প্রকাশিত : ১৯:১৩
১১ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৩২
১১ জুন ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
ঢাকা নিশুতি রাতেও ঘুমায় না—এ কথাটি মোটেও অসত্য নয়; বরং নিদ্রার প্রতি এই অতিমহানগরের যেন এক মজ্জাগত অনীহা। মালিবাগ মোড়টি রাত দুটোতেও জেগে থাকে, চোখ মেলে চেয়ে থাকে চারপাশের নিয়ন আলোর কোলাহলে। তখনো দূরপাল্লার যানের তীব্র হেডলাইটের আলোয় পিচঢালা কৃষ্ণবর্ণ রাজপথ ঝলমল করে। বাস, লরি, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা—কে কোন পানে ছুটছে, কে কাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট খতিয়ান নেই। উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে যখন গাড়িগুলো তীব্র বেগে ছুটে যায়, তখন মনে হয় যেন নিজ নিজ নীড়ে ফিরে যাওয়ার এক ব্যাকুল তাড়া রয়েছে তাদের মনে। কেউ ঘরে ফিরছে, কেউবা সস্তার হোটেলে, কেউ আবার রাতের শেষ চায়ের দোকানে আড্ডায় মগ্ন। কিন্তু উড়ালসড়কের নিচের নিষ্ঠুর আখ্যানগুলো ওই গতিময় যানের চালক কিংবা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরার যাত্রীদের কারও গন্তব্যের সীমানায় পড়ে না।
মগবাজার-মৌচাক-মালিবাগের এই উড়ালসড়কটি সুবিশাল, দৈর্ঘ্যে প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন একসময় সেই কংক্রিটের স্তম্ভগুলোর গায়ে ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্র এঁকেছিল। সেখানে স্থান পেয়েছিল রূপসী বাংলার নদী, পালতোলা নৌকা, মাছরাঙা ও লাল শাপলার রঙিন আলপনা। সকালবেলায় পথচারীরা কখনো কখনো সেখানে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে তা প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু রাত নামলেই ওই বর্ণিল চিত্রগুলো যেন ঢাকা শহরের কুয়াশা আর ধুলোর ধূসর আস্তরণে ম্লান হয়ে যায়। ফুটপাতের টিমটিমে আলো তখন বড্ড আবছা হয়ে আসে। সেই আবছা আলোতেই তখন সমবেত হয় একদল ভাগ্যহীন মানুষ, যাদের ঠিকানা নেই পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে, যাদের নাম লিপিবদ্ধ নেই রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক তালিকায়।
ওই জায়গাটি আমার খুব চেনা। বিশেষ করে ১৭ ও ১৮ নম্বর স্তম্ভের মাঝখানটায়, রেলগেটের ঠিক পাশেই ছিল করিম চাচার আস্তানা। এখানে দীর্ঘ সাতটি বছর কাটিয়েছিলেন তিনি।
করিম চাচার প্রকৃত বয়স কত, তা কে জানে? তিনি নিজেও তা সঠিকভাবে জানতেন না। কখনো বলতেন সত্তর, কখনোবা আশি। একবার এক শান্ত সন্ধ্যায় মিজান ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "চাচা, আপনার বয়স কত হবে?" তিনি আমার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বয়স গুনতে গুনতেই তো জীবন ফুরিয়ে যায়, বাবা।" কথাটা শুনে তখন ঠিক উপলব্ধি করতে পারিনি। পরে যখন তাঁর জীবনের পুরোনো গল্পগুলো শুনলাম, তখন বুঝতে আরও বেশি কষ্ট হলো।
নরসিংদীর মেঘনা নদীর পাড়ে অবস্থিত চরকান্দা গ্রাম। করিম চাচার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানেই। তাঁর বাবা ফজলু মিয়ার তিন বিঘা চাষের জমি ছিল। একটি টিনের ঘর, উঠোনে একটি বিশাল বটগাছের সুশীতল ছায়া আর গোয়ালে একটি বুড়ো গাভি—এই নিয়েই ছিল তাঁদের সাজানো সংসার। ছোটবেলায় করিম মেঘনা নদীর বুকে জাল ফেলতে যেতেন। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে নদীর ঠান্ডা জলে সাঁতার কেটে গোসল সেরে পরম তৃপ্তিতে মায়ের হাতের লাল আটার রুটি খেতেন। মা আয়েশা খাতুন মাটির চুলায় রুটি বানাতেন, আর বাবা বারান্দায় বসে আয়েশ করে হুকো টানতেন। সেসব সোনালি দিনের কথা বলার সময় বৃদ্ধ করিম চাচার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠত।
১৯৭১ সালে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছিল, করিম চাচার বয়স তখন মাত্র কুড়ি বছর। নিজের চোখে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখেছিলেন তিনি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একদিন গ্রামের সাতজন নিরীহ মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করেছিল। করিম চাচা তখন ভয়ে জানালা দিয়ে তা লুকিয়ে দেখেছিলেন। সেদিনের সেই দুঃসহ ভয় বহু বছর ধরে তাঁর মন থেকে কাটেনি। তারপর রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ছোটখাটো শান্ত স্বভাবের মেয়েটি হাসলে যেন চোখ মেলতেই পারত না। রাবেয়ার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল তাঁর নতুন এক যৌথ জীবন।
১৯৭৮ সালে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় বড় ছেলে জসিম। তারপর আসে মকবুল। তাঁদের আরেকটি কন্যাসন্তানও হয়েছিল—নাম রেখেছিলেন আয়েশা; কিন্তু মেয়েটি বেশি দিন বাঁচেনি। কন্যার অকালমৃত্যুর বেদনায় রাবেয়া দীর্ঘদিন স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে ছিলেন। করিম চাচা যখন সেসব ফেলে আসা দিনের গল্প বলতেন, তখন শূন্য দৃষ্টিতে দূরের আকাশপানে তাকিয়ে থাকতেন। তাঁর সেই দূরবর্তী চাউনিতেই বোঝা যেত, বুকের গভীরে তিনি আজও সেই তীব্র বেদনা সযতনে লুকিয়ে রেখেছেন।
১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার কথা অনেকেরই জানা। কিন্তু করিম চাচার জীবনে ওই বন্যা ছিল সর্বনাশের প্রথম সূচনা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে মেঘনার পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। প্রথমে গ্রামের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে গেল। বানভাসি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিতে লাগল উঁচু স্থানে। করিম চাচার ঘরটি তুলনামূলক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় তিনি ভেবেছিলেন এ যাত্রায় হয়তো বেঁচে যাবেন।
কিন্তু আগস্টের এক অন্ধকার রাতে প্রতিবেশী কালু মিয়া চিৎকার করে সতর্ক করল, "বাঁধ ভেঙে গেছে!" করিম চাচা চোখ মেলে দেখলেন, ঘরের মেঝের ওপর ততক্ষণে নদীর ঠান্ডা পানি খেলা করছে। রাবেয়া তড়িঘড়ি করে সন্তানদের জাগিয়ে তুললেন। দশ বছরের জসিম আর আট বছরের মকবুল তখনো বুঝতে পারছিল না চারপাশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বুকসম পানি পেরিয়ে করিম চাচা সবাইকে নিয়ে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে আশ্রয় নিলেন। পেছনে তখন কেবল ঘরবাড়ি ভাঙার মড়মড় শব্দ আর অসহায় মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ।
পরদিন সকালে আলো ফুটলে তিনি স্কুলের ছাদ থেকে দেখলেন, তাঁদের চেনা চরকান্দা গ্রামটি আর কোথাও নেই। যেখানে একসময় ঘরবাড়ি ছিল, সেখানে এখন কেবলই প্রমত্তা মেঘনার আগ্রাসী জলরাশি। কালু মিয়াসহ কয়েকজন তাদের ঘরের চালার ওপর কোনোমতে বসে ছিল। গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা আশ্রয়হীন মানুষগুলোর চোখে-মুখে তখন রাজ্যের শূন্যতা। করিম চাচা সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই প্রথমবার তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলেন, মেঘনা কেবল জীবনদায়ী নদীই নয়—কখনো কখনো তা অভিশাপও হয়ে উঠতে পারে।
বন্যার পানি কমতে কমতে প্রায় দুই মাস কেটে গেল। অক্টোবর মাসে নিজের জমিতে গিয়ে দেখলেন, চেনা জায়গাটি পলি জমে সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে গেছে। পলিমাটির সেই স্তূপে কী চাষ করবেন, তা ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারলেন না। কিছুদিন সরকারি ত্রাণের রুটি ও খিচুড়ির ওপর ভরসা করে কোনোমতে দিন অতিবাহিত করতে লাগলেন।
সময় বয়ে চলল। ২০০৪ সাল নাগাদ করিম চাচার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছিল। জসিম বড় হয়ে মোটরমিস্ত্রির কাজ শিখেছিল, আর মকবুল যুক্ত হয়েছিল পাটের ব্যবসায়। মেঘনা নদী তখন প্রতি বর্ষাতেই রাক্ষুসে রূপ নিয়ে পাড় ভেঙে চলেছিল। একে একে গ্রামের মানুষেরা সর্বস্ব হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়ছিল।
প্রথম ভাঙন ধরল কালু মিয়ার জমিতে। এক রাতের ব্যবধানে তার তিন বিঘা জমি নদীর পেটে চলে গেল। কালু মিয়া পাগলের মতো ছুটে এসে করিম চাচার বাড়িতে হাজির হলো, "করিম ভাই, দেখো আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল!" করিম চাচা স্তম্ভিত হয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। যেখানে কালুর জমিটুকু ছিল, সেখানে এখন কেবলই ঘূর্ণায়মান গভীর জলস্রোত। বাড়ি ফিরে এসে করিম চাচার মনে একটিই শঙ্কা জাগল—'আমার জমিটুকু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে তো?'
কিন্তু না, ভাগ্য তাঁর সহায় হলো না। ২০০৫ সালের বর্ষাকালে একদিন বিকেলে করিম চাচা নিজের ক্ষেতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ দেখলেন জমির এক কোণ ভেঙে ধসে পড়ছে। প্রথমে ধীরে, তারপর অত্যন্ত দ্রুতবেগে মাটির চাপ ধসে পড়তে লাগল। মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যেই তাঁর আধা বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। করিম চাচা তখনই বুঝতে পারলেন, তাঁর পৈতৃক ভিটেমাটির এবার শেষ বিদায়ের পালা। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রমত্তা মেঘনা তাঁর অবশিষ্ট দুই বিঘা জমিও গ্রাস করে নিল।
সেদিন রাতে শূন্যহাতে বাড়ি ফিরে রাবেয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তাঁর ছিল না। ঘরের কোণে চুপচাপ বসে কেবল ফুঁপিয়ে কাঁদলেন। রাবেয়া কাছে এসে মাথায় হাত রাখলে তিনি ডুকরে উঠলেন, "আমাদের জমি চলে গেছে রাবেয়া, আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।" সেদিন ওই সংসারে উনুন জ্বলেনি। অবুঝ জসিম ও মকবুল কিছু না বুঝেই ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমিয়ে পড়ল। করিম আর রাবেয়া সারা রাত ঘরের দাওয়ায় বসে রইলেন আর শুনতে লাগলেন সেই নদীর গর্জন—যে নদী তাঁদের জীবনের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে।
ভূমিহীন মানুষের জীবন তখন দিনমজুরিতে এসে ঠেকল। তবুও চরের মায়া ছাড়তে না পেরে করিম চাচা সেখানে থেকে গেলেন। প্রতিবেশীদের জমিতে মজুর খাটতেন। কিন্তু নদীভাঙনের ফলে চরে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাজের প্রতিযোগিতা বেড়ে গেল এবং শ্রমের মজুরিও অত্যন্ত কমে গেল।
২০০৬ সালে বড় ছেলে জসিম সিদ্ধান্ত নিল সে ঢাকায় চলে যাবে; মিরপুরের কোনো পোশাক কারখানায় একটা কাজ জুটিয়ে নেবে। করিম চাচা কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে কথাগুলো হারিয়ে গেল। "আব্বা, এখানে পড়ে থেকে কোনো ভবিষ্যৎ নেই," জসিম বলেছিল। করিম চাচা কেবল মাথা নেড়ে বললেন, "তোর যা ভালো মনে হয়, তা-ই কর, বাবা।"
জসিম চলে গেল, কিছুদিনের মধ্যে মকবুলও তার অনুগামী হলো। দুজনেই মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি পেল। প্রথম প্রথম তারা বাড়িতে নিয়ম করে কিছু টাকা পাঠাত। তারপর একসময় মিরপুরের এক নোংরা বস্তিতে ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে তারা স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করল। করিম চাচা তখনও চরের মাটিতেই পড়েছিলেন। ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর রাবেয়া মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ঝড়ে ঘরের চাল উড়ে গিয়েছিল, আর বৃষ্টির লোনা পানিতে ভিজে রাবেয়ার শরীরে যে জ্বর বসেছিল, তা আর কিছুতেই কমছিল না। প্রত্যন্ত চরে কোনো সুচিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। নিরুপায় করিম চাচা রাবেয়াকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে বললেন, "তীব্র নিউমোনিয়া। এখনই ভর্তি করাতে হবে।" তিন দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পর চতুর্থ দিন সকালে করিম চাচা দেখলেন রাবেয়ার চোখ দুটো অর্ধনিমীলিত, শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত দ্রুত ও ভারী। ডাক্তার সাহেব এসে গম্ভীর মুখে জানালেন, "খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন।" দুপুরের দিকে রাবেয়া তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। করিম চাচা কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে তাঁর তিরিশ বছরের জীবনসঙ্গিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাসপাতালের করিডোর কাঁপিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন, "কেন আমাকে এভাবে ছেড়ে চলে গেলি! তোকে নিয়ে তো সারাটা জীবন শুধু কষ্টই করে গেলাম রে!"
নার্সরা এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু করিম চাচা কেবল মাথা নিচু করে নীরবে অশ্রুবিসর্জন করতে লাগলেন। তিরিশ বছরের সুখ-দুঃখের সংসার, একসঙ্গে কাটানো বৈচিত্র্যময় দিনগুলো—সব এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
স্ত্রী রাবেয়ার মৃত্যুর পর করিম চাচা আর চরের শূন্য ভিটেয় টিকতে পারলেন না। ছেলেরা ঢাকা থেকে খবর পাঠাল, "আব্বা, একা একা চরে কষ্ট করার দরকার নেই, ঢাকায় চলে আসেন।" ২০০৮ সালে তিনি মিরপুরের ওই ঘিঞ্জি বস্তিতে এসে উঠলেন। ঘরটি ছিল মাত্র একশো বর্গফুটের এক চিলতে জায়গা। জসিম, মকবুল আর করিম চাচা—তিনজন পুরুষ সেখানে গাদাগাদি করে থাকতেন। শুরুর দিকে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। করিম চাচা ঘরের রান্না করতেন, ঘর গুছিয়ে রাখতেন।
পরের বছরই জসিমের বিয়ে হলো নড়াইলের জায়েদা নামের এক মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটি শুরুতে শান্ত স্বভাবের হলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুরের প্রতি তার মনে একরাশ বিরক্তি জমে উঠল। "এত বুড়ো একটা মানুষকে নিয়ে আমি এই ছোট্ট ঘরে কী করব?"—এই নিয়ে সংসারে প্রতিনিয়ত অশান্তি শুরু হলো। দিনভর চলত শাশুড়িহীন সংসারের খিটমিট। একদিন জায়েদা সরাসরি জসিমকে জানিয়ে দিল, "তোমার বাবা এই বাড়ি থেকে না গেলে আমিই বাপের বাড়ি চলে যাব।" জসিম স্ত্রীর এমন চরম কথার মুখে সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে রইল। করিম চাচা আড়াল থেকে সব শুনতেন। রাতে ঘুমানোর সময় চোখের জল লুকাতে কাঁথার নিচে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন।
মকবুলও তখন বিয়ের বয়সে উপনীত হয়েছে। করিম চাচা গভীরভাবে বুঝতে পারলেন, এই সংসারে তিনি এখন এক বিরাট বোঝা ছাড়া আর কিছুই নন। ২০০৯ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ছেলেদের আর কোনো কষ্ট দেবেন না। সেদিন সবার আগে ঘুম থেকে উঠে রান্না শেষ করলেন, ঘরদোর পরিষ্কার করে জসিমকে ডেকে বললেন, "ওরে জসিম, আমি চলে যাচ্ছি।"
জসিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কোথায় যাচ্ছেন, আব্বা?"
"যেদিকে চোখ যায় চলে যাব। তোরা আমার জন্য কোনো চিন্তা করিস না।"
জায়েদা পেছন থেকে কর্কশ গলায় বলল, "যাবেন তো যান, আমাদের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।"
করিম চাচা চোখ নামিয়ে নিলেন। একটি পুরোনো প্লাস্টিকের ব্যাগে দুটো জীর্ণ জামা, একটি ছেঁড়া কম্বল আর রাবেয়ার সেই বিয়ের ভাঙা ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা গুছিয়ে নিলেন। শেষবারের মতো ছেলেদের দিকে তাকালেন। মকবুল তখন ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। করিম চাচা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, "কেঁদো না বাপ। বেঁচে থাকলে কোনো একদিন আবার দেখা হবে।"
বস্তি ছেড়ে বেরিয়ে করিম চাচা সেদিন সারা দিন উদ্দেশ্যহীনভাবে ঢাকার পথে পথে ঘুরলেন। কোথায় যাবেন, কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলবে—কিছুই তাঁর জানা ছিল না। বিকেলের দিকে ক্লান্ত শরীরে তিনি এসে পড়লেন মালিবাগ মোড়ে। উড়ালসড়কের নিচের ফুটপাতটি ছিল একদল ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয়স্থল। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল কয়েকজন গৃহহীন মানুষ—একটি মাদকাসক্ত তরুণ, এক উন্মাদ বৃদ্ধা আর একজন পঙ্গু লোক। করিম চাচা জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা, এখানে কি একটু থাকা যাবে?"
পঙ্গু লোকটা উদাসীন গলায় বলল, "যেখানে এই দুনিয়ার সব আশ্রয়হীন মানুষের ঠাঁই হয়, সেখানে তোমারও একটা গতি হয়ে যাবে।"
সেদিন রাতেই ফুটপাতে শুয়ে পড়লেন করিম চাচা। প্রথম রাতে তাঁর চোখে কোনো ঘুম আসেনি। মেঘনা নদীর চিরচেনা কলকল ধ্বনির পরিবর্তে কানে আসছিল যান্ত্রিক হর্ণের কর্কশ আওয়াজ আর গাড়ির অবিশ্রান্ত গর্জন। উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে ভারী বাস-ট্রাক চলে গেলে পুরো কংক্রিটের কাঠামোটি কেঁপে উঠত, মনে হতো যেন তীব্র ভূমিকম্প হচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, প্রকৃতির রুদ্র রূপের চেয়েও এই নগরী কত বেশি ভয়ংকর ও নির্মম!
এভাবে কেটে গেল দীর্ঘ সাতটি বছর। করিম চাচা ওই ফুটপাতেই রয়ে গেলেন। শীতের রাতে ঘন কুয়াশায় তাঁর গায়ের কম্বল ভিজে যেত, বর্ষায় উড়ালসড়কের জোড়াতালি দিয়ে নোংরা পানি চুঁইয়ে পড়ত, আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে নিচের পিচ গলে তপ্ত উনুন হয়ে উঠত। তবুও তিনি এই স্থান ছাড়েননি। কারণ, এই যান্ত্রিক শহরের এই ধূলিধূসরিত কোণটিই তখন ছিল তাঁর একমাত্র ঠিকানা।
স্থানীয় চায়ের দোকানদার মিজান ভাই দয়াপরবশ হয়ে কখনো কখনো এক কাপ গরম চা দিতেন। পাশের বেকারির সোহেল বাসি বা ভাঙা রুটিগুলো ফেলে না দিয়ে করিম চাচার হাতে তুলে দিতেন। মালিবাগ মোড়ের মসজিদের ইমাম সাহেব মাঝে মাঝে শুক্রবারের খাবারের প্যাকেট দিতেন।
কিন্তু রাজপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া অধিকাংশ ব্যস্ত পথচারী করিম চাচাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেত। কেউ স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকত, কেউবা নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় অন্ধ। কেউ কেউ তাঁর দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকাত, কেউ বা দুর্গন্ধে নাক সিটকিয়ে দ্রুত পা চালাত। কখনো কখনো কেউ অবহেলাভরে একটা পাঁচ বা দশ টাকার মুদ্রা তাঁর দিকে ছুড়ে মারত। করিম চাচা সেই কয়েনগুলো সযতনে জমিয়ে রাখতেন; তা দিয়ে কখনো শুকনো রুটি কিনে খেতেন, আর কখনোবা ভবিষ্যতের কোনো কঠিন দিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখতেন।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা ছিল তাঁর সন্তানদের নীরবতা। করিম চাচা মনে মনে বিশ্বাস করতেন, একদিন তাঁর ছেলেরা নিশ্চয়ই ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে। কোনো একদিন জসিম ফোন করে বলবে—"আব্বা, আপনি কোথায় আছেন? আসেন, বাড়ি ফিরে যাই।" কিন্তু কোনো দিন কোনো ফোন আসেনি। একদিন প্রচণ্ড আকুলতায় তিনি নিজেই একটি দোকান থেকে জসিমের নম্বরে ফোন করেছিলেন। প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতেই যান্ত্রিক কণ্ঠ জানিয়ে দিল—"নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।" করিম চাচা সেদিন চূড়ান্তভাবে বুঝতে পারলেন, ছেলেরা তাঁকে চিরতরে মুছে ফেলেছে।
এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা তিনি কখনো কাউকে বুঝতে দেননি। শুধু রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে যখন মালিবাগ মোড়ের ফুটপাত ঘুমিয়ে পড়ত, তখন তিনি নীরবে চোখের জল মুছতেন। মানুষের চোখের জল কি কখনো শেষ হয়? না, কখনো শেষ হয় না।
ফুটপাতে করিম চাচারও কিছু সঙ্গী জুটেছিল। যেমন আমেনা—সবাই তাকে 'পাগলি' বলে ডাকত, কিন্তু করিম চাচা তাকে কখনো এই নামে ডাকেননি। একবার প্রচণ্ড শীতে আমেনার কোনো কম্বল ছিল না দেখে করিম চাচা নিজের একমাত্র জীর্ণ কম্বলটি ছিঁড়ে তাকে অর্ধেক দিয়ে দিয়েছিলেন। আমেনা সেদিন অবুঝ শিশুর মতো কেঁদে উঠে বলেছিল, "তুই আমার নিজের ভাইয়ের মতো রে।"
ইউসুফ নামের পঙ্গু যুবকটি ছিল তাঁর আরেক বন্ধু, যে হাত দিয়ে ঠেলে তিন চাকার ভ্যানগাড়ি চালাত। সে প্রায়ই রসিকতা করে বলত, "কাকু, তুমি তো একদিন এই ফুটপাতে ধুঁকে ধুঁকে মরবা। তারপর পুলিশ এসে তোমার বেওয়ারিশ লাশ মর্গে নিয়ে যাবে। কেউ তোমার জন্য এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলবে না।" করিম চাচা তাঁর ফোকলা দাঁতে মলিন হেসে বলতেন, "তা তো হবেই রে। কিন্তু তুই কি আমার জন্য একটুও কাঁদবি না?" ইউসুফ মুখ ঘুরিয়ে বলত, "আমি কাঁদতে যাব কেন? বল তো শুনি?"
এই কৃত্রিম হাসিখুশিই ছিল তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কারণ, কান্নার ভার সহ্য করার শক্তি তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না।
সেখানে একটি কালো রঙের কুকুরও থাকত, করিম চাচা আদর করে তার নাম দিয়েছিলেন 'কালু'। কালু প্রতি রাতে তাঁর পায়ের কাছে এসে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকত। করিম চাচা নিজের বাসি রুটির অর্ধেকটা কালুকে দিতেন। মানুষের চেয়ে ওই অবলা প্রাণীটিই যেন তাঁর প্রতি বেশি বিশ্বস্ততা ও ভালোবাসা দেখাত। করিম চাচা কালুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, "দেখ কালু, এই দুনিয়ায় তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই।" কালু প্রত্যুত্তরে লেজ নেড়ে তাঁর হাত চাটত।
২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর, এক হাড়কাঁপানো শনিবার। সকাল থেকেই আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা ছিল। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সেদিন তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ফুটপাতের ছিন্নমূল মানুষদের জন্য এই তীব্র শীত ছিল অত্যন্ত প্রাণঘাতী।
করিম চাচা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন তাঁর ছেঁড়া কম্বলটি কুয়াশার পানিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। ভোরে উঠে কোনোমতে ঠান্ডা পানিতে অজু করে মালিবাগ মোড়ের মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। তারপর কাঁপতে কাঁপতে মিজান ভাইয়ের দোকানে গিয়ে এক কাপ চা চাইলেন। মিজান ভাই গরম চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, "কী খবর চাচা, এই শীতে বেঁচে আছ তো?" করিম চাচা মৃদু হেসে বললেন, "আল্লাহর রহমতে এখনো টেনেটুনে বেঁচে আছি, বাবা।"
সেদিন সকাল থেকেই তাঁর শরীরটা মোটেও ভালো ছিল না। বুকে ঘন কফ জমেছিল, অনবরত কাশি হচ্ছিল আর শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল। ফুটপাতে এসে দেয়াল ঘেঁষে বসলেন তিনি। কালু তাঁর পাশে এসে বসলে, অত্যন্ত দুর্বল হাতে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।
দুপুরের দিকে ক্ষুধার তীব্রতায় পেটে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া শুরু হলো। আগের দিন রাতেও কিছু খাননি, সকালেও পেটে এক ফোঁটা পানি ছাড়া আর কিছু পড়েনি। মসজিদ থেকে পাওয়া একমুঠো বাসি ভাতই ছিল তাঁর শেষ আহার। ক্ষুধার এই তীব্র যন্ত্রণা—সাতটি বছর ধরে সহ্য করলেও, প্রতিবারই তা নতুন ও সমানভাবে কষ্টদায়ক মনে হতো।
করিম চাচা ভাবলেন, বেঁচে থাকতে হলে আজ কিছু একটা জোগাড় করতেই হবে। পকেটে কোনো টাকা নেই। গত সপ্তাহে এক দয়ালু পথচারী পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিল, সে টাকা দিয়ে কয়েক বেলা রুটি কিনে খাওয়ার পর এখন হাত একেবারেই খালি। মালিবাগ মোড়ের 'শাহী বিরিয়ানি হাউস' থেকে ভেসে আসা কাচ্চির সুবাস তাঁর ক্ষুধার তীব্রতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
বিরিয়ানি হাউসের ক্যাশ কাউন্টারে বসা যুবকটির নাম পরশ। পরিপাটি পোশাক আর কবজিতে চকচকে দামি ঘড়ি। করিম চাচা অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে গিয়ে দাঁড়ালেন, "বাবা, একটু খাবারের ব্যবস্থা করবা? দুই দিন ধরে পেটে কিছু পড়ে নাই।"
পরশ স্ক্রিন থেকে মাথা না তুলেই রুক্ষ সুরে বলল, "যান সামনে যান, এখানে কোনো ভিক্ষা দেওয়া হয় না।"
করিম চাচা একটু বিনীত হয়ে বললেন, "আমি তো ভিক্ষা চাই না বাবা। আমাকে হোটেলের কোনো কাজ দাও, বিনিময়ে শুধু একটু ভাত খেতে দিয়ো।"
পরশ এবার মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে তখন চরম অবজ্ঞা ও বিরক্তি। সে বলল, "কাজ? তোর এই জরাজীর্ণ শরীরে কাজ করার কী শক্তি আছে? গা থেকে ভ্যাপসা পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। যা এখান থেকে, কাস্টমার পালাবে।"
করিম চাচা অপমানিত বোধ করে মাথা নিচু করে ফিরে এলেন। তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এই নির্মম শহরে অপমানের চেয়ে বড় কোনো পাওনা নেই তাঁর মতো মানুষের।
বিকেলের দিকে করিম চাচা ফুটপাতে নিস্পৃহ হয়ে বসে রইলেন। চারপাশের কোলাহলময় পৃথিবীর মানুষগুলো তাঁকে একপ্রকার অদৃশ্য মানবের মতোই এড়িয়ে চলে গেল। রাস্তার ওপাশে একটি বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল। একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নামলেন, যাঁর হাতে ছিল শপিং ব্যাগ। অসাবধানতাবশত তাঁর ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট দামি বিদেশি চকলেট রাস্তায় পড়ে গেল। ভদ্রলোক খেয়াল না করেই চলে গেলেন। করিম চাচা দেখলেন, একটি নোংরা কুকুর এসে প্যাকেটটি শুঁকে চলে গেল, আর এক পথশিশু এসে প্যাকেটটি কুড়িয়ে নিয়ে চকলেটের অবশিষ্টাংশ ছুড়ে ফেলে দিল। করিম চাচা শূন্য চোখে তাকিয়ে ভাবলেন, এই শহরে যেখানে খাবারের এত অপচয় হয়, সেখানে তাঁর পেটে জ্বলছে এক হাহাকার ভরা ক্ষুধার আগুন।
বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁর কাশির বেগ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেল। এক তীব্র কাশির দমকে ফুসফুস ছিঁড়ে যেন এক দলা রক্ত বেরিয়ে এল। করিম চাচা তাঁর ময়লা চাদরের কোণ দিয়ে তা মুছে নিলেন। এই দৃশ্য দেখার মতো বা তাঁর খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ পাশে ছিল না।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তার স্ট্রিটলাইটগুলো জ্বলে উঠল। উড়ালসড়কের ওপর যানবাহনের ভিড় ও হর্ণের তীব্রতা বেড়ে গেল। সবাই কাজ শেষে উষ্ণ ঘরে ফিরছে, রাতের খাবারের আয়োজন করছে। এক দয়ালু পথচারী করিম চাচার বাড়িয়ে দেওয়া কাঁপানো হাতের মুঠোয় একটি পাঁচ টাকার কয়েন গুঁজে দিয়ে গেল। করিম চাচা টাকাটি নিলেন এবং একটি রুটির দোকান খুঁজলেন—কিন্তু ততক্ষণে আশপাশের সব সস্তা দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি ভাবলেন, কাল সকালে এই পাঁচ টাকা দিয়ে একটি রুটি কিনে খাওয়া যাবে। কিন্তু সেই সকাল তাঁর জীবনে আর কোনো দিন আসেনি।
রাত যত গভীর হতে লাগল, করিম চাচার শারীরিক অবস্থার ততই দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকল। পেটে তীব্র মোচড়, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা আর বুকের ভেতর মনে হলো যেন কোনো ভারী পাথর চেপে বসে আছে। পাশে বসা ইউসুফকে অতি কষ্টে বললেন, "ইউসুফ রে, আমার শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে।" ইউসুফ বলল, "হাসপাতালে যাও না কেন, চাচা?" করিম চাচা মৃদু হেসে বললেন, "হাসপাতালে যাব কোন টাকা দিয়ে রে বাবা? আমাদের মতো মানুষের জন্য এই ফুটপাতই হাসপাতাল।"
রাত এগারোটা নাগাদ ফুটপাতের ছিন্নমূল মানুষগুলো প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এমন সময় দূর থেকে এক তরুণ হেঁটে আসছিল—পরনে জিন্স আর হুডি, কাঁধে একটি ব্যাগ। কাছে এসে করিম চাচার জরাজীর্ণ দশা দেখে সে থমকে দাঁড়াল। অত্যন্ত মানবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "চাচা, আপনার কি কোনো সমস্যা হয়েছে?"
করিম চাচা করুণ চোখে তাকিয়ে বললেন, "বাবা... একটু খাবার দিবি? বড্ড ক্ষিধা লেগেছে।"
তরুণটি কাছে এসে দেখল বৃদ্ধের শরীর তীব্র জ্বরে কাঁপছে এবং চোখ-মুখ কোটরে ঢুকে গেছে। তার মনে এক গভীর মায়ার উদ্রেক হলো। নিজের পকেটে হাত দিয়ে দেখল মাত্র পঁয়তাল্লিশ টাকা অবশিষ্ট আছে, যা তাঁর আগামীকালের বাসের ভাড়া। তবুও সে নিজের পকেট খালি করে কুড়ি টাকা দিয়ে দুটি শুকনো রুটি আর একটি কলা কিনে এনে বৃদ্ধের হাতে দিল, "নিন চাচা, খেয়ে নিন।"
করিম চাচা কাঁপতে কাঁপতে রুটির একটি টুকরো মুখে দিলেন এবং অতি কষ্টে গিললেন। কিন্তু তাঁর দুর্বল শরীর সেই খাবার গ্রহণ করতে পারল না; পরক্ষণেই পেটের সমস্ত নাড়িভুঁড়ি উল্টে বমি হয়ে গেল। তরুণটি ঘাবড়ে গিয়ে বলল, "চাচা, আমি কি কোনো অ্যাম্বুলেন্স ডাকব?"
করিম চাচা অস্ফুটে বললেন, "না বাবা, তার আর প্রয়োজন নেই। আমাকে শুধু একটু পানি দাও।"
তরুণটি দৌড়ে গিয়ে এক বোতল পানি এনে তাঁর মুখে ধরল। করিম চাচা এক চুমুক পানি পান করলেন এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রুর ধারা গড়িয়ে পড়ল। তরুণের হাতটি শক্ত করে ধরে বললেন, "আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক, বাবা।"
তরুণটি নরম গলায় বলল, "আমি এখন আসি চাচা, আগামীকাল সকালে আবার আপনার খোঁজ নিতে আসব।" করিম চাচা বিদায়ের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। এটাই ছিল তাঁর শেষ দেখা কোনো মানুষের মুখ।
রাত একটা, দুইটা, তিনটা বেজে গেল। উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে গাড়ির সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। পাশের রেললাইন দিয়ে একটি মালগাড়ি কর্কশ শব্দে চলে গেল। করিম চাচার চোখ দুটো তখন অর্ধনিমীলিত। তিনি এক তীব্র ঘোরের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন।
স্বপ্নে তিনি দেখলেন—মেঘনার শান্ত পাড়, তাঁদের সেই ছোট্ট টিনের ঘর, উঠোনে রাবেয়া মিষ্টি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। জসিম তখনো ছোট শিশু, ধূলিময় উঠোনে লাঠিম ঘোরাচ্ছে, আর মকবুল একটি ছোট পাখি ধরে এনে আনন্দের আতিশয্যে নাচছে। চারদিকে কেবল সবুজ ধানের ক্ষেত আর সোনালি রোদের খেলা। করিম চাচা স্বপ্নে ছুটে গিয়ে রাবেয়াকে জড়িয়ে ধরলেন। রাবেয়া অভিমানের সুরে বলল, "আজ বাড়ি ফিরতে এত দেরি করলে কেন?" তিনি হেসে বললেন, "এই তো আমি চলে এসেছি, রাবেয়া।"
স্বপ্নটি তখনো তাঁর মনের গভীরে বহমান ছিল। কিন্তু এক তীব্র শীতের কামড়ে হঠাৎ তাঁর চোখ খুলে গেল। কোথায় মেঘনা? কোথায় রাবেয়া? চোখের সামনে ভেসে উঠল কেবল পিচঢালা কালো ফুটপাত, ময়লা কালির দাগ লেগে থাকা ভেজা কম্বল আর দূরের নিয়ন আলোর আবছা রশ্মি। করিম চাচার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। কিন্তু কৃত্রিম আলোর এই যান্ত্রিক শহরে তারা দেখা যায় না; ঢাকার আকাশ চিরকালই এক ধূসর ও নিস্পৃহ চাদরে ঢাকা।
তিনি চিৎকার করে কাঁদতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তাঁর হাত-পা সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে গেছে, শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত দ্রুত ও বুকের ভেতর এক মরণঘণ্টার শব্দ। করিম চাচা বুঝতে পারলেন তাঁর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি মৃত্যুকে কখনো ভয় পাননি; তাঁর ভয় ছিল কেবল এই নিদারুণ একাকিত্বে শেষ বিদায় নেওয়ার। মৃত্যুর এই শেষ মুহূর্তে পাশে কেউ নেই, হাতটি ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ নেই—এই হাহাকার তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
রাত চারটার দিকে বিশ্বস্ত কুকুর কালু এসে করিম চাচার পাশে বসল। সে তাঁর ঠান্ডা পায়ের ওপর নিজের মাথাটি রেখে অবলা শরীরের সামান্য উষ্ণতাটুকু বিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। করিম চাচা অতি কষ্টে তাঁর অসাড় হাতটি কালুর পিঠে রাখলেন। কুকুরটি বড় বড় চোখে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন সেও বুঝতে পারছিল তাঁর পরম বন্ধুর চলে যাওয়ার সময় উপস্থিত।
ভোরের আজানের ঠিক কিছু সময় আগে, যখন পূর্ব আকাশে ভোরের প্রথম আলোর আভা ফুটে উঠছিল, করিম চাচা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর চোখ দুটো অর্ধেক খোলা রইল, হাতের মুঠোটি শক্ত করে ধরা আর জরাজীর্ণ মুখে এক পরম শান্তির আভা খেলা করতে লাগল। কালু কুকুরটি হয়তো বুঝতে পেরেছিল তাঁর প্রিয় মানুষটি আর নেই; সে নিজের দুই পা মাথায় ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে কেঁদে উঠল—কিন্তু মানুষের মতো বিলাপ করার ভাষা তো সৃষ্টিকর্তা তাকে দেননি।
ভোরের আলো ফুটে উঠল। মালিবাগ মোড়ে আবার শুরু হলো প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা। চায়ের দোকানগুলোর ঝাঁপ খুলল, পথচারীরা কাজে বেরোল, ট্রাফিক পুলিশ এসে রাস্তায় দাঁড়াল। কেউ কেউ করিম চাচার নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে দেখল—এক বৃদ্ধ ফুটপাতে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কেউ কেউ ভয়ে এড়িয়ে গেল, আর কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে পুলিশে খবর দিল।
সকাল সাড়ে সাতটায় পুলিশের একটি ভ্যান এসে থামল। পুলিশ কর্মকর্তা লাশটি পরীক্ষা করে প্রাথমিক সুরতহালে লিখলেন—শীত ও ক্ষুধাজনিত কারণে মৃত্যু। লাশটি একটি সস্তা প্লাস্টিকের চাদরে মুড়িয়ে ভ্যানের পেছনে তুলে নেওয়া হলো। কালু তখনও নিথর পায়ের কাছে বসে ছিল; পুলিশ তাকে লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দিল। ভ্যানটি সাইরেন বাজিয়ে চলে গেল।
পরে জানা গেল, করিম চাচার লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় দাফন করা হয়েছে। তাঁর দুই ছেলে জসিম আর মকবুল এখন কোথায়? কে জানে। হয়তো মিরপুরের কোনো বস্তিতে বা টঙ্গীর কোনো কারখানায় তারা জীবিকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। তারা হয়তো কোনো দিন জানতেও পারল না তাঁদের জন্মদাতা পিতার এই করুণ পরিণতির কথা। আর যদি জানত, তবুও কি তারা আসত লাশটি নিতে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো দিন মিলবে না।
সেদিনের পর আর মালিবাগ উড়ালসড়কের নিচে করিম চাচাকে দেখা যায় না। পাগলিনী আমেনা কয়েক দিন তাঁর খোঁজ করল, তারপর সেও একসময় মালিবাগ ছেড়ে চলে গেল। ইউসুফ সেদিন বিকেলে মিজান ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। মিজান ভাই সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "কেঁদো না রে পাগলা। আমাদের মতো ছিন্নমূল মানুষের শেষ গন্তব্য তো এই পথই।"
তবে কালু কুকুরটি আজও রোজ সন্ধ্যায় মালিবাগ মোড়ের ওই নির্দিষ্ট পিলারটির নিচে এসে চুপচাপ বসে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে রাস্তার দূর সীমানার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে—যেন এখনও সে বিশ্বাস করে, তাঁর প্রিয় বৃদ্ধ বন্ধুটি কোনো একদিন বাসি রুটির টুকরো হাতে নিয়ে আবার ফিরে আসবে।
লেখক এই করুণ গল্পটি লিপিবদ্ধ করলেন আর পাঠক তা গভীর দরদ দিয়ে পাঠ করলেন। কিন্তু করিম চাচা তো আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। তাঁর মতো শত শত মানুষ এই নির্মম শহরের ফুটপাতে রোজ এভাবে তিলে তিলে মারা যাচ্ছে, যাদের মৃত্যুর সংবাদ পরদিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ঠাঁই পায় না। মানুষ বড়ই ব্যস্ত, উন্নত ও আধুনিক সভ্যতার গর্বে অন্ধ; উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে দ্রুতবেগে গাড়ি ছুটে চলে নিচের অন্ধকার কোণটির দিকে চোখ না রেখেই।
তবুও গভীর রাতে, যখন ঢাকা শহরের যান্ত্রিক কোলাহল কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে, তখন মালিবাগ উড়ালসড়কের নিচে দাঁড়ালে বাতাসে এক করুণ বেদনাদায়ক কান্না ভেসে আসে—"বাবা, একটু ভাত দিবা?" কিন্তু কোনো উত্তর আসে না; কেবল ফিরে আসে এই সভ্যতার এক নির্মম ও পাথুরে নীরবতা।
আর এই গভীর নীরবতার বুকেই চিরতরে হারিয়ে যায় করিম চাচার অন্তিম সেই "শেষ রাত"।