প্রকাশিত :  ১৩:০৫
১৩ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:১৫
১৩ জুন ২০২৬

বাজেট, পুঁজিবাজার ও আস্থার নতুন সমীকরণ

বাজেট, পুঁজিবাজার ও আস্থার নতুন সমীকরণ

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই বাজার কি কখনো প্রকৃত অর্থে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে, নাকি এটি বারবার স্বল্পমেয়াদি জল্পনা-কল্পনা ও আস্থাহীনতার চক্রে আবর্তিত হতে থাকবে? প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট এবং সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত পদক্ষেপ সেই প্রশ্নের নতুন উত্তর খোঁজার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আলোচনায় সাধারণত রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এবারের বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। শুধু করছাড় বা প্রণোদনার ঘোষণা নয়, বরং বাজারের কাঠামোগত সংস্কারকে সামনে রেখে যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা রয়েছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে পুঁজিবাজার তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে এই বাস্তবতার স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার যে নীতিগত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের করপোরেট খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশেষ করে আইপিও প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও সময়োপযোগী করার উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান এত দিন বাজারে আসতে অনাগ্রহী ছিল। তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ হলে বাজারে ভালো মানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে।

বাজেটে করপোরেট বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিল এবং সম্ভাব্য মিউনিসিপ্যাল বন্ডের মতো বিকল্প বিনিয়োগ উপকরণের প্রসঙ্গও এসেছে। একটি আধুনিক পুঁজিবাজার শুধু শেয়ারনির্ভর হতে পারে না। বিনিয়োগের বহুমাত্রিক সুযোগই বাজারকে গভীরতা ও স্থিতিশীলতা দেয়। সে বিবেচনায় এসব উদ্যোগ সময়োপযোগী।

অন্যদিকে পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দীর্ঘদিনের ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থার অবসান। সংকটকালে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে নেওয়া এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে তারল্য সংকট, মূল্য আবিষ্কারে প্রতিবন্ধকতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণ হয়ে উঠেছিল। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার এবং বাজারকে স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাজার অর্থনীতির মৌলিক দর্শনই হলো চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ।

স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তের পর কিছু শেয়ারের দরপতন ঘটেছে। তবে তা বাজারের দুর্বলতার চেয়ে বরং বাস্তব মূল্যায়নের প্রতিফলন। একটি সুস্থ বাজারে কৃত্রিম স্থিতিশীলতার চেয়ে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশও এখন সেই বাস্তবতাকে মেনে নিতে শুরু করেছেন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা। নতুন নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে, তা অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড কিংবা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বাজারের জন্য অপরিহার্য। কারণ পুঁজিবাজারে আস্থা সৃষ্টি হয় কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে, কেবল আশ্বাসের মাধ্যমে নয়।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট কখনো মূলধনের অভাব ছিল না; সংকট ছিল আস্থার। বহু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী অতীতে ক্ষতির অভিজ্ঞতা নিয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাই নতুন সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়, বরং তার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর।

রবিবারের বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যেতে পারে—এমন প্রত্যাশার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। বাজেট-পরবর্তী আশাবাদ, নীতিগত সংস্কারের ঘোষণা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎকে কোনো এক দিনের সূচক বৃদ্ধি বা লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা উচিত হবে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে আগামী মাস ও বছরগুলোতে।

অর্থনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও এখানে বিবেচনায় রাখতে হবে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি—সবকিছুই পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করবে। তাই অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস যেমন কাম্য নয়, তেমনি অযথা হতাশাও সমীচীন নয়।

একটি পরিণত পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এর জন্য প্রয়োজন নীতি-স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, স্বচ্ছ করপোরেট সংস্কৃতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা। এবারের বাজেট সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত সংস্কারগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং বাজার কতটা কার্যকরভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। কারণ পুঁজিবাজারের ইতিহাস আমাদের শেখায়—আশার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থার ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ওপর।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর