প্রকাশিত : ১৩:৩২
২০ জুন ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: দেশের চা শিল্পে গুণগত মান, উৎপাদন, রপ্তানি, উদ্ভাবনী বিপণন ও শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় চা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শীর্ষ চা বাগান, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। এর মধ্যে সর্বোচ্চ গুণগতমানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগানের স্বীকৃতি পেয়েছে কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের অধীন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মধুপুর চা বাগান।
শনিবার (২০ জুন) দেশের চায়ের রাজধানী হিসেবে খ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্মাননা ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ধারাবাহিকভাবে উন্নতমানের চা উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং গুণগত উৎকর্ষের কারণে এবার সর্বোচ্চ গুণগতমানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে মধুপুর চা বাগান। দেশের অন্যতম স্বনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে পরিচালিত বাগানটি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমানের চা উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের চা শিল্পে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে।
কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ চা বাগানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। এগুলো হলো মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ঝিমাই চা বাগান, হবিগঞ্জের বাহুবলের মধুপুর চা বাগান এবং শ্রীমঙ্গলের দিনারপুর ও সাতগাঁও চা বাগান। উৎপাদন, গুণগত মান ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটি দেশের চা শিল্পে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নাম হিসেবে পরিচিত।
কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়লা রহমান কবীর ১৯৭৫ সাল থেকে সফলতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নিহাদ কবির। ব্যবসায়িক নেতৃত্বে লায়লা রহমান কবীর দেশের অন্যতম অগ্রগণ্য নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) প্রথম ও একমাত্র নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) প্রথম নারী সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। করপোরেট ব্যবসা ও জাতীয় অর্থনীতিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৪ সালে ‘ডেইলি স্টার-ডিএইচএল বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।
এবার একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান। শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারকের পুরস্কার পেয়েছে দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়তন চা উৎপাদনকারীর স্বীকৃতি পেয়েছেন। শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পেয়েছে মির্জাপুর চা বাগান।
চা পণ্যের উদ্ভাবনী বাজারজাতকরণ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন চা মিশ্রণ বাজারজাতকরণ—এই দুটি পৃথক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার অর্জন করেছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড। শ্রমিক ক্যাটাগরিতে নেপুচা চা বাগানের জেসমিন ওরাওঁ শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন। জাতীয় চা দিবসের বিশেষ পুরস্কার হিসেবে শ্রেষ্ঠ বটলিং চা কারখানা নির্বাচিত হয়েছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল এলাকার সৃষ্টি টি লিমিটেড।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত মান উন্নয়ন এবং শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করেই এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।’ তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ১৬০টির বেশি চা বাগান এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র চা বাগান জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের ‘চা পর্যটন’ গড়ে তোলারও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ জন্য মালিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সহমর্মিতা বাড়াতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চা শিল্পের আধুনিকায়নে চা বোর্ডের কার্যক্রম ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি’ ও ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে দুটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ক্লোন উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জেসমিন টি, রোজ টি, লেমন টি, মাসালা টি ও চকোলেট টি-সহ বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পকে আরও বহুমুখী ও রপ্তানিমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ শুরু হয় ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে। পরে ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে দেশের চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে প্রায় ৫০টি চা বাগান রয়েছে। শতবর্ষের ঐতিহ্য, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও মানসম্মত উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় চা দিবস-২০২৬-এ নতুন স্বীকৃতি যুক্ত করল কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের মধুপুর চা বাগান।