প্রকাশিত :  ১৯:৫২
০৭ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৫৭
০৭ জুন ২০২৬

বাজেটের সামনে কঠিন বাস্তবতা: প্রতিশ্রুতি ও সক্ষমতার পরীক্ষায় নতুন সরকার

বাজেটের সামনে কঠিন বাস্তবতা: প্রতিশ্রুতি ও সক্ষমতার পরীক্ষায় নতুন সরকার

দীর্ঘ রাজনৈতিক পালাবর্তনের পর নতুন সরকারের প্রথম বাজেট কেবল একটি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অনেক সূচকই চাপের মুখে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে, ব্যাংক খাত দুর্বল, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির এবং রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ও কৌতূহল—দুই-ই রয়েছে।

বড় বাজেট ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট। আকারের দিক থেকে এটি অবশ্যই উচ্চাভিলাষী; কিন্তু বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বড় বাজেট প্রণয়ন করা তুলনামূলক সহজ হলেও তা বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজস্ব আদায় নিয়ে। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি, যার সিংহভাগই আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। এমনকি কর-জিডিপি অনুপাতও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে। ফলে কাগজে-কলমে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই তা অর্জিত হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ঘাটতি অর্থায়ন ও 'ক্রাউডিং আউট' ঝুঁকি

রাজস্ব ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজেট ঘাটতির ওপর। প্রস্তাবিত বাজেটে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু এখানেও ঝুঁকি রয়েছে; ব্যাংক খাত ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে ভুগছে। এই অবস্থায় সরকার যদি ব্যাংক থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা আরও কমে যেতে পারে—অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’।

নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের পরপরই জনগণের ওপর নতুন করের বোঝা চাপানো রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক নয়। সে কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত কয়েকটি নতুন কর প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলেই জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে তরুণ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য কর অব্যাহতির মতো উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরিতে এসব সিদ্ধান্ত সহায়ক হতে পারে।

বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা

এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ এখনো উপযুক্ত কাজের সুযোগ পাচ্ছে না। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগও দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত গতি অর্জন করতে পারেনি। সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে এবং শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচির কথা বলছে। বন্ধ বা অর্ধসচল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক। তবে শুধু স্বল্প সুদের ঋণ দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না; বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবারও বাজেটের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে। মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং অপচয় রোধ করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

কৃষি ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা

উদ্বেগের আরেকটি বিষয় কৃষি খাত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষির গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় বাজেটে কৃষির বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার মতো সংকটের মুখে কৃষি খাতকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিলে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতির ওপর পড়বে।

এবারের বাজেটে সবচেয়ে ভারী বোঝাগুলোর একটি হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। সুদ খাতে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়া একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। উন্নয়ন ব্যয়ের পরিবর্তে যদি রাজস্বের বড় অংশ অতীতের ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়বে। একইভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল ভর্তুকির চাপও সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলছে।

সদিচ্ছা ও সংস্কারের পরীক্ষা

ইতিবাচক দিক হলো, সরকার সৃজনশীল অর্থনীতি ও ডিজিটাল খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে অর্থনীতির মূল ভিত্তি—উৎপাদন, রপ্তানি, কৃষি ও বিনিয়োগ—শক্তিশালী না হলে শুধু সৃজনশীল অর্থনীতি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না।

সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, অন্যদিকে সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। তাই বড় বাজেট, বড় প্রতিশ্রুতি কিংবা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা।

অর্থনীতির বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। নতুন সরকারের জন্য এ বাজেট তাই কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতারও প্রথম বড় পরীক্ষা।


Leave Your Comments




জাতীয় এর আরও খবর