প্রকাশিত : ২১:০৯
১১ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৮
১২ জুন ২০২৬
✍️ ড. নাজমূল ইসলাম
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন আলো নিয়ে, আবার কিছু মানুষ আলো সৃষ্টি করেন। তাঁদের হাতে সূর্যের মতো কোনো দীপ্তি থাকে না; থাকে শব্দের প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলোয় তাঁরা মানুষের হৃদয়ের অন্ধকার কোণগুলো আলোকিত করেন, সময়ের ধুলোমাখা আয়নায় জীবনের প্রতিচ্ছবি আঁকেন এবং সাধারণ ঘটনাকে রূপ দেন অসাধারণ শিল্পে। রেজুয়ান আহম্মদ তেমনই একজন শব্দশিল্পী—যিনি প্রচারের উজ্জ্বল মঞ্চে নয়, বরং নিভৃত সৃজনের আঙিনায় দাঁড়িয়ে নির্মাণ করে চলেছেন এক অনন্য সাহিত্যভুবন।
বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত আকাশে তাঁর অবস্থান যেন এক নীরব নক্ষত্রের মতো। তিনি শোরগোল তোলেন না, নিজের পরিচিতিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেন না; বরং তাঁর সৃষ্টিই তাঁর হয়ে কথা বলে। তাঁর লেখার ভেতরে যে মানবিকতা, যে অনুভূতির গভীরতা এবং যে মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা প্রবাহিত হয়, তা পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করে।
রেজুয়ান আহম্মদের সাহিত্যযাত্রার সূচনা হয়েছিল এক স্বপ্নবিহারী তরুণের হাত ধরে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কলেজজীবনে লেখা তাঁর প্রথম গল্প ‘অভাগী’ ছিল কেবল একটি গল্প নয়; বরং এক সাহিত্যিক সত্তার প্রথম আত্মপ্রকাশ। সেই গল্পের পাতায় যে সংবেদনশীলতার বীজ রোপণ করা হয়েছিল, সময়ের প্রবাহে তা এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। জীবনের বাস্তবতা ও শিল্পসাধনার সমান্তরাল পথে চলতে চলতে তিনি যুক্ত হন দৃশ্যমাধ্যমের সঙ্গে। চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় এবং খুব দ্রুতই তাঁর প্রতিভা দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ‘ম্যারিজ স্টেশন’ নাটকের সাফল্য যেন তাঁর সৃজনশীল শক্তির প্রথম বড় স্বীকৃতি। এরপর একের পর এক নাটক মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো ছিল জীবন্ত, সংলাপগুলো ছিল হৃদয়ের ভাষা এবং গল্পগুলো ছিল মানুষের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু একজন সত্যিকারের শিল্পীর পরিচয় কখনো একক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না। রেজুয়ান আহম্মদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা গান—প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি রেখেছেন নিজের স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। তাঁর কলম যেন এক বহমান নদী, যা কখনো গল্পের প্রান্তর অতিক্রম করে, কখনো কবিতার বাগানে প্রবেশ করে, আবার কখনো সুরের সমুদ্রে গিয়ে মিশে যায়।
তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তিনি মানুষের বাহ্যিক পরিচয় দেখেন না; দেখেন তাদের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, প্রেম, বেদনা, সংগ্রাম ও সম্ভাবনাকে। তাঁর গল্পের চরিত্ররা কোনো কাল্পনিক জগতের বাসিন্দা নয়; বরং আমাদের চারপাশের মানুষ। সেই কারণেই তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে পাঠক নিজের জীবনকে খুঁজে পান, আবিষ্কার করেন নিজের হাসি-কান্না।
গীতিকার হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা গানগুলো কেবল সুরের জন্যই নয়, শব্দের সৌন্দর্যের কারণেও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তাঁর গানে প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে, জীবনদর্শন আছে; আবার আছে সময় সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। শব্দ ও সুরের এই মেলবন্ধন তাঁকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রিক পরিচয়।
তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ভাষার সৌন্দর্য। তিনি ভাষাকে অলঙ্কারে ভারাক্রান্ত করেন না, আবার একে অতিরিক্ত সরলও করে তোলেন না। তাঁর ভাষা নদীর জলের মতো—স্বচ্ছ, প্রবহমান এবং প্রাণস্পর্শী। পাঠক তাঁর লেখায় প্রবেশ করলে ভাষা আর কেবল ভাষা থাকে না; তা হয়ে ওঠে অনুভূতির এক জীবন্ত ভুবন।
‘এক মুঠো গল্প’, ‘সন্দেহের ছায়া’, ‘মায়াবী মুহূর্ত’, ‘শঙ্খের শপথ’, ‘শব্দে তুমি’, ‘আলোকচ্ছায়া’, ‘স্বপ্নের চাকরি’, ‘শেষ সূর্যের আলো’, ‘দ্য ডেজ অব গাজা’, ‘লাভ অব দ্য ফরেস্ট বার্ড’, ‘অপেক্ষার মায়া’ এবং ‘অজল নির্বাসন’—তাঁর প্রতিটি গ্রন্থ যেন একেকটি অভিজ্ঞতার দরজা। প্রতিটি বইয়ের ভেতরে রয়েছে জীবনকে নতুনভাবে দেখার এক অনন্য আমন্ত্রণ।
একজন লেখকের প্রকৃত সাফল্য তাঁর পুরস্কারে নয়, বরং পাঠকের হৃদয়ে। রেজুয়ান আহম্মদের অর্জনও সেখানেই। তিনি বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো পাঠকের ভালোবাসা ও বিশ্বাস। কারণ পাঠক জানে—এই লেখকের শব্দে কোনো কৃত্রিমতা নেই; আছে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি গভীর আস্থা।
আজকের সময়ে, যখন প্রচার অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিভার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে, তখন রেজুয়ান আহম্মদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—শিল্পের প্রকৃত শক্তি তার নীরবতায় নিহিত। একটি ভালো লেখা নিজেই নিজের পথ খুঁজে নেয়, একটি সত্যিকারের সৃষ্টি নিজগুণেই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়।
তিনি যেন এক নিভৃত বাগানের মালী। প্রতিদিন শব্দের বীজ বপন করেন, অনুভূতির জল দেন, অভিজ্ঞতার আলো দেন। আর সেই বাগান থেকে জন্ম নেয় গল্প, কবিতা, গান ও উপন্যাসের অসংখ্য ফুল। সময়ের বাতাসে তাদের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মন থেকে মনে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
বাংলা সাহিত্যের এই নিরহংকার সাধক তাঁর সৃষ্টিশীল যাত্রা অব্যাহত রাখুন—এই প্রত্যাশাই রইল। কারণ এমন লেখকেরা কেবল বই লেখেন না; বরং মানুষের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দেন, সমাজকে আরও মানবিক করে তোলেন এবং ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর হওয়ার স্বপ্ন দেখান।
রেজুয়ান আহম্মদ—একটি নাম নয়; এক নীরব সৃজনযাত্রার প্রতীক, এক অনিঃশেষ আলোকবর্তিকা, যিনি শব্দের মাধ্যমে মানুষের অন্তর্লোকের মানুষটিকেই নিরন্তর খুঁজে ফিরছেন।