প্রকাশিত :  ২০:২৭
০৯ জুন ২০২৬

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতি করিম চাচার খোলা চিঠি

এক বৃদ্ধ নাগরিকের হৃদয়ের আর্তি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতি করিম চাচার খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আসসালামু আলাইকুম।

চিঠির শুরুতেই বলে রাখি, আমি কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি নই। আমার নামের আগে-পিছে কোনো উপাধি নেই, ক্ষমতার কোনো ছায়াও নেই। আমি করিম চাচা—বাংলার অগণিত সাধারণ মানুষের একজন। জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছি ধুলোভরা গ্রামের পথ, ভাঙা সেতু, বন্যার জল আর মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প দেখতে দেখতে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেখেছি, তার কৈশোর দেখেছি, তার সংগ্রাম দেখেছি। দেখেছি স্বপ্নের উড়ান, আবার দেখেছি হতাশার দীর্ঘ ছায়াও।

আজ বার্ধক্যের এই প্রান্তবেলায় দাঁড়িয়ে আপনাকে একটি চিঠি লিখছি। এটি কোনো অভিযোগপত্র নয়, কোনো রাজনৈতিক ভাষণও নয়। এটি একজন সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের ভাষা; একটি দেশের জন্য, একটি ভবিষ্যতের জন্য এবং একটি প্রজন্মের জন্য লেখা এক আর্তি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

যখন সকালে বাজারে যাই, দেখি লোহার দাম বেড়েছে, রডের দাম বেড়েছে। একটি ছোট্ট বাড়ির স্বপ্ন আজ অনেক পরিবারের কাছে আকাশের তারার মতো দূর হয়ে গেছে। যে বাবা সারাজীবন সঞ্চয় করে সন্তানের জন্য মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই গড়তে চেয়েছিলেন, তিনি এখন হিসাবের খাতায় চোখ রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। যে তরুণটি নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখে, সে নির্মাণসামগ্রীর দাম শুনে নীরবে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পিছিয়ে দেয়।

আমরা কেবল দাম বাড়তে দেখি; কিন্তু সেই মূল্যবৃদ্ধির পেছনের অন্ধকার গলিগুলো দেখতে পাই না।

দেশের বন্দরগুলোতে, কাস্টমসের উঁচু দালানের ভেতরে, ফাইলের স্তূপ আর সিলমোহরের আড়ালে বহু বছর ধরে এমন এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, যার নাম দুর্নীতি। সেখানে আইন আছে, কিন্তু আইনের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে তার ব্যাখ্যা; নিয়ম আছে, কিন্তু নিয়মের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে প্রভাব। একজন ব্যবসায়ী যখন পণ্য নিয়ে বন্দরে আসেন, তখন তিনি শুধু রাষ্ট্রের করই দেন না; তাঁকে অনেক অদৃশ্য দরজায় কড়া নাড়তে হয়, অনেক অদৃশ্য দাবির সামনে মাথা নত করতে হয়।

সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের শেষ গন্তব্য কোথায়, জানেন? সেটি এসে পড়ে আমাদের রান্নাঘরের হাঁড়িতে, আমাদের সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ে এবং আমাদের বাড়ি নির্মাণের ইট-সিমেন্টের গাঁথুনিতে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আমি অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব জানি না। জিডিপি, রাজস্ব ঘাটতি কিংবা শুল্ক কাঠামোর গাণিতিক বিশ্লেষণও বুঝি না। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে একটি সত্য শিখিয়েছে—যে ব্যবস্থার ভেতরে অযথা জটিলতা থাকে, সেখানে দুর্নীতির শেকড় গজায়। আর যেখানে নিয়ম সহজ, স্পষ্ট এবং সবার জন্য সমান, সেখানে অসততার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

আজ কাস্টমসে একটি পণ্য খালাস করতে গিয়ে একজন ব্যবসায়ীকে এমন এক গোলকধাঁধায় প্রবেশ করতে হয়, যার শেষ কোথায়, তিনি নিজেও জানেন না। করের পর কর, হিসাবের পর হিসাব, ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা—আর এই জটিলতার অন্ধকারেই জন্ম নেয় দরকষাকষি, ঘুষ, ভয়ভীতি ও হয়রানি।

ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবাই। রাষ্ট্র হারায় তার প্রাপ্য রাজস্ব। সৎ ব্যবসায়ী হারায় তার আত্মবিশ্বাস। আর সাধারণ মানুষ হারায় ন্যায্য মূল্যে জীবনযাপনের অধিকার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আমি আপনার কাছে কোনো অলৌকিক সমাধান চাই না। আমি শুধু চাই একটি সহজ, স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট পণ্যভিত্তিক শুল্কব্যবস্থা, যেখানে কর কত হবে তা আগেই জানা থাকবে; যেখানে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করতে পারবেন না; এবং যেখানে আইন হবে মানুষের জন্য, মানুষ আইনের কাছে জিম্মি হবে না।

শুনেছি, দেশের কাস্টমস ব্যবস্থার কোনো কোনো জায়গায় নিরাপত্তার এমন ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি হয়েছে যে সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে শত শত কনটেইনার খালাস করে নেওয়া হয়েছে। কোথাও স্ক্যানার অচল, কোথাও ক্যামেরা অকার্যকর, কোথাও ওজন পরিমাপক যন্ত্র নীরব। এসব খবর পড়ে আমি শুধু একজন করদাতা হিসেবে উদ্বিগ্ন হই না; একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবেও শঙ্কিত হই। কারণ রাজস্ব চুরি মানে শুধু অর্থের ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যতের ওপরও আঘাত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশ উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সামনে যে পথ, তা সহজ নয়। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, চ্যালেঞ্জ বাড়বে, চাপও বাড়বে। এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিতাপূর্ণ প্রশাসন।

যদি কাস্টমসকে দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে মুক্ত করা যায়, যদি প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, যদি শুল্কব্যবস্থাকে সহজ ও আধুনিক করা যায়, তাহলে শুধু রাজস্বই বাড়বে না—দেশের শিল্পায়ন নতুন গতি পাবে, বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।

তখন হয়তো কোনো বাবা বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখে ভয় পাবেন না। কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করার আগে আতঙ্কিত হবেন না। কোনো তরুণ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আমরা সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চাই না। আমরা চাই রাষ্ট্রের অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হোক, দুর্নীতিবাজদের গোপন ভাণ্ডারে নয়। আমরা চাই সৎ মানুষ সম্মান নিয়ে বাঁচুক, আর অসৎ মানুষ আইনের ভয়ে কাঁপুক।

আমার বয়স হয়েছে। জীবনের অধিকাংশ পথ হেঁটে ফেলেছি। সামনে যতটা পথ আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পথ পেছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু এখনো যখন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাটি বাতাসে উড়তে দেখি, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোবাসা জেগে ওঠে।

আমি এখনো বিশ্বাস করি, এই দেশ আরও ভালো হতে পারে। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই আপনাকে লিখছি।

হয়তো একদিন আমার মতো সাধারণ মানুষের এই ছোট্ট চিঠি ইতিহাসের কোনো পাতায় স্থান পাবে না। কিন্তু যদি এই দেশের কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ একটু বেশি নিরাপদ হয়, যদি কোনো সৎ ব্যবসায়ী মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন, যদি রাষ্ট্র তার ন্যায্য রাজস্ব ফিরে পায়—তাহলেই এই বৃদ্ধ মানুষের কলম ধরা সার্থক হবে।

আল্লাহ আপনাকে ন্যায়, সাহস ও প্রজ্ঞার পথে পরিচালিত করুন। বাংলাদেশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্তগ্রহণের শক্তি দান করুন।


বিনীত,

করিম চাচা,

বাংলার মাটি, নদী ও মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর