প্রকাশিত : ০৮:১১
১০ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৪৫
১০ জুন ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
রেজা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। চায়ে চিনি কম ছিল, কিন্তু সেদিন সেদিকে তাঁর খেয়াল ছিল না। কারণ সেই সকালটা ছিল অন্যরকম। আকাশটা নীল ছিল না; বরং দেখতে লাগছিল পুরোনো তামার পাত্রের মতো—এক অদ্ভুত ছাই রঙ, যেন কেউ পৃথিবীর গায়ে ছাই ছড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি ভাবলেন, এটা কি সেই তেহরান, যেখানে তিনি বড় হয়েছিলেন? সেই তেহরান, যার রাস্তায় বসন্ত এলেই বাদাম গাছে ফুল ফুটত আর শিশুরা ঘুড়ি উড়িয়ে ছুটত? সেই তেহরান, যার বাড়ির ছাদ থেকে সূর্যাস্তের সময় আলবোর্জ পর্বতের চূড়াগুলো সোনার মতো ঝকঝক করত?
ফাতেমা তখনো ঘুমোচ্ছিলেন। কম্বল মুড়ি দিয়ে তিনি হয়তো স্বপ্নের দেশে ঘুরছিলেন—সেই দেশে, যেখানে এখনো নীল আকাশ আছে, যেখানে বোমা পড়ে না। রেজা তাঁকে ডাকতে গেলেন, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোলো না। তখনই শোনা গেল আকাশ ভাঙা শব্দ—বিমানের গর্জন।
রেজা একজন স্থপতি। সারাজীবন তিনি বাড়ি বানিয়েছেন। কত বাড়ির নকশা এঁকেছেন, কত বাড়ি দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু আজ তিনি বুঝতে পারলেন, বাড়ি বানানোর চেয়ে বাড়ি ভাঙা কত সহজ। একটুখানি বোমা, আর মুহূর্তের মধ্যেই বাড়ি ধুলোয় মিশে যায়।
সেদিন সকালে প্রথম বোমাটা পড়ল কারাজের তেল শোধনাগারে। তারপর শাহরানে, তারপর তেহরানের পশ্চিমে। মাটির নিচ দিয়ে যেন এক অদৃশ্য হাত পুরো শহরকে কাঁপিয়ে দিল। জানালার কাঁচগুলো থরথর করে বাজতে লাগল। ফাতেমার ঘুম ভাঙল; তিনি বিছানায় উঠে বসলেন। তাঁর চোখে-মুখে প্রশান্তি। যেন তিনি অনেক আগেই জানতেন, কোনো এক ভোরে এমন শব্দেই তাঁর ঘুম ভাঙবে।
‘কী হলো, রেজা?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, ফাতেমা।’
ফাতেমা কিছু বললেন না। শুধু হাত বাড়িয়ে রেজার হাতখানা নিজের হাতে নিলেন। সেই স্পর্শে রেজার বুকের ভেতরটা কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু ততক্ষণে আবার গর্জন—আরেকটি বোমা। এবার আরও কাছে। পাশের বিল্ডিংটা বুঝি?
রেজা বারান্দায় দৌড়ালেন। উত্তরের দিগন্তে আগুনের স্তম্ভ। তার ওপর দিয়েই যাচ্ছে বিমানের সারি। বিমানের ডানায় মার্কিন পতাকা আর ইসরায়েলের নীল তারকা। আমেরিকান পাইলটরা এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’—মহাকাব্যিক ক্রোধ। ইসরায়েলিরা বলে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’—গর্জনকারী সিংহ।
রেজা ভাবলেন, মানুষ যে নামই দিক, তাতে কী আসে যায়? তেহরানের মানুষের কাছে এটা অন্য দশটা নামের মতোই অর্থহীন। তারা শুধু জানে—আজ তাদের মাথার ওপর মৃত্যু নেমেছে। আর সেই মৃত্যুর ডানা আছে; সেই ডানা নীল রঙের, ঠিক যে রঙে একসময় আকাশ ভরে থাকত।
সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে গেল। তারপর মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট—সব। শহর হঠাৎ করে বোবা হয়ে গেল। কেবল রেডিওতে সরকারি ঘোষণা বাজছে—‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। দয়া করে ঘর থেকে বেরোবেন না।’
কিন্তু ঘর আর নিরাপদ ছিল না। কারণ সেই ঘরগুলো তো ইট দিয়ে বানানো, আর ইটের শক্তি বোমার সামনে কিছুই না।
রেজার পাশের বাড়িটা তিনতলা। ধূসর রঙের, জানালায় নীল পর্দা ছিল। নিচতলায় থাকতেন এক বুড়ি, যার ছেলে আমেরিকায় পড়তে গিয়েছিল। তিনি প্রতিদিন রোজা রাখতেন, সকালে কবুতরকে দানা ছিটিয়ে দিতেন। তার জানালার পাশেই একটা লাল বালতি ছিল; সেটায় তিনি পাখিদের জন্য জল রাখতেন।
সেই বাড়ির ওপর বোমা পড়ল দুপুরের আগেই।
শব্দটা এত প্রচণ্ড ছিল যে রেজা মেঝেতে জ্ঞান হারালেন। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখলেন, ফাতেমা তাঁর মুখে জল ছিটাচ্ছেন। ‘ঠিক আছো তো?’ ফাতেমার গলা কাঁপছে। রেজা উঠে দাঁড়ালেন। কান দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। তিনি সেই রক্ত মুছলেন না। দৌড়ে গেলেন বাইরে।
রাস্তায় ইতিমধ্যে লোক জমে গেছে। কেউ হাত দিয়ে ইট সরাচ্ছে, কেউ চিৎকার করছে। ধুলোর নিচ থেকে একটি হাত দেখা যাচ্ছে—ছোট্ট হাত, শিশুর। নখে মেহেদি লাগানো। হয়তো গতকালই ওর মা মেহেদি পরিয়ে দিয়েছিল কোনো উৎসবে।
রেজা দৌড়ে গিয়ে সেই হাতটা ধরলেন। কব্জিতে ছোট্ট একটি রুপোর বালা। তিনি সেই বালা চিনতে পারলেন—ওটা মিনার। বয়স আট হবে। যে মিনার রোজ সন্ধ্যায় ফাতেমার কাছ থেকে মিষ্টি নিতে আসত আর বলত, ‘আন্টি, তোমার গানটা শুনতে চাই।’
মিনারকে বের করতে সময় লেগেছিল দুই ঘণ্টা। যখন বের হলো, তখন সে আর কাঁদছে না। তার চোখ বন্ধ। গালে লাল ফোঁটা; হয়তো মা গতকাল রাতে মেহেদি পার্টিতে ঠোঁটের রং ঘষে দিয়েছিল। সেই লাল দাগ এখনো আছে, কিন্তু মিনার নেই।
রেজা সেদিন আরও এগারোটি মরদেহ উদ্ধার করলেন। পাঁচটা শিশু, তিনজন নারী, তিনজন পুরুষ। সবাই প্রতিবেশী। সবার নাম তিনি জানেন—যার বাড়িতে খেয়েছেন, যার ছেলের বিয়েতে নেচেছেন, যার সঙ্গে ঈদের দিন কোলাকুলি করেছেন।
রাত যখন দশটা, তখন তিনি বাড়ি ফিরলেন। ফাতেমা তেতো কুমড়ার ডাল বানিয়ে রেখেছেন। গন্ধটা ভারি চমৎকার, মৌরির ঘ্রাণ উঠছে। কিন্তু রেজার খিদে পাচ্ছে না। তিনি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। চাঁদ উঠেছে। কিন্তু সেই চাঁদের আলো পড়ছে ধ্বংসস্তূপের ওপর। শহরটাকে এখন যুদ্ধের স্মৃতিসৌধের মতো দেখাচ্ছে।
ফাতেমা পেছন থেকে এসে বললেন, ‘আমরা কি এখান থেকে পালাব, রেজা?’
রেজা চুপ করে থাকলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, ‘পালিয়ে কোথায় যাব, ফাতেমা? পুরো দুনিয়াটা কি এখন যুদ্ধক্ষেত্র নয়?’
ফাতেমা কোনো কথা বললেন না। শুধু স্বামীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বাইরে তখনো বোমা পড়ছে। ভোর পর্যন্ত পড়ল। কিন্তু সেই রাতে রেজা আর ফাতেমা শুতে গেলেন। কারণ বেঁচে থাকাটা যদি হয়, তবে তো ঘুমও দরকার। আর মরতে হলেও ঘুমিয়ে মরা ভালো।
এটি ২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারির গল্প। লেখক বলে দিচ্ছেন, এটি একটি উপন্যাস। কিন্তু রেজা যদি বাঁচেন, তিনি বলবেন, এটি কোনো উপন্যাস নয়। এটি সত্যি ঘটনা। আর সত্যি ঘটনা লেখার আগে লেখক নিজেই প্রায়ই কাঁদেন।
মোজতবার বাবা ছিলেন পুলিশের অফিসার। তিনি কখনো ছেলেকে ফিল্মমেকার হতে দেখে খুশি হননি। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে উকিল হোক, কিংবা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু মোজতবা যখন ছোট ছিল, বাবা তাকে একবার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে নিয়ে গিয়েছিলেন নওরোজের কেনাকাটা করতে। তখন মোজতবার হাতে ছিল বাবার পুরোনো সনি হ্যান্ডিক্যাম।
সেদিন বাজারে কী হইচই! কোথাও সবুজ পাখির খাঁচা, কোথাও লাল আপেলের স্তূপ, কোথাও নীল ফিরোজা পাথরের গলাবন্ধ। আর মানুষের হাসি—সেসব হাসির শব্দ, কোলাহল, গন্ধ। জাফরানের ঘ্রাণ ভেসে আসছে কোথাও থেকে। কাবাবের ধোঁয়া। শিশুদের চিৎকার। বুড়ো দোকানদারের গলা—‘এসো এসো, তুমি তো আমার পছন্দের ক্রেতা!’
মোজতবা সেদিন যতটা ঘুরেছে, তার চেয়ে বেশি ভিডিও ধারণ করেছে। সে ক্যামেরা ঘুরিয়েছে ফেরিওয়ালার পণ্যবাহী গাধার পেছনে, বুড়ো কসাইয়ের চওড়া হাতের গোশত কাটার দৃশ্য ধারণ করেছে। এক ছোট মেয়েকে ক্যামেরাবন্দি করেছে যে তার মায়ের হাত ধরে কাঁদছে—‘মা, লাল জুতা কিনে দাও, প্লিজ!’
বাড়ি ফিরে সেই ভিডিওগুলো দেখে বাবা হেসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুই তো দারুণ ফিল্মমেকার হবি রে বাবা।’
আজ সেই মোজতবা বসে আছে তেহরানের উত্তর উপকণ্ঠে, এক পুরোনো ভবনের পাতালঘরে। ভবনটা ইরানি বিপ্লবের সময় বানানো। তলায় তলায় টানেল, কক্ষ আর আশ্রয়স্থল। মোজতবা নিজের জন্য বেছে নিয়েছে সবচেয়ে নিচের কক্ষটা—যেখানে সিলিং থেকে সবসময় জল পড়ে, যেখানে চুনের গন্ধে বমি পায়।
তার হাতে এখন বাবার দেওয়া সেই ক্যামেরা নয়, পেশাদার ক্যানন ক্যামেরা। লেন্সে জমেছে ছাই। সে কাপড় দিয়ে মুছছে, কিন্তু দাগ যাচ্ছে না। ঠিক যেন যুদ্ধের স্মৃতি—বারবার মুছতে চাইলেও তা থেকে যায়।
মোজতবা যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তথ্যচিত্র বানিয়েছে। কুর্দিস্তানের রাখালদের জীবন, বালুচিস্তানের মৎস্যজীবীদের নৌকার মাঝি, ইসফাহানের কার্পেট বুনন শিল্পীদের হাতের নকশা। তার ক্যামেরা সবসময় মানুষের খুব কাছে গেছে, তাদের চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু এখন সে বানাতে চায় এক ভিন্ন তথ্যচিত্র। নাম দিয়েছে ‘যারা বেঁচে নেই’। এতে সে রাখবে সেইসব মুহূর্ত, যখন মানুষ বুঝতে পারে—এই শেষ ক্ষণ। ঠিক যখন মা শেষবারের মতো ছেলের কপালে চুমু খায়, ঠিক যখন বাবা শেষবারের মতো মেয়েকে কোলে নেয়, ঠিক যখন প্রেমিক-প্রেমিকা শেষবারের মতো চোখাচোখি করে।
প্রতিদিন রাত আটটায় মোজতবা স্টুডিও খোলে। সেই স্টুডিওতে কম্পিউটার আছে, ক্যামেরা আছে, আর কয়েক ডজন মেমরি কার্ড আছে। সে সারা দিন শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ পাঠানো ভিডিও সংগ্রহ করে। কারো ফোনে তোলা ছবি, কারো পুরোনো ডিভিডি, কারো ডায়েরির স্ক্রিনশট।
একদিন একটা ভিডিও এলো—এক বৃদ্ধা নারী রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। তাঁর পরনে কালো চাদর, হাতে ভাঙা প্লাস্টিকের বোতল। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছেন, ‘হে ঈশ্বর, তুমি কি আমাদের ভুলে গেছ?’
এই কথার মাঝখানেই এলো বোমার আওয়াজ। ক্যামেরাটা লাফিয়ে নিচে পড়ে গেল। পরের ফুটেজে শুধু অন্ধকার আর চিৎকার। নারীর আর্তনাদ, ছেলের চিৎকার—সব মিলেমিশে একাকার।
মোজতবা ভিডিওটা থামিয়ে দেয়। সে এক গ্লাস পানি খায়। কলের পানি। গত সপ্তাহ থেকে তাতে পোড়া তেলের গন্ধ আসছে; ফোটালেও যাচ্ছে না। মোজতবা ওষুধ খেত সেই গন্ধ এড়াতে। কিন্তু ওষুধ ফুরিয়ে গেছে।
সে সিগারেট ধরায়। সিলিং থেকে চুনকাম খসে পড়ে সিগারেটের আগায়। সে তা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। কাশি আসে। গত তিন সপ্তাহের কাশি—বন্ধ হয় না। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। শুধু একটা বাক্স মেন্থল লজেন্স আছে, কিন্তু তার মেয়াদ উত্তীর্ণ।
গুজব শোনা যাচ্ছে—সর্বোচ্চ নেতা নাকি আর নেই। কেউ বলে বিমান হামলায় নিহত, কেউ বলে গুপ্তহত্যায়, কেউ বলে আত্মগোপনে চলে গেছেন। মোজতবা এসব শোনে, আশা করে। সে শাসনের বিরুদ্ধে দুবার জেল খেটেছে। জেলে তাকে মারধর করা হয়েছে, পায়ের নখ তুলে নেওয়া হয়েছে। সে ফিরে এসে আবার ক্যামেরা হাতে নিয়েছে।
কিন্তু এবার সে জেলে যেতে পারবে না। ক্যামেরা রেখে দিয়ে শুধু সিগারেট ধরায়, আর কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তখনই হঠাৎ স্ক্রিনে খবর এলো—সরকারি টেলিভিশনের লাইভ। ঘোষক বলছেন, ‘আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ি গত রাতে শহীদ হয়েছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন তাঁর পুত্র, মোজতবা খামেনেয়ি।’
মোজতবা ক্যামেরাম্যান স্থির হয়ে গেল। এক নাম, দুই মানুষ। পিতা থেকে পুত্র। যেন ক্ষমতা কোনো উত্তরাধিকার, কোনো পারিবারিক ব্যবসা।
সে ক্যামেরা হাতে নিল। লেন্সের ধুলো আঙুল দিয়ে মুছল। রেকর্ড বাটন চাপল। ক্যামেরার সামনে বলতে শুরু করল:
‘আমার নাম মোজতবা, আমি একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা। আজ আমি দেখলাম ক্ষমতা বাবা থেকে ছেলের হাতে যায়। কিন্তু মৃত্যু? মৃত্যু কার হাতে যায়? একজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু যায় বোমার হাতে। আর বোমা যায় ক্ষমতাবানদের হাতে। এই চক্র থামে না। থামে শুধু প্রাণ। হাজার হাজার প্রাণ। আর কত প্রাণ, ঈশ্বর? কত?’
ক্যামেরা বন্ধ করে সে দেয়ালের দিকে তাকাল। এখানে জানালা নেই। কিন্তু মনে মনে সে দেখতে পায়—তেহরানের রাস্তা, যেখানে একসময় শিশুরা ঘুড়ি উড়াত। এখন সেখানে ঘুড়ি ওড়ে না। এখন ওড়ে ড্রোন।
সে সিগারেটটা জোরে টান দিল। সিলিং থেকে ফের চুনকাম খসে পড়ল। এবার চোখে পড়ল। সে চোখ মুছল। তারপর আবার ক্যামেরার রেকর্ড বাটন চেপে বলল, ‘আর হ্যাঁ, যারা এই ভিডিও দেখবে, তাদের জন্য বলছি—আমার বাবা-মা আছেন কারাজের রাস্তায়। তাদের বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে, কিন্তু দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভাই জাভেদ বলেছে, “দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।” আমি বাঁচতে চাই সেই দেয়াল হয়ে—ধ্বংসের পরেও দাঁড়িয়ে থাকা।’
সে ক্যামেরা বন্ধ করল। তারপর ভিডিওটা মেমরি কার্ডে সেভ করল। লেবেল দিল: ‘মোজতবার শেষ কথা - যদি কিছু হয়।’
সেদিন রাতে সে ঘুমাতে গেল। কিন্তু ঘুম আসে না। বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা। সে ভাবল, হয়তো কাল সকালে বেরোতে হবে। বাবা-মায়ের খোঁজ নিতে হবে। কিন্তু কীভাবে? রাস্তায় এখন ড্রোন টহল দেয়।
ঘুম আসছিল না। সে উঠল, আবার সিগারেট ধরাল। পাতালঘর থেকে আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কল্পনায় সে দেখল সেই চাঁদ, যেটাকে ছোটবেলায় বাবা বলেছিলেন—‘ওই চাঁদের বুকে দাগ দেখছিস? ওটা ওর চিরকালের গল্প। ঠিক আমাদের মতো।’
মোজতবা চাঁদের গল্পটা মনে করে কাঁদতে চাইল, কিন্তু কান্না আসে না। যুদ্ধের এত রক্ত, এত মৃত্যু দেখার পর কান্না করার ক্ষমতা কি আর থাকে?
সে শুধু আরেকটা সিগারেট ধরাল। আর সিলিং থেকে চুনকাম খসে খসে পড়তে লাগল তার সাদা শার্টের ওপর। সেই সাদায় কালো দাগ—যেন এই যুদ্ধের স্বাক্ষর।
নাফিসের হাত ছিল জাদুর ছোঁয়ায় মাখানো। বন্ধুরা ডাকত ‘জাদুকরী নাফিসে’ বলে। কারণ তিনি যা কিছু ডিজাইন করতেন, মনে হতো সেটা যেন কোনো পরির দেশের গয়না। তিনি জুয়েলারি ডিজাইন করতেন। তাঁর তৈরি নেকলেসের পুঁতি সাজানো থাকত মেহরাবের মতো; আংটির ফাঁকে বসানো থাকত মিনিয়েচার পার্সিপলিটান। দুবাই থেকে প্যারিস, ইস্তাম্বুল থেকে বার্লিন—সর্বত্র তাঁর পণ্যের চাহিদা ছিল।
গত বছর তিনি ইনস্টাগ্রামে ‘শেহেরাজাদের স্বপ্ন’ কালেকশন লঞ্চ করেছিলেন। সেই কালেকশনে ছিল হাজার ও এক রাতের গল্পের আদলে নকশা। একদিনেই সব বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। নাফিসে তখন ভেবেছিলেন, জীবন খুব সুন্দর, খুব স্থিতিশীল।
কিন্তু ২০২৫ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় যখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হলো, তখন নাফিসের ব্যবসা থমকে গেল। অর্ডার জমা নেই, পেমেন্ট গেটওয়ে বন্ধ, কাস্টমারের খোঁজ নেই। তিনি ধীরে ধীরে সব সঞ্চয় শেষ করে ফেললেন।
তারপর এলো এই যুদ্ধ।
নাফিসে আর ফরহাদের অ্যাপার্টমেন্টটা একসময় ছিল যেন একটা জাদুঘর। লাল গালিচা—হেরাত প্রদেশের হাতে বোনা। দেয়ালে হাফেজের কবিতার ক্যালিগ্রাফি, যেখানে লেখা—‘এমন সময় দিও না যাতে মনে পড়ে আমায়।’ বুকশেলফ ভর্তি ইংরেজি ও ফার্সি উপন্যাস। আর কোণে রৌদ্র পোহাত স্যাম আর ইয়াল—পারসিয়ান বিড়াল; একটার চোখ সোনালি, আরেকটার সবুজ।
আজ সেই অ্যাপার্টমেন্টটার দেয়াল ফেটে গেছে। গালিচার রং উড়ে গেছে ধুলোয়। বুকশেলফের বই মেঝেতে ছড়ানো, কেউ পড়ে না। আর স্যাম ও ইয়াল? তারা সোফার নিচে কুঁকড়ে আছে, শরীর কাঁপছে। সারাদিন খায় না, শুধু কাঁপে। কারণ বোমার শব্দে তাদের মনে হয়—এইবার মৃত্যু আসছে।
নাফিসে প্রতিদিন সকালে তাদের কোলে নিয়ে বসে। চুলে হাত বোলায়, ফিসফিস করে বলে, ‘চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু তিনি নিজেও বিশ্বাস করেন না সেসব কথা। শুধু বলতে হয়, কারণ স্যাম-ইয়াল যদি ভয় পেয়ে যায়, তবে সাহস রাখবে কে?
ফরহাদ ছিল ইঞ্জিনিয়ার। যুদ্ধ শুরুর পর তার কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। সে এখন ছাদে বসে দূরবীন দিয়ে আকাশ দেখে। ড্রোন চেনার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে বলে ফেলে—‘ওইটা মার্কিন ড্রোন, আর ওইটা ইসরায়েলি এফ-৩৫।’
নাফিসে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি এত চেনো কী করে?’
ফরহাদ উত্তর দেয়, ‘ইন্টারনেটে দেখেছি।’
কিন্তু এখন ইন্টারনেট নেই। ফরহাদ আসলে কিছুই চেনে না। সে কেবল সময় কাটায়। বোমা না পড়লে সেই সময়গুলো সবচেয়ে ভয়ংকর হয়। কারণ তখন নিজের ভেতরের আওয়াজগুলো খুব পরিষ্কার শোনা যায়। আর সেই আওয়াজগুলো সব সময় সুখের কথা বলে না।
নাফিসে আর ফরহাদের ভালোবাসা এবার আগের চেয়ে গভীর। কারণ তারা জানে, আজ যাকে ভালোবাসছে, কাল হয়তো সে থাকবে না। বোমার টার্গেট কেউ জানে না।
প্রতি রাতে বন্ধুদের জমায়েত হয়। মোমবাতির আলোয়—কারো বাড়িতে, কখনো নাফিসেদের অ্যাপার্টমেন্টে, কখনো রেজার বাড়িতে, কখনো লাইলার বাসায়। বয়স্ক বন্ধু দারাও আসে। তারা যা আছে তাই নিয়ে আসে—কেউ মসুর ডাল, কেউ চাল, কেউ রুটি, কেউ এক টুকরো পনির।
তারা মোমবাতি জ্বালায়, খাবার ভাগ করে নেয়, আর গান গায়। গানগুলো পুরোনো—ফারিদ ফারহাদের ‘মঞ্জেল’, গুগুশের ‘দো হাজার’, হায়েদেহের ‘হাসান’। সেই গান শুনলে তাদের মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো। ক্লাসের ফাঁকে পিৎজা খাওয়া, ছাদে বসে আড্ডা দেওয়া, প্রেম করা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা। সেই ভবিষ্যৎ আজ এসে দাঁড়িয়েছে ধ্বংসের মুখে।
এক রাতে নাফিসে হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে নাফিসে?’
নাফিসে বলল, ‘আমার মনে পড়ে গেছে—গত বছর এই সময় আমরা কাস্পিয়ান সাগরের ধারে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ফরহাদ বলেছিল, “নাফিসে, তোমার চোখের রং কী জানো? কাস্পিয়ানের জলের মতো নীল।” এখন সেই কাস্পিয়ান সাগরে কী অবস্থা? তেলের দাগ, মরা মাছ, বিষাক্ত পানি। ঠিক আমাদের শহরের মতো।’
সবাই চুপ হয়ে গেল। ফরহাদ নাফিসের হাতটা নিজের হাতে নিল। বলল, ‘আমি আজও তোমার চোখের রং দেখি, নাফিসে। এত ধুলোয়, এত ছাইয়েও চোখের নীল রং হারায়নি। সেটাই তো বাঁচার আশা।’
নাফিসে ফিসফিস করে বলল, ‘আমরা তো এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার অবসান চেয়েছিলাম, ফরহাদ। কিন্তু এভাবে নয়। এই যুদ্ধ আমাদের মুক্তি দিচ্ছে না, আমাদের জীবন্ত কবর দিচ্ছে।’
ফরহাদ কিছু বলল না। শুধু নাফিসের চুলে হাত বোলাতে লাগল। বাইরে তখন আবার বোমার শব্দ। আর মোমবাতির আলোয় বন্ধুরা গাইতে শুরু করল—‘বিপ্লব কখনো আসে না, বিপ্লব সবসময় থাকে। থাকে মানুষের ভেতরে, প্রতিদিনের সংগ্রামে।’
তবে কি সত্যিই থাকে? নাকি বিপ্লবও একটা পণ্য হয়ে গেছে, যেটা কিনতে গেলে আগে মরতে হয়, আর পরে দেখা যায় সেটা ছিল মিথ্যে?
নাফিসে জানে না। সে শুধু জানে, আজ রাতে তারা সবাই—সে, ফরহাদ, স্যাম ও ইয়াল—একসঙ্গে ঘুমাবে। কাল সকালে আবার ঘুম থেকে উঠবে। উঠে বাঁচার চেষ্টা করবে। বাঁচাটা যখন এত কঠিন, তখন বাঁচাটাই হয়তো সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ।
আসলের মা নাম রেখেছিলেন ‘আসল’—ফার্সি ভাষায় যার অর্থ ‘মধু’। মা বলতেন, ‘আমার মেয়ে যেন সবার জীবন মিষ্টি করে দেয়।’
আসল সত্যিই তাই করতেন। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে তিনি নারীদের পরিয়ে দিতেন রঙের আভা। লাল স্কার্ফ, নীল ব্লাউজ, হলুদ পায়জামা—এই রঙগুলো যেন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার রসদ জোগাত। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন নিজেকে সুন্দর দেখে, তখন তার বাঁচার ইচ্ছে ফিরে আসে।
তাঁর বুটিকের নাম ছিল ‘আসলের আয়না’। কারণ তিনি চাইতেন—প্রত্যেক নারী যেন সেই আয়নায় নিজেকে দেখে ভালোবাসতে শেখে। বুটিকের ভেতরে রেশমি কাপড়ের স্তূপ, নকশি জামদানি, তেরমেহ শাল, কাশ্মিরি পশমিনা। সব হাতে বোনা, সব হাতে ডিজাইন করা।
এখন সব পুড়ে ছাই।
যে রাতে বোমা পড়ল, আসল ঘরেই ছিলেন। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল—কালো বৃষ্টি। প্রথমবারের মতো তিনি সেই অদ্ভুত বৃষ্টি দেখলেন। তেলের মতো আঠালো, পোড়া গন্ধ; পড়লে দাগ রেখে যায়। তিনি ভেবেছিলেন, এটা হয়তো দুঃস্বপ্ন। কারণ বাস্তবে এমন বৃষ্টি হয় না।
কিন্তু ভোরবেলা ফোন এলো—প্রতিবেশীর থেকে। ‘আসল, তোমার দোকানে আগুন।’
আসল চিৎকার করে উঠল। দৌড়াতে চাইল, কিন্তু ফরহাদ তাকে আটকাল। বলল, ‘রাস্তা নিরাপদ নয়, সকালে যাব।’
সে সকালে গিয়ে দেখল দোকান নেই। শুধু দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের গায়ে কালো দাগ—বৃষ্টির? নাকি আগুনের? সে জানে না। ভেতরে যা ছিল সব পুড়ে গেছে। রেশমি কাপড় কয়লা হয়েছে, গয়না গলে পাথর হয়েছে, আয়নাগুলো চুরমার।
আসল সেদিন কাঁদেনি। সে চুপ করে ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে ছিল কয়েক ঘণ্টা। ফরহাদও কাছে বসেছিল। কিছু বলেনি। বলার কিছু ছিল না। কারণ কী বলবে? ‘চিন্তা করো না, নতুন করে শুরু করো’—এই শব্দগুলোর কোনো অর্থ কি এখানে আছে?
সেই থেকে আসল বদলে গেল। সে আর ডিজাইন করে না। আর স্বপ্ন দেখে না। সে প্রতিদিন বিকেলে ছাদে যায়, দাঁড়ায়, আকাশ দেখে। বৃষ্টি এলে সে ছাদেই থাকে, ভিজতে দেয়। কালো ফোঁটা পড়ে তার সাদা জামায়, কালো চুলে, খোলা ত্বকে।
ফরহাদ বারবার ডাকে, ‘নিচে চলে আয়, অসুস্থ হয়ে যাবি।’
আসল উত্তর দেয়, ‘আমি ইতিমধ্যেই অসুস্থ, ফরহাদ। পুরো শহর অসুস্থ। আমি চাই এই বৃষ্টি আমায় পুরোপুরি ভিজিয়ে নিক। হয়তো তখন আমার বুকের জ্বালা একটু কমবে।’
ফরহাদ বুঝতে পারে, আসলের জ্বালা কমার নয়। কারণ তার স্বপ্নগুলো পুড়ে গেছে। বুটিকটা শুধু দোকান ছিল না, সেটা ছিল তার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গা। সেখানে সে প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি করত, বাঁচার অর্থ তৈরি করত।
একদিন নাফিসে এসে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। আসল কাঁদছিল না। সে বলল, ‘তুমি জুয়েলারি ডিজাইন করো, আমি ফ্যাশন। আমরা দুজনই নারীদের সুন্দর দেখাতে চাইতাম। কিন্তু এখন কেউ সুন্দর দেখতে চায় না। এখন সবাই চায় বাঁচতে। বাঁচা আর সুন্দর থাকা কি এক জিনিস?’
নাফিসে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, আসল। বাঁচা আর সুন্দর থাকা একই কথা। কারণ সুন্দর থাকা মানেই আশা রাখা। আর যতদিন আশা আছে, ততদিন মানুষ বাঁচে।’
আসল প্রথমবারের মতো কিছুক্ষণের জন্য হাসল। সেই হাসি দেখে নাফিসে বলল, ‘দেখলি? এখনো তোর হাসি সুন্দর আছে। তুই বাঁচবি, আসল। আমরা সবাই বাঁচব।’
তখনই বাইরে বোমার আওয়াজ। দুজন মেঝেতে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে আসল বলল, ‘নাফিসে, তুমি কি ভেবেছিলে আমাদের জীবন এভাবে শেষ হবে?’
নাফিসে বলল, ‘শেষ হয়নি এখনো, আসল। হয়তো এটাই আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায়। আর প্রতিটি অধ্যায়েই সুন্দর কিছু থাকে। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’
আসল অন্ধকারে নাফিসের চোখের দিকে তাকাল। দুই বন্ধুর চোখে চোখ রেখে আসল বলল, ‘তুমি সবসময় আশাবাদী ছিলে, নাফিসে। কিন্তু এবার আমি জানি—এই যুদ্ধের কোনো সুন্দর দিক নেই।’
বাইরে কালো বৃষ্টি নামছে। আসল জানালার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। ফোঁটা পড়ল তার হাতের তালুতে। কালো দাগ জমল। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘এই পোড়া তেলের গন্ধে ভরা জ্বলন্ত শহরটাই আমার একমাত্র পরিচয়। আমার দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর আমি তার দিকে না তাকিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পালাব? না, আমি এখানেই থাকব, এই ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে।’
নাফিসে বন্ধুর কথাগুলো শুনল। সে জানে, আসল এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না। কারণ আসল অন্য নারীদের মতো নয়। সে যুদ্ধে পালায় না, সে যুদ্ধের দিকে তাকায়। তার চোখে ধ্বংসের ছবি ধরা থাকে। কারণ একদিন সেই ছবি হয়তো পৃথিবীকে বদলে দেবে।
অথবা না-ও দিতে পারে। কিন্তু আশা রাখাটা কি বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়?
এলাহী কারাগারে ছিল সাত বছর। সাত বছর অন্ধকার কুঠুরিতে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। সেখানে তাকে অনেকবার বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে, পায়ের নখ তুলে নেওয়া হয়েছে, চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু সে ভাঙেনি। কেন ভাঙবে? সে তো কবিতা লিখেছিল—স্বাধীনতা নিয়ে একটা কবিতা।
যেদিন গ্রেফতার করা হয়, সেদিন ভোর চারটেয় দরজায় কড়া নাড়ে সিভিল ড্রেসের লোকেরা। এলাহী তখনো ঘুমাচ্ছিল। স্বামী আলি রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিল। এলাহী দরজা খুলতে গিয়ে বুঝতে পারে—এবার শেষ। সে শুধু স্বামীকে বলে, ‘আমার ছেলেটাকে বলে দিও, মা ফিরেছে।’
সাত বছর পর ফিরে এসে দেখে ছেলে বড় হয়ে গেছে। সে মাকে চেনে না। এলাহী যখন ঘরের ভেতর ঢোকে, ছেলে টিভি দেখছিল। একবারও তাকায়নি। কারণ মা যাকে চেনে না, তার দিকে তাকানোর কী আছে?
সেই স্মৃতি এলাহীকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে। কারাগারের সব নির্যাতন সে ভুলতে পারে, কিন্তু ছেলের উদাসীন চোখ ভুলতে পারে না। যুদ্ধ শুরু হলে সে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। স্বামী আলি চাকরি হারিয়েছে। এখন দিনমজুরের কাজ খোঁজে; কখনো পায়, কখনো পায় না।
এক ভোরবেলা ফোন বাজল। এলাহী আঁতকে উঠল। বোনের ফোন। কাঁদছে। ‘ভাইয়া,’ বোনের গলা ধরে আসছে, ‘আমাদের প্রতিবেশী... যিনি ভোরে বারান্দায় সিগারেট খেতেন... তিনি আর নেই। গত রাতে বোমার শকওয়েভে বারান্দা থেকে ছিটকে পড়ে গেছেন।’
এলাহী ফোন রেখে দেয়। দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়ালে একটা দাগ আছে—যেদিন জেল থেকে ফিরে এসে মাথা ঠেকিয়ে কেঁদেছিল, সেদিনের দাগ। এখনো আছে। সে ওই দাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। কান্না আসে না। হয়তো সব কান্না শুকিয়ে গেছে জেলের ভেতরেই।
তার ফুসফুসে জ্বালা ধরে। রিফাইনারির বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাসনালী পুড়িয়ে দিচ্ছে। সে ক্যাবিনেট থেকে নীল রঙের ইনহেলারটা বের করে। ডাক্তার বলেছিলেন—‘যতবার মনে হবে দম বন্ধ আসছে, ততবার ব্যবহার করবে।’ কিন্তু ইনহেলার ফুরিয়ে আসছে। আর ফার্মেসিগুলো বন্ধ। নতুন কেনার টাকা নেই।
এলাহী জানালার পাশে দাঁড়ায়। বাইরে ধুলো উড়ছে। একটা রোগা বিড়াল পথ পার হচ্ছে; হাড় বেরিয়ে গেছে তার। ক্ষুধায় পথ হারিয়েছে।
এলাহীর মনে পড়ে কারাগারের কথা। সেখানে এক রাজনৈতিক বন্দী ছিলেন—ফেরেস্তে নামে এক তরুণী কবি। তিনিও স্বাধীনতার কবিতা লিখতেন। ফেরেস্তে শেষবার এলাহীকে বলেছিলেন, ‘দেখিস, বাইরে গেলে তুই আমাদের গল্প বলবি। পৃথিবীকে জানাবি, এখানে কী হয়।’
এলাহী বাইরে এসেছে। কিন্তু পৃথিবী কি তার গল্প শুনতে চায়? পৃথিবী কি চোখ মেলে তাকায় এই ধ্বংসের দিকে? নাকি পৃথিবী চোখ বন্ধ করে বসে আছে, ঠিক ওই বিড়ালটার মতো যে খাবারের আশায় রাস্তায় ঘুরছে?
সে টেবিলে রাখা শেষ মসুর ডাল আর সামান্য কিছু টাকা ব্যাগ করে রাখে। কাল এক বন্দীর স্ত্রীকে দিতে হবে। সেই নারী নিজে অসুস্থ, তার ছোট শিশুটির দুধের সংকট। এলাহী ভাবে—সে নিজে না খেয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সেই শিশুকে বাঁচাতে হবে। কারণ শিশুরা যুদ্ধের অপরাধী নয়।
বাইরে আবার ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন। এলাহী শুয়ে পড়ে মেঝেতে, হাতে শক্ত করে ধরে নীল ইনহেলারটা। তার চোখের সামনে ভাসে ছেলেটির মুখ। সে ফিসফিস করে বলে, ‘মা ফিরেছিল তোর কাছে। কিন্তু তুই মাকে চিনিস না। সেই যন্ত্রণা, বাবা, সেই যন্ত্রণা কোন ইনহেলার কমায়?’
বাইরে তখন বৃষ্টি নামছে—কালো বৃষ্টি। এলাহী জানালার ফাঁকে হাত বাড়ায়। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে তার হাতে। সে সেই কালো দাগ দেখে আর ভাবে—এ যেন তার ভেতরের কালো দাগ। সাত বছরের নির্যাতনের কালো দাগ। ছেলের চোখের উদাসীন কালো দাগ। এই যুদ্ধের কালো দাগ।
কোনো সাবান এসব দাগ মোছাতে পারে না। কোনো ইনহেলার এসব বুকের জ্বালা কমাতে পারে না। তবুও এলাহী বাঁচে। কারণ ফেরেস্তে বলেছিল, ‘বাইরে গিয়ে গল্প বলবি।’ বাইরে থাকাটাই যদি গল্প হয়, তাহলে এলাহী সেই গল্প বাঁচিয়ে রাখে। নিঃশ্বাসের শেষ বিন্দু পর্যন্ত।
ফয়সালের গল্প সহজ নয়। কারণ তার গল্পে শুরুটা আছে, কিন্তু শেষটা নেই। মাঝখানে শুধু দুঃখ আর হারানো।
২০২১ সালের আগস্ট। কাবুলের পতনের শেষ রাতে ফয়সালের স্ত্রী গুলালাই তাকে বলেছিল, ‘আমরা কি পারব সব ছেড়ে চলে যেতে?’
ফয়সাল আফগান ন্যাশনাল আর্মিতে চাকরি করত। তালিবানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তার দুই কমরেড তালিবানের হাতে মারা গেছে। সে জানে—তালিবান ফিরলে তাকে প্রথমেই হত্যা করবে।
তাই তারা পালিয়েছিল। রাতে। অন্ধকারে। তিন সন্তানকে নিয়ে। গুলালাই তখন সপ্তম মাসের গর্ভবতী।
স্মাগলারদের হাতে সব টাকা দিয়ে তারা উঠেছিল একটা ট্রাকে। ট্রাকের তলায়। সেই তলায় আরও পঞ্চাশ জন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কারো পানি নেই, খাবার নেই। ট্রাকটা যখন ইরানি সীমান্ত পার হলো, তখন দেখা গেল দুই শিশু মারা গেছে। তৃষ্ণায়, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে।
ফয়সাল নিজের চোখে দেখেছে—পাঁচ বছরের একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে কীভাবে চুপ হয়ে গেল। তার মা তাকে জাগানোর চেষ্টা করল, গাল চাপড়াল, মুখে জল দিল। কিন্তু মেয়েটা আর ওঠে না। তার মা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। ট্রাকের অন্ধকারে ওই চিৎকার শুনে বাকিরাও কাঁদল। কিন্তু কান্নায় কী লাভ? তৃষ্ণা তো মেটে না।
ইরানে এসে ফয়সাল আশ্রয় নিল তেহরানের দক্ষিণের একটা গেটোতে। সেখানে আফগান অভিবাসীদের বসতি। ঘরগুলো ত্রিপাল আর টিনের চালা। বিদ্যুৎ নেই—আড়াল থেকে টেনে আনে। পানি ট্যাংকার থেকে কিনতে হয়।
ফয়সাল কাজ পায় নির্মাণ সাইটে। দিনে আট ডলার মজুরি। তাতে মোটামুটি চলে যায়। চার সন্তান, এক স্ত্রী—পেট চলে। ২০২৪ সালে পঞ্চম সন্তান হয়। ফয়সাল ভাবে, এখন আর আফগানিস্তান ফেরা যাবে না। ইরানেই থাকতে হবে।
কিন্তু ইরান সরকার অভিবাসীদের দিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তার ওপর এলো এই যুদ্ধ।
যুদ্ধ শুরুর পর নির্মাণ সাইটে বোমা পড়ে। কোম্পানির মালিক পালায়। ফয়সাল কাজ হারায়। সে এখন প্রতিদিন ভোরে ‘সাদ্দে-দাওলাত’ ময়দানে গিয়ে দাঁড়ায়—যেখানে দিনমজুররা জমায়েত হয়। কেউ এলে দৌড়ে গিয়ে বলে, ‘আমাকে নেন, আমি ভালো কাজ করি।’ কিন্তু কাজ নেই। যুদ্ধের সময় কেউ বাড়ি বানায় না, দোকান খোলে না।
ফয়সাল প্রায়ই শূন্য হাতে বাড়ি ফেরে। গুলালাই জিজ্ঞেস করে, ‘কিছুই নেই?’ ফয়সাল চুপ করে বসে থাকে। তার পাঁচটি সন্তান বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে—আজ কী খাওয়াবে?
বাজারে রুটির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মুরগির দাম চার গুণ। তেল, ডাল, চাল—সব আকাশছোঁয়া। ফয়সাল যা টাকা পায়, তাতে এক টুকরো রুটি আর কিছু আলু কেনা যায়। গুলালাই সেই আলু সেদ্ধ করে পাঁচ সন্তানের ভাগে ভাগ করে দেয়। পানি দিয়ে খায় তারা।
একদিন ফয়সাল স্ত্রীকে বলে, ‘আমি তুরস্কের সীমান্ত দিয়ে পালানোর চেষ্টা করব।’
গুলালাই চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘শুনেছি তুরস্কের সীমান্তরক্ষীরা গুলি করে। পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ। ইরানই এখন আমাদের একমাত্র আশ্রয়। আর এখানেও যদি না থাকা যায়?’
ফয়সাল উত্তর দেয় না। সে জানে—ইরানে থাকাও অসম্ভব। সরকার যুদ্ধের সুযোগে আফগানদের জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে পুশব্যাক করা হয়েছে।
সে তিন দিন পর বন্ধু ওমরকে নিয়ে তুরস্ক সীমান্তের দিকে রওনা হয়। ভোর রাতে। পায়ে হেঁটে। পথে পড়ে আছে লাশ। কেউ দুই দিন আগের, কেউ পাঁচ দিন আগের। অভিবাসী যারা পালাতে গিয়ে মরেছে।
ওমর ফিসফিস করে বলে, ‘ফয়সাল, আমরা কি সত্যিই পারব?’
ফয়সাল বলে, ‘পারব কি না জানি না। কিন্তু চেষ্টা না করলে মরব নিশ্চিত। চেষ্টা করলে হয়তো বাঁচব।’
রাত দুপুরে পৌঁছাল তুর্কি সীমান্তে। তারের বেড়া। ফাঁক আছে। ওমর আগে গেল।
গুলির শব্দ। ওমর মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ফয়সাল পেছনে ফিরে দৌড়াল। তার পায়ে রক্ত লেগেছে। নিজের? ওমরের? সে জানে না। সে শুধু দৌড়াল; দম ফুরিয়ে এলে হাঁটল, আবার দৌড়াল।
তিন দিন পর সে ফিরে এল তেহরানে। গুলালাই তাকে দেখে কাঁদল। জিজ্ঞেস করল, ‘ওমর কোথায়?’
ফয়সাল কিছু বলল না। শুধু মেঝেতে বসে পড়ল। তার শরীর কাঁপছে। সিগারেট নেই। টাকা নেই। সে আকাশের দিকে তাকাল। সেই তামাটে আকাশ। আফগানিস্তানের আকাশ ছিল নীল। এখনো কি নীল আছে? কে জানে।
ফয়সাল তখন বুঝতে পারল—তার বাঁচার আর কোনো পথ নেই। ইরান তাকে চায় না। আফগানিস্তান তাকে মরতে চায়। তুরস্ক গুলি করে। পাকিস্তান দরজা বন্ধ।
সে এখন ‘বাধ্যতামূলক নিশ্চলতা’র শিকার। বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারে না, মরার সাহস পায় না। শুধু ভাবে—তার পাঁচটি সন্তান। তাদের কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানে না ফয়সাল। জানে না কেউ। শুধু সেই তামাটে আকাশ জানে। কিন্তু আকাশ তো সব জানে। তবু কেন বোমা ফেলে?
ফয়সাল আবার ঘুমাতে গেল। হয়তো স্বপ্নে আফগানিস্তানের নীল আকাশ দেখবে। সেখানে তার মা থাকবে, হাতে সেদ্ধ আলু দিয়ে বলবে—‘খেয়ে নে বাবা।’
সেই আলু খেতে খেতে ফয়সালের ঘুম ভাঙবে না। চিরকাল ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার সন্তানদের জন্য তাকে জাগতে হবে। আবার ভোরে দাঁড়াতে হবে ময়দানে। আর বলতে হবে—‘আমাকে নেন, আমি ভালো কাজ করি।’
আল্লাহ জানেন, সত্যিই ভালো কাজ করে ফয়সাল। কিন্তু ভালো কাজের বাজার এখন বন্ধ।
লারা খ্রিস্টান। তার ভাই ফিলিপ খ্রিস্টান। তারা গাজায় বাস করে। গাজা শহরটা এখন ধ্বংসস্তূপ। ইসরায়েলি বোমায় হাসপাতাল উড়ে গেছে, স্কুল উড়ে গেছে, গির্জা উড়ে গেছে।
ফিলিপের কিডনি বিকল। তার ডায়ালাইসিস দরকার। কিন্তু গাজার হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ইউনিট চালু নেই। লারা ভেবেছিল—মিশর সীমান্ত পার হলে ওপারের হাসপাতালে চিকিৎসা হবে। ভাই বাঁচবে।
ভোর চারটায় তারা হাঁটা শুরু করল। লারা ফিলিপের হাত ধরে। ফিলিপের পা ফুলে গেছে, শরীর দুর্বল। প্রতি কয়েক পা পর পর থামতে হয়। লারা ভাইকে পানি খেতে দেয়। ফিলিপের পানি খেতেও কষ্ট হয়।
সূর্য ওঠার সময় তারা পৌঁছাল রাফাহ সীমান্ত চেকপয়েন্টে। সেখানে ইসরায়েলি সেনা। কালো সানগ্লাস পরা, হাতে মেশিনগান। লারা এগিয়ে গেল—‘আমার ভাই অসুস্থ, ওকে ডায়ালাইসিস দরকার, প্লিজ পার হতে দাও।’
সেনা উত্তর দিল না। সিগারেট টানল। তারপর ইশারা করল—পিছু হটতে।
লারা ফিরে এল ভাইয়ের কাছে। বসে পড়ল রাস্তার ধারে। গরমে শরীর জ্বলছে। ফিলিপ পানি চাইল। পানি নেই। লারা নিজের শেষ পানিটুকু ভাইকে দিল।
দুপুরে রোদ মাথার ওপর। লারা আবার গেল চেকপয়েন্টে। এবার চিৎকার করল। সেনা তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। লারা মাটিতে পড়ে গেল। মাথা ফেটে রক্ত বের হলো।
সে উঠে ভাইয়ের কাছে ফিরে এল। ভাই ফিলিপ তখন মাটিতে শুয়ে। চোখ বন্ধ। আর নড়ে না।
লারা চিৎকার করে উঠল। সীমান্তের মরুভূমিতে তার চিৎকার শোনা গেল মাইল দূরে। কিন্তু কেউ এল না। সেনারা সিগারেট টানতে লাগল।
বিকেলে লারাও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল সে। দুই ভাইবোন পাশাপাশি শুয়ে থাকল। হাত ধরে আছে। চোখে মরুভূমির বালি। গালে বোমার ধুলো।
একজন সেনা এগিয়ে এসে দেখল। বলল, ‘আরেক জোড়া অভিবাসী। সরিয়ে ফেলো লাশ।’
সিরিয়ার ইউফ্রেটিস নদীর তীরে, রাক্কা শহরের কাছে, একটি পরিত্যক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। বিদ্যালয়ের দেয়ালে সবুজ চকবোর্ড। চকবোর্ডে এখনো লেখা আছে—‘বসন্ত আসবে, ফুল ফুটবে।’ লেখাটি শিশুদের হাতের। দুই বছর আগের।
ওই বিদ্যালয়ে এখন হাসপাতাল। পরিচালনা করেন ডা. রবার্ট ফ্যাবিচ, জার্মান চিকিৎসক। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এসেছিলেন সিরিয়ায়; পরে আর ফেরেননি। দেখেছেন এত মৃত্যু, এত রক্ত যে ফিরে যেতে মন চায় না।
প্রতিদিন সকালে ডা. ফ্যাবিচ ট্রমা বোর্ডে নতুন নাম লেখেন। আহত শিশু, নিহত শিশু, ছিন্নভিন্ন দেহ, চোখ ফুঁটে যাওয়া, পা না থাকা, মাথায় গভীর ক্ষত।
একদিন একটি পাঁচ বছরের মেয়েকে আনা হলো। নাম আইজা। তার দুই পা নেই। বোমা এসে উড়িয়ে নিয়েছে। আইজা কাঁদছে না। সে শুধু তাকিয়ে আছে শূন্যে। চোখের দৃষ্টি যেন কোনো অচেনা দেশে হারিয়ে গেছে।
ডা. ফ্যাবিচ আইজাকে কোলে নিলেন। তার চুলে হাত বোলালেন। কিছু বললেন। আইজা সাড়া দিল না। শুধু তাকিয়ে থাকল।
পরে ডা. ফ্যাবিচ তাঁর ডায়েরিতে লিখলেন:
‘আজ আমি একটি শিশুকে বাঁচাতে পারিনি। আমি চিকিৎসক, জীবন বাঁচানো আমার পেশা। কিন্তু যুদ্ধ যখন শিশুদের টার্গেট করে, তখন আমি পরাজিত। আমরা সবাই পরাজিত। সেই আইজা, যার পা দুটো উড়ে গেছে, সে কোনোদিন দৌড়াবে না। সে কোনোদিন লাফাবে না। সে শুধু বসে থাকবে, আর ভাববে—কেন আমি বাঁচলাম? এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। ঈশ্বর জানেন কি?’
ট্রমা বোর্ডে প্রতিদিন নতুন নতুন নাম যুক্ত হয়। যেন এটি কোনো স্কুলের উপস্থিতি রেজিস্টার নয়, বরং মৃত্যুর খাতা। ডা. ফ্যাবিচ ভাবেন—এই বোর্ডে কবে থামবে নাম লেখা? যখন শেষ শিশু মরবে? নাকি শেষ যুদ্ধ থামবে?
তিনি জানেন—যুদ্ধের শেষ নেই। তাই ট্রমা বোর্ডের শেষও নেই।
তিনি আবার কলম হাতে নিলেন। লিখলেন আরেকটি নাম। আরেকটি ছোট্ট প্রাণের গল্প।
সময়ের হিসাব রাখা কঠিন। যুদ্ধের দিনগুলো একাকার হয়ে যায়। সপ্তাহ, মাস—কোনটা যে কোনটা, তা চেনা দায়। মোজতবা পাতালঘর থেকে বেরোয়নি প্রায় কয়েক মাস। তার কম্পিউটারে এখন পাঁচ হাজার ঘণ্টার ফুটেজ। সে নিজেও জানে না এসব দিয়ে কী করবে। কিন্তু থামছে না। সম্পাদনা করছে, দেখছে, আবার কাঁদছে।
নাফিসে আর ফরহাদের বন্ধুদের দল ছোট হয়ে এসেছে। তিন বন্ধু মারা গেছে। একজন পালিয়েছে তুরস্কে। একজনের পুরো বাড়ি ধসে গেছে। নাফিসে এখন রাতে শুধু ফরহাদের বুকে মাথা রেখে ঘুমায়। স্যাম আর ইয়াল প্রায় খাওয়া বন্ধ করেছে। নাফিসে জোর করে তাদের মুখে দুধ দেয়।
আসল ছাদ ছেড়েছে। এখন জানালার পাশে বসে দূরের ধোঁয়া দেখে। তার বুটিকের ধ্বংসস্তূপ ঘাসে ঢেকে গেছে। প্রকৃতি নিজের জায়গা ফিরে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। কিন্তু মানুষের মন ঘাসে ঢাকে না।
এলাহীর ইনহেলার ফুরিয়ে এসেছে। সে শেষবারের মতো দম নিল। বাতাসে কিছুটা উন্নতি? নাকি কল্পনা? সে জানে না। তার ছেলে এখনো তাকে চেনে না। কিন্তু ছোট বোনের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছে—‘আমার মা কেমন আছেন?’ ‘আমার মা’ শব্দ দুটি এলাহীকে কাঁদায়। সাত বছরের কারাবাস সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।
ফয়সালকে কেউ খোঁজে না। সে পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরিতে থাকে; বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই। শুধু দেয়াল ও ভাঙা মেশিন। তার পাঁচ সন্তান ক্ষুধার্ত। সে প্রতিদিন ভোরে ময়দানে যায়, শূন্য হাতে ফেরে।
২০২৬ সালের ডিসেম্বর। যুদ্ধবিরতি। দোহায় বসে ইরানের নতুন সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা চুক্তি সই করল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে সব উজ্জ্বল। কূটনীতিকরা হাসলেন, শপথ নিলেন, বললেন—‘আমরা শান্তির নতুন যুগ শুরু করছি।’
যুদ্ধ থামল সত্যি। বোমা পড়া বন্ধ হলো। ড্রোন উড়ে না। কিন্তু থামল কি সত্যিই সবকিছু?
মোজতবা যখন পাতালঘর থেকে বেরিয়ে এল, চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার। সূর্যের আলো দেখে সে প্রায় অন্ধ। রাস্তায় নেমে দেখল—শহর ধ্বংসস্তূপ। মানুষ ফিরছে না। যারা বেঁচে আছে তারা কঙ্কালের মতো, চোখে শূন্যতা।
সে তার বাবা-মায়ের খোঁজে গেল পশ্চিম তেহরানে। যেখানে বাড়ি ছিল, সেখানে শুধু ধ্বংস। এক প্রতিবেশী বলল—‘আপনার বাবা-মা? তারা... চল্লিশ দিন আগে... শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়ার পথে বোমায়...’
মোজতবা মাটিতে পড়ে গেল। তার হাতে ক্যামেরা, লেন্সে ধুলো। সে ভাবল—সবকিছুই ধুলো। মানুষ ধুলো। স্বপ্ন ধুলো।
নাফিসে ফরহাদকে নিয়ে বেরোল ঘর থেকে। পার্কে গিয়ে বসল। দেখল পার্কের গাছগুলো পুড়ে গেছে, বেঞ্চ ভাঙা, দোলনা খালি। নাফিসে ফরহাদের হাত ধরল। বলল, ‘আমরা বাঁচব তো?’
ফরহাদ উত্তর দিল, ‘বাঁচতে হবে।’
‘কেন?’
‘কারণ স্যাম আর ইয়ালের আমাদের দরকার। তাদের খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। আমরা তাদের ছেড়ে যেতে পারি না।’
নাফিসে হাসল। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম সে সত্যিকারের হাসল।
আসল ছাদ থেকে নেমেছে। সে ফরহাদকে বলল—‘চলো বাজারে যাই। নতুন কাপড় কিনি। হয়তো আবার বুটিক খোলা যাবে।’ ফরহাদ রাজি হলো। বাজারে কিছু দোকানপাট খোলা। দাম অনেক বেড়েছে, কিন্তু আসল কিছু কিনতে পারল। ফরহাদের জন্য সাদা শার্ট, নিজের জন্য লাল ওড়না।
বাড়ি ফিরে সে ওড়না পরল। আয়নায় নিজেকে দেখল। কাঁদল। আয়নায় সে দেখল—যুদ্ধে ফাটা চোখ, শুকনো ঠোঁট, কুঁচকে যাওয়া গাল। কিন্তু লাল ওড়নার রংটা এখনো উজ্জ্বল। যেন বুকের ভেতরের আগুন নিভতে চায় না।
এলাহীকে খুঁজে পেল মোজতবা ও নাফিসে। এলাহী এখন একটি সেন্টারে কাজ করে—যুদ্ধপীড়িত নারীদের কাউন্সেলিং দেয়। হাতে এখনো নীল ইনহেলার, তবে নতুন। সরকার পুনরায় চিকিৎসা সেবা চালু করেছে।
এলাহী মোজতবাকে দেখে চিনতে পারল। বলল, ‘আপনি তো তথ্যচিত্র নির্মাতা। আমাদের গল্প বানান। পৃথিবীকে দেখান।’
মোজতবা চুপ করে থাকল। তার ভাঙা ক্যামেরা হাতে। বলল, ‘আমি বানাব। যতদিন বাঁচি, ততদিন এই গল্প বলব।’
ফয়সালকে কেউ খুঁজে পেল না। তার পরিবার পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরি থেকে নিখোঁজ। কেউ বলে পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছে। কেউ বলে তালিবান ধরে নিয়ে গেছে। কেউ বলে সীমান্তের ওপারে মারা গেছে। ঠিকানা নেই, শেষ খবর নেই। ফয়সাল শুধু একটি নাম হয়ে গেল—লাখো অভিবাসীর একজন, যাদের গল্প কেউ জানে না, কেউ বলে না।
আকাশ ফিরে পেল নীল রঙ, কিন্তু...
যুদ্ধবিরতি হলো। কূটনীতিকরা চুক্তি সই করলেন। সংবাদমাধ্যমে বড় বড় শিরোনাম—‘সংঘাতের অবসান’, ‘নতুন যুগের সূচনা’।
তবে সাধারণ মানুষ জানে—যুদ্ধ শেষ হয়নি। যুদ্ধ বদলেছে রূপ। এখন এটি বাস করে তাদের মনে। প্রতিটি বিস্ফোরণের শব্দ সাইরেনের মতো বাজে প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে। প্রতিটি অচেনা শব্দে তারা লাফিয়ে ওঠে। প্রতিটি আকাশে উড়ন্ত পাখি দেখে তারা ভাবে—ড্রোন কি না!
নাফিসের অ্যাপার্টমেন্টে স্যাম আর ইয়াল এখন খায়। কিন্তু জানালার কাছে গেলে এখনো কাঁপে। আসলের বুটিক পুনরায় খোলেনি। সামনে সাইনবোর্ড—‘শীঘ্রই আসছি।’ কিন্তু কবে? কেউ জানে না।
এলাহী এখনো ছেলের সঙ্গে দেখা করেনি। তবে ফোনে কথা হয়। ছেলে বলে, ‘মা, একদিন আসব তোমার কাছে।’ এলাহী সেই ‘একদিন’-এর অপেক্ষায় থাকে। তার হাতে নীল ইনহেলার, বুকের ভেতর নীল বিষাদ।
মোজতবার তথ্যচিত্র শেষ হয়েছে। নাম দিয়েছে ‘কালো বৃষ্টির নিচে’। আন্তর্জাতিক উৎসবে দেখানো হয়েছে। অনেকে দেখেছে, কেউ কেউ কেঁদেছে। কিন্তু কী লাভ? যে পৃথিবী যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি, সেই পৃথিবী কি তথ্যচিত্র দেখে বদলে যাবে?
মোজতবা বিশ্বাস করে—হ্যাঁ, বদলে যাবে। কারণ মানুষের মন বদলায়। ধীরে ধীরে হলেও বদলায়। আর যতদিন একজন মানুষ বাঁচে, ততদিন আশা থাকে।
তেহরানের আকাশ এখন আবার নীল। কালো ধোঁয়া ধীরে ধীরে কমেছে। আলবোর্জ পর্বতের চূড়ায় আবার সোনালি রোদ পড়ে। শহরের রাস্তায় মানুষ ফিরছে। দোকানপাট খুলছে। শিশুরা আবার স্কুলে যাচ্ছে। পথে পথে আবার হাসি—অবশ্যই, হাসি ফিরেছে। মানুষ তো হাসবেই। না হাসলে বাঁচা যায়?
কিন্তু পুরোনো ক্ষত রাতারাতি শুকায় না। সেগুলো থাকবে। থাকবে মোজতবার ভাঙা ক্যামেরার লেন্সে। থাকবে নাফিসের সোফায় কুঁকড়ে থাকা স্যাম আর ইয়ালের চোখে। থাকবে আসলের বুটিকের পোড়া ছাইয়ের গন্ধে। থাকবে এলাহীর নীল ইনহেলারের শেষ ফোঁটায়।
আর থাকবে ফয়সালের মতো লাখো মানুষের অদৃশ্য প্রস্থানের কাহিনি—যাদের নাম কোনো চুক্তির পাতায় লেখা হয়নি, যাদের মৃত্যু সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়নি, যারা কেবল ধ্বংসস্তূপের ফাঁকে ফাঁকে হারিয়ে গেছে এক অস্পষ্ট স্মৃতিচিহ্ন হয়ে।
কূটনীতিকরা যখন বিলাসবহুল হোটেলে বসে চুক্তি সই করেন, তখন হয়তো কামানের গর্জন থামে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে সাইরেন বাজতে শুরু করে, তা আর কখনো থামে না। সেই সাইরেন শোনা যায় আজও। শোনা যায় মোজতবার ক্যামেরার রেকর্ডিংয়ে, শোনা যায় নাফিসের অশ্রুভেজা গানগুলোতে, শোনা যায় এলাহীর প্রতিটি নির্জন রাতে।
যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ছবি শেষ হয়নি। কারণ আমরা সেই সব ছবি নিজেদের ভেতরে ধারণ করি। আর ততদিনই আমরা সত্যিকারের মানুষ থাকব—যতদিন আমরা সেসব ছবি দেখতে পাব, অনুভব করতে পারব, এবং অন্যকে দেখাতে পারব।
তেহরানের আকাশ আবার নীল। কিন্তু যে তামাটে ছাই রঙ একসময় শহর গ্রাস করেছিল, সেই রঙের আভা রয়ে গেছে মানুষের চোখের মণিতে। সেটা কখনো যাবে না। হয়তো যাওয়াও উচিত নয়। কারণ সেই রঙই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা কতটা ভাঙতে পারি, আবার কতটা বাঁচতে পারি।
আ যতদিন বাঁচার গল্প থাকবে, ততদিন এই উপন্যাস অমর।
আর যতদিন একজন মানুষ এই গল্প পড়বে, ততদিন ফয়সালের মতো কেউ না কেউ বাঁচবে। অন্তত গল্পে তো বাঁচবেই।