প্রকাশিত : ১৮:০০
২৪ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:০৯
২৪ জুন ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। শ্রীমঙ্গলের সবুজে ঘেরা এক চা বাগান। হঠাৎ চা–গাছের আড়াল থেকে ডানা মেলে আকাশে উড়াল দেয় একটি তিলানাগ ঈগল। তার শক্ত পায়ের নখরে ধরা একটি দাঁড়াশ সাপ। সাপটির মাথা নেই, তবে লেজ তখনো কাঁপছে। কিছু দূরে একটি ছায়াঘেরা গাছে গিয়ে বসে পাখিটি। মিনিটখানেকের মধ্যেই শেষ হয় সকালের আহার। তারপর আবার ডানা মেলে মিলিয়ে যায় বনের গভীরে।
প্রকৃতির এই বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হন হবিগঞ্জের ডেন্টাল সার্জন ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডা. এসএস আল আমিন সুমন। সম্প্রতি অন্য একটি পাখির খোঁজে তিনি শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলেন। পথে একটি চা বাগানের কাছে গাড়ি থামাতেই চোখে পড়ে তিলানাগ ঈগলের শিকার ও আহারের দৃশ্য। সুযোগ হাতছাড়া না করে ক্যামেরাবন্দি করেন কয়েকটি ছবি।
ছবিটি তুলেছেন হবিগঞ্জের ডেন্টাল সার্জন ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডা. এসএস আল আমিন সুমন।
ডা. সুমন গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “তিলানাগ ঈগল সাধারণত সাপ শিকার করার পর প্রথমেই ঘাড়ের কাছ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এতে পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি থাকে না। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা দাঁড়াশ সাপের বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখতে পাই।”
তিনি বলেন, “যে পাখির খোঁজে গিয়েছিলাম, সেটির দেখা পাইনি। তবে তিলানাগ ঈগলের এই অভিজাত সকালের আহার দেখা কম প্রাপ্তি নয়।”
প্রকৃতির দক্ষ শিকারি
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, তিলানাগ ঈগল (Spilornis cheela) প্রকৃতির অন্যতম দক্ষ শিকারি। দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে উঁচু ডালে বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। শিকার চোখে পড়লেই দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বিষধর চন্দ্রবোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সাপ এদের প্রধান শিকার। এ ছাড়া গিরগিটি, টিকটিকি, উভচর প্রাণী, ছোট স্তন্যপায়ী এবং সুযোগ পেলে মাছ ও ছোট পাখিও শিকার করে। এ কারণে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তিলানাগ ঈগল। অনেক বিশেষজ্ঞ একে বন–প্রকৃতির ‘নীরব প্রহরী’ বলেও উল্লেখ করেন।
বিস্তৃত আবাস, রাজকীয় উপস্থিতি
মধ্যম আকৃতির এই শিকারি পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Spilornis cheela। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বনভূমিতে এর বিচরণ রয়েছে। বিভিন্ন দেশে এদের ২১টি উপপ্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
বড় মাথা, খাড়া ঝুঁটি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, হলুদ ঠোঁট এবং শক্ত আঁশযুক্ত পা তিলানাগ ঈগলকে সহজেই আলাদা করে চেনায়। বিস্তৃত ডানা মেলে বনাঞ্চলের আকাশে এদের রাজকীয় উড়াউড়ি এবং কর্ণভেদী ডাক দূর থেকেই নজর কাড়ে।
তাইওয়ানে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের শুরুতে প্রায় ৯৮ শতাংশ সময় এরা গাছের ডালে বসে কাটায়। দীর্ঘ সময় চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার পর সুযোগ বুঝে শিকার ধরে।
কমছে দেখা মেলার হার
একসময় দেশের বনাঞ্চলে তিলানাগ ঈগলের উপস্থিতি ছিল বেশ সাধারণ। তবে বন ধ্বংস ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় এখন এদের সংখ্যা কমছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডব্লিউসিএস বাংলাদেশের সাবেক সমন্বয়কারী সামিউল মোহসেনিন বলেন, “সিলেট অঞ্চলের বনগুলো দিন দিন অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে তিলানাগ ঈগলসহ অনেক বন্যপ্রাণী অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”
শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের সেই সকালের দৃশ্য তাই শুধু একটি শিকারের গল্প নয়; এটি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মেরও এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এক প্রাণীর মৃত্যু আরেক প্রাণীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। দাঁড়াশ সাপকে শিকার করে তিলানাগ ঈগলের সেই সকালের ভোজ যেন বনের নিঃশব্দ জীবনচক্রেরই এক জীবন্ত দলিল।