প্রকাশিত : ১৮:৪৮
২০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৭
২০ জুন ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই আস্থার সংকট, তারল্যের সংকোচন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের চিত্র যেন ভিন্ন এক গল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে রয়েছে। সূচকটি এখন প্রায় দশ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল সাময়িক উচ্ছ্বাস, নাকি দীর্ঘদিন পর বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতার প্রত্যাবর্তনের লক্ষণ?
বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। প্রথমত, নতুন অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আভাস দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমিয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তা অন্তত আপাতত কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীরা আবারও ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
তবে আগামীকালের বাজারে সবচেয়ে আলোচিত খাত হতে পারে মিউচুয়াল ফান্ড। দীর্ঘদিন ধরে নিট সম্পদ মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ছাড়ে লেনদেন হওয়া বন্ধমেয়াদি ফান্ডগুলোকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বহু বছর ধরে অবমূল্যায়িত অবস্থায় থাকা এ খাতে বিপুল পরিমাণ মূলধন আটকে ছিল। এখন সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি হয়েছে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে যে নতুন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তা অস্বাভাবিক নয়।
একই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। কয়েক দিন আগে কিছু অনলাইন প্রতিবেদনে কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাখ্যার পর তা অনেকটাই দূর হয়েছে। বাজারে গুজবের প্রভাব যে কতটা গভীর হতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই আরেকটি উদাহরণ। তবে বিভ্রান্তি কেটে যাওয়ায় এ খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত থেকেও কিছু ইতিবাচক বার্তা আসছে। প্রাইম ব্যাংকের পরিচালকদের বড় আকারের শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা যখন নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করেন, তখন তা সাধারণত প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতি তাদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরা হয়। একইভাবে নিয়মিত লভ্যাংশ বিতরণ বাজারে নতুন তারল্য সঞ্চার করে।
অন্যদিকে, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ঘোষিত রেকর্ড পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো এখনো বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যখন অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত, তখন কিছু কোম্পানি ধারাবাহিক মুনাফা ও নগদ লভ্যাংশের মাধ্যমে বাজারে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে আশাবাদের মধ্যেও সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সূচক টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে বাড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে চাইবেন। ফলে দিনের কোনো এক পর্যায়ে মূল্য সংশোধনের চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক হবে না। বাজারের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ধারাবাহিক উত্থানের পর স্বল্পমেয়াদি মুনাফা তুলে নেওয়া একটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত প্রক্রিয়া।
এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হওয়া কয়েকটি শেয়ারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর, আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে। কারসাজিনির্ভর উত্থান কখনোই একটি টেকসই বাজার কাঠামো গড়ে তুলতে পারে না।
সব মিলিয়ে আগামীকালের বাজারে ইতিবাচক মনোভাবই প্রাধান্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে সেই ইতিবাচকতা হবে বাছাইভিত্তিক। বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে মিউচুয়াল ফান্ড, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তির ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর দিকে। অন্যদিকে, গুজবনির্ভর কিংবা অতিমূল্যায়িত দুর্বল শেয়ারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অব্যাহত থাকবে।
পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো—অনেক দিন পর বিনিয়োগকারীরা আবারও কোম্পানির মৌলভিত্তি, লভ্যাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। যদি এই প্রবণতা ধরে রাখা যায়, তাহলে সূচকের কয়েকশ পয়েন্ট বৃদ্ধি নয়; বরং একটি সুস্থ, স্বচ্ছ ও পরিপক্ব পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অর্জন।