিভাগ ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে; মানুষের ধৈর্যের সীমা আছে, আর সেই সীমা অতিক্রম করলেই জনগণ রুখে দাঁড়ায়।
৪ আগস্ট রাতে ঘুমাতে পারেননি; রেডিওতে শুনলেন সারাদেশে ভয়াবহ সংঘর্ষ—একদিনেই প্রায় ৯১ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে ১৪ জন পুলিশও। ভাবলেন, "আল্লাহর কসম, এই দিনটি ইতিহাসে লেখা থাকবে; মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ দেয়, সেটা কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।" সারারাত জেগে কুরআন পড়েছেন, দোয়া করেছেন; প্রার্থনা করেছেন যেন রক্তপাত থামে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়।
সকাল ৫ আগস্ট। খুব ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়লেন; নামাজের পর কুরআন খুলে সুরা আল-ফাজরের ২৭-৩০ আয়াত পড়লেন:
"হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাও, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর প্রবেশ করো আমার বান্দাদের দলে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।"
পড়তে পড়তে গলা কেঁপে উঠছিল; যেন অনুভব করছিলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ কিছু বলতে চাইছেন—হয়তো তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে।
দুপুরে খবর এল শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে পালিয়ে গেছেন; মনসুর আলী এক অদ্ভুত অনুভূতি পেলেন। কাঁদতে চাইলেন, কিন্তু কান্না এল না। ভাবলেন, আল্লাহর নিয়ম কীভাবে কাজ করে! যে শাসক নিজেকে অটল মনে করছিল, তাকে পালিয়ে যেতে হলো; যে অন্যায় হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ল।
মনে মনে বললেন, "আল্লাহ সবচেয়ে বড়; তিনি যাকে চান সম্মান দেন, যাকে চান অপমান করেন।" সুরা আল-ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াত মনে পড়ল: "বলো, হে আল্লাহ! তুমিই রাজত্বের অধিপতি; তুমি যাকে ইচ্ছে রাজত্ব দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছে তা ছিনিয়ে নাও।"
কিন্তু গণভবনে লুণ্ঠনের খবর শুনে মন বিষণ্ণ হলো; মানুষ কীভাবে নিজের হাতে নিজেদের ঐতিহ্য ধ্বংস করছে? ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত স্বাধীনতা জাদুঘরে আগুন—সেখানে ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস ও বাঙালির আত্মমর্যাদার নানা প্রতীক; এখন আগুন, ধ্বংস।
ভাবলেন, "এটাই কি আমাদের বিজয়? এটাই কি আমাদের মুক্তি? আমরা স্বৈরাচার উৎখাত করেছি, কিন্তু তার জায়গায় দাঁড়াচ্ছে আরেক অশুভ শক্তি—প্রতিশোধের আগুন। কুরআন বলে প্রতিশোধ নিও না; প্রতিশোধ আগুনের মতো, গোটা গোছা পুড়িয়ে দেয়।"
তখনই বুঝলেন, স্বৈরাচারের পতন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের পর শৃঙ্খলা বজায় রাখা; কারণ জুলুমের পর মানুষের মনে প্রতিশোধের প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়, অন্ধ হয়ে যায়, সঠিক-ভুল বিচার করতে পারে না—পরে আফসোস করে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে মনসুর আলী 'অহংকারের প্রাসাদ' ধারণাটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। বলতেন, "ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও নিজের নশ্বরতা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। অহংকারের প্রাসাদ খুব উঁচু, কিন্তু ভিত্তি দুর্বল—কারণ অহংকার ভিত্তি করে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা দেখে না।"
ফেরাউনের উদাহরণ দিতেন; বলতেন, "ফেরাউন যখন সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে বলল 'আমি তোমাদের সর্বোচ্চ প্রভু', নিজেকে অজেয় মনে করছিল; কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্ত পর আল্লাহ তাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিলেন। একইভাবে হামান, কারুন, নমরুদ—অহংকারী শাসকদের কারো প্রাসাদ আজ টিকেনি।"
শেখ হাসিনার সরকারের পতনকেও একই দৃষ্টিতে দেখতেন; বলতেন, "শেখ হাসিনার সরকার অহংকারের প্রাসাদ তৈরি করেছিল; মনে করেছিল সব পারে—বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ, সংবাদ মাধ্যম দমন, বিরোধীদের জেল—ভাবল এইভাবে চিরদিন ক্ষমতায় থাকবে; কিন্তু আল্লাহর নিয়মে টিকল না; অহংকারের প্রাসাদ ধসে পড়ল।"
তিনি শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষণই করছিলেন না, আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণও করছিলেন—দেখাচ্ছিলেন কীভাবে অহংকার ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে। বলতেন, "অহংকার কেবল ব্যক্তিগত রোগ নয়, সামাজিক রোগ; যখন রাষ্ট্র অহংকারী হয়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে; সমাজ অহংকারী হলে নিজের দুর্বল সদস্যদের অবহেলা করে; অহংকার ধ্বংসের বীজ বপন করে।"
ছাত্রদের বলতেন, "নিজের ক্ষমতা, সম্পদ, পদের দিকে তাকিয়ে অহংকারী হয়ো না; বরং আল্লাহর দিকে তাকাও; মনে রেখো, তুমি যাই হও, আল্লাহর কাছে বান্দা; সবকিছু একদিন শেষ; শুধু সৎকর্ম থাকবে।"
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভোর; ঢাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছিল; আজ ছিল 'লং মার্চ টু ঢাকা'—সারাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ঢাকার দিকে রওনা; পথে ফজরের নামাজ পড়েছে, কেউ ঘর থেকে রান্না করা খাবার নিয়েছে; সবার মুখে এক মন্ত্র—ইনসাফ চাই।
মনসুর আলী ভোরে ফজর পড়ে কুরআন খুলে সুরা আল-বাকারার ১৯৩ নম্বর আয়াত পড়লেন: "আর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যতক্ষণ না ফিতনা শেষ হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হয়ে যায়।"
ভাবলেন, এই লড়াই 'ফিতনা' বা জুলুমের বিরুদ্ধে; যারা নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, তারা ফিতনা সৃষ্টি করছে; তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জায়েজ। 'ফিতনা' শুধু গোলমাল নয়—মানুষের চিন্তা-চেতনা বিপর্যস্ত করা, ইনসাফের পথ থেকে বিচ্যুত করা; এই আন্দোলন ছিল ফিতনার বিরুদ্ধেই।
দিন গড়ানোর সঙ্গে খবর আসতে লাগল; যাত্রাবাড়ীতে ভয়াবহ সংঘর্ষ, পুলিশ নির্বিচারে গুলি। রেডিওতে শুনলেন অনেক শিক্ষার্থী নিহত; তাঁর হাত কাঁপতে লাগল; নামাজ পড়তে পড়তে কাঁদতে লাগলেন। জোবেদা খাতুন পাশে এসে বসে, হাত ধরে রাখে; বলে, "ওগো আল্লাহর জন্য, তুমি এত কষ্ট পেয়ো না; আল্লাহ দেখছেন সব।"
যাত্রাবাড়ী—ঢাকার প্রবেশদ্বার; সেই পথ রণক্ষেত্র। পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা সেখানে অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাচ্ছে; ইট-পাটকেল আর গুলির যুদ্ধ।
১৯ বছর বয়সী মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ইয়াসির সরকারের কথা শুনে হৃদয় ভেঙে গেল; ইয়াসির ছিল সাধারণ ছেলে, কুরআন শিখতে চাইত, স্বপ্ন ছিল আলেম হওয়ার; আজ শহীদ পুলিশের বুলেটে; তার মা হয়তো এখনও খবর পায়নি, অপেক্ষা করছে ফিরে আসার।
আরেক তরুণ আলেম মাওলানা খুবাইব বিন আবদুর রহমানকে ফ্লাইওভারের পিলারের আড়াল থেকে খুঁজে বের করে ব্রাশফায়ার; মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর আরও কয়েক রাউন্ড গুলি—নিশ্চিত করতে। মনসুর আলী চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন; বললেন, "আল্লাহর কসম, এই মাওলানা সাহেব শহীদ হয়েছেন; আল্লাহর পথে শহীদ; তার রক্ত বৃথা যাবে না।" মনে পড়ল মাওলানা খুবাইবের মতো মানুষ—সারাজীবন ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা, শান্তিপূর্ণ; তারাও বুলেটের শিকার।
যাত্রাবাড়ীতে আরও কয়েকজন—ফ্রিল্যান্সার মিরাজ হোসেন, দরজি কর্মী তারেক; মনসুর আলী তাঁদেরও স্মরণ করলেন; বললেন, "যারা ইনসাফের জন্য জীবন দেয়, তারা শহীদ; পেশা বড় নয়, উদ্দেশ্য বড়।"
এরপর চানখাঁরপুলের খবর—ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর; হঠাৎ পুলিশ ও এপিবিএন বাহিনী গুলি; প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এক পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি, আর গুলি করার পর ফোনে কথা, হাসি—যেন কিছুই হয়নি।
ছয়জন তরুণ সেদিন শহীদ; তাঁদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী শাহরিয়ার খান আনাস—সবচেয়ে ছোট। মনসুর আলী শুনে আরও জল ফেললেন; "ওর বয়স আমার নাতির মতো," ফিসফিস করে বললেন; "ও তো রাজনীতি বোঝে না; ও বুঝেছে ইনসাফ; আর ইনসাফের জন্য প্রাণ দিতে দ্বিধা করেনি।"
"আল্লাহর কাছে এই ছেলেটি কত বড়," বললেন; "আমি নব্বই বছরে অনেক দেখেছি, কিন্তু এত নির্ভীক তরুণ দেখিনি—বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছে, প্রতিশোধের ভয় পায়নি; জানত ইনসাফের পথে চলছে।"
সরকার কীভাবে জনগণের ওপর গুলি চালাচ্ছে—একজন শাসকের কি এ অধিকার? কুরআন কী বলে?
সুরা আল-ফুরকানের ৬৮ নম্বর আয়াত: "যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যাকে নিষেধ করেছেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না।"
মনসুর আলী বললেন, "এই আয়াত স্পষ্ট—অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা বড় পাপ; যারা নির্দেশ দিয়েছে, তাদের কঠিন শাস্তি; আখেরাতে কঠিন শাস্তি, ইনশাআল্লাহ।"
তিনি আরও বললেন, "এই রাজপথে অনেক রক্ত দেখেছি—১৯৪৭-এর দাঙ্গা, ১৯৭১-এর যুদ্ধ; কিন্তু আজকের রক্ত অন্য রকম; ইনসাফের রক্ত; জুলুমের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে আসলে তাদের রক্ত আল্লাহর কাছে খুব মূল্যবান।"
দুপুর বারোটায় খবর—শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে পালিয়েছেন; পরিস্থিতি বদলে গেল; মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল—গণভবনে লুণ্ঠন, কেউ উল্লাস, কেউ কান্না, কেউ ক্ষোভে ধ্বংস।
মনসুর আলী লুণ্ঠনের খবর শুনে চিন্তিত; বললেন, "আমি জানি মানুষের ক্ষোভ আছে; কিন্তু এই লুণ্ঠন আমাদের বিজয়কে কলঙ্কিত করবে; কারণ কুরআন বলে প্রতিশোধ নিও না; মানুষ অন্যায় করলে আল্লাহ বিচার করবেন; তোমরা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করো না।" সুরা আল-মায়িদার ৪৫ নম্বর আয়াত স্মরণ করলেন— "প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ... কিন্তু যে ক্ষমা করে, তা তার জন্য কাফফারা"; বললেন, "ক্ষমা করাই উত্তম।"
গণভবনের ভেতর থেকে মানুষ টাকা, শাড়ি, গয়না, আসবাব, এমনকি পুকুরের মাছ ও হাঁস-মুরগি লুণ্ঠন—শুনে মনসুর আলী খুব দুঃখ পেলেন; "আমরা স্বৈরাচার উৎখাত করেছি, কিন্তু তার জায়গায় অন্যায়ের বসতি যেন না করে; এই লুণ্ঠন নৈতিক পতন ঘটাবে।"
এরপর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে স্বাধীনতা জাদুঘরে আগুন—স্তম্ভিত; "বাঙালি জাতি নিজের পায়ে কুঠার মেরেছে; এই জাদুঘর ছিল স্বাধীনতার স্মৃতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক; স্মৃতি পুড়ে গেল।" পরে জানলেন দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে—মনে কিছুটা শান্তি, তবে তীব্র নিন্দা জানালেন; "বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো অধ্যায়; যারা করেছে হয়তো রাজনৈতিক স্বার্থে, কিন্তু ভুলে গেছে—এই জাদুঘর কোনো দলের ছিল না, সমগ্র জাতির সম্পদ।"
মনসুর আলী ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করলেন:
"আজকের দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে; কিন্তু সঙ্গে লেখা থাকবে লজ্জার অক্ষরেও। জনগণ জুলুমের বিরুদ্ধে জয়ী—এটা সত্যি; কিন্তু জয়ের পর লুণ্ঠনে লিপ্ত—এটাও সত্যি। প্রকৃত ইনসাফ চাইলে লুণ্ঠন ও প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে ফেলতে হবে।"
শেষে লিখলেন:
"আমি যখন রক্তের রাজপথ দেখি, মনে হয় এখানে 'নফসে লাউয়ামা'-র জাগরণ হয়েছে; বিবেক জেগেছে, আর জুলুম সহ্য করছে না। কিন্তু এই জাগরণ যেন 'নফসে মুতমাইন্না'-র দিকে নিয়ে যায়—শুধু প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়, শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা দরকার।"
"আমি নব্বই বছর দেখলাম কীভাবে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কিন্তু বিজয়ের পর কীভাবে আবার অন্যায়ে লিপ্ত হয়। বিজয়ের চেয়েও কঠিন বিজয়কে ধারণ করা; বিজয়ী মানুষকে সাবধান থাকতে হবে, যেন নতুন জুলুম না করে।"
ডায়েরি শেষে কুরআন খুলে সুরা আল-ফুরকানের ৬৩ নম্বর আয়াত পড়লেন:
"পরম করুণাময়ের বান্দা তারাই, যারা যমীনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে সালাম।"
বললেন, "প্রকৃত 'ইবাদুর রহমান' হতে চাইলে বিজয়ের পরও নম্র হতে হবে, ক্ষমাশীল হতে হবে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।"
ছাত্রদের বললেন, "তোমরা যখন জয় পাও, অহংকারী হয়ো না; অহংকার জয় নষ্ট করে; মনে রেখো, যে অহংকার করে, আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন।"
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে নতুন অধ্যায় শুরু; অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া; ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ। মনসুর আলী কিছুটা আশ্বস্ত হলেন; "ড. ইউনূস সৎ মানুষ; গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে দরিদ্রদের সহায়তা করেছেন; আশা করি দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাবেন।" মনে পড়ল গ্রামীণ ব্যাংকের গল্প—কীভাবে একজন অর্থনীতিবিদ দরিদ্রদের টাকা দিয়ে প্রমাণ করলেন তারা বিশ্বস্ত; ভাবলেন, এই মানুষটিই দেশ চালালে হয়তো ইনসাফ আসবে।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই নানা সমস্যা—প্রথমত, ইউনূসের নিযুক্তি নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক; সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে সংসদ সদস্য হতে হবে, কিন্তু ইউনূস সংসদ সদস্য ছিলেন না; আইনগত জটিলতা।
মনসুর আলী বললেন, "সংবিধান মানুষের জন্য তৈরি, মানুষ সংবিধানের জন্য নয়; অসাধারণ পরিস্থিতিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যায়; কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যেন এই বিশেষ ব্যবস্থা নতুন স্বৈরাচার না তৈরি করে। সংবিধানের ফাঁকফোকর দিয়ে নতুন স্বৈরাচার তৈরি হলে আবার ফেরাউনের খপ্পরে পড়ব।"
আরেক সমস্যা—নির্বাচন; সংবিধান বলে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার মনে করল প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া নির্বাচন ঠিক না; নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হলো।
মনসুর আলী বললেন, "নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে নই—যত বেশি সময় সরকার হাতে, স্বৈরাচারের সম্ভাবনা তত বেশি; কিন্তু সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থহীন; স্বল্প সময়ে সংস্কার শেষ করে নির্বাচন দেওয়া উচিত।"
সবচেয়ে বড় সমস্যা—সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা; ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসা, রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে হামলা-অগ্নিসংযোগ। মনসুর আলী মর্মাহত; "কুরআন বলে প্রতিশোধ নিও না; প্রতিশোধ ইনসাফ নিয়ে আসে না, আরও প্রতিশোধের জন্ম দেয়; সমাজে প্রতিশোধের সর্পিল শেষ পর্যন্ত সবাইকে গ্রাস করে।"
বিশেষ করে হিন্দু ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা—অত্যন্ত কষ্ট দিল; বললেন, "প্রকৃত মুসলিম হতে চাইলে অন্য ধর্মের মানুষদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে; কুরআন বলে 'ধর্মে কোনো জোরজবরদস্তি নেই'; আমরা কাউকে জোর করে মুসলিম করতে পারি না, যেমন অন্য ধর্মের মানুষদের পালনে বাধা দিতে পারি না।"
সুরা আল-বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত উল্লেখ করলেন; বললেন, "এই আয়াত স্পষ্ট শিক্ষা—আমরা কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করতে পারি না; অন্য ধর্মের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে পারি; তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধা দিতে পারি না।"
কিন্তু সহিংসতায় দেখা গেল অনেক হিন্দু পরিবারের ওপর হামলা, ব্যবসা লুণ্ঠন; রাগ হলো; বললেন, "এ কাজ ইসলাম সমর্থন করে না; জাহিলিয়াতের কাজ; যারা করছে তারা প্রকৃত মুসলিম নয়, নিজেদের স্বার্থে ইসলাম ব্যবহার করছে।"
আরও বললেন, "আমাদের সমাজে কিছু দুষ্কৃতকারী; সুযোগ পেলেই সহিংসতা; অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত তাদের শাস্তি দেওয়া—কারণ তারা রাষ্ট্রের শান্তি-নিরাপত্তা নষ্ট করছে।"
আরেক ভয়াবহ ঘটনা—'মব জাস্টিস' বা পিটিয়ে হত্যা; ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে অনেককে পিটিয়ে হত্যা; বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তোফাজ্জল নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যা; নিরীহ, কেবল ভুল জায়গায় ছিল, জনতার ক্রোধের শিকার।
মনসুর আলী কাঁদতে লাগলেন; "আল্লাহর কসম, কী হচ্ছে? আমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, তাদের থেকে কীভাবে আলাদা? তারাও মানুষ হত্যা করত; আমরাও করছি; তাহলে লড়াইটা কী জন্য?"
"ইনসাফ প্রতিষ্ঠা চাইলে নিজেদের হাতেও ইনসাফ রাখতে হবে; ভেতরের অহংকার ও প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে ফেলতে হবে; অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরও অন্যায় করলে আমরা জালেম থেকে কম নই।"
এই ঘটনাগুলো দেখে তিনি উপলব্ধি করলেন—স্বৈরাচার পতন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্বৈরাচারী মানসিকতা এখনও সমাজে বিদ্যমান; মানুষ এখনও বুলেটে সমস্যা সমাধান চায়, প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ হয়।
ডায়েরিতে লিখলেন:
"বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচার উৎখাত করেছে, কিন্তু স্বৈরাচারী মানসিকতা উৎখাত করতে পারেনি; এখনও ভাবি বলপ্রয়োগে সমস্যা সমাধান, প্রতিশোধেই ইনসাফ; কিন্তু ইনসাফের জন্য দরকার ধৈর্য, শান্তি, আইনের শাসন।"
"আমি আশা করেছিলাম, ২০২৪-এর অভ্যুত্থান সমাজে পরিবর্তন আনবে; কিন্তু দেখছি পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাচ্ছি; কীভাবে এগোতে পারি? কীভাবে সত্যিকার ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করি?"
উত্তর খুঁজতে কুরআনের দিকে ফিরে গেলেন; সুরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াত পড়লেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় থাকবে, ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদানে। কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে অন্যায় করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো, তা তো তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।"
বললেন, "এই আয়াত শিক্ষা দেয়—শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করতে হবে; সত্যিকার ইনসাফ চাইলে শত্রুদের সঙ্গেও ন্যায়বিচার; কারণ ন্যায়বিচার তাকওয়ার নিকটবর্তী।"
ছাত্রদের বললেন, "আমরা স্বৈরাচার উৎখাত করেছি—তাদের হয়তো শত্রু মনে করি; কিন্তু তাদের সঙ্গেও ইনসাফ করতে হবে; বিচার আইনের মাধ্যমে, রাস্তায় পিটিয়ে না; রাস্তায় পিটিয়ে বিচার হয় না, হয় প্রতিশোধ।"
"আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—নিজেদের ভেতরের স্বৈরাচার দমন; অন্যায় দেখলে রাগ, দ্রুত প্রতিশোধ চাই; কিন্তু কুরআন শিক্ষা দেয় ধৈর্য ধরো; কারণ ধৈর্যই ইনসাফের পথ প্রশস্ত করে।"
সুরা আল-আসরের আয়াত উল্লেখ করলেন; বললেন, "এই আয়াত চারটি বিষয়ে শিক্ষা—ঈমান, সৎকাজ, সত্যের উপদেশ, ধৈর্যের উপদেশ; এই চারটি মনে রাখতে হবে; সৎকাজ করতে ধৈর্য, সত্য প্রতিষ্ঠায় ধৈর্য; ধৈর্য ছাড়া কিছু অর্জন যায় না।"
বিজয়ের পরের সময়কে পরীক্ষার সময় মনে করতেন; বলতেন, "আল্লাহ পরীক্ষা করছেন—জয়ের পর কী করি; অহংকারী হই নাকি বিনয়ী থাকি; প্রতিশোধ নিই নাকি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করি; লুণ্ঠন করি নাকি রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করি।"
"আশা করি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হব; জয়কে সঠিক ধারণ করব; আল্লাহর কাছে জয়ের চেয়ে জয়কে ধারণা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
ছাত্রদের মধ্যে তাঁর কথা ব্যাপক প্রভাব ফেলল; তাঁরা অহংকার দমন, প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করলেন।
মনসুর আলী যখন দেখলেন ছাত্ররা পরিবর্তিত হচ্ছে, মুখে হাসি; বললেন, "আমি নব্বই বছরে এই আনন্দ পাচ্ছি যে শিক্ষাগুলো কাজ করছে; ছাত্ররা বুঝছে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য কী করতে হবে; আশা করি একদিন সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।"
মনসুর আলী তাঁর শেষভাগে বুঝলেন, সমাজে প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য আত্মশুদ্ধি দরকার; রাজনৈতিক পরিবর্তন যতই হোক, মানুষের ভেতরের পরিবর্তন না হলে তা দীর্ঘস্থায়ী নয়। তাই শেষ সময়গুলো আত্মশুদ্ধির পথ দেখানোর জন্য উৎসর্গ করলেন।
বলতেন, "আত্মশুদ্ধি হলো 'তাযকিয়াতুন নফস'—নিজের মন পরিশুদ্ধ করা; চিন্তা, আবেগ, আচরণ—সব কুরআনের আলোয় শুদ্ধ করা; যখন আত্মা শুদ্ধ হয়, সহজেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারি; তখন কোনো স্বার্থ থাকে না; শুধু সত্যের পথে চলি।"
তিনটি প্রধান স্তর চিহ্নিত করলেন: প্রথম 'মুহাসাবা'—আত্ম-বিশ্লেষণ; প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করো—আজ কী ভালো করেছি? কী খারাপ? কোথায় ভুল? আত্ম-বিশ্লেষণ ছাড়া আত্মশুদ্ধি নয়। নিজের সমালোচনা শুনে প্রথমে রাগ হয়, কিন্তু থামি, ভাবি—লোকটি সঠিক বলছে? যদি সঠিক, তাহলে ভুল স্বীকার করা উচিত।
দ্বিতীয় 'তওবা'—অনুশোচনা; ভুলের জন্য আন্তরিক অনুতাপ, ভবিষ্যতে না করার প্রতিজ্ঞা। ভুল স্বীকার করতে চাই না—অহংকার বাধা দেয়; কিন্তু কুরআন বলে 'যারা তওবা করে ও সংশোধন করে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্ষমাশীল'—ভুল স্বীকার করাই সাহস।
তৃতীয় 'আমল'—সৎকর্ম; শুধু আত্ম-বিশ্লেষণ আর তওবা যথেষ্ট নয়; সৎকর্ম করতে হবে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মানুষের কল্যাণে কাজ; সৎকর্ম ছাড়া আত্মশুদ্ধি পূর্ণ হয় না।
মনসুর আলী নিজেও এই পথ অনুসরণ করে পরিবর্তিত হয়েছিলেন—অহংকার দমন, দুনিয়াপ্রীতি কমানো, সত্যের পথে চলা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কাজ।
ছাত্রদের বলতেন, "আমি যদি আত্মশুদ্ধি না করতাম, ইনসাফের কথা বলতে পারতাম না; তখন নিজেও অন্যায়ে লিপ্ত থাকতাম; কিন্তু আত্মা পরিশুদ্ধ করে বুঝেছি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কত গুরুত্বপূর্ণ।"
তিনি এই পথ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন; চাইতেন প্রতিটি মুসলিম এই পথে চলুক—জানতেন যখন সমাজের মানুষ আত্মশুদ্ধি অর্জন করবে, সমাজ নিজেই পরিবর্তিত হবে; স্বৈরাচার থাকবে না, জুলুম থাকবে না।
বলতেন, "যে সমাজের মানুষ আত্মশুদ্ধি অর্জন করে, সেই সমাজে স্বৈরাচার টিকতে পারে না; স্বৈরাচারের ভিত্তি অজ্ঞতা, লোভ ও অহংকার; মানুষ এসব থেকে মুক্ত হলে স্বৈরাচারের ভিত্তি থাকে না।"
শেষ বছরগুলোতে এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত ছিলেন; মসজিদে খুতবা, সমাবেশে ভাষণ, ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা—চাইতেন শিক্ষাগুলো পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছুক।
বলতেন, "আমি হয়তো মারা যাব, কিন্তু শিক্ষা মরবে না; শিক্ষা বেঁচে থাকে মানুষের মনে; আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।"
আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব বুঝিয়ে বলতেন, "ইনসাফ প্রতিষ্ঠা চাইলে নিজের আত্মা শুদ্ধ করতে হবে; অন্যায়ের মূল কারণ মানুষের ভেতরের কলুষতা; ভেতর থেকে কলুষতা দূর করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হবে।"
ডায়েরিতে লিখে গেছেন:
"আমি নব্বই বছরে দেখেছি, যারা আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছে, তারা কখনো অন্যায় করেনি; ইনসাফের পথে থেকেছে; যারা করেনি, তারা কখনো প্রকৃত ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি—নিজেদের ভেতরেই অশান্তি ছিল।"
"আশা করি, বাংলাদেশের মানুষ আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে আসবে; আত্মশুদ্ধি ছাড়া জাতির মুক্তি নেই; রাজনৈতিক মুক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আত্মিক মুক্তিও তেমন; দুইটি একত্রে না এলে প্রকৃত মুক্তি আসে না।"
ডায়েরি পড়ে চোখে অশ্রু; নিজেকে প্রশ্ন করতেন, "আমি কি যথেষ্ট করেছি? শিক্ষাগুলো সঠিক পৌঁছে দিতে পেরেছি?"
কিন্তু জানতেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন; জীবন উৎসর্গ করেছেন আত্মশুদ্ধি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য; কিছু অসম্পূর্ণ থেকে গেলে আল্লাহর ইচ্ছায়।
শেষ দিনগুলোতে খুব শান্ত ছিলেন; নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া; আল্লাহর কাছে প্রার্থনা— "হে আল্লাহ, শিক্ষাগুলো কবুল করো; বাংলাদেশের মানুষকে ইনসাফের পথে পরিচালিত করো; স্বৈরাচার উৎখাত করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো।"
বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন—কুরআন বলে "আমি তোমার ডাকে সাড়া দিই; যে আমাকে ডাকে, তার ডাক শুনি"—আশাবাদী ছিলেন; জানতেন বাংলাদেশ একদিন ইনসাফের দেশ হবে; সেদিন হয়তো তিনি থাকবেন না, কিন্তু শিক্ষা বেঁচে থাকবে—সেটাই যথেষ্ট।
মনসুর আলী চৌধুরী এখন নব্বই বছরের প্রবীণ; শরীর দুর্বল, কিন্তু আত্মা শক্তিশালী; চোখে এখনও তেজ, যুবক বয়সের মতো; কুরআনের আয়াত পড়তে পারেন, ছাত্রদের শিক্ষা দিতে পারেন; আঙুলে স্পর্শ—যখন কুরআন স্পর্শ করেন, হাত কাঁপে না।
জীবনের দিকে ফিরে তাকালে অনেক কিছু দেখেন: ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, মানুষ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে; ১৯৪৭-এর দেশভাগ, মানুষ বিভক্ত; ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে; ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, মানুষ আবার স্বৈরাচার উৎখাত করেছে।
কিন্তু আরও দেখেন, ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষ এখনও পরিবর্তিত হয়নি—অহংকারী, লোভী, অন্যায়কারী; ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ডায়েরিতে লিখেছিলেন, "আমরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছি, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না।"
এই উপলব্ধি থেকে প্রশ্ন করেন: "কেন মানুষ পরিবর্তিত হচ্ছে না? কেন বারবার একই ভুল?"
উত্তর দেন: "কারণ মানুষ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেনি; বাহ্যিক পরিবর্তন করেছে, আভ্যন্তরীণ করেনি; রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছে, কিন্তু আত্মিক স্বাধীনতা পায়নি; তাই বারবার একই ভুল।"
বলতেন, "রাজনৈতিক স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আত্মিক স্বাধীনতাও তেমন; শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলে আবার স্বৈরাচারের দাস হয়ে যাব—স্বৈরাচার আমাদের ভেতরে বাস করে।"
ছাত্রদের বলতেন, "যখন নিজেদের ভেতরের স্বৈরাচার উৎখাত করতে পারবে, বাইরের স্বৈরাচার আর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না—মন স্বাধীন হবে; কাউকে ভয় করবে না, শুধু আল্লাহকে ভয় করবে।"
এই উপলব্ধি থেকে চূড়ান্ত বার্তা: "জীবনে প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য আত্মশুদ্ধি করতে হবে; অহংকার দমন, দুনিয়াপ্রীতি কমানো, সত্যের পথে চলা—এই চারটি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি।"
সুরা আল-আসরের আয়াত স্মরণ করলেন; বললেন, "এই আয়াত চারটি বিষয়ে শিক্ষা—ঈমান, সৎকাজ, সত্যের উপদেশ, ধৈর্যের উপদেশ; এই চারটি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার স্তম্ভ।"
মনসুর আলীর জীবনদর্শনের সারাংশ—আত্মশুদ্ধি ও ইনসাফ; কুরআনকে পথপ্রদর্শক করেছেন; জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; স্বৈরাচার উৎখাতে কাজ করেছেন; কিন্তু কখনো ভোলেননি প্রকৃত পরিবর্তন আসে ভেতর থেকে— "প্রথমে নিজেকে বদলাও, তারপর সমাজ; নিজেকে না বদলিয়ে সমাজ বদলানো সম্ভব নয়।"
শেষ সময়গুলো শান্ত; জানেন যা করার করেছেন—আত্মশুদ্ধির পথ, ইনসাফের আহ্বান, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো; এখন প্রার্থনা করেন শিক্ষাগুলো পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছায়।
শেষ ডায়েরিতে লিখেছেন:
"জীবনের শেষ প্রান্তে কুরআনের সেই আয়াত স্মরণ করি, যা যাত্রার শুরুতে পথ দেখিয়েছিল: 'আলিফ-লাম-মীম। সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ।' এই কিতাবই পথনির্দেশক হয়েছে; শিখিয়েছে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, অহংকার দমন, আত্মশুদ্ধি অর্জন।"
"আমি জানি, সময় শেষ; হয়তো বেশি দিন থাকব না; কিন্তু আল্লাহর কাছে দোয়া করি—শিক্ষাগুলো বেঁচে থাকুক; মানুষ আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে আসুক; বাংলাদেশ একদিন ইনসাফের দেশ হোক।"
এই ডায়েরি তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়; তিনি বিদায় নেবেন, কিন্তু শিক্ষা থেকে যাবে; মানুষকে ইনসাফের পথ দেখাবে; অহংকার দমনে সাহায্য করবে; আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে।
আর এই শিক্ষাগুলোই মনসুর আলী চৌধুরীর সবচেয়ে বড় অবদান—তিনি কেবল জীবনযাপন করেননি, জীবনের অর্থ খুঁজেছেন; কেবল বাঁচেননি, বাঁচতে শিখিয়েছেন; কেবল মরেননি, শিক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুকে জয় করেছেন।
মনসুর আলী চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২০২৬ সালের এক শীতের সকালে; বয়স প্রায় বিরানব্বই। শেষ দিনগুলো শান্ত; জানতেন সময় শেষ—ছাত্রদের ডেকে শেষ শিক্ষা দিয়ে গেলেন।
সে সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছিলেন; জোবেদা খাতুন আগেই চলে গেছেন—২০২৫-এ মারা যান; তারপর থেকে একা, কিন্তু ছাত্ররা পাশে ছিল; শেষদিনগুলোতে আসিফ সবসময় কাছে থাকত।
বললেন, "আমার সময় শেষ; হয়তো বেশি বাঁচব না; কিন্তু শিক্ষাগুলো তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে; যদি ধারণ করো, আমি বিদায় নিলেও আত্মা তোমাদের মধ্যে বাস করবে।"
ছাত্রদের বললেন, "তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কাজ করো; অহংকার দমন করো; আত্মশুদ্ধি অর্জন করো; সত্যের পথে চলো; ধৈর্য ধরো—এই পথেই তোমাদের মুক্তি, বাংলাদেশের মুক্তি।"
তারপর চোখ বন্ধ করে দোয়া করতে লাগলেন; ঠোঁটে সুরা আল-ফাজরের ২৭তম আয়াত:
"হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাও, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।"
পড়তে পড়তে নিঃশ্বাস বন্ধ; চিরনিদ্রায়; মুখে প্রশান্তি—যেন জানতেন আল্লাহর কাছে ফিরে যাচ্ছেন, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।
ছাত্ররা কাঁদল, কিন্তু জানত—মনসুর আলী এখন জান্নাতে; আর কষ্ট নেই। জানাজা পড়ালো, দাফন করলো; কবরে ফুল, দোয়া—আল্লাহ যেন ক্ষমা করেন ও জান্নাত দান করেন। আকাশে সূর্যের আলো কবরকে সোনালি করে তুলছিল; আসিফ বলল, "হুজুরের মতো সরল মানুষ আর দেখিনি।"
পরবর্তী বছরগুলোতে ছাত্ররা তাঁর শিক্ষা ছড়িয়ে দিল; মসজিদে খুতবা, সমাবেশে ভাষণ, মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও ইনসাফের আহ্বান। মনসুর আলীর ডায়েরি প্রকাশ করল; মানুষ অনুপ্রাণিত হল—বুঝতে পারল কীভাবে আত্মশুদ্ধি ও ইনসাফ একসঙ্গে সম্ভব; ডায়েরি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল, স্কুল-কলেজে পড়ানো হতে লাগল।
ধীরে ধীরে তাঁর শিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে পড়ল; মানুষ অহংকার দমন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে শুরু করল; আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করল। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে লাগল; ২০২৪-এ স্বৈরাচারের পতন হয়েছিল, কিন্তু সমাজে কিছু অশান্তি ছিল; মনসুর আলীর শিক্ষা সেই অশান্তি দূর করতে সাহায্য করল—প্রতিশোধ নয়, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
কয়েক বছর পর বাংলাদেশ নয়া রূপ পেল—ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত, অহংকার দমন, আত্মশুদ্ধি সর্বস্তরে ছড়িয়ে; স্বৈরাচার নেই, গণতন্ত্র; জুলুম নেই, ইনসাফ।
মনসুর আলী বেঁচে থাকলে খুশি হতেন—বলতেন, "শিক্ষাগুলো কাজ করেছে; মানুষ বুঝেছে আত্মশুদ্ধি ও ইনসাফ একসঙ্গে সম্ভব; বাংলাদেশ এখন ইনসাফের দেশ।"
কিন্তু তিনি আর নেই; আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন; জান্নাতে আল্লাহর রহমত উপভোগ করছেন; কোনো কষ্ট নেই। তাঁর শিক্ষা থেকে গেছে—মানুষকে ইনসাফের পথ দেখায়, অহংকার দমনে সাহায্য করে, আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে।
মনসুর আলী বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষায় অমর—ছাত্রদের মধ্যে, ডায়েরিতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে। তিনি ছিলেন নিরব সাক্ষী—নীরবে দেখেছেন বাংলার নব্বই বছরের ইতিহাস, বিশ্লেষণ করেছেন কুরআনের শিক্ষা, শিখিয়েছেন আত্মশুদ্ধি ও ইনসাফের পথ; নীরবে চলে গেছেন, কিন্তু শিক্ষা থেকে গেছে; আর এই শিক্ষাই একদিন বাংলাদেশকে ইনসাফের দেশে পরিণত করবে—ইনশাআল্লাহ।
মনসুর আলী চলে গেছেন; কিন্তু তাঁর কথা, শিক্ষা, জীবনদর্শন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তাঁর ছাত্ররা নিজ নিজ জায়গায় কাজ করছে—আসিফ এখন একটি এনজিও চালায়, গ্রামের মানুষকে কুরআনের আলোয় ইনসাফ শিক্ষা দেয়; আরও অনেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—কেউ ইমাম, কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজকর্মী। তারা একত্রিত হলে মনসুর আলীর কথা স্মরণ করে; তাঁর কণ্ঠ শোনে, যা ইনসাফের পথে পরিচালিত করেছিল; তাঁর হাসি দেখে, যা কঠিন সময়েও আশা দিয়েছিল।
একদিন আসিফ পুরনো ডায়েরিতে মনসুর আলীর হাতে লেখা শেষ বার্তা পায়:
"আমি চলে যাচ্ছি; কিন্তু মনে রেখো—ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কোনো একদিনের কাজ নয়; প্রতিদিনের কাজ; প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করো, আমি কি ইনসাফ করেছি? অহংকার দমন করেছি? আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছি? যদি না করো, কাল থেকে শুরু করো—কারণ কাল খুব দেরি হতে পারে।"
আসিফ পড়ে কাঁদে; সংকল্প করে—মনসুর আলীর পথেই চলবে; জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কাজ করবে।
গ্রামের নতুন প্রজন্ম মনসুর আলীকে চেনে না, কিন্তু তাঁর কথা শুনেছে; জানে একসময় এই গ্রামে এক বুড়ো মানুষ বাস করত, যিনি বলতেন, "অহংকার বর্জন করো, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো, আত্মশুদ্ধি অর্জন করো।" জানে সেই মানুষটিই পূর্বপুরুষদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন; তাঁর শিক্ষার কারণেই বাংলাদেশ আজ ইনসাফের দেশ।
মনসুর আলী চলে গেছেন, কিন্তু অমর; বেঁচে আছেন তাঁর শিক্ষায়, আদর্শে, ভালোবাসায়; প্রতিটি ইনসাফপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে, প্রতিটি আত্মশুদ্ধিকামী মানুষের মনে।
তিনি চিরন্তনের পথিক—এই পৃথিবীতে এসেছিলেন ইনসাফের বীজ বপন করতে; চলে গেছেন; কিন্তু সেই বীজ বৃক্ষ হয়েছে; ছায়ায় এখন বাংলাদেশের মানুষ আশ্রয় পায়; ফল দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছেছে।
মনসুর আলী প্রমাণ করে গেছেন—আধ্যাত্মিকতা ও ইনসাফ এক সিক্কার দুই পিঠ; কোনো মানুষ আধ্যাত্মিক হতে পারে না যদি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করে; কোনো সমাজ ইনসাফপূর্ণ হতে পারে না যদি তার মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে পতিত হয়।
আজকের বাংলাদেশ—যেখানে স্বৈরাচার নেই, ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত, মানুষ অহংকার দমন করে—সে বাংলাদেশ মনসুর আলী চৌধুরীর স্বপ্নের বাংলাদেশ; বাস্তবায়িত তাঁর ছাত্রদের মাধ্যমে, শিক্ষার মাধ্যমে, জীবনদর্শনের মাধ্যমে।
নসুর আলীর চূড়ান্ত বিজয়—ফেরাউনের পতন দেখেছেন, অহংকারের প্রাসাদ ধসে পড়তে দেখেছেন, ইনসাফের উত্থান দেখেছেন; সব দেখেছেন, সব সত্য হয়েছে; কারণ সত্য কখনো মিথ্যার কাছে হার মানে না; ইনসাফ কখনো জুলুমের কাছে পরাজিত হয় না।
এটাই তাঁর জীবনদর্শনের সারমর্ম—সত্যের জয় অনিবার্য, ইনসাফের জয় চিরন্তন; এই পথেই চলতে হবে, এই পথেই বাংলাদেশের মুক্তি, মানুষের মুক্তি, 'আল-ইনসান আল-কামিল'-এর মর্যাদা।
সমাপ্ত