প্রকাশিত : ১৪:০৬
২২ জুন ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও অস্থির। সূচকের পতন, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং লেনদেনের ক্রমাগত সংকোচন—সব মিলিয়ে বাজারে এক ধরনের হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সংকট কমানোর বদলে তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজারের বর্তমান অবস্থাকে যদি একজন অসুস্থ রোগীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে বলা চলে, রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসার পরিবর্তে তাকে এমন ওষুধ দেওয়া হয়েছে, যা রোগের জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে একসঙ্গে ৬২টি কোম্পানি সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্তটি বাজারে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে বলে অনেক বিনিয়োগকারীর ধারণা। প্রশ্ন হলো, তথ্য প্রকাশের বিরোধিতা কেউ করছে না; কিন্তু সময় নির্বাচন কি যথাযথ ছিল?
পুঁজিবাজারে তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, পরিচালনাগত দুর্বলতা কিংবা অনিয়ম সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের জানার অধিকার রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থারও দায়িত্ব হলো সেই তথ্য নিশ্চিত করা। কিন্তু তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও একটি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কারণ বাজার শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এটি আস্থারও বাজার। আর আস্থা ভেঙে গেলে সবচেয়ে ভালো কোম্পানির শেয়ারও চাপে পড়ে।
যখন বাজার ইতিমধ্যে দুর্বল, বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত এবং লেনদেন নিম্নমুখী, তখন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কোম্পানিকে নিয়ে নেতিবাচক বার্তা প্রকাশ করা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কের জন্ম দেয়। বিনিয়োগকারীরা তখন শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানিই নয়, পুরো বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর ফল হয় বিক্রির চাপ বৃদ্ধি, সূচকের পতন এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ হ্রাস।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। যদি ৬২টি কোম্পানির বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে সেগুলো কি হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছে? নিশ্চয়ই নয়। এসব সমস্যা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে। তাহলে এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করছিল? বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সময়মতো নজরদারি করত, তাহলে হয়তো একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক কোম্পানিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনই পড়ত না।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ কেবল অনিয়ম শনাক্ত করা নয়; অনিয়ম প্রতিরোধ করাও তাদের দায়িত্ব। যেমন একজন চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অবনতির আগেই ব্যবস্থা নেন, তেমনি বাজার নিয়ন্ত্রকদেরও উচিত ছিল প্রাথমিক পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু যখন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়, তখন তা অনেক ক্ষেত্রে সমাধানের চেয়ে নতুন সংকট সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের একটি বড় সমস্যা হলো আস্থার ঘাটতি। গত এক যুগে বাজারে নানা ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কারসাজি, দুর্বল আইপিও, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এসব ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। এমন বাজারে যেকোনো নেতিবাচক সংবাদ বহুগুণ বেশি প্রভাব ফেলে।
আস্থা এক দিনে তৈরি হয় না, আবার এক দিনেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পুঁজিবাজার মূলত ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাসের জায়গা। একজন বিনিয়োগকারী আজ অর্থ বিনিয়োগ করেন আগামী দিনের লাভের আশায়। তিনি যদি মনে করেন যে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিংবা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই, তাহলে তিনি বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়াবেন। বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারীর আচরণে সেই প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে।
বিএসইসি ও ডিএসইর প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ। তাঁরা চেয়েছিলেন বাজারে ভালো কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ুক, নতুন বিনিয়োগ আসুক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হোক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এখানে অবশ্য আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব কখনোই শুধুমাত্র বাজারকে সবুজ রাখা নয়। যদি কোনো কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় সমস্যা থাকে, অনিয়ম থাকে কিংবা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তা অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই তথ্য প্রকাশের ধরন ও সময় কি এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে বাজারে অযথা আতঙ্ক না ছড়ায়? বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোতে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি বাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এবং আস্থা ধরে রাখার জন্য যোগাযোগ কৌশল অনুসরণ করা হয়।
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, সিদ্ধান্ত আসে; কিন্তু তার পেছনের যুক্তি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না। ফলে গুজবের বিস্তার ঘটে। বিনিয়োগকারীরা তথ্যের অভাবে অনুমানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। বাজারে তখন বাস্তবতার চেয়ে ভয় বেশি কাজ করে। ৬২টি কোম্পানি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা পুরো বাজারের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।
পুঁজিবাজার পরিচালনার ক্ষেত্রে যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না, সেই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য প্রভাব এবং পরবর্তী করণীয়ও স্পষ্ট করতে হয়। অন্যথায় বাজারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাজারে এই ঘাটতি বহুদিনের।
বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন। এর জন্য প্রথমত প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা। বিনিয়োগকারীরা যেন বুঝতে পারেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত বদলাবে না এবং তাদের পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে, তবে তা হতে হবে সময়োপযোগী এবং ধারাবাহিক। তৃতীয়ত প্রয়োজন স্বচ্ছ যোগাযোগব্যবস্থা, যাতে বাজারে গুজবের পরিবর্তে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার অপরিহার্য। ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস হতে পারে পুঁজিবাজার। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বাজারকে বারবার ধাক্কা দেওয়া যাবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে পুঁজিবাজার শুধু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র নয়; এটি মনস্তত্ত্ব, আস্থা ও প্রত্যাশারও ক্ষেত্র। নিয়ন্ত্রকদের প্রতিটি পদক্ষেপের বাজারগত প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করতে হবে। কারণ ভালো উদ্দেশ্য থেকেও নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল সময়ে বাস্তবায়িত হলে তার ফল উল্টো হতে পারে।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগকে শুধু আবেগ বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। কেন বাজারে আতঙ্ক তৈরি হলো, কেন আস্থা আরও কমে গেল এবং কেন বিনিয়োগকারীরা এসব সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে মনে করছেন—সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন, কিন্তু তা নষ্ট করা খুব সহজ।
একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের জন্য কঠোর নজরদারি যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন বিচক্ষণতা। তথ্য প্রকাশ যেমন দরকার, তেমনি দরকার সঠিক সময় নির্বাচন। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যেমন অপরিহার্য, তেমনি প্রয়োজন বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভালো উদ্যোগও বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা হিসেবে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ সেই ভারসাম্যের পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। নিয়ন্ত্রকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—শুধু অনিয়ম চিহ্নিত করা নয়, হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনর্গঠন করা। কারণ আস্থা ছাড়া পুঁজিবাজার টিকে থাকতে পারে না। আর আস্থাহীন বাজারে যতই সংস্কারের কথা বলা হোক, বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত নিরাপদ দূরত্বেই অবস্থান নেবেন।
বাজারকে সুস্থ করতে হলে রোগের চিকিৎসা করতে হবে, রোগীকে নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো দেখে অনেক বিনিয়োগকারীর মনে হয়েছে, অসুস্থ বাজারকে সুস্থ করার পরিবর্তে তার ওপর আরও একটি আঘাত হানা হয়েছে। সেই উপলব্ধি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এখনই সময় নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবার