প্রকাশিত : ১৪:৪৪
০৮ জুন ২০২৬
শায়খ ড. সাজিদ উমার
আল্লাহ তাআলা এই উম্মাহকে সর্বোত্তম জাতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন । কিন্তু আমরা সবাই জানি, একটি জাতি মূলত অসংখ্য পরিবারের সমষ্টি । সুতরাং যদি এই উম্মাহ সর্বোত্তম জাতি হয়, তাহলে এর পরিবারগুলোও অবশ্যই সর্বোত্তম পরিবার হতে হবে।
এ কারণেই কুরআন ও সুন্নাহ এমন এক সময়ে অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন ছিল অজ্ঞতা, শিরক, জুলুম ও অবিচারে নিমজ্জিত । তবুও তারা পরিবার, সন্তান প্রতিপালন এবং দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে শিক্ষা দিতে ভোলেনি । বরং কুরআন বিবাহ সম্পর্কে এমন এক সত্য শিক্ষা দেয়, যা আজ আমাদের অনেকের কাছেই হারিয়ে গেছে।
যখন কোনো বিয়ে বা নিকাহ হয়, আমরা আনন্দিত হই—এবং তা হওয়াই স্বাভাবিক । কারণ এটি শুধু দুই ব্যক্তির নয়, দুটি পরিবারেরও মিলন । কিন্তু কুরআন আমাদের আরও গভীর একটি কারণে আনন্দিত হতে শেখায় । কুরআন বলে, বিবাহ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন। এটি তাঁর একত্ববাদ, তাঁর ইবাদত এবং তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলীর প্রমাণ। আপনার নিকাহ, আপনার দাম্পত্য জীবন—আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের সাক্ষ্য বহনকারী একটি মাধ্যম হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন—পুরুষ ও নারী, আলো ও অন্ধকার, গরম ও ঠান্ডা। এই জোড়াগুলো আমাদের চিন্তা করতে শেখায়, যাতে আমরা উপলব্ধি করি যে প্রতিটি জোড়ার পেছনে রয়েছেন একমাত্র সেই সত্তা, যিনি নিজে কোনো অংশীদারবিহীন। প্রতিটি জোড়া আমাদের সেই এক আল্লাহর দিকেই নির্দেশ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো । আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। (সূরা রূম: ২১)। আপনার জীবনসঙ্গী আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন । এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে?
বিয়ে সহজ, বিচ্ছেদ কঠিন
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, ইসলামে বিয়ে কত সহজ? অভিভাবক, দুইজন সাক্ষী, মহর নির্ধারণ এবং উভয়ের সম্মতি—মাত্র কয়েক মুহূর্তেই নিকাহ সম্পন্ন হয়ে যায় । শরিয়ত বিয়েকে সহজ করেছে, কারণ বিবাহ আল্লাহর একটি নিদর্শন । কিন্তু অন্যদিকে, আল্লাহ এই চুক্তিকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা অন্য কোনো চুক্তিকে দেননি । তিনি একে বলেছেন “মীসাকান গালীযা”—একটি দৃঢ় ও গুরুগম্ভীর অঙ্গীকার।
তাই বিয়ে সহজ হলেও তালাককে সহজ করা হয়নি । প্রয়োজন হলে বিচ্ছেদেরও একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি রয়েছে—নির্ধারিত সময়, নিয়ম এবং দায়িত্বসহ। এটি আমাদের শেখায় যে, বিবাহ কেবল দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; বরং এটি তাওহীদের বাস্তব প্রয়োগের একটি অংশ।
বিবাহের দুটি উপহার
সূরা রূমের আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিবাহের দুটি বিশেষ উপহারের কথা উল্লেখ করেছেন।
১. মাওয়াদ্দাহ (মমতাপূর্ণ ভালোবাসা) : আমরা সাধারণত মাওয়াদ্দাহকে “ভালোবাসা” বলে অনুবাদ করি। কিন্তু এর অর্থ আরও গভীর। মাওয়াদ্দাহ হলো এমন ভালোবাসা, যা প্রকাশ পায়, অনুভূত হয়, অন্যের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। ইংরেজিতে যাকে বলা যায় এফেকশন।
বিয়ের আগে কোনো নারী-পুরুষের পারস্পরিক প্রেমের প্রকাশ গুনাহের কারণ হতে পারে। কিন্তু নিকাহর পর সেই একই হাসি সদকা হয়ে যায়, একই কথোপকথন সওয়াবের কাজ হয়ে যায়, এমনকি একে অপরকে খাবার খাওয়ানোও ইবাদত হয়ে যায়।
কিন্তু আজ অনেক দাম্পত্য সমস্যার মূল কারণ হলো—ভালোবাসা আছে, কিন্তু তা প্রকাশ পায় না।
স্বামী বলেন, আমি স্ত্রীকে ভালোবাসি । স্ত্রীও বলেন, আমি স্বামীকে ভালোবাসি। কিন্তু কেউই তা অনুভব করতে পারেন না।
অথচ মাওয়াদ্দাহ প্রকাশ করতে বড় কিছু লাগে না। একটি আন্তরিক বার্তা, একটি সুন্দর কথা, একটি মমতাময় স্পর্শ—এসবই ভালোবাসাকে জীবন্ত করে তোলে।
২. রহমাহ (দয়া ও করুণা): তাফসিরের অনেক আলেম বলেন, এখানে রহমাহ বলতে সন্তানদেরও বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ যদি আপনাকে সন্তান দান করেন এবং আপনি তাদের ঈমান ও তাকওয়ার ওপর লালন-পালন করেন, তবে তারা আপনার জন্য রহমতের উৎস হয়ে ওঠে ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তানরা ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরও তাদের সঙ্গে মিলিত করে দেব এবং তাদের আমলের কোনো অংশ কমিয়ে দেব না। (সূরা তূর: ২১)
অর্থাৎ জান্নাতে যদি সন্তানদের মর্যাদা পিতা-মাতার চেয়ে বেশি হয়, আল্লাহ পিতা-মাতাকেও সেই উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করবেন। আর যদি পিতা-মাতার মর্যাদা বেশি হয়, সন্তানদেরও তাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেবেন। পৃথিবীতে একটি পরিবার, জান্নাতেও একটি পরিবার।
উন্নত দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলুন
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম । আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।
আমরা জীবনের সব ক্ষেত্রে সেরাটা চাই—সেরা চাকরি, সেরা ব্যবসা, সেরা বাড়ি। কিন্তু ঘরের ভেতরের চরিত্রকে কতটা উন্নত করার চেষ্টা করি? সন্তানরা আমাদের কথা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে আমাদের আচরণ দেখে।
তারা দেখে—আমরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে কথা বলি, কীভাবে সম্মান করি, কীভাবে মতভেদ সামলাই, কীভাবে পরস্পরকে গুরুত্ব দিই। এভাবেই তারা ভবিষ্যতের স্বামী, স্ত্রী ও অভিভাবক হিসেবে গড়ে ওঠে।
অধিকার নয়, দায়িত্ব
দাম্পত্য জীবনের বড় একটি সমস্যা হলো—আমরা দায়িত্ব ভুলে গিয়ে শুধু নিজের অধিকার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং খাদিজা (রাঃ)-এর জীবনের দিকে তাকান । নবী (সাঃ) খাদিজা (রাঃ)-এর ঘরেই বসবাস করেছিলেন । খাদিজা (রাঃ) কখনো এটি তাঁর ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে নবী (সাঃ) খাদিজা (রাঃ)-এর সন্তান হিন্দকে নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করেছিলেন। পরে নবী (সাঃ) যখন আবু তালিবের কষ্ট লাঘবের জন্য আলী (রাঃ)-কে নিজের ঘরে নিয়ে আসতে চাইলেন, খাদিজা (রাঃ) কোনো আপত্তি করেননি । বরং সাদরে গ্রহণ করেছিলেন । এটাই দায়িত্বভিত্তিক বিবাহ। যেখানে স্বামী-স্ত্রী হিসাবের খাতা নিয়ে বসে না—“আমি এত করলাম, তুমি কী করলে?” বরং তারা ভাবে—আমি কীভাবে আমার দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পারি? এটাই কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা। এটি কেবল জীবন কাটানোর জন্য একটি সম্পর্ক নয়; এটি চিরস্থায়ী সফলতার জন্য একটি বন্ধন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উত্তম পরিবার দান করুন। আমীন।