প্রকাশিত : ১৯:১৯
০৭ জুন ২০২৬
দীর্ঘদিনের বিতর্ক, আলোচনা ও নীতিগত টানাপোড়েনের পর অবশেষে ফ্লোর প্রাইসের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেছে দেশের পুঁজিবাজার। আগামীকাল সোমবার থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারের ওপর আর কোনো ফ্লোর প্রাইস কার্যকর থাকবে না। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে চলা কৃত্রিম মূল্যসীমার যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
রোববার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদের সৌজন্য বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বৈঠকে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, বাজারে আর কোনো কৃত্রিম ফ্লোর প্রাইস রাখা হবে না। ফলে সোমবার থেকে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার আওতায় লেনদেন হবে।
বর্তমানে বেক্সিমকোর শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ১১০ টাকা ১০ পয়সা এবং ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ৩২ টাকা ৬০ পয়সা। এর আগে অধিকাংশ কোম্পানির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হলেও বিভিন্ন কারণে এই দুটি কোম্পানিকে এর আওতায় রাখা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে পুঁজিবাজার পুরোপুরি বাজারনির্ভর মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
করোনা থেকে যুদ্ধ—ফ্লোর প্রাইসের দীর্ঘ পথচলা
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের মার্চে, করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কায় বাজারকে বড় ধরনের পতন থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২১ সালে তা তুলে নেওয়া হয়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় ২০২২ সালের জুলাইয়ে আবারও ফ্লোর প্রাইস চালু করা হয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থা বহাল থাকায় বাজারে তারল্যসংকট বাড়তে থাকে। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ শেয়ার বিক্রি করতে না পেরে আটকে পড়েন। এ অবস্থায় চলতি বছরের শুরু থেকে কমিশন ধাপে ধাপে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়।
ফ্লোর প্রাইস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রাক্কালে তৎকালীন কমিশন বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পরবর্তী সময়ে তা বাতিল করা হয়। এরপর চারটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংককে আগের অবস্থায় রাখা হয়েছিল।
ব্রোকারদের চাপ ও আটকে থাকা বিনিয়োগ
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। বছরের পর বছর অনেকেই তাঁদের বিনিয়োগ আটকে রাখতে বাধ্য হয়েছেন। একই সঙ্গে মার্জিন ঋণগ্রহীতা বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নেতিবাচক ইক্যুইটির ঝুঁকিতে পড়েছেন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) একাধিকবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে এই দুটি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিল, কৃত্রিমভাবে মূল্য আটকে রাখার ফলে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে বলে মনে করেন বাজারবিশ্লেষকেরা। কারণ অধিকাংশ উন্নত ও উদীয়মান বাজারে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দেখা যায় না।
বেক্সিমকোকে ঘিরে উদ্বেগ
ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বেক্সিমকো। একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত প্রধান কোম্পানিটি বর্তমানে আর্থিক ও পরিচালন সংকটে রয়েছে।
সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোম্পানিটির রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের লোকসানও হয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রমে স্থবিরতা, তারল্যসংকট, ঋণসংক্রান্ত জটিলতা এবং কারখানা পরিচালনায় সমস্যার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাজারবিশ্লেষকদের ধারণা, মুক্ত লেনদেন শুরু হলে শেয়ারটির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য মূল্যসংশোধন ঘটতে পারে।
ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক চ্যালেঞ্জ
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততার সূচকও চাপে রয়েছে।
টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে না পারায় ব্যাংকটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর ব্যাংকটির শেয়ারদরেও বাজারভিত্তিক সমন্বয় ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংস্কারের বার্তা
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কেবল দুটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের বিষয় নয়; এটি নতুন কমিশনের বাজার সংস্কার কর্মসূচিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
সম্প্রতি বাজারে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে এবং প্রধান সূচকও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কমিশন আইপিও প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ, মার্জিন ঋণ ব্যবস্থার সংস্কার এবং দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর মতো উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদরে চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং এর প্রভাব সূচকেও পড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্বচ্ছতা, তারল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ফ্লোর প্রাইসের অবসান একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পুঁজিবাজারে কৃত্রিম সুরক্ষার যুগের অবসান ঘটিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক নিয়মে ফিরিয়ে আনার এই সিদ্ধান্ত কতটা ইতিবাচক ফল বয়ে আনে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট সবার।