প্রকাশিত :  ১১:৩৬
২২ জুন ২০২৬

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দরপতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক যুগে বিনিয়োগকারীরা উত্থানের চেয়ে পতনের গল্পই বেশি শুনেছেন। তবু প্রতি বড় দরপতনের দিন আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন হাজির হয়—সমস্যাটা কী কেবল বাজারের, নাকি এর পেছনে অর্থনীতি, নীতি এবং আস্থার আরও গভীর সংকট কাজ করছে?

সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। এক দিনে শতাংশ দেড় ভাগের বেশি পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু উদ্বেগের প্রকৃত কারণ সূচকের পতন নয়; বরং বাজারের সামগ্রিক চিত্র। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে।

পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী যখন বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতিনির্ধারকরা সুস্পষ্ট অবস্থানে আছেন এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে অনিশ্চয়তা বাড়লে তিনি অপেক্ষার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে সেই অপেক্ষার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দুর্বলতার ব্যাখ্যা কেবল বাইরের ঘটনায় খুঁজলে ভুল হবে। কারণ আমাদের বাজার বহুদিন ধরেই তারল্যসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সমস্যায় ভুগছে।

সোমবারের বাজারে তারল্যসংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপুল অঙ্কের সরকারি সুকুক ইস্যুর কারণে আর্থিক খাতের একটি বড় অংশের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে চলে গেছে। এটি সাময়িক ঘটনা হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে সামান্য চাপ এলেই বাজার নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক লেনদেন ও জল্পনানির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের একটি অংশ বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেলেও বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা দাম একসময় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

প্রথমত, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কারসাজিকারীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ছাড়া স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ যত বাড়বে, বাজার তত শক্তিশালী হবে।

স্বল্পমেয়াদে সূচক আরও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেটি বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সূচকের দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল কিছু শেয়ারের দর বাড়া–কমার নাম নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলে সূচকের কয়েক পয়েন্ট পতনের চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যায়।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর