প্রকাশিত :  ১৯:০৯
১৩ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:০৫
১৩ জুন ২০২৬

শেষ রাতের আলো

শেষ রাতের আলো

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

ঢাকার নৈশ বাতাসের ঘ্রাণটা স্বতন্ত্র; কেমন এক পঙ্কিল, গুরুভার আর স্যাঁতসেঁতে আমেজ ছড়িয়ে থাকে। দিবসের রৌদ্রে এই নগরী মানুষকে পিষে ছিঁড়ে ফেলে—যেন এক দানবীয় কলের চাকা। রাত্রি গভীর হলে সেই অবক্ষয়িত যন্ত্রই উগরে দেয় কিছু জীবকে—ফুটপাতে, নর্দমার পঙ্কিল কিনারায়, উড়ালপথের পিলারের তলায়, রেললাইনের আঁধার গর্ভে। ওই আদিম অন্ধকারের কোনো নকশা নেই, কোনো দলিল-দস্তাবেজ নেই, নেই কোনো রাজকীয় আইনের স্পর্শ। ওই মানুষগুলো নাগরিক পদবাচ্য নয়—তারা কেবল নগ্ন জীবমাত্র। ফুসফুসে তাদের বিষাক্ত ধোঁয়া, জঠরে ডাস্টবিনের গলিত আবর্জনা।

ওই প্রাচীন অন্ধকার থেকেই সংগৃহীত এক জীর্ণ কঙ্কালসার সত্তা রেহানা। তাকে মানুষ বললে ভদ্রপল্লির সভ্য বাবুদের রুচিতে বাধবে; কারণ সমাজ তাকে মনুষ্যত্বের পরিধিতে স্থান দেয়নি। সমাজ তাকে ডাকে অন্য নামে—যেখানে মাংসের কেনাবেচা চলে কিন্তু আত্মার কোনো প্রয়োজন থাকে না। রেহানার বয়স কত? সে জানে না। ত্রিশ নাকি পঁয়ত্রিশ, কিংবা চল্লিশের কোটা পেরিয়ে গেছে! নিচুতলার মানুষদের জন্ম-মৃত্যুর কোনো লিখিত কাগজ থাকে না। ক্ষুধা আর অন্তহীন লাঞ্ছনা তার মুখের চামড়ায় এমন কুৎসিত আঁচড় কেটেছে যে, কুড়ির মেয়েকে দেখলে মনে হয় পঞ্চাশের জরাজীর্ণ বৃদ্ধা। কাল তার দেহের সমস্ত লাবণ্য ও রস শুষে নিয়েছে, অবশিষ্টাংশ কেবল খড়খড়ে হাড় আর ঝুলে পড়া কৃষ্ণবর্ণ চামড়ার কঙ্কাল।

সেদিন রাতের অন্ধকারেও রেহানা দাঁড়িয়েছিল মালিবাগ রেলগেটের পাশে। পৌষের শীতে আকাশ থেকে যে কুয়াশা নামছিল, তা দেখতে কুষ্ঠরোগীর ফ্যাকাশে গাত্রবর্ণের মতো বীভৎস। রাজপথের পীতবর্ণের বাতিগুলো যেন জ্বরাক্রান্ত কোনো রোগীর ঘোলাটে চোখ। গায়ে তার একখানা প্রাচীন পশমি শাল—বাতাসের দোলায় তার জীর্ণ তন্তুগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে উড়ছে। শালের অভ্যন্তরে তার শীর্ণ দেহটি কাঁপছিল। কিন্তু এই কম্পন কেবল পৌষের হিমের জন্য নয়—জঠরের শূন্য হাহাকার তাকে অধিক দগ্ধ করছিল।

প্রভাত থেকে এক কণা অন্নও তার উদরস্থ হয়নি। ক্ষুধা যখন দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্ব করে, তখন তা আর মাংসপেশির সামান্য তাগিদ থাকে না—মস্তিষ্কের কোষে এসে আসন পাতে এক নির্দয় সর্দার। তখন নীতি-দুর্নীতি, ইজ্জত-আব্রুর সূক্ষ্ম সুতাগুলো পাকস্থলীর তীব্র অম্লরসে গলে নিঃশেষ হয়ে যায়।

অপরাহ্ণে একটা লোক এসেছিল। অঙ্গে তার মধ্যবিত্তের ভদ্রতার কৃত্রিম চাদর, নয়নে লোভ ও ভয়ের এক দ্বান্দ্বিক খেলা। রেহানার মুখের দিকে চেয়ে সে তার জীর্ণ দেহটি কিছুক্ষণ মাপার চেষ্টা করল। রেহানা যখন নিজের মূল্য চাইল, ভদ্রলোকের সেই মেকি মুখোশটি পলকে খসে পড়ল। রাজপথে এক গেলা থুতু ফেলে সে হনহন করে চলে গেল। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাবার পর আর এক পুরুষ এল। কুয়াশার আঁধারে রেহানার গায়ের কটু গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে দীর্ঘক্ষণ ফিসফিস করল। অবশেষে বিরস গলায় বলে উঠল:

—তোর অঙ্গে আর আগের মতো রস নেই রে। গালে মাংস নেই, চামড়া ঝুলে পড়েছে।

লোকটি নিজের পথে চলে গেল। রেহানা কোনো প্রতিবাদ করল না। উত্তর দেওয়ার মতো আত্মসম্মান কিংবা শারীরিক শক্তি কোনোটিই আর অবশিষ্ট ছিল না। জীর্ণ ঝুপড়ির কোণে কোনো দর্পণ নেই—ফুটপাতের পঙ্কিল জলে সে নিজের কদর্য ছায়া দেখে। জানে, লোকটা মিথ্যা বলেনি। যৌবনের রস শহরের উত্তপ্ত পিচ আর দালালের চাবুক অনেক আগেই চুষে নিয়েছে। কাল তাকে অতি নিষ্ঠুর ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

রেহানার এই সামাজিক পতন কোনো আকস্মিক দৈব ঘটনা নয়—এটি যেন এক গাণিতিক নিয়তির ফল। একদা তারও এক ভিন্ন ঘর ছিল। মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরীর তীরে ছোট্ট গ্রামে ছিল তাদের গৃহ। মধ্যাহ্নে উঠানের তপ্ত রোদের গন্ধ গায়ে মেখে সে তার একমাত্র সন্তান রুবেলকে কোলে নিয়ে বসে থাকত। স্বামী ছিল পদ্মার এক সাধারণ মাঝি—কুবেরের মতোই সহজ ও সিধা মানুষ। সে নদীকে ভালোবাসত; পদ্মার তরঙ্গায়িত বুকের ওপর নৌকা ভাসিয়ে চলার আনন্দ ছাড়া জীবনে তার আর কোনো বাড়তি লালসা ছিল না।

কিন্তু পদ্মা যেমন জীবন দেয়, তেমনি ভাঙনে কেড়েও নেয়। এক বর্ষার রাতে উত্তাল ঢেউয়ে স্বামীর নৌকাটি তলিয়ে গেল। নদীর তলার পঙ্কিল মাটি যেখানে চিরকাল গোপন হয়ে থাকে, রেহানার ক্ষুদ্র সংসারটিও তেমনি এক মুহূর্তে তলিয়ে গেল কোনো অদৃশ্য গহ্বরে। পতির মৃত্যুর পর দেনার কুৎসিত তাগাদা, প্রতিবেশীর লোলুপ চোখ আর লাঞ্ছনা। জঠরের ক্ষুধা যখন মানুষের সমস্ত কৃত্রিম লজ্জা গ্রাস করে ফেলে, তখন কাল্পনিক ইজ্জতের চেয়ে এক মুঠো চালের দাম অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

একদিন দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় ঢাকায় ভালো কাজের লোভ দেখিয়ে তাকে নিয়ে এল। তারপর... আর মুন্সীগঞ্জে ফেরা হয়নি। ঢাকা শহর তাকে তার লোভের জাঁতাকলে পিষে ফেলল। সে বুঝতে পেরেছিল—এই শহরে সে কেবল এক জড় পুতুল, যার সুতো বাঁধা অদৃশ্য স্বার্থান্বেষীদের হাতে।

রেহানা এক দীর্ঘ ও উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। তার ফুসফুসের গরম বাতাস কুয়াশায় মিশে মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।

দূরে একটি জীর্ণ বাস এসে থামল। হেডলাইটের তীব্র আলো কুয়াশা চিরে মুহূর্তের জন্য চারপাশ স্পষ্ট করল। বাস থেকে নামল কয়েকজন যাত্রী। তাদের মধ্যে এক মাতাল টলতে টলতে রেললাইনের দিকে আসছিল। পরনে ঢিলেঢালা নোংরা প্যান্ট, গায়ে সস্তা জ্যাকেট। নিঃশ্বাসে সস্তা মদের গন্ধ।

লোকটা রেহানার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ দুটো লালচে-ঘোলাটে। রেহানার মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নেশার ঘোরে দৃষ্টি স্থির হচ্ছে না। এলোমেলো গলায় প্রশ্ন করল:

—যাবি?

রেহানা জড়সড় হয়ে গলা পরিষ্কার করে দাম বলল। সামান্য কয়েকটি টাকা—যাতে কালকের দিনটায় দুবেলা ভাত আর একটু ডাল জোটে।

দাম শুনে মাতালের ভেতরের পুরুষ-অহংকার জেগে উঠল। মাটিতে একটা থুতু ফেলল। তারপর কুৎসিত গলায় গালি দিয়ে উঠল:

—এই মাগী! তোর ওই জীর্ণ শরীরের দাম এত? আয়নায় মুখ দেখিস না? মরিস তো ক্ষুধায়, আবার ফুটানি দেখাস!

লোকটা টলতে টলতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার গালিগুলো কুয়াশায় ধ্বনিত হয়ে একসময় বিলীন হলো।

রেহানা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। চোখ দিয়ে জল পড়ল না। অশ্রুনালী শুকিয়ে গেছে অনাহারে। অপমান এখন আর নতুন কোনো ক্ষত তৈরি করে না—তা চামড়ার ওপর জমে থাকা ধুলোর মতো। হাত দিয়ে শালের ঝালরটা টেনে নিল।

রেহানা আবার দাঁড়িয়ে থাকল। রাত বাড়তে লাগল। শহর আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠল।

হাঁটতে হাঁটতে সে মগবাজার মোড়ের দিকে এগোচ্ছিল। শীতে ফুটপাতগুলো যেন খোলা কবর। চটের বস্তা, প্লাস্টিকের চাদর, খবরের কাগজ গায়ে দিয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছে কতগুলো মানুষ। নিঃশ্বাসের আওয়াজ কুয়াশার স্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তুলছিল।

হঠাৎ কানে এল মৃদু ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। বুড়ো মানুষের কান্না নয়—কোনো শিশুর অবরুদ্ধ কণ্ঠ। রেহানা থমকে দাঁড়াল।

ফ্লাইওভারের পিলারের গোড়ায়—যেখানে অন্ধকার সবচেয়ে ঘন—একটা ছেলে বসেছিল। বয়স দশ বা এগারো। ছেঁড়া কাঁথা গায়ে জড়িয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে। ছোট দেহটি শীতে আর আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে।

রেহানা প্রথমে চাইল চলে যেতে। এই শহরে অন্যের কান্নায় কান দেওয়ার ফুরসত নেই। নিজের পিঠের চামড়া বাঁচানোই যেখানে দায়, সেখানে পরের দুঃখের ভাগীদার হওয়া বোকামি। কিন্তু ভেতরের এক দমিত সত্তা তাকে টেনে ধরল। কান্নার সুরটা বড্ড চেনা। পনেরো-ষোলো বছর আগে রুবেল যখন সামান্য জ্বরে কাঁদত, তখন তার সুরটাও এমনই অবুঝ, অসহায় ছিল।

ধীরে ধীরে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভাঙা গলায় ডাকল:

—কাঁদিস কেন?

ছেলেটা চমকে মুখ তুলল। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় তার ছোট্ট মুখটি দেখা গেল। চোখ লাল হয়ে ফুলেছে, নাক দিয়ে জল পড়ছে। রেহানার ময়লা শাড়ি আর রুক্ষ চেহারা দেখে সে ভয় পেল না—বরং এক তীব্র আশায় আঁকড়ে ধরার মতো তাকাল। ফুঁপিয়ে বলল:

—মা অসুস্থ।

—কোথায় তোর মা?

ছেলেটা রাস্তার ওপাশে ফ্লাইওভারের তলার আইল্যান্ডের দিকে ইশারা করল। রেহানা রাস্তা পেরিয়ে গেল।

আইল্যান্ডের এক কোণে নোংরা প্লাস্টিকের বস্তার ওপর শুয়ে আছে এক নারী। গায়ে কোনো গরম কাপড় নেই—শুধু পাতলা সুতির শাড়ি। রেহানা কপালে হাত দিতেই চমকে উঠল। হাত যেন আগুনে পড়ল! জ্বরে দেহ পুড়ছে। নারীটি অচেতন, মুখে বিড়বিড় করছে—হয়তো প্রলাপ বকছে। পাশে ছেঁড়া প্লাস্টিকের ব্যাগ, ভেতরে খালি ঠোঙা আর এক বোতল জল।

—ডাক্তার দেখিয়েছিস? রেহানা ছেলেটার দিকে তাকাল।

ছেলেটা মাথা নাড়ল। চোখে অসহায়ত্বের চরম অন্ধকার। ভাঙা গলায় বলল:

—টাকা নেই।

রেহানা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। কুয়াশা যেন তার চিন্তাও জমিয়ে দিচ্ছে। নিজের পকেটে হাত দিল—আঙুলের ডগায় স্পর্শ পেল সেই জীর্ণ একশো টাকার নোটটি। এই টাকা তার আগামীকালের অস্তিত্বের চাবি। এটা দিয়ে দিলে কাল সে কী খাবে? কোথায় থাকবে?

কিন্তু এই মুহূর্তে মনের ভেতর এক অদ্ভুত বদল ঘটে গেল। সে যেন এই নোংরা ফুটপাতে শুয়ে থাকা নারীর জায়গায় নিজেকে দেখতে পেল—আর কাঁদতে থাকা ছেলেটার জায়গায় তার হারিয়ে যাওয়া রুবেলকে। পনেরো বছর আগে যখন রুবেলকে এক দালালের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম, তখনই সে (রুবেল) হারিয়ে গিয়েছিল। তখন রুবেলের বয়সও এমনই ছিল। সে কি বেঁচে আছে? নাকি কোনো রেললাইনের ধারে না খেতে পেয়ে মারা গেছে?

এক মা তার ছেলেকে হারালেও ভেতরের মাতৃত্ব কখনো হারায় না। এটা বড়ো কোনো নীতি নয়—এক অন্ধ সত্তা, যা যুক্তি বা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদকেও ছাড়িয়ে যায়।

রেহানা আর দ্বিধা করল না। পকেট থেকে হাত বের করে একশো টাকার নোটটি ছেলেটার হাতে গুঁজে দিল:

—ওষুধ কিনে আন।

ছেলেটা নোটের দিকে তাকাল। চোখে অবিশ্বাস—যেন কোনো স্বর্গের আলো দেখেছে। ফুটপাতের নোংরা রাতে, যেখানে সবাই শুধু লুট করতে জানে, সেখানে এক অচেনা নারী তাকে একশো টাকা দিয়ে দিচ্ছে—তা সে মেনে নিতে পারল না।

হঠাৎ ছেলেটা রেহানার নোংরা, রুক্ষ হাত দুটো ধরে ফেলল। তার চোখের জল রেহানার হাতের তালুতে এসে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল:

—আপা, আল্লাহ আপনার ভালো করুক।

ভালো?

কথাটা বুকের ভেতর এক মোচড় দিল। আল্লাহ কি এখনও তার মতো এক পতিতার জন্য কোনো ভালো কিছু রেখে দিয়েছেন? ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লিতে—এই ফুটপাতে তো কেবল অন্ধ হিংস্রতা আর ক্ষুধার রাজত্ব। যে সমাজ তাকে প্রতি মুহূর্তে জাহান্নামের কীট বলে ভাবে, সেই সমাজে তার কল্যাণ আছে কি? সে জানে না।

রাত আরও গাঢ় হলো। কুয়াশা ঘন হলো। শহরের আলো মিটমিটিয়ে নিভে যাওয়ার উপক্রম হলো। রেহানা হাঁটতে লাগল মগবাজারের দিকে।

হাঁটতে হাঁটতে দেখল—এক বুড়ো রিকশাওয়ালা ফুটপাতে বসে আছে। মুখ শুকিয়ে গেছে, শীতে কাঁপছে।

রেহানা কাছে গিয়ে বলল:

—কী হয়েছে চাচা?

বুড়ো বলল:

—সারাদিন কাজ নেই। কিছু খাইনি।

রেহানা আবার থামল।

পকেটে তখন বাকি মাত্র বিশ টাকা। সে জানত, এই টাকা দিলে নিজের জন্য আর কিছু থাকবে না। নিজের পেট ক্ষুধার তীব্র কামড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে আলো ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু মানুষের মন অদ্ভুত। যখন কোনো মানুষ সব হারিয়ে ফেলে, তখন তার আর হারানোর ভয় থাকে না।

সে জানত—এই বিশ টাকা দিলে কাল সকালে এক কাপ চা কেনার সামর্থ্যও থাকবে না। তবু দিল। বুড়োর হাতে বিশ টাকার নোটটি তুলে দিল।

লোকটার চোখ ভিজে উঠল। রেহানার মুখের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে বলল:

—মা, তুমি অনেক ভালো মানুষ।

ভালো মানুষ!

কথাটা শুনে রেহানার হাসি পেল—এক তিতকুটে হাসি। যে সমাজ তাকে সারা জীবন খারাপ বলেছে, সেই সমাজেরই এক ক্ষুধার্ত মানুষ তাকে ভালো বলছে। মানুষের বিচার অদ্ভুত! এই সামাজিক কাঠামোতে কার পাপ আর কার পুণ্য—তার কোনো ঠিক নেই। পরিচয় কি পেশা, নাকি ভেতরের মানুষটা? এই চরম কৌতুক তাকে হাসাল, কিন্তু সেই হাসির শব্দ কুয়াশায় মিলিয়ে গেল করুণ কান্নার মতো।

রাত প্রায় শেষ। আজ কোনো রোজগার নেই। পকেট খালি, পেট খালি, দেহ ক্লান্ত।

তবু অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতর এক তীব্র শান্তি। যেন অনেক দিন পর নিজেকে আবার মানুষ বলে মনে হচ্ছে। রেললাইনের পাশে বসে পড়ল। আকাশের দিকে তাকাল। কুয়াশার আড়ালে একটা তারা মিটমিট করছে।

মায়ের কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় মা বলত:

—মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখ। মানুষের দোয়া বড়ো জিনিস।

তখন বোঝেনি, আজ বুঝতে পারছে।

হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠল। সারাদিন না খেয়ে দেহ আর সহ্য করতে পারছিল না। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল—পারল না। পৃথিবীটা দুলে উঠল। তারপর সব অন্ধকার।

ফজরের আজান ভেসে এল। ঢাকা নতুন দিনের জন্য তৈরি হতে লাগল। বাস চলতে শুরু করল, চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ল, পত্রিকার হকার ছুটে চলল।

কিন্তু রেললাইনের ধারের সেই কোণটায় ছোট্ট একটা ভিড় জমেছে। এক নারী পড়ে আছে—নড়ছে না। লোকজন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে।

কেউ বলল:

—মনে হয় মরে গেছে।

আরেকজন বলল:

—কে জানে কে!

কেউ তার নাম জানে না, কেউ পরিচয় জানে না।

শুধু সেই ছেলেটা দৌড়ে এল—যার মায়ের জন্য রেহানা টাকা দিয়েছিল। সে রেহানাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল:

—আপা! আপা!

কোনো সাড়া নেই। রেহানা তখন অনেক দূরে চলে গেছে। যেখানে ক্ষুধা নেই, অপমান নেই, দালালের বেত নেই—রাতের অন্ধকার নেই।

ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে তার হাত ধরে বসে থাকল। লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। তারা জানত না—এই মৃত নারী রাতের শহরে ঘুরে বেড়ানো এক পতিতা ছিল। জানত না—মরার কয়েক ঘণ্টা আগে সে নিজের শেষ টাকাগুলো অন্যের জন্য বিলিয়ে দিয়ে গেছে। জানত না—সমাজ যাকে সবচেয়ে নিচে ফেলে রেখেছিল, সেই মানুষটাই হয়তো তাদের অনেকের চেয়ে বেশি ‘মানুষ’ ছিল।

সূর্য উঠতে লাগল। আলো ছড়িয়ে পড়ল শহরের ওপর। কিন্তু সেই আলো রেহানার জন্য নয়। তার জীবনে আলো খুব কমই এসেছিল। তবু মরার আগে এক রাতের জন্য সে আলো হয়ে উঠেছিল অন্য মানুষের জীবনে।

আর এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এটাই—যারা সারা জীবন আলো দেয়, তাদের নাম কেউ মনে রাখে না।

ঢাকার ব্যস্ত সকাল শুরু হয়ে গেল। মানুষ ছুটতে লাগল, গাড়ির হর্ন বাজল, জীবন এগিয়ে চলল। শুধু রেললাইনের ধারে পড়ে রইল এক অচেনা নারীর নিথর দেহ।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর