প্রকাশিত :  ১৫:৩২
১৪ জুন ২০২৬

সূচকের উত্থান ও লেনদেন বৃদ্ধি: পুঁজিবাজারে কী ফিরছে আস্থা?

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

সূচকের উত্থান ও লেনদেন বৃদ্ধি: পুঁজিবাজারে কী ফিরছে আস্থা?

দীর্ঘদিনের হতাশা, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার ভারে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যেন নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান এবং লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাজারজুড়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ও বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এটি বাজারের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।

গত কয়েক বছরে দেশের পুঁজিবাজার নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির দুর্বল আর্থিক ভিত্তি, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, তারল্য সংকোচন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে বাজার প্রত্যাশিত গতি হারিয়েছিল। এমন বাস্তবতায় রোববারের লেনদেনকে অনেকেই কেবল একটি দিনের উত্থান হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও দেখছেন।

লেনদেন বেড়েছে, বেড়েছে অংশগ্রহণ

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, রোববার বাজারে ক্রয়চাপ ছিল দৃশ্যমান। অধিকাংশ খাতেই বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ, প্রকৌশল এবং কিছু বৃহৎ মূলধনী কোম্পানির শেয়ারে ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল তুলনামূলক বেশি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বাজারের প্রকৃত শক্তি শুধু সূচকের উত্থান দিয়ে বিচার করা যায় না; লেনদেনের পরিমাণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কখনো কখনো কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সূচক বাড়তে পারে। কিন্তু লেনদেনের বৃদ্ধি সাধারণত বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাজারে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির প্রতিফলন।

তাই রোববারের ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকার লেনদেনকে অনেকেই ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। গত কয়েক মাসে বাজারে যেভাবে লেনদেনের পরিমাণ কমে এসেছিল, তার তুলনায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি।

বাজেট কী বদলে দিয়েছে বাজারের মনোভাব?

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর প্রথম বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও ঘোষণা করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুধু ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাই কমায় না, বিনিয়োগ পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একজন বাজার বিশ্লেষক বলেন, “বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতিগত স্থিতিশীলতাকে। বাজেটে সরকার যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাত সংস্কারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা দেয়, তখন তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”

নতুন আর্থিক উপকরণ নিয়ে আশাবাদ

প্রস্তাবিত বাজেটে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর পরিকল্পনা এবং মিউনিসিপ্যাল বন্ড ও সুকুক বন্ডের সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজার মূলত শেয়ার ও সীমিত সংখ্যক বন্ডনির্ভর। উন্নত দেশগুলোর মতো বহুমাত্রিক আর্থিক পণ্যের অভাবে বিনিয়োগকারীদের বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগও সীমিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হলে কৃষিপণ্য, ধাতু এবং অন্যান্য পণ্যের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।

অন্যদিকে, মিউনিসিপ্যাল বন্ড স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। সুকুক বন্ড ইসলামী অর্থব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন

পুঁজিবাজারে পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন নেতিবাচক পরিবেশ বিরাজ করলে অনেক বিনিয়োগকারী বাজার থেকে দূরে সরে যান। আবার ইতিবাচক ধারাবাহিকতা তৈরি হলে নতুন অর্থ বাজারে প্রবেশ করতে শুরু করে।

ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে যে হতাশা বিরাজ করছিল, রোববারের লেনদেন তা অনেকটাই দূর করেছে। বিশেষ করে দরবৃদ্ধি হওয়া কোম্পানির সংখ্যা দরপতন হওয়া কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।

একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহে আমরা অনেক বিনিয়োগকারীকে অপেক্ষার অবস্থানে দেখেছি। কিন্তু রোববারের বাজার তাঁদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।”

তারল্য প্রবাহের প্রত্যাশা

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছেন, বিভিন্ন উৎস থেকে নতুন তারল্য বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। আর্থিক খাতে নগদ প্রবাহ বাড়লে তার একটি অংশ পুঁজিবাজারেও আসতে পারে।

তাঁদের মতে, বাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে অপেক্ষমাণ অনেক বিনিয়োগকারী পুনরায় সক্রিয় হতে পারেন। এতে লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

তবে তাঁরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে কেবল স্বল্পমেয়াদি তারল্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি বাজার উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি।

বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব

বিশ্ব অর্থনীতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু ইতিবাচক সংকেত দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল হওয়া, কিছু উন্নত অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কার্যক্রমের উন্নতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন দেশের বাজারেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।

সতর্কতার কথাও বলছেন বিশ্লেষকেরা

যদিও বাজারে আশাবাদের আবহ তৈরি হয়েছে, তবু বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

তাঁদের মতে, এক দিনের উত্থানকে বাজারের স্থায়ী পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। অতীতেও কয়েকবার বড় ধরনের উত্থান দেখা গেলেও পরে তা টেকসই হয়নি।

তাঁরা বলছেন, প্রকৃত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পেতে হলে অন্তত কয়েক সপ্তাহ বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সূচকের ধারাবাহিক অগ্রগতি, লেনদেনের স্থিতিশীল বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তবেই বাজারে আস্থা ফিরছে বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

একজন গবেষক বলেন, “বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। একটি দিনের উত্থান বিনিয়োগকারীদের মন ভালো করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন স্থায়ী ইতিবাচক প্রবণতা।”

সোমবারের দিকে নজর

সব মিলিয়ে রোববারের শক্তিশালী উত্থান দেশের পুঁজিবাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে সোমবারের লেনদেনের দিকে। বাজার কী এই গতি ধরে রাখতে পারবে, নাকি এটি ছিল সাময়িক উচ্ছ্বাস—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে আগামী কয়েকটি কার্যদিবসের মধ্যেই।

তবে একটি বিষয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে—দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারকে ঘিরে আবারও ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। আস্থার সংকটে ভোগা বাজারের জন্য এটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

সোমবারের বাজার তাই শুধু আরেকটি সাধারণ লেনদেন দিবস নয়; অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে এটি ভবিষ্যৎ প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দিন। বাজার যদি ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারে, তবে দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর