প্রকাশিত :  ১৬:০৬
১৮ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:২১
১৮ জুন ২০২৬

ঋণখেলাপি ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ, সরকারি ও বিরোধী দলের তুমুল বিতর্ক

ঋণখেলাপি ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ, সরকারি ও বিরোধী দলের তুমুল বিতর্ক

ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় সরকারি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য তাঁর বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার (এক্সপাঞ্জ) দাবি জানান। অন্যদিকে, বিরোধী দলের সদস্যরা বক্তব্য বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে একপর্যায়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে—বাংলাদেশে টোটাল মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যদি আপনি অবলোকন পুনঃতফসিল করা এবং মামলার কারণে যে ঋণের টাকাটা আটকে আছে আদালতে অর্থাৎ পেন্ডিং মামলা হিসেবে যেটা এখনো খাতায় তোলা হয় নাই। সেটা যদি আমরা যোগ করি এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি টাকা। যেটা মোট ঋণের ৫৯.৭৩ শতাংশ। সুতরাং ব্যাংকগুলো চাইলেও সরকারকে বেশি সহায়তা দিতে পারবে না।’

পরে ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদ’ শব্দ এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘সকলেই বলেছেন এই সংসদটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী সংসদ। অনেক আন্দোলন সংগ্রামের পরে ত্যাগের বিনিময়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। দেশে-বিদেশে সম্মানিত হয়েছি। আমরা সম্মানিত হয়েছি। বিগত অনেকগুলো বছর ভোটারহীন নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ কলুষিত করা হয়েছে। সেইখানে সংসদের মর্যাদা অন্য যেকোনো সংসদের চেয়ে আমরা মনে করি অনেক উঁচুতে। কিন্তু আমরা যখন বক্তব্য রাখি, দুঃখজনক হলেও সত্য হয়তো খেয়াল করি না। কিন্তু আমরা অনেকেই অবচেতন মনে হোক, সচেতন মনে হোক—এমন কিছু কথা সংসদে উচ্চারণ করি, যা আমাদের মর্যাদাকে খাটু করে। আজকের বক্তব্য চলাকালীন মাননীয় সংসদ সদস্য আবু তালেব (মূলত বক্তব্য দিয়েছেন ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা) উনি এক জায়গায় বলেছেন, ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে, এই যে ঋণখেলাপিদের এই সংসদ—এই শব্দ কোথা থেকে পেলেন।’

তখন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘মাননীয় সদস্য এটা ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বলেননি। আমি যতটুকু শুনতে পেরেছি এটা রুমিন ফারহানা বলেছিলেন।’

তখন মিলন বলেন, ‘যেই বলুক এই কথাটার প্রেক্ষিতে বলছি। একটা কথা আছে বাংলা ভাষায় মাননীয় স্পিকার যে, ভেড়ায় যদি ক্ষেত খায় সেই ক্ষেত টিকানো যায় না। এইখানে নির্বাচিত হয়ে নিজের মর্যাদা নিজের হানি করার জন্য আমরা যদি আত্মঘাতী সমালোচনা, আত্মঘাতী কথা বলি, ঋণখেলাপি হয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না। সেখানে ঋণখেলাপিদের সংসদ কী করে হয়? আমি অনুরোধ করবো, আপনি এই শব্দটি এখান থেকে এক্সপাঞ্জ করবেন এবং ভবিষ্যতে আমরা যাতে বক্তব্য রাখি নিজেদের মানসম্মান হানি হয়, এমন কথা যেন অতি উৎসাহিত হয়ে না বলি এইজন্য সকলের প্রতি বিনয়ের অনুরোধ করছি।’

এরপর অধিবেশনে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম অধিবেশনেও অনেক সম্মানিত সংসদ সদস্যের কত ঋণখেলাপি রয়েছে, তার সংখ্যা উল্লেখ করেছিলাম, তবে সম্মানের কারণে নাম প্রকাশ করিনি। এখন যে দল ঋণখেলাপিদের নমিনেশন দিয়ে সংসদে নিয়ে আসে, এটা তাদের দায়। সংসদে এতগুলো ঋণখেলাপি থাকলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলবে।’

তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘সংসদকে আমরা সার্বভৌম বলি। এখন এই সংসদে যদি আমরা ঋণখেলাপিদের ‘ঋণখেলাপি’ বলতে না পারি, তাহলে কোথায় বলব? আমার অনুরোধ থাকবে, এ ধরনের শব্দ এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার মতো কোনো বক্তব্য নয়।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের বক্তব্যের জবাব দিতে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মহান জাতীয় সংসদের সব সদস্যকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের উচিত। এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি নন। নির্বাচনী আইন (আরপিও) এবং অন্যান্য বিধিমালা অনুসারে, আদালত কর্তৃক কেউ ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হলে তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হন। তার নমিনেশন অবৈধ হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘যাদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে, তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংকের বা প্রাইভেট মামলা ছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট থেকে সেগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার পরই তারা বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে ‘ঋণগ্রস্ত’ হতে পারেন, কিন্তু ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে তাদের ডিফেম (মানহানি) করা হচ্ছে। এটি মানহানিকর বক্তব্য, এটি এক্সপাঞ্জ হওয়া উচিত।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) তথ্য উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘টিআইবি সম্প্রতি বলেছে, এই সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।’

আইনজীবী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু একজন আইনজীবী, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে রিশিডিউলিং করা হয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সিআইবির (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম আসার পর কীভাবে রিট পিটিশন দাখিল করে তা স্টে (স্থগিত) করে ইলেকশন করা হয় এবং এরপর আবারও সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, সেটাও আমরা ভালো বুঝি।’



Leave Your Comments




জাতীয় এর আরও খবর