প্রকাশিত :  ১৬:৪২
২৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:২৫
২৫ জুন ২০২৬

দিল্লি–ঢাকা–বেইজিং: প্রতিযোগিতার মাঝখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা

দিল্লি–ঢাকা–বেইজিং: প্রতিযোগিতার মাঝখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ কখনোই কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়; বরং এটি বহু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থের সংযোগস্থল। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি, বৃহৎ জনবাজার এবং আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা, দিল্লি ও বেইজিংকে ঘিরে যে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—বাংলাদেশ কি দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান শক্তি ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে নিজের উন্নয়নের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারবে, নাকি এই প্রতিযোগিতার চাপে পড়ে কৌশলগত স্বাধীনতা হারাবে?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস বলে, এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনো সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও নয়; বরং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বর্তমান বাস্তবতাও তার ব্যতিক্রম নয়।

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের চারপাশের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে ভারতের অবস্থান। নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা পর্যটনের প্রয়োজনে ভারতে যাতায়াত করেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখা শুধু কূটনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক প্রয়োজনও।

কিন্তু গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনেও প্রভাব ফেলেছে। ভিসা–সংক্রান্ত জটিলতা, সীমান্ত উত্তেজনা, পানি বণ্টন প্রশ্ন কিংবা রাজনৈতিক অবিশ্বাস—এসব বিষয় দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত যদি পুনরায় বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ও যোগাযোগের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কূটনীতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনেই একটি রাজনৈতিক বার্তা থাকে।

ভারত ভালো করেই জানে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হয়ে গেলে সেই শূন্যতা অন্য কেউ পূরণ করবে। আর সেই ‘অন্য কেউ’ যে চীন হতে পারে, তা নিয়ে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই।

চীন গত এক দশকে বাংলাদেশে তার অর্থনৈতিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ, সেতু, বন্দর, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেইজিং তার অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের শিল্পায়নের বর্তমান গতিতে চীনা কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, তার একটি বড় অংশ চীনা কাঁচামাল ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে কম খরচে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর সেই জায়গায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এ কারণেই যখন ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতা, বিনিয়োগ চুক্তি কিংবা অবকাঠামোগত সহযোগিতার খবর সামনে আসে, তখন দিল্লি সেগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে বলেই ভারতকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন ‘পক্ষ বেছে নেওয়ার’ যুগ অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে। বর্তমান বাস্তবতা হলো বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব।

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে কীভাবে জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ারে পরিণত করা যায়।

অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রকৃতি একেবারেই ভিন্ন। চীন বাংলাদেশের জন্য মূলত উৎপাদন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের অংশীদার। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের জন্য ভৌগোলিক সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং মানবিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

অর্থাৎ, এক দেশের বিকল্প অন্য দেশ নয়।

বাংলাদেশ যদি কেবল চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ভৌগোলিক বাস্তবতা তাকে ভারতের প্রয়োজনীয়তা ভুলতে দেবে না। আবার শুধু ভারতের ওপর নির্ভর করেও বাংলাদেশের শিল্পায়নের উচ্চাভিলাষ পূরণ করা কঠিন। ফলে জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে যৌক্তিক পথ হলো ভারসাম্যমূলক কূটনীতি।

বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতাও সেই বার্তাই দেয়। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে, কিন্তু চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। সৌদি আরব ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়েও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরও একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত পথ সেটিই।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কীভাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকে জাতীয় উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করা যায়। যদি চীন বিনিয়োগ দিতে চায়, তবে তা জাতীয় স্বার্থের আলোকে গ্রহণ করতে হবে। আবার ভারত যদি বাজার, যোগাযোগ বা জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে চায়, তবে সেটিও বাংলাদেশের সুবিধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য কোনো একটি দেশের প্রশংসা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে কতটা অবদান রাখা যায়, সেটির ওপরই তার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে।

বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো শক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

দিল্লি ও বেইজিং উভয়েই বাংলাদেশের গুরুত্ব উপলব্ধি করে। এই গুরুত্বই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারব?

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সুযোগও বড়, ঝুঁকিও বড়। একদিকে রয়েছে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা; অন্যদিকে রয়েছে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার চাপ। এই পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, প্রয়োজন বিচক্ষণতা; পক্ষপাত নয়, প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বাস্তববাদ।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ঢাকা আর কেবল অন্যদের সিদ্ধান্তের দর্শক নয়; বরং আঞ্চলিক সমীকরণ নির্ধারণে বাংলাদেশ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

দিল্লি, ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যকার এই ত্রিমুখী সমীকরণ আগামী বছরগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই সমীকরণে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়েই—দেশটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাঝখানে থেকেও নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে পারে।

 


 


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর