প্রকাশিত :  ১৭:০০
১৬ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:০৬
১৬ জুন ২০২৬

পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বগতি ও সংস্কারের প্রভাব, তবে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বগতি ও সংস্কারের প্রভাব, তবে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে

ঢাকা, ১৬ জুন ২০২৬: দেশের পুঁজিবাজার সাম্প্রতিক সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির চাপের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও আস্থা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.১৪ শতাংশে। অন্যদিকে, চলমান গড় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার-সংক্রান্ত নীতি অর্থবাজারে তারল্য সংকোচন সৃষ্টি করলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক গতি লক্ষ্য করা গেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দীর্ঘ প্রায় সাড়ে নয় মাস পর ৫,৬০০ পয়েন্টের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ১৪ জুন সূচকটি একদিনে ১০০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৫,৬২৫ পয়েন্টে পৌঁছায় এবং পরদিন আরও বেড়ে ৫,৬৪১ পয়েন্টে অবস্থান করে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ স্তর। একই সময়ে ডিএসই-৩০ ও ডিএসইএস সূচকেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

লেনদেনেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। ১৪ জুন ডিএসইতে দৈনিক লেনদেন ১,৩৫৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা পরদিন আরও বেড়ে ১,৪৫৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে সিএএসপিআই সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাজেটে পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানো, তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর কাঠামোতে প্রণোদনা এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি) ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) মতো নতুন বিনিয়োগ যন্ত্র অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে সাম্প্রতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার উদ্যোগও বাজারে আস্থা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আইপিও প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, বাজার নজরদারিতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং নিষ্পত্তি চক্রকে টি+২ থেকে টি+০-এর দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এসব ইতিবাচক প্রবণতার মধ্যেও কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট রয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। বিশেষ করে, বিদেশি বিনিয়োগের ধারাবাহিক পতন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর স্বল্পতা এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের অতিনির্ভরতা বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ব্লু-চিপ শেয়ারগুলো থেকেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ অব্যাহত রয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রার দুর্বলতা এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া, বাজারে অতীতে ফ্লোর প্রাইসের মতো নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ তারল্যকে সীমিত করেছিল বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এসব বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের মাধ্যমে বাজারকে আরও মুক্ত প্রবাহে আনার চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল করতে হলে মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানো, মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর ও স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সার্বিকভাবে, সাম্প্রতিক উত্থান বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করলেও এটি স্থায়ী প্রবৃদ্ধির সূচনা কিনা—তা নির্ভর করবে আগামী দিনের কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর