রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরেই আস্থার সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের হতাশার এক দীর্ঘ অধ্যায় অতিক্রম করেছে। সেই বাস্তবতায় গত কয়েক কার্যদিবসের ধারাবাহিক উত্থান শুধু সূচকের অগ্রযাত্রা নয়, বরং বাজারের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতও বটে।
রবিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) টানা দশম কার্যদিবসের মতো সূচকের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান এবং প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর বাজারে তারল্যের এমন প্রবাহ দেখা যাচ্ছে, যা প্রমাণ করে—অনেক বিনিয়োগকারী আবারও পুঁজিবাজারকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন।
এই ইতিবাচক প্রবণতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে পরিবর্তন। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কারণ পুঁজিবাজার মূলত আস্থার বাজার। এখানে শুধু অর্থ নয়, ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাও বিনিয়োগ হয়।
নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধিদের বৈঠক এবং আইপিও প্রক্রিয়া আধুনিকীকরণ, মার্জিন ঋণ নীতিমালা পর্যালোচনা ও মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সংস্কারের মতো বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব কাঠামোগত দুর্বলতা বাজারকে পিছিয়ে রেখেছিল, সেগুলো সমাধানের ইঙ্গিতই যেন বাজার পেয়েছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই উত্থান কতটা টেকসই?
ইতিহাস বলে, পুঁজিবাজারে শুধু প্রত্যাশার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। নীতিগত ঘোষণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার বাস্তবায়ন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পরিবর্তনের ফলাফল দেখতে চান।
রবিবারের বাজারে কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক উত্থানও লক্ষ্য করা গেছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়া স্বল্পমেয়াদে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য তা স্বাস্থ্যকর নয়। একটি কোম্পানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত তার ব্যবসায়িক সক্ষমতা, মুনাফা, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতে।
অন্যদিকে বাজারে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে অস্বীকার করাও যাবে না। টানা কয়েক দিনের উত্থানের পর অনেক বিনিয়োগকারী স্বাভাবিকভাবেই অর্জিত মুনাফা নগদায়নের চেষ্টা করবেন। ফলে আগামী কার্যদিবসে সূচকের সাময়িক ওঠানামা বা মূল্য সংশোধন দেখা গেলে সেটিকে অস্বাভাবিক বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বরং একটি সুস্থ বাজারে মাঝেমধ্যে এমন সংশোধন প্রয়োজনও হয়।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি স্বস্তির জায়গায় পৌঁছায়নি। মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান। ফলে পুঁজিবাজারের বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতাকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
সোমবারের বাজার তাই এক অর্থে একটি পরীক্ষার দিন। বিনিয়োগকারীরা দেখবেন, সাম্প্রতিক উচ্ছ্বাসের পেছনে প্রকৃত আস্থা কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যদি তারল্যের প্রবাহ বজায় থাকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় থাকেন, তাহলে বাজার ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে যেতে পারে। তবে গুজবনির্ভর লেনদেন ও অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা আবারও বাজারকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
পুঁজিবাজারের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় একটি বার্তা—এই বাজার আর কৃত্রিম উত্থান-পতনের নয়, বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা ও মৌলভিত্তিক বিনিয়োগের পথে হাঁটতে চায়। সাম্প্রতিক উত্থান সেই পথচলার সূচনা হতে পারে। তবে সেটি স্থায়ী হবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করে সংস্কারের ধারাবাহিকতা ও বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর।
বিনিয়োগকারীদের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—গুজব নয়, তথ্য; আবেগ নয়, বিশ্লেষণ; আর স্বল্পমেয়াদি উত্তেজনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবোধই হওয়া উচিত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
Leave Your Comments