প্রকাশিত :  ১১:৪২
০৮ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৫
০৮ জুন ২০২৬

আগামীকালের পুঁজিবাজার কোন পথে হাঁটবে?

সম্পাদকীয়

আগামীকালের পুঁজিবাজার কোন পথে হাঁটবে?

ঢাকা, ৯ জুন, ২০২৬: দেশের পুঁজিবাজার গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এক অদ্ভুত দোলাচলে আটকে আছে—কখনো ঊর্ধ্বমুখী, কখনো আবার হঠাৎ করেই থমকে যাচ্ছে। টানা কয়েক কার্যদিবসের ঊর্ধ্বগতির পর গত রোববার ডিএসইতে (DSE) লেনদেন যখন ১,৫০০ কোটি টাকার রেকর্ড ছুঁয়েছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন—বাজার হয়তো এবার নতুন এক উত্থান-পর্বে প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই আশার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার সকালে দৃশ্যপট বদলে গেল।

লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টাতেই সূচকে চাপ, অধিকাংশ শেয়ারের দরপতন এবং বিনিয়োগকারীদের একাংশের দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলো। এখন প্রশ্ন উঠছে, এটি কি বড় ধরনের পতনের পূর্বাভাস, নাকি দীর্ঘ উত্থানের পর একটি স্বাভাবিক সংশোধনমাত্র?

বাস্তবতা হলো, বাজারে এই ধরনের ‘প্রফিট বুকিং’ বা মুনাফা তুলে নেওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের উত্থানের পর বিনিয়োগকারীরা যখন লাভ তুলে নিতে শুরু করেন, তখন সূচকে চাপ আসাই স্বাভাবিক। এটিকে আতঙ্ক হিসেবে না দেখে বরং বাজারের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস হিসেবেই দেখা উচিত।

তবে বাজারের এই পরিবর্তনের পেছনে একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে—ফ্লোর প্রাইস (সর্বনিম্ন মূল্যসীমা) প্রত্যাহার। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব বাজারে দীর্ঘদিন ধরে থাকা এই কৃত্রিম মূল্যসীমা তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকোর মতো বড় কোম্পানির শেয়ারে যে ‘বন্দিদশা’ তৈরি হয়েছিল, বাজার এখন তা থেকে বেরিয়ে আসছে।

এ পরিবর্তন নিঃসন্দেহে কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফ্লোর প্রাইস থাকলে বাজারে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং লেনদেনও অনেকাংশে স্থবির হয়ে যায়। এখন সেই বাধা উঠে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে চাপ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে স্বচ্ছতার দিকেই এগিয়ে নেবে।

অন্যদিকে, আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চ্যালেঞ্জিং। বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বেসরকারি খাতে তারল্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—যার সরাসরি প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়তে পারে।

তা ছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপও উপেক্ষা করার মতো নয়। মে মাসে ৯ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি সাধারণ বিনিয়োগকারীর ক্রয়ক্ষমতা সীমিত করেছে। ফলে বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহের গতি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ধীর হতে পারে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও পুরোপুরি অনুকূলে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এশিয়ার কিছু অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে পারে।

তবে পুরো চিত্রটি একেবারে নেতিবাচক নয়। বিদ্যুৎ খাতে ডরিন পাওয়ারের একীভূতকরণ, রবি আজিয়াটার মুনাফা বৃদ্ধি, নাভানা ফার্মার শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মা ও রেনাটার মতো ব্লু-চিপ শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের উপস্থিতি বাজারে একটি স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে আগামীকালের বাজার নিয়ে এককথায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। তবে প্রবণতা বলছে, স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপ ও মুনাফা গ্রহণের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে এবং লেনদেনও কিছুটা সংকুচিত হতে পারে। কিন্তু এটিকে বড় কোনো ধস হিসেবে দেখার কারণ নেই।

বরং বলা যায়, বাজার এখন এক ধরনের রূপান্তরপর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে কৃত্রিম স্থিতিশীলতা সরে গিয়ে ধীরে ধীরে বাস্তবমুখী মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই পথ সহজ নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা বাজারের জন্য স্বাস্থ্যকর।

শেষ পর্যন্ত বাজারে টিকে থাকবেন তারাই, যারা আতঙ্কের পরিবর্তে যুক্তিকে গুরুত্ব দেবেন এবং স্বল্পমেয়াদি ওঠানামাকে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার অংশ হিসেবে দেখতে শিখবেন।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর