প্রকাশিত :  ১৬:৩৩
২৮ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:৪৫
২৮ জুন ২০২৬

কেমন যাবে আগামীকালের পুঁজিবাজার?

কেমন যাবে আগামীকালের পুঁজিবাজার?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, তারল্য সংকট এবং আস্থার নিদারুণ ঘাটতি কাটিয়ে অবশেষে একটি টেকসই ও গতিশীল পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সূচক এবং লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া মিলেছে, তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ ২২ মাস পর ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৫,৭০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক মাইলফলক অতিক্রম করে ৫,৭১৯.১৯ পয়েন্টে এসে স্থিতি পেয়েছে, যা এক কার্যদিবসেই প্রায় ৬৬.৯৪ পয়েন্ট বৃদ্ধির রেকর্ড। একই সাথে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ আগের কার্যদিবসের ১,১১০.৭৪ কোটি টাকা থেকে প্রায় ২৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১,৩৭১.০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই নাটকীয় অগ্রগতির পেছনে কাজ করছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের জোরালো আশ্বাস, নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুশাসনের বার্তা এবং ৩০ জুনের ডেডলাইনকে সামনে রেখে করদাতাদের শেষ মুহূর্তের বিনিয়োগের তড়িঘড়ি প্রচেষ্টা।

বাজারের এই পুনরুজ্জীবনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বড় মূলধনী শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের পুঞ্জীভূত আগ্রহ এবং বিশেষ করে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ ১৩ কার্যদিবস ধরে চরম ক্রেতাসংকটে ভোগার পর, গত ৯ জুন ফ্লোর প্রাইস (সর্বনিম্ন মূল্যস্তর) প্রত্যাহারের ধাক্কা সামলে কোম্পানিটির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বৃদ্ধি পায়। টানা দরপতনে ১১০.১০ টাকা থেকে ২৫.৬০ টাকায় নেমে আসার পর, শেয়ারটির দাম সর্বোচ্চ সীমা (সার্কিট ব্রেকার) স্পর্শ করে ৩১.২০ টাকায় পৌঁছায়, যা সমগ্র বাজারের লেনদেনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে বেক্সিমকোর বিপুল শেয়ার হাতবদল হওয়া এবং দিনশেষে এটি টার্নওভার তালিকার শীর্ষে অবস্থান করা সামগ্রিক বাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত।

একই সাথে, জুন মাসের শেষে করদাতাদের বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত (ট্যাক্স রিবেট) পাওয়ার তাগিদ বাজারকে বাড়তি তারল্য যুগিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর রেয়াতের নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুসারে, করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, প্রকৃত যোগ্য বিনিয়োগের ১০ শতাংশ (যা আগে ১৫ শতাংশ ছিল) অথবা সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকা (যা আগে ১০ লাখ টাকা ছিল)—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হবে, করদাতারা সেই পরিমাণ কর রেয়াত পাবেন। এই সুবিধার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেষ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ করছেন, যা লেনদেনের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে।

তাছাড়া, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে “স্মার্ট রেগুলেশন”, রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের অঙ্গীকার প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন কমিশন কৃত্রিম উপায়ে শেয়ারের দর ধরে রাখার মতো অপ্রাকৃতিক পদ্ধতি পরিহার করে বাজারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়ার যে নীতিগত অবস্থান নিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে একটি পরিপক্ক পুঁজিবাজার গঠনে সহায়ক হবে।

আগামীকাল ২৯ জুন দেশের পুঁজিবাজার কেমন যাবে এবং কোন কোন খাতের শেয়ারের দাম বাড়তে পারে, তা নিয়ে বাজার সংশ্লিষ্ট মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আগামীকাল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিল পাস হওয়ার কথা রয়েছে, যা সামগ্রিক কর কাঠামো এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের একটি স্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট আলোচনায় দেশের ধ্বংসপ্রায় পুঁজিবাজারকে আগামী দুই বছরের মধ্যে পুরোপুরি পুনর্গঠন ও স্থিতিশীল করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা আগামীকালের বাজারেও ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক এবং লেনদেনের সাম্প্রতিক ধারা বিবেচনায় নিয়ে আগামীকালের বাজারে বেশ কয়েকটি সেক্টরের শেয়ারের দাম বাড়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত আগামীকালের বাজারেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় অবস্থায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত কার্যদিবসে ব্যাংকিং সেক্টর ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৬.৩ শতাংশ শেয়ার দখল করে শীর্ষে অবস্থান করছিল। অনেক ভালো ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য বর্তমানে তাদের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম (আন্ডারভ্যালুড) থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অব্যাহত রাখছেন। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি এই খাতের মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে, যা আগামীকালের বাজারেও ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাতে পারে।

একই সাথে ওষুধ ও রসায়ন খাতেও বড় ধরনের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে গত ২৬ জুন থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিটের (জিডিআর) স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও লেনদেন পুনরায় চালু হওয়া এই খাতের জন্য একটি মাইলফলক। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে বাংলাদেশের ওষুধ খাতের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করেছে। গত সেশনে ওষুধ খাত উল্লেখযোগ্য লেনদেন আকর্ষণ করেছে এবং আগামীকালেও এই খাতের সুপ্রতিষ্ঠিত ও মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকৌশল ও সিরামিক খাতের শেয়ারগুলোও আগামীকালের বাজারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। ডিএসইর মোট লেনদেনে প্রকৌশল খাত ১১.২ শতাংশ হিস্যা নিয়ে সচল রয়েছে এবং সিরামিক খাত গত সেশনে ২.৯ শতাংশ দরবৃদ্ধির মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছে। খুচরা ও মধ্যম সারির বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকায় আগামীকালও এই দুটি খাতের শেয়ারের দাম ইতিবাচক ধারায় থাকতে পারে।

অন্যদিকে, বিমা ও মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও গত সেশনে সাধারণ বিমা ও জীবন বিমা খাতে সামান্য সংশোধন (যথাক্রমে ০.৪% ও ০.১% হ্রাস) দেখা গেছে, তবে জুন-ক্লোজিংয়ের কর রেয়াত সুবিধার শেষ মুহূর্তের বিনিয়োগের বড় অংশ এই দুটি খাতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে, ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর রূপান্তর বা লিকুইডেশনের আইনি বাধা সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত কর্তৃক দূর হওয়ার পর এই খাতে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামীকালের লেনদেনকে গতিশীল করতে পারে।

বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী জোয়ারের মধ্যেও কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাব রয়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় ১২ শতাংশ বা ৫১টি কোম্পানি তাদের বাধ্যতামূলক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মাবলী লঙ্ঘন করছে, যা সামগ্রিক বাজারের স্বচ্ছতাকে ব্যাহত করে। ডিএসই অতি সম্প্রতি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সকে তাদের শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির (৮ থেকে ২১ জুনের মধ্যে ২৪% বৃদ্ধি) কারণ জানতে চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে, যেখানে কোম্পানিটি কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকার কথা জানিয়েছে।

একইভাবে, সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা শ্যাম্পুর সুগার মিলসের শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর গত ১১ জুন সেটির লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করে বিএসইসি। অন্যদিকে, অ্যাক্টিভ ফাইন কেমিক্যালের উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার তথ্য ডিএসইর পরিদর্শনে উঠে আসলেও, গত সেশনে কোম্পানিটির শেয়ার দর ১.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরণের অসামঞ্জস্য নির্দেশ করে যে, বাজারে এখনও কিছু ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর ও কৃত্রিম লেনদেন সচল রয়েছে। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামীকাল কেবল সূচকের উত্থান দেখে নয়, বরং কোম্পানির প্রকৃত উৎপাদনশীলতা, আর্থিক ডিসক্লোজার ও সুশাসন বিবেচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে।

পুঁজিবাজারের এই সাময়িক উত্থানকে একটি স্থায়ী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দুই বছরের পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং জেপি মরগানের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আগ্রহ দেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে। আগামীকালের বাজারে সাময়িক মুনাফা তোলার (Profit-booking) কারণে দুপুরের দিকে কিছুটা ওঠানামা হতে পারে, তবে বাজারের সামগ্রিক ইতিবাচক ধারা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কম। একটি গতিশীল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কারসাজিমুক্ত পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য নতুন বিএসইসি কমিশনের কঠোর অবস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির প্রধান চাবিকাঠি।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর