প্রকাশিত : ১১:২১
২৮ জুন ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
দূর থেকে পাহাড়ের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে তার অপার সৌন্দর্য। মেঘে ঢাকা সবুজ ঢাল, ঝিরির কলকল ধ্বনি আর অরণ্যের নিস্তব্ধতা—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পকর্ম। কিন্তু যারা প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে এই পাহাড়ের বুকে সংগ্রাম করেন, তাঁদের কাছে এই সৌন্দর্যের অর্থ ভিন্ন। সেখানে পাহাড় কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামের আরেক নাম।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই এই দ্বৈত বাস্তবতার সাক্ষী। একদিকে পর্যটনের পোস্টকার্ডে বন্দী অপরূপ সৌন্দর্য, অন্যদিকে অনিশ্চয়তায় ঘেরা মানুষের জীবন। প্রকৃতি এখানে যেমন উদার, তেমনি নির্মমও। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, ঝিরি-ঝরনার শুকিয়ে যাওয়া, জুমচাষের সংকট এবং বাজারব্যবস্থার বৈষম্য—সব মিলিয়ে পাহাড়ের মানুষের জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
জুমচাষী লাপ্রু মারমার জীবন সেই বাস্তবতারই প্রতীক। তাঁর কাছে পাহাড় মানে রোমান্টিক কুয়াশা নয়; বরং অনিশ্চিত ফসল, শুকিয়ে যাওয়া পানির উৎস এবং প্রতিদিনের খাদ্যসংকট। যে ঝিরির জল একসময় তাঁর জমিকে সজীব রাখত, আজ সেখানে ধুলো উড়ে। বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বনভূমির পরিবর্তন পাহাড়ের প্রাচীন কৃষিব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
কিন্তু সংকট শুধু প্রকৃতির নয়; অর্থনীতিরও। পাহাড়ের কৃষক উৎপাদন করেন, অথচ ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করেন অন্যরা। স্থানীয় হাটে মধ্যস্বত্বভোগীদের সামনে দাঁড়িয়ে লাপ্রু জানেন, তাঁর শ্রমের প্রকৃত মূল্য তিনি পাবেন না। তবু তাঁকে বিক্রি করতেই হয়। কারণ, ঘরে অপেক্ষা করছে ক্ষুধার্ত পরিবার। এই বৈষম্য কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
এই বাস্তবতার ঐতিহাসিক শিকড়ও গভীর। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ফলে হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। উন্নয়নের সুফল জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছালেও তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছিল পাহাড়ের মানুষকে। পরবর্তী সময়ে ভূমি, প্রশাসন, পুনর্বাসন ও পরিচয়ের প্রশ্ন সেই ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি নতুন আশার সঞ্চার করলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেই প্রত্যাশার বড় একটি অংশ আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
তবে এই ইতিহাসকে কেবল পাহাড়ি ও বাঙালির দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। পাহাড়ে পুনর্বাসিত দরিদ্র বাঙালি পরিবারগুলোর জীবনও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। নদীভাঙন ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশায় তারা পাহাড়ে এসেছিল; কিন্তু অনেকেই সেখানে নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। ফলে সংঘাতের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ আসলে একই ধরনের বঞ্চনার শিকার।
আরও একটি নীরব সংকট চলছে ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বহু ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, ইতিহাস, জীবনদর্শন এবং পৃথিবীকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। উন্নয়নের আলো যদি এই বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে না পারে, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
আজ পার্বত্য চট্টগ্রামকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। পাহাড়কে শুধু পর্যটনের গন্তব্য বা নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল কৃষিনীতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর বাজারব্যবস্থা, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের টেকসই সমাধান, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
পাহাড়ের মানুষ বিশেষ কোনো সুবিধা চান না; তাঁরা চান মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করা শুধু একটি অঞ্চলের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
পাহাড়ের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করতে পারে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাস যদি আমরা শুনতে না পাই, তবে আমাদের উন্নয়নের গল্প চিরকালই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।