প্রকাশিত :  ১২:৩৯
৩০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:০৪
৩০ জুন ২০২৬

অন্তর্জল

অন্তর্জল

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

রাত প্রায় আড়াইটা। শহরের কোলাহল মিলিয়ে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু আরিয়ানের ফ্ল্যাটের আলো জ্বলেই রইল। টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাইকোলজি জার্নাল আর ক্লিনিক্যাল রিপোর্টের ভিড়ে এক কাপ কালো কফি—এতক্ষণে ঠান্ডা—আর একটা লেদার-বাউন্ড নোটবুক। পাতায় কাঁপা হাতের লেখা:

"মানুষ সবসময় ভেতরের নদীটাকে চুপ করিয়ে রাখতে চায়। অথচ এই নদীর শব্দই তো বাঁচার সাক্ষ্য।"

আরিয়ান রহমান, বয়স বত্রিশ, মনোবিজ্ঞানী। মানুষের অবচেতনের গভীরে যাওয়া তার নেশা, কিন্তু নিজের মনটা তার কাছে যেন আজও অচেনা। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থিওরি আর নিউরোসায়েন্সের জটিল শব্দগুলো তার মুখস্থ, রোগীদের কেস হিস্ট্রি পড়ে তিনি রাতভোর ডায়াগনোসিস তৈরি করতে পারেন—কিন্তু নিজের জীবনের গল্পটা কোনো থেরাপি নোটে ধরে না।

ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় সাড়ে তিনটা, ফোন বাজল। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি কল।

"ড. রহমান, আপনার রোগী ঈশিতা হক। ওভারডোজ। আমরা ইমার্জেন্সিতে এনেছি।"

শব্দটা কানে যেতেই ঘরের বাতাস সরে গেল। আরিয়ান অন্ধকার জানালার দিকে তাকিয়ে রইল—কাচে শহরের আলোর ঝলক, আর তার নিজের প্রতিবিম্ব। ভেতরে একটা প্রশ্ন জ্বলে উঠল, যার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।

"আমি কি ব্যর্থ?"

হাসপাতালের করিডোরে সাদা ফ্লোরোসেন্ট আলো, জীবাণুনাশকের তীক্ষ্ণ গন্ধের মাঝে মিশে আছে ভয় আর ক্লান্তি। ঈশিতাকে স্ট্রেচারে নিয়ে যাচ্ছে নার্সরা। মুখটা অদ্ভুত শান্ত—যেন ঘুমিয়ে আছে, কোনো স্বপ্ন ছাড়া। আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু চোখে সেই পুরোনো প্রশ্ন।

শেষ সেশনের কথা ভাসছে। ঈশিতা বলেছিল—শান্ত কণ্ঠে, কিন্তু চোখে দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ—

"ডাক্তার, কাগজে-কলমে সবকিছু ঠিক আছে, আমি জানি। কিন্তু মাথার ভেতর একটা আওয়াজ বারবার বলে—আমি যথেষ্ট নই।"

আরিয়ান তখন সোজা বলেছিল—"চিন্তাটা নোট করো। যাচাই করো, সত্যি কিনা।"

ঈশিতা হেসেছিল—একটু তিক্ত, একটু ক্লান্ত—"চিন্তার সঙ্গে যুক্তি চলে না, ডাক্তার। চিন্তা তো ঢেউ।"

আজ সেই ঢেউ তাকে ডুবিয়ে দিল।

ভোরের আলো যখন হাসপাতালের জানালা দিয়ে ঢুকল, ঈশিতার চোখ খুলল। সাদা চাদরের ওপর এক টুকরো রোদ, ঠোঁটে শুষ্কতা। আরিয়ান চেয়ারেই বসে ছিল। রাতভর সে ওঠেনি।

"আমি মরিনি?" ঈশিতার গলা ফেটে-ফাটা।

আরিয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, "না। কিন্তু এটাকে সুযোগও বলা যায়।"

ঈশিতা শুকনো ঠোঁটে হাসল—"মৃত্যু থেকে বাঁচা এখন সুযোগ?"

"হ্যাঁ। জীবন নতুন করে সাজানোর সুযোগ দেয়। আবার শুরু করতে পারো। চাইলে তোমার গল্পের নতুন ফ্রেম বানাতে পারো।"

ঈশিতা চোখ বন্ধ করল। এই মানুষটা অদ্ভুত—বোঝে না, তবু বোঝাতে চায়।

সেদিন বিকেলে আরিয়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে। নিচে শহরের চিরচেনা শব্দ, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, ভিড়। নিজের নোটবুক খুলে লিখল শুধু একটা শব্দ—"Reframe"। নিচে ছোট করে লিখল—"যা দেখো, তাই সত্য নয়। সত্য নির্ভর করে তুমি কীভাবে দেখো।"

তার মায়ের কথা মনে পড়ল। আঠারো বছর বয়সে মা আত্মহত্যা করেছিলেন। তার আগে বলতেন, "আরিয়ান, জীবনের প্রতিটি ব্যথা এক আয়না। তাতে নিজের মুখই দেখো।" আরিয়ান তখন বোঝেনি। এখন প্রতিটি রোগীর চোখে মায়ের সেই চোখ খুঁজে পায়। ঈশিতার ঘুমন্ত মুখেও সেই ছায়া।

সেদিন হাসপাতালের গার্ডেনে গেল তারা। পাতার ফাঁকে সূর্যের আলো, নরম ঘাস। আরিয়ান বলল—"আজ একটা ছোট প্র্যাকটিস করি। রিফ্রেমিংয়ের প্রথম ধাপ।"

ঈশিতা কৌতূহলী, কিন্তু কিছু বলল না।

"যে চিন্তাটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, সেটা লেখো।"

ঈশিতা একটু ভেবে বলল—"আমি সবসময় ব্যর্থ।"

"ভালো। এখন এর পক্ষে প্রমাণ কী?"

"লেখালেখিতে সফল হইনি। সম্পর্ক টিকেনি। পরিবার আমাকে বোঝা ভাবে।"

"বিপরীত প্রমাণ কী?"

ঈশিতা থমকে গেল। তারপর ধীরে—"একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। পড়েছিলাম, কেউ কেউ ভালোবেসেছিল। আমার ভাইয়ের জন্য অনেক কিছু করেছি।"

আরিয়ান হাসল—"দেখলে? চিন্তা পুরো সত্য নয়। তুমি অন্ধকার দিকটাই দেখছিলে। আলোর দিকটাও আছে।"

ঈশিতার চোখে একটু আলো ফিরল—ক্ষীণ, কিন্তু বাস্তব।

সন্ধ্যায় সে বলল—"আমি সবসময় ভাবতাম জীবন একরঙা। অথচ হয়তো রঙ ছিল, আমি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম।"

"আজ চোখ খুলেছো," আরিয়ান বলল, "এটাই প্রথম জয়।"

ঈশিতা বলল—"ছোটবেলায় ভাবতাম, নদীর জল কাঁদে নাকি গান গায়। এখন মনে হয়, দুটোই করে। জীবনও তেমন।"

আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল—"জলকে নতুন চোখে দেখাটাই রিফ্রেমিং। ব্যথার মাঝেও সৌন্দর্য থাকে।"

সেদিন রাতে ঈশিতা খাতা খুলে লিখল:

"নেগেটিভ: আমি একা।

প্রমাণের বিপরীতে: আমি এখন কারো সঙ্গে কথা বলছি। কেউ বোঝার চেষ্টা করছে।

রিফ্রেম: আমি একা নই। আমি আমার ভেতরের মানুষটার সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছি।"

লিখে সে এক অদ্ভুত শান্তি পেল। ভেতরে যেন একটা আলো জ্বলে উঠল। ফিসফিস করে বলল—"ভাঙনের আড়ালেও আলো থাকে।"

আরিয়ান তার কেবিনে বসে আরেকটা নোট লিখল—"রোগীর চোখে আজ নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম। দোষ নয়, দৃষ্টিকোণ বদলালেই জীবন বদলায়।"

সেদিন রাতে বাইরে বৃষ্টি নামল। আরিয়ান ভাবল—বৃষ্টিও তো রিফ্রেমিং। আকাশের কান্নাকে পৃথিবী নতুন করে দেখে, তাতেই ফসল জন্মায়।

ঈশিতা শান্ত ঘুমে আচ্ছন্ন। আরিয়ান দেখল, ঘুমের মাঝেও তার ঠোঁটে হালকা হাসি—যেন নতুন কোনো দিগন্তের স্বপ্ন দেখছে।

সে ডায়েরিতে লিখল—"আজ প্রথম মনে হলো, অন্ধকার আমাকে গ্রাস করেনি, বরং তার ভেতর দিয়ে আলো দেখতে শুরু করেছি।"

জানালার বাইরে বৃষ্টি থেমে চাঁদ উঠেছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। আরিয়ান বুঝল—ভাঙন শেষ নয়, কখনো নতুন আলোর দরজা।

পরদিন সকালে ঈশিতা জানালা খুলল। বাতাসে শিউলির গন্ধ, দূরের পাখির ডাক। তার চোখে সেই পুরোনো নিস্তেজতা নেই—এক নরম সচেতনতা।

আরিয়ান এল, হাতে দু'কাপ কফি। "আজ কথা নয়, অনুভব করব।"

ঈশিতা অবাক—"অনুভব?"

"মানে—এই মুহূর্তে থাকা। অতীত ক্লান্ত করেছে, ভবিষ্যৎ ভয় দেখায়। তুমি তাদের মাঝে দৌড়েছো; অথচ জীবন এখানে, এখন।"

গার্ডেনে পাথরের পথে হাঁটছে। শিশির, নরম রোদ। ঈশিতা গভীর শ্বাস নিল—ভারটা একটু কমল।

আরিয়ান বলল—"মাইন্ডফুল ব্রিদিং। চোখ বন্ধ করো, শ্বাসের গতি দেখো। জোর নেই, শুধু পর্যবেক্ষণ। প্রতিটি শ্বাস তোমাকে এখনকার দিকে ফিরিয়ে আনে।"

ঈশিতা প্রথমে অস্বস্তি পেল, কিন্তু ধীরে শব্দগুলো দূরে সরে গেল। এক নিস্তব্ধতা, যেন পৃথিবী থেমে গেছে।

আরিয়ান বলল—"এখন চোখ খুলে দেখো, এই পাতার রং কেমন?"

ঈশিতা তাকাল—সবুজ, মাঝে হলুদ রেখা, রোদে স্বচ্ছ। "আমি কখনো এত মনোযোগ দিয়ে দেখিনি।"

"তুমি আজ প্রথমবার সত্যি দেখলে। এই ছোট মুহূর্তগুলোর মধ্যে জীবন লুকিয়ে থাকে।"

ঈশিতা বলল—"সময় যেন ধীর হয়ে গেল। আগে সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি মনে হতো—পাখির ডাক, বাতাস, নিঃশ্বাস—এখন আলাদা করে টের পাচ্ছি।"

আরিয়ান বলল—"এই অনুভূতিই বাঁচিয়ে রাখবে। জীবন বড় অর্জন নয়—এক নিঃশ্বাস, এক মুহূর্ত।"

রাতে করিডোরে হাঁটছিল ঈশিতা। বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু তার ভয় নেই। ফোঁটা গুনছে—এক, দুই—প্রতিটি শব্দে ছন্দ—"আমি আছি। এখন।"

করিডোরের শেষে এক শিশু কাঁদছিল। ঈশিতা কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখল—"কাঁদো না, ঠিক হয়ে যাবে।" নিজেকেও যেন বলল।

পরদিন সকালে আরিয়ান দেখল, ঈশিতা টেবিলে বসে লিখছে—

"আমি এখন জানি, সব গল্প এখোনের ভেতরে। ভবিষ্যৎ ভয় নয়, অতীত অনুশোচনা নয়। শুধু এখন—যেখানে শ্বাস নিচ্ছি, বেঁচে আছি।"

আরিয়ান বলল—"তুমি ফিরে এসেছো।"

ঈশিতা বলল—"আমি কখনো পুরোপুরি হারাইনি। শুধু বর্তমানকে ভুলে গিয়েছিলাম।"

রাতে আরিয়ান ডায়েরিতে লিখল—"আজ ঈশিতা আত্মার জাগরণ অনুভব করল। থেরাপি নয়, মুক্তি। হয়তো আমরা সবাই বর্তমানে ফেরার অপেক্ষায় বাঁচি।"

ঈশিতা ঘুমানোর আগে লিখল—"আজ পাতা ছুঁয়েছি, বাতাস শুনেছি, নিজেকে অনুভব করেছি। ভয় নরম হয়েছে। আমি আর পালাতে চাই না। বাঁচতে চাই, এখানেই, এখন।"

প্রথমবার স্বপ্ন দেখল অন্ধকার নয়—শান্ত নদী, জলে তার মুখ, সেই প্রতিচ্ছবির হাসি নির্মল, জীবন্ত।

হাসপাতালের ঘরে কুয়াশার সকাল। জানালায় শিশির। ঈশিতা টেবিলে বসে, কলম হাতে। দৃঢ়তা ফিরেছে।

আরিয়ান আগের দিন বলেছিল—"নিজেকে চিঠি লেখো, যাকে ভয় পেয়ে এড়িয়ে গেছো।"

ঈশিতা লিখল—

"প্রিয় আমি,

জানি, তোমার ভেতরে অনেক ভাঙা অংশ। নিজেকে দোষ দিয়েছ, বলেছ 'পারব না।' ভেবেছ ভালোবাসার যোগ্য নও। কিন্তু আমি তোমার পাশে আছি। ব্যর্থতা তোমার গল্পের অংশ, কান্না তোমার ভাষা। আমি তোমাকে ক্ষমা করি। কারণ তুমি বাঁচতে চেয়েছিলে, পথ হারিয়েও।"

লিখতে লিখতে চোখ ভিজল, কিন্তু তিক্ততা নেই, মুক্তি আছে। যেন নিজের আত্মাকে ছুঁল।

দুপুরে আরিয়ান পড়ল—প্রতিটি শব্দ থেরাপির মতো। বলল—"এটা inner dialogue-এর শুরু। আমরা অন্যদের চেয়ে নিজের সঙ্গে বেশি কথা বলি—নীরবে, অবচেতনে। যদি সেই কথোপকথন বিষাক্ত হয়, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাই। তুমি আজ সেই কথোপকথন আলোকিত করলে।"

ঈশিতা বলল—"আমি নিজের শত্রু ছিলাম। প্রতিদিন বলতাম 'যথেষ্ট নও'। আজ বুঝলাম—আমি যথেষ্ট, কারণ মানুষ।"

বিকেলে ছাদে হাঁটছিল তারা। ঈশিতা বলল—"মনের ভেতর একটা ভিড়—কেউ বলে ভয় করো, কেউ বলে চেষ্টা করো, কেউ বলে শেষ। জানতাম না কার কথা শুনব।"

আরিয়ান বলল—"ভেতরে অনেক 'আমি' বাস করে—শিশু, কিশোর, হতাশ প্রাপ্তবয়স্ক, আশাবাদী আত্মা। মাইন্ডফুলনেস শেখায়—শোনো, বিচার করো না।"

"ভয়কে শুনলেও?"

"তাহলে ভয় আর কাঁদাবে না। সে শুধু বলবে—'আমি আছি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করি না।'"

রাতে ঈশিতা দ্বিতীয় চিঠি লিখল—

"প্রিয় ভয়,

তুমি বন্ধু ছিলে, যদিও ভেবেছি শত্রু। সতর্ক করতে চেয়েছ, আমি ভেবেছি থামাতে চাও। আজ বুঝি—সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছ। এখন তোমাকে সঙ্গী করেই হাঁটব।"

চিঠি শেষে বুকের ভার কমে গেল।

আরিয়ান লিখল—"ভয়কে অস্বীকার করলে মন সংকুচিত হয়, স্বীকার করলে মন প্রসারিত হয়। হয়তো এটাই আত্ম-সংলাপের প্রথম পাঠ।"

পরদিন ঈশিতা বলল—"আমার মনে হয়, আমি নিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি।"

আরিয়ান বলল—"অধিকাংশ মানুষ সারা জীবন নিজের শত্রু হয়। তুমি মিত্র হয়েছো। এটাই মানসিক পুনর্জন্ম।"

ঈশিতা বলল—"আত্মা নদীর মতো। যত কাদা মেশে, প্রবাহ থামে না। আমিও শুধু দিক হারিয়েছিলাম।"

সে রাতে লিখল—

"আজ বুঝেছি, আত্ম-সংলাপ নিজেকে আলিঙ্গন করার পবিত্র মুহূর্ত। ভেতরের শিশুটিকে জড়িয়ে বলেছি—'ভয় পেও না, আমি আছি।'"

হাসপাতাল ছাড়ার সময় আরিয়ান বলল—"আজ শুধু হাসপাতাল ছাড়ছো না, পুরোনো খোলসও ছেড়ে যাচ্ছো।"

ঈশিতা হাসল—"অনেকদিন পর নিজেকে বোঝার অনুমতি পেয়েছি।"

আরিয়ান বলল—"জীবন চলমানতা, পূর্ণতা নয়। ভেতরের আলো পেলে অন্ধকারও বন্ধু হয়।"

ঈশিতা বলল—"ভয় এখন আমাকে শেখায়—আমি বেঁচে আছি।"

বাসায় ফিরে সবকিছু পুরোনো, কিন্তু নতুন লাগে। বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল—"বাবা, তুমি আমাকে শক্ত হতে শিখিয়ে গেছো।"

ডায়েরিতে লিখল—

"আজ আর পালাচ্ছি না। প্রতিটি ব্যথার সঙ্গে বসে কথা বলতে পারি। অন্ধকার আলোর অনুপস্থিতি নয়, বরং আলোর অপেক্ষা।"

পুরোনো বন্ধু অনন্যার সঙ্গে ফোনে কথা হলো, এক বছর পর। "আমি নিজের ওপর রাগ করেছিলাম, তোমার ওপর না। ক্ষমা করো।"

ওপাশে কান্না—"আমি তোকে মিস করছি।"

ঈশিতা বুঝল—ক্ষমা নিজের মুক্তি। ভেতরের আলো তখন জ্বলে, যখন আমরা দোষারোপ নিভাই।

রাতে ধ্যানে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্বাসের তালে অতীত হালকা হলো। মনে মনে ভাবল—"এটাই অন্তর্জল, সব ঝড় পেরিয়েও প্রবাহিত।"

পরদিন পার্কে হাঁটতে গিয়ে এক মেয়ে ফুল দিল—"আপনার মুখে আলো আছে।" ঈশিতার চোখে জল। বুঝল—ভেতরের আলোর প্রতিফলন বাইরেও পড়ে।

আরিয়ানকে ফোন করে বলল—"পদক্ষেপের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শরীর, শ্বাস, মাটি—সব একসঙ্গে। এটাই মাইন্ডফুলনেস?"

"হ্যাঁ, বর্তমানে থাকা।"

"তাহলে বুঝেছি—আমার নদী কখনো থামেনি, আমি শুধু শুনিনি।"

রাতে শেষ চিঠি লিখল ভবিষ্যৎ 'আমি'-কে—

"যদি আবার অন্ধকার নামে, মনে রেখো, তোমার ভেতরে আলো আছে। ভয়, হতাশা, ব্যথা—অতিথি; কিন্তু তুমি ঘর। অন্তর্জল প্রবাহিত রাখো।"

চিঠি শেষ। ঘর অন্ধকার, কিন্তু মুখে আলো। দিগন্তে নতুন ভোরের রেখা।

তিন সপ্তাহ পর। ঈশিতা এখন অফিসে যায় নিয়মিত। সকাল শুরু হয় লেবু-চা আর দশ মিনিট ধ্যানে। টেবিলে মোমবাতি—সঙ্গী। মনে করিয়ে দেয়—"আমি যথেষ্ট।"

অফিসে সহকর্মীর সমালোচনায় আগে কেঁপে উঠত, আজ গভীর শ্বাস নিয়ে রিফ্রেম করল—"শেখার সুযোগ।" মিটিং শেষে সহকর্মীকে বলল—"প্রেজেন্টেশনটা একবার দেখো, মতামত চাই।" সহকর্মী অবাক।

বাসায় ফেরার পথে বৃষ্টি। এক বৃদ্ধা ফুলের মালা বিক্রি করছে, কেউ নেয় না। ঈশিতা দুটো কিনে একটা তার গলায় পরিয়ে দিল—"আপনার জন্য।" বৃদ্ধার চোখে জল—"মা, তোমার মুখে আলো।"

রাতে ডায়েরিতে লিখল—

"মানুষ নদীর মতো—বাধা পেলে বাঁক নেয়, থামে না। রিফ্রেমিং নমনীয়তা, শক্তি নয়। আমি আর যুদ্ধ করি না, বুঝতে শিখেছি।"

শনিবার ট্রেনে গ্রামে গেল—শৈশবের নদী। প্রতিফলনে নিজের মুখ দেখল—শান্তি, হাসি। পাথরের ওপর বসে চোখ বন্ধ। নদীর শব্দ ধ্যানের সঙ্গীত।

স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে আঁকা। এক বাচ্চা জিজ্ঞেস করল—"ফুল লাল কেন রাঙালেন?"

"কারণ আমার ভেতরেও লাল রঙ আছে।"

শিক্ষিকা বললেন—"তুমি বদলে গেছো।"

"না, নিজের নদী চিনে ফেলেছি।"

সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল—"জীবন নদীর মতো—কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল, তবু এগোয়।"

আরিয়ানকে বার্তা দিল—

"আমি এখন নদীর মতো। ঢেউ আসে, কিন্তু জানি—শেষে শান্ত জল থাকে। আপনি প্রবাহিত হতে শিখিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা।"

উত্তর এল—"নদীর মতো মানুষ কখনো হারায় না, শুধু দিক বদলায়।"

রাতে জানালায় দাঁড়িয়ে ফিসফিস—"আমি এখন নদী। বাঁচি, প্রবাহিত হই, আলো ছড়াই।"

সকাল। রঙধনু। ঈশিতা চায়ের কাপ হাতে জানালায়—"সময় শত্রু নয়, আমি ছিলাম তার বিপরীতে।" ডায়েরিতে লিখল—

"সময় নদীর মতো। ধরতে চাইলে ফসকে যায়, হাত খোলা রাখলে শান্তভাবে তালুতে বসে। উপস্থিত থাকাই সময়ের উপহার।"

লাইব্রেরিতে পুরোনো বইয়ে নোট পেল—"যখন সময় তাড়া করা বন্ধ করো, তখন সময় তোমার পাশে বসে।" কারো নাম নেই, কিন্তু বুকের ভেতর ঢেউ।

আরিয়ানকে ফোন—"সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করেছি।"

"অভিনন্দন, সময়ের সঙ্গে নাচতে শিখছো।"

"সময় সঙ্গী, প্রতিটি মুহূর্ত শেখায়।"

"সময়ই সবচেয়ে বড় থেরাপিস্ট।"

রাতে অ্যালবামে ছোট্ট ঈশিতা বাবার কোলে। বাবা বলছে—"সময়কে ভালোবাসলে, সময়ও ভালোবাসবে।" চোখে জল—"তখন বুঝিনি, আজ বুঝেছি।"

নতুন সিদ্ধান্ত—মানসিক স্বাস্থ্য সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবা। প্রথম দিন অল্পবয়সী মেয়ে, হাতে কাটা দাগ। ঈশিতা পাশে বসল, হাত রাখল।

মেয়েটি বলল—"সময় থেমে গেছে।"

"থামেনি, শুধু তোমার পাশে বসে আছে। প্রস্তুত হলে হাঁটবে।"

মেয়ের চোখে প্রথম আলো।

রাতে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বলল—"সময়ের উপহার বর্তমান। অতীত শিখিয়েছে, ভবিষ্যৎ আহ্বান জানায়, বর্তমান বাঁচিয়ে রাখে।"

ডায়েরিতে লিখল—

"সময় কেড়েছে, কিন্তু ফিরিয়েও দিয়েছে—ধৈর্য, উপলব্ধি, এখন। কৃতজ্ঞতা।"

জানালায় ভোরের আলো, ঈশিতার মুখে শান্তি। ফিসফিস—"আমি জলের ওপারে আলো।"

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে জলরাশি দেখছে—সবকিছু চলে যায়, জীবন থামে না। ভেতরের ভয়, ক্ষত, আত্মঅভিযোগ ধীরে গলে যাচ্ছে নদীর জলে।

তিন মাস। মানসিক স্বাস্থ্য সংগঠনে নিয়মিত। প্রতিদিনের গল্পে নিজের প্রতিফলন। রোগীদের পাশে বসে শোনে, কখনো বলে—"একটু সময় দাও নিজেকে।"

আরিয়ান এসে বলল—"মুখে আর সেই ভয় নেই।"

"ভয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করি না, আলিঙ্গন করি।"

"অসাধারণ, তুমি থেরাপির উদাহরণ।"

"প্রতিটি ভাঙন জন্মদ্বার, খুলতে শুধু ভয় পাই।"

অনন্যা নামের মেয়েটি বলল—"আবার শুরু করতে পারব না।"

ঈশিতা হাত ধরে বলল—"নদীর মতো বাঁক নাও, নতুন পথ খোঁজো। থেমে গেলে জল শুকিয়ে যাবে।"

অনন্যা চোখ মুছে বলল—"আজ থেকেই নতুন বাঁক।"

ছাদে বসে ধ্যান। আরিয়ানের কথা মনে পড়ল—"পুনর্জন্ম মানে নতুনভাবে দেখা শেখা।"

পুরোনো অফিসে গেলে সবাই অবাক—যে মেয়েটি ডিপ্রেশনে ছিল, সে এখন প্রশান্ত। বস বললেন—"তুমি অন্য মানুষ।"

"একই শরীর, নতুন মন।"

সন্ধ্যায় ডায়েরিতে লিখল—

"মানুষ নদীর মতো—বাধা পেলে দিক বদলায়, থামে না। রিফ্রেমিং নমনীয়তা। আমি নিজেকে বুঝতে শিখেছি।"

রাতে নদীর শব্দ ভেসে এল। চোখ বন্ধ—নদী বলছে—"তুমি আমার মতো হয়েছো। বাঁক নিচ্ছো, থেমে যাচ্ছো না।"

ভোরের ডায়েরিতে শেষ লেখা—

"পুনর্জন্ম দায়িত্ব। অন্যদের আলো দেখাতে চাই, কারণ জানি অন্ধকার কত নিঃশব্দ, আলো কত মূল্যবান।"

প্রথম আলোর রেখায় এক গভীর, নির্মল হাসি।

সকালের নীরবতা। নদীর ধারে ঈশিতা। জলের প্রতিফলনে তার ভেতরের আলো উজ্জ্বল। আজ নতুন মিশন—অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, সচেতনতা ছড়ানো।

কমিউনিটি সেন্টারে নানা বয়সের মানুষ। কেউ চাপে, কেউ দুঃখে। ঈশিতা মৃদু হাসে—"আজ আমরা নদীর মতো হই। প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ঢেউ শেখায়, প্রতিটি প্রবাহ শক্তি দেয়।"

এক কণ্ঠ—"আমি নিজেকে ভালোবাসতে পারি না।"

ঈশিতা গভীর শ্বাস—"নিজেকে ভালোবাসা চর্চা। প্রতিদিন নিজেকে চোখে চোখ রেখে দেখা, ভুলে ক্ষমা, ঠিকলে স্বীকৃতি। এটাই প্রথম আলো।"

সবাই শান্ত। ঈশিতার ভেতর গভীর সন্তুষ্টি।

শিশুটি ছুটে এল—"আপু, আমি কি ভালো হব?"

"হ্যাঁ, নিজেকে বিশ্বাস করো, সময়ের সঙ্গে এগোও। প্রতি ভুল শিক্ষার আলো।"

"আপনি আমার আলো।"

"আমার আলো পথ দেখায়, কিন্তু পথ তুমি নিজে তৈরি করবে।"

পার্কে মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন—শ্বাস, শরীর, মন। সবাই শান্ত। রাতে ডায়েরি—

"পুনর্জন্ম কেবল নিজের নয়। জল অন্যকে দেখায় আলো, অন্ধকার দূর করে। প্রতিটি মানুষই নদী, প্রতিটি মানুষই আলো।"

স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে শিশু-যুবকদের শেখায় মাইন্ডফুলনেস, রিফ্রেমিং, শ্বাসের কৌশল। শিক্ষিকা বলল—"আমাদের বিশ্বাস শেখালেন, ভুল হলেও চেষ্টা করতে পারি।"

সন্ধ্যায় নদীর ধারে দাঁড়িয়ে—জল নীরব, কিন্তু জীবন্ত। চাঁদের আলো ছড়ায় শহরে। ঈশিতা বুঝল—তার জীবন সম্পূর্ণ। পুনর্জন্ম নিজের ও সমাজের।

জল ছুঁয়ে বলল—ছোঁয়া সমস্ত জীবনের জন্য।

ভোরের আলোয় মুখে শান্ত হাসি—"আমি জলের ওপারে আলো। বাঁচি, শিখি, ছড়িয়ে দিই।"


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর