প্রকাশিত :  ১৮:০৭
১৪ জুন ২০২৬

আইনশৃঙ্খলা: নাগরিকের নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের প্রথম পরীক্ষা

আইনশৃঙ্খলা: নাগরিকের নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের প্রথম পরীক্ষা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

 রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপের নানা সূচক রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ কিংবা রপ্তানি আয়—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো নিরাপত্তা। একজন নাগরিক যখন ঘর থেকে বের হন, তখন তাঁর প্রথম প্রত্যাশা থাকে—তিনি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না। ব্যবসায়ী তাঁর পুঁজি, অভিভাবক তাঁর সন্তান এবং সাধারণ মানুষ তাঁর জীবন নিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত—রাষ্ট্রের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত সেখানেই যাচাই হয়। 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ প্রতিবেদন এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি ক্রমেই অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষের মূল্যায়নে পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু নাগরিকদের মনে যদি নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি জন্ম নেয়, তবে সেই অনুভূতিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্য সাধারণত আশাব্যঞ্জক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং অপরাধসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্তও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীদের একটি অংশের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান ঘাটতি রয়ে গেছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যবর্তী বাস্তবতাকে খুঁজে বের করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 আইনের শাসন কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই একটি দক্ষ প্রশাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব, গোয়েন্দা সক্ষমতা, দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি—এসবই একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের অপরিহার্য উপাদান। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা গেলে জনআস্থাও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।

বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা কম নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তার অন্যতম প্রধান অংশ হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থনীতি, শিক্ষা কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প—সবকিছুর ভিত্তি একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ। নাগরিক যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তবে উন্নয়নের সুফলও তাঁর কাছে অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়।

এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের উদ্বেগকে কেবল সমালোচনা হিসেবে না দেখে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করার মতো উদ্যোগগুলো এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রের প্রদর্শনে নয়, নাগরিকের আস্থায় নিহিত। একজন সাধারণ মানুষ যদি বিশ্বাস করেন যে বিপদের মুহূর্তে রাষ্ট্র তাঁর পাশে দাঁড়াবে, তাহলে সেটিই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর সেই আস্থা অর্জনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। 

নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান উদ্যোগ, কার্যকর সংস্কার এবং কঠোর জবাবদিহিই মানুষের মনে নতুন করে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারে।


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর