প্রকাশিত : ১৭:১২
১৬ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:২৬
১৬ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—শেয়ারের দাম কি কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন, নাকি কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ইচ্ছামতো পরিচালিত এক কৃত্রিম খেলা? সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কয়েকটি দীর্ঘদিনের বন্ধ, লোকসানগ্রস্ত এবং ঋণাত্মক সম্পদমূল্যের কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সেই প্রশ্নটিকে আবারও সামনে এনেছে।
একটি সুস্থ পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন সক্ষমতা, মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা, নগদ প্রবাহ, সম্পদমূল্য ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ, বিপুল পুঞ্জীভূত লোকসান এবং ঋণাত্মক নিট সম্পদমূল্যের কোম্পানির শেয়ার কয়েক মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু অস্বাভাবিক নয়, বরং বিপজ্জনক।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কোম্পানির অনেকগুলোরই আর্থিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের সব সম্পদ বিক্রি করলেও দায়-দেনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় তারা কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে। অথচ বাজারে সেই শেয়ারই বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বাজারে গুজব, কৃত্রিম প্রত্যাশা এবং হিসাবনিকাশের কিছু বিতর্কিত কৌশল একসঙ্গে কাজ করছে। সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে অনেক কোম্পানি কাগজে-কলমে নিজেদের সম্পদমূল্য বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। বাস্তবে কারখানা বন্ধ, উৎপাদন নেই, বিক্রি নেই—কিন্তু হিসাবের খাতায় সম্পদের মূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখিয়ে আর্থিক অবস্থার একটি ইতিবাচক ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এই পার্থক্য অনুধাবন করতে না পেরে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি শিল্পখাত পুনরুদ্ধারে ঘোষিত বৃহৎ প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিকেও কেন্দ্র করে বাজারে নতুন ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। কিছু মহল প্রচার করেছে যে, বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো অচিরেই বিপুল ঋণ সুবিধা পেয়ে উৎপাদনে ফিরবে এবং দ্রুত লাভজনক হয়ে উঠবে। বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো প্রণোদনা কর্মসূচি নিজে থেকেই একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে না। তবু গুজবের শক্তি অনেক সময় আর্থিক বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়।
এখানেই সক্রিয় হয়ে ওঠে তথাকথিত কর্নারিং সিন্ডিকেট। স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোর বাজারে ভাসমান শেয়ার কম থাকায় সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিছু গোষ্ঠী ধীরে ধীরে শেয়ার সংগ্রহ করে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে। এরপর নিজেদের মধ্যেই লেনদেন করে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়। বাইরে থেকে এটি স্বাভাবিক বাজার চাহিদা বলে মনে হলেও বাস্তবে তা অনেক সময় পরিকল্পিত কারসাজি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনে ফাঁদে পড়েন, আর কারসাজিকারীরা মুনাফা তুলে বাজার ছাড়েন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতের বিভিন্ন ধসের পেছনেও গুজব, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি এবং দুর্বল তদারকির ভূমিকা ছিল। দুঃখজনকভাবে, প্রতিবারই সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। তাদের সঞ্চয়, অবসরভাতা কিংবা জীবনের জমানো পুঁজি মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেছে।
এই বাস্তবতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কারসাজি শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর প্রয়োগই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য।
তবে সব দায় নিয়ন্ত্রকদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। বিনিয়োগকারীদেরও আর্থিক প্রতিবেদন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে তার নিট সম্পদমূল্য, নগদ প্রবাহ, অডিটরের মন্তব্য এবং ব্যবসার বাস্তব অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ফেসবুক গ্রুপের পরামর্শ কিংবা দ্রুত মুনাফার প্রলোভনের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে।
পুঁজিবাজার মূলত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টির জায়গা, দ্রুত ধনী হওয়ার ক্যাসিনো নয়। যে বাজারে মৌলভিত্তির চেয়ে গুজবের মূল্য বেশি হয়ে যায়, সেখানে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি। তাই আজ প্রয়োজন কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আর্থিক শিক্ষার প্রসার।
অন্যথায়, পচা শেয়ারের এই উল্লাস হয়তো সাময়িকভাবে কিছু মানুষের মুনাফা নিশ্চিত করবে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই সবচেয়ে বড় আঘাত করবে।