প্রকাশিত : ১৮:৫৪
২০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:০৯
২০ জুন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক : গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) যে উত্থান দেখা গেছে, তাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে উল্লেখযোগ্য হারে। আর এই ধারা কি আগামীকালও অব্যাহত থাকবে? সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ৩৯.৭৬ পয়েন্ট, যা শতাংশের হিসেবে ০.৭১। আর এই পয়েন্টে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৬১ পয়েন্টে। এটি গত দশ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান। আর শুধু যে সূচক বেড়েছে তাই নয়, টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাজারে বিরাজ করছে। এই সময়ে সূচকটি মোট ৩৫৬ পয়েন্ট বেড়েছে, যা কোনোভাবেই নগণ্য নয়।
শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস এখন ১ হাজার ১৫০ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০ রয়েছে ২ হাজার ১৪৩ পয়েন্টে। এই তথ্য বলছে, বাজার শুধু বাড়ছেই না, তার গভীরতাও বাড়ছে।
বাজারের পেছনের কারণটা কী?
অর্থনীতির মূলভিত্তি মজবুত হচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) প্রস্তাবিত বাজেটকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকারের নীতিগত সহায়তার ঘোষণাও বাজারে বাড়তি প্রাণসঞ্চার করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কিছু ইতিবাচক খবর আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ও হরমুজ প্রণালী পুনরুন্মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। এই খবর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জ্বালানি তেলের দাম কমলে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে। আর সেই আশ্বাসে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নিতে আরও উদাসীন হচ্ছে।
তবে আগামীকালের সেশনটি কিন্তু অন্য রকম হতে পারে। কারণ বেশ কিছু খাত ও করপোরেট সিদ্ধান্ত বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সম্প্রতি এমন একটি রায় দিয়েছেন যা মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে নতুন গতিতে এগিয়ে দিতে পারে। রায়টি বিএসইসির পক্ষে এসেছে এবং তা বন্ধমেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) ফান্ডের রূপান্তর বা অবসায়নের পথ খুলে দিয়েছে।
নতুন আইনি বিধান অনুযায়ী, যেসব ফান্ড তাদের নিট সম্পদ মূল্যের (এনএভি) চেয়ে ২৫ শতাংশ বা তার বেশি কমে লেনদেন হচ্ছে, সেগুলোকে খোলামেয়াদি (ওপেন-এন্ড) ফান্ডে রূপান্তরিত করা যাবে অথবা সম্পূর্ণ অবসায়ন করা যাবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে আটকে থাকা বিনিয়োগকারীদের টাকা উত্তোলনের পথ তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে ১৮ জুনের লেনদেনে ৩৬টি তালিকাভুক্ত ফান্ডের মধ্যে মাত্র দুটি বাদে বাকি সবগুলোই লাভ করেছে। বিশেষ করে ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড ও ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ১০ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার স্পর্শ করেছে। এই ধারা আগামীকাল সকালেও বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
গুজব কেটেছে, আস্থা ফিরছে এনবিএফআই খাতে
গত ১৫ জুন কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমে খবর ছড়িয়েছিল যে, বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ বা অবলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই খবরে বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১৮ জুন ফেয়ারইস্ট ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের কাছে এমন কোনো নির্দেশনা আসেনি।
এখন এই বিভ্রান্তি দূর হওয়ায় আগামীকাল এনবিএফআই খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। আগের সেই আতঙ্কিত বিক্রির চাপও আর থাকবে না বলেই তারা আশা করছেন।
বন্ড বাজারে বড় পরিবর্তন
আগামীকাল বন্ড বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কয়েকটি ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন আবার শুরু হবে। ১০ বছর মেয়াদি (বিজিটিবি ২১/১২/২০৩২, বিজিটিবি ২০/০৬/২০৩৪, বিজিটিবি ২০/০৬/২০২৮, বিজিটিবি ১৯/০৬/২০২৯) এবং ১৫ বছর মেয়াদি (বিজিটিবি ২১/১২/২০২৬, বিজিটিবি ২০/০৬/২০২৭, বিজিটিবি ১৯/০৬/২০২৮, বিজিটিবি ১৯/১২/২০২৭) মোট আটটি সিকিউরিটিজের লেনদেন পুনরায় চালু হচ্ছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের পোর্টফোলিও আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারবেন।
কিন্তু কিছু বন্ড লেনদেন বন্ধ থাকবে। ২০ বছর মেয়াদি দুটি ট্রেজারি বন্ড (বিজিটিবি ২৩/০৬/২০৩০ ও বিজিটিবি ২৩/১২/২০২৯) রেকর্ড ডেটের কারণে ২১ ও ২২ জুন লেনদেন বন্ধ থাকবে।
বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকের পঞ্চম বছরের প্রথম অর্ধবার্ষিকীর ৪.৫৯ শতাংশ মুনাফা বিতরণের রেকর্ড ডেট ২২ জুন হওয়ায়, ২১ জুন স্পট মার্কেটে শেষ ‘কাম-বেনিফিট’ লেনদেন হবে। এতে ফিক্সড-ইনকাম বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে বলে ধারণা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রিমিয়ার ব্যাংক পারপেচুয়াল বন্ডে খারাপ খবর আছে। এই বন্ডের নবম অর্ধবার্ষিকীর জন্য লভ্যাংশ দেওয়া হবে না, কারণ ব্যাংকটির পর্যাপ্ত সঞ্চিত মুনাফা নেই। যদিও আগামী মেয়াদের জন্য কুপন হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, তবুও লভ্যাংশ না পাওয়ার সংবাদটি ঋণপত্র বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কোম্পানি পর্যায়ে যেসব সিদ্ধান্ত আলোচনায়
সাউথইস্ট ব্যাংক তাদের অনুমোদিত শেয়ার মূলধন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২১ জুনকে রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করেছে। ফলে ওই দিন ব্যাংকটির শেয়ারের লেনদেন বন্ধ থাকবে। এতে ব্যাংকিং খাতের লেনদেনে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রাইম ব্যাংকের খবরটি অবশ্য অনেক বেশি ইতিবাচক। ব্যাংকটির নয়জন পরিচালক স্পনসর শেয়ারহোল্ডার মোহাম্মদ নাদের খানের কাছ থেকে প্রায় ৩১ কোটি টাকার শেয়ার কিনছেন। ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য ৪০ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি কার্যকরী অপারেটিং নগদ প্রবাহ ৫৮ টাকার বেশি। এই সুসংহত আর্থিক ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীরা উদ্বুদ্ধ হবেন বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। আরও ভালো খবর হলো, ব্যাংকটি আগামীকালের মধ্যেই ঘোষিত লভ্যাংশ বিতরণ সম্পন্ন করবে, যা বিনিয়োগকারীদের হাতে তারল্য বাড়াবে।
বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ রেকর্ড মুনাফা ঘোষণা করেছে। মার্চ ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৩.৭২ বিলিয়ন টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এই অসাধারণ ফলাফলের ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদ ৫২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, অর্থাৎ প্রতি শেয়ারে ৫২.৫০ টাকা। পাশাপাশি কোম্পানিটি জে অ্যান্ড এন প্যাকেজিংয়ে ৫১ শতাংশ মালিকানা কিনছে, যা করপোরেট সম্প্রসারণের অংশ। আগামীকাল বহুজাতিক ও ব্লু-চিপ খাতে বার্জারের এই অর্জন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কঠোর হচ্ছে নিয়ন্ত্রক নজরদারি
বিএসইসি ফাটকাবাজি রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ১১ জুনের মধ্যে ‘রিজেন্ট টেক্সটাইলস’ শেয়ারের দাম ১০৮ শতাংশ বেড়েছে, যা অস্বাভাবিক। এই ঘটনায় ডিএসইকে ৩০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একইভাবে আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ার মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। আইডিআরএ ৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধেও তদন্ত জোরদার করেছে।
এই কঠোর নজরদারির ফলে বাজারে ফাটকাবাজদের দৌরাত্ম্য কমবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিনিয়োগকারীদের টাকা এখন মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর দিকে যাবে, যা বাজারের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
শেষ কথা: আগামীকালের বাজার কোন দিকে?
সবকিছু মিলিয়ে আগামীকাল বাজার ইতিবাচক থাকার প্রবল সম্ভাবনা আছে। সরকারের বাজেটোত্তর স্থিতিশীল কর কাঠামো এবং নীতি সহায়তা এই ধারা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
কিন্তু সাবধান থাকার কারণও আছে। টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে সূচক বাড়ার পর মুনাফা তোলার (প্রফিট-টেকিং) প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অনেক বিনিয়োগকারী তাদের সাম্প্রতিক লাভ তুলে নিতে চাইবেন, যা সেশনের মধ্যভাগে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে।
সাউথইস্ট ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ থাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের পারপেচুয়াল বন্ডের লভ্যাংশ না দেওয়ার সংবাদ ফিক্সড-ইনকাম বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুযোগ নিয়ে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ এবং ভালো লভ্যাংশের ইতিহাস আছে—এমন ব্লু-চিপ শেয়ারে লম্বা মেয়াদি বিনিয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্ষণস্থায়ী কারসাজির শিকার হওয়া শেয়ারগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
বাজার এখন উত্থানের পথে। কিন্তু এই পথে কিছু ওঠানামা থাকবেই। বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারী সেটা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন।