প্রকাশিত :  ০৯:৩৮
১৪ জুন ২০২৬

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর : ৬০০ ফুট আগুনের শিখা, পুড়ে যাওয়া হাজার কোটি টাকার সম্পদ—তবু মেলেনি ক্ষতিপূরণ

মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর : ৬০০ ফুট আগুনের শিখা, পুড়ে যাওয়া হাজার কোটি টাকার সম্পদ—তবু মেলেনি ক্ষতিপূরণ
সংগ্রাম দত্ত: ১৪ জুন এলেই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের মানুষের মনে ফিরে আসে এক দুঃসহ স্মৃতি। ১৯৯৭ সালের এই দিনে মাগুরছড়ার আকাশ চিরে উঠেছিল ভয়াবহ আগুনের শিখা। গভীর রাতে একটি গ্যাস অনুসন্ধান কূপে বিস্ফোরণের পর প্রায় ৬০০ ফুট উঁচু অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় শিল্প ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে মাগুরছড়া।
আজ সেই মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর। কিন্তু বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, বনভূমি ও রাষ্ট্র এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি অপূরণীয় ক্ষতি, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির এক অসমাপ্ত অধ্যায়।

যেখানে মাগুরছড়া
মাগুরছড়া পাহাড়ি এলাকা শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ—দুই উপজেলা শহর থেকেই প্রায় সমদূরত্বে, প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাগুরছড়া পাহাড়ি এলাকার বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে গেছে। সবুজ বনভূমি, টিলাঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং খাসিয়াসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতির কারণে এলাকাটি পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ বহন করে।

তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই পথ বহন করে দেশের অন্যতম বড় শিল্প ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের স্মৃতি। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত মাগুরছড়া গ্যাসকূপ এলাকা এখনো সেই ভয়াবহ ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আশার শুরু, বিপর্যয়ের পরিণতি
১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল অব বাংলাদেশ লিমিটেড। গ্যাসের সম্ভাবনাকে ঘিরে তখন আশাবাদী হয়ে ওঠেন কমলগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার মানুষ। অনেকেই মনে করেছিলেন, এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে।

কিন্তু সেই আশার স্থায়িত্ব ছিল অল্প সময়ের। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে ফুলবাড়ী চা-বাগানসংলগ্ন মাগুরছড়া গ্যাসকূপে খননকাজ চলাকালে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতায় খননের লক্ষ্য থাকলেও মাত্র ৮৪০ মিটার অগ্রসর হওয়ার পরই বিপর্যয় নেমে আসে।

১৫ দিন দাউদাউ আগুন, ছয় মাসে নিয়ন্ত্রণ
বিস্ফোরণের পর টানা ১৫ দিন ভয়াবহভাবে জ্বলতে থাকে আগুন। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল পরিস্থিতি আংশিক নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও পুরো কূপের আগুন নিভতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি কূপের মুখ সম্পূর্ণ সিল করা হয়।

তত দিনে আগুনে ধ্বংস হয়ে যায় বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, চা-বাগান, রেললাইন, সড়কপথ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং গ্যাস পাইপলাইন। মারা যায় অসংখ্য বন্যপ্রাণী ও পাখি। সবচেয়ে বড় আঘাত আসে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্যের ওপর, যার ক্ষত এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

পুড়ে যায় ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস
তেল-গ্যাস বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ডে ভূগর্ভস্থ প্রায় ২৪৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস আগুনে পুড়ে যায়। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি যোগ করলে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণা ও মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৯টি চা-বাগান, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৬৯ দশমিক ৫ হেক্টর এলাকায় ধ্বংস হয় ২৫ হাজার ৬৫০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ। বন বিভাগের হিসাবে বন ও পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ ৯ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ২ হাজার ফুট রেলপথ, সড়ক অবকাঠামো, বিদ্যুৎ লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন। ক্ষতির মুখে পড়েন খাসিয়া পানচাষিরাও। সরকারি তদন্তে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। তবে পরিবেশগত এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি প্রকৃতির
মাগুরছড়া বিস্ফোরণের সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে প্রকৃতির বুকে। পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের অংশ হিসেবে ঘোষিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের একটি বড় এলাকা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বননির্ভর জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রাকৃতিক বনের যে ক্ষতি হয়েছিল, তার প্রকৃত মূল্য অর্থের অঙ্কে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষতির প্রভাব এখনো দৃশ্যমান। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, বনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। তাঁদের মতে, প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

এখন কেমন আছে বিস্ফোরণের স্থান
মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর পরও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিস্ফোরণস্থল। গ্যাসকূপ এলাকার প্রবেশপথের গেটের ভেতরে এখন দেখা যায় অনেকটাই নিস্তব্ধ এক পরিবেশ। যে স্থান একসময় ৬০০ ফুট উঁচু অগ্নিশিখায় প্রকম্পিত হয়েছিল, আজ সেখানে প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব ফিরিয়ে এনেছে।
বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থলে তৈরি হয়েছে গর্ত বা পুকুরের মতো একটি চিহ্ন। চারপাশজুড়ে গড়ে উঠেছে ঝোপঝাড় ও ঘন সবুজ জঙ্গল। সময় প্রকৃতির ক্ষত কিছুটা ঢেকে দিলেও মাগুরছড়ার সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। স্থানটি আজও বহন করে দেশের অন্যতম বড় শিল্প ও পরিবেশগত দুর্যোগের নীরব সাক্ষ্য।

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, খননকাজে অবহেলা, অদক্ষতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। গ্যাসকূপ খননে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিলেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ব্যবহার করে অক্সিডেন্টাল নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতি ও রিগের বীমা দাবি আদায় করলেও বাংলাদেশ এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখনো ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও আইনি প্রচেষ্টা।

প্রতিবাদ এখনো থামেনি
মাগুরছড়ার আগুন নিভে গেছে বহু আগেই, কিন্তু প্রতিবাদের আগুন থামেনি। বিস্ফোরণের পর থেকেই স্থানীয় মানুষ ও বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন ক্ষতিপূরণ এবং জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। প্রতি বছর ১৪ জুন মানববন্ধন, সমাবেশ ও স্মরণ কর্মসূচির মাধ্যমে ট্র্যাজেডির স্মৃতি তুলে ধরা হয়।
এ বছরও ২৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় জনগণের জন্য গ্যাস সুবিধা নিশ্চিত করা।

মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়া পাহাড়ি এলাকার আদিবাসী নেতা ও গণমাধ্যমকর্মী সাজু মারছিয়াং বলেন, “মাগুরছড়া বিস্ফোরণ শুধু একটি গ্যাসকূপ দুর্ঘটনা ছিল না, এটি আমাদের বন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনের ওপর গভীর আঘাত। ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও প্রকৃতি কোনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়নি। আমরা চাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করুক এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নিক।”

প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে
মাগুরছড়া বিস্ফোরণের পর কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। নতুন প্রজন্মের অনেকেই সেই রাতের ভয়াবহ আগুন দেখেনি। কিন্তু লাউয়াছড়ার বন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্মৃতি এবং অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতি এখনো বহন করছে সেই বিপর্যয়ের সাক্ষ্য।

মাগুরছড়া আজ শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনার নাম নয়; এটি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ২৯ বছর পরও প্রশ্নটি রয়ে গেছে—হাজার কোটি টাকার সম্পদ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দায় কে নেবে? আর কবে মিলবে মাগুরছড়ার মানুষের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ?



Leave Your Comments




সারাদেশ এর আরও খবর