প্রকাশিত : ১৫:৩৬
০৬ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:২৪
০৬ জুন ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
১৯৬৭ সালের মে মাস। জ্যৈষ্ঠের অলস দুপুর মেঘনার বুকে। খাঁ খাঁ রোদের রাজত্ব; এমন তীব্র রৌদ্র যে মনে হয় কেউ যেন গলানো রুপোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে নীল জলের শরীরে। প্রমত্তা মেঘনা বয়ে চলেছে—আদিম ঐশ্বর্য আর রুদ্ররূপ নিয়ে, অবাধ গতিতে। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে তীরের পলিমাটিতে, আর ওঠে এক অদ্ভুত খলখল ধ্বনি। মাঝনদীতে পালের নৌকো ভাসে; বাতাসের শনশন শব্দ আর জলের কুলকুল ধ্বনি মিলে তৈরি করে এক অপার্থিব জলতরঙ্গ।
এই মেঘনার আঁচল ঘেঁষেই কেটেছে নূরজাহানের ডানপিটে শৈশব। তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোরী, ডাগর চোখে অন্তহীন কৌতূহল। গ্রামের অন্য মেয়েরা যখন ঘরের কোণে পুতুল খেলা বা রান্নাবান্না শিখছে, নূরজাহান তখন ছুটে বেড়ায় মেঘনার চরে। তার চুলে জড়িয়ে থাকে নদীর শীতল বাতাস, পায়ে লেগে থাকে নরম পলি। নিজেকে মাটির চেয়ে নদীরই অংশ ভাবতে বেশি ভালোবাসে সে। দিগন্তের দিকে তাকালে যেন ডানা মেলে ওড়ার এক গোপন ব্যাকুলতা তাকে ডাকে। প্রতিদিন বিকেলে ঘাটের শান বাঁধানো সিঁড়িতে এসে একা বসলে মনে হয়, নদী ফিসফিসিয়ে তার কানে কোনো আদিম রহস্যের কথা বলে যাচ্ছে—এমন এক ভাষা, যা শুধু নদী আর নূরজাহানই বোঝে।
নূরজাহানের বাবা মফিজুদ্দিন আহমদ। গ্রামের একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। পরনে ধবধবে সাদা পায়জামা, গায়ে ফতুয়া আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তিনি শুধু ইংরেজি ব্যাকরণের ‘ভয়েস চেঞ্জ’ বা ‘ন্যারেশন’-ই শেখাতেন না; ব্ল্যাকবোর্ডে চকের দাগ টেনে দিয়ে শেখাতেন জীবন চেনার গভীর পাঠ। সৎ, অমায়িক ও দূরদর্শী—এই মানুষটিই ছিলেন নূরজাহানের চোখের চেনা পৃথিবীর নীল আকাশ। গ্রামের লোকেরা তাকে যেমন সমীহ করত, তেমনি পরম শ্রদ্ধায় হৃদয়ে রাখত।
তিনি জানতেন, তাঁর এই মেয়েটি সাধারণ নয়। নূরজাহানের চোখে অন্যরকম এক আলো। তাই ঘরের কাজের ফাঁকে তিনি মেয়েকে শোনাতেন দেশ-দুনিয়ার গল্প। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপের কবি-দার্শনিকদের কথা—সবই বলতেন সহজ-সরল ভাষায়। নূরজাহান শুনত মন্ত্রমুগ্ধের মতো, আর তার কিশোরী মনে ধীরে ধীরে ডানা মেলাতে শুরু করত এক বিশাল পৃথিবীর স্বপ্ন।
এমনই এক জ্যৈষ্ঠের বিকেলে—যখন সূর্য মেঘনার ওপারে হেলে পড়েছে এবং আকাশজুড়ে আবিরের খেলা—মফিজুদ্দিন সাহেব এলেন ঘাটে। হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি। মেয়ের মাথায় হাত রেখে প্রশ্ন করলেন পরম স্নেহে, "কী রে মা, একলা বসে নদীর দিকে চেয়ে কী ভাবিস? তোর মা তো ঘরে চিন্তায় অস্থির।"
নূরজাহান ওপারের দিগন্তছোঁয়া জলরাশির দিকে আঙুল তুলে বলল, "বাবা, আমি বড় হয়ে এই নদীর মতো হতে চাই। দেখছ বাবা, কী বুক চিতিয়ে সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে! কোনো পাহাড়, কোনো বন—কিছুই ওকে আটকে রাখতে পারে না।"
মফিজুদ্দিন সাহেব দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে মৃদু হাসলেন। মেয়ের চুলে বেণি বাঁধতে বাঁধতে বললেন, "নদীর মতো হওয়া বড় কঠিন রে মা। নদীকে নীরবে অনেক কিছু সইতে হয়। দুপাড়ের লোক তার বুক চিরে নৌকো চালায়, নিজের স্বার্থে বালু তোলে, তাকে নোংরা করে। খরায় সে নিজেই শুকিয়ে কাঠ হয়, আবার বর্ষায় কূল উপচে বন্যা এলে সবাই তাকে অভিশাপ দেয়। নদী কেবল দিতে জানে, নিতে জানে না। মানুষের মায়েদের জীবনটাও ঠিক এই নদীর মতো—অনন্তকাল শুধু বিলিয়ে যাওয়ার ত্যাগ। তুই কি সেটা পারবি?"
নূরজাহান তখনো বোঝেনি জীবনের জটিলতা, বোঝেনি ত্যাগের পেছনে কত রক্তক্ষরণ থাকে। অবুঝ জেদেই সে বলল, "তবু আমি নদীর মতোই হব বাবা। কারও কাছে কিছু চাইব না, শুধু দিতে শিখে যাব।"
সত্তরের দশকের শুরু। গ্রামীণ সমাজ তখন ঘন অন্ধকারের চাদরে ঢাকা। মেয়েদের পড়াশোনা যেন এক অলিখিত সামাজিক অপরাধ। বারো-তেরো বছর বয়সেই যেখানে মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে ঘরের কোণে বন্দি করা হতো, সেখানে নূরজাহান ছিল ভিন্ন ধাতুতে গড়া। সে ছিল সেই গ্রামের প্রথম মেয়ে, যে সমাজের লোকলজ্জা আর অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে সাইকেলে চড়ে বিদ্যালয়ে যেত।
মফিজুদ্দিন সাহেব নিজেই কিনে দিয়েছিলেন পুরোনো সাইকেলটা। প্রথম যেদিন নূরজাহান প্যাডেলে পা দিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় স্কুলের দিকে রওনা হলো, সেদিন গোটা গ্রামে শোরগোল পড়ে গেল। কুৎসিত টিপ্পনী, মাতব্বরদের চোখরাঙানি, হাটের কোণে বসে থাকা বৃদ্ধদের থুথু ফেলে বলা—"কলিকাল আইল রে! মফিজ মাস্টারের মাইয়া তো বংশের নাক কাটল।" কোনো কিছুই তার ইচ্ছের ডানাকে ছাঁটতে পারেনি। সে সোজা তাকিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেত, যেন কোনো অদৃশ্য যুদ্ধের এক নির্ভীক সৈনিক।
কৈশোর পেরিয়ে নূরজাহান যখন যৌবনে পা রাখল, তখন তার মেধার আলো আর চেপে রাখা গেল না। ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে কৃতিত্বের পর মফিজুদ্দিন সাহেব চিরাচরিত প্রথা ভেঙে মেয়েকে পাঠালেন ঢাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন এক উত্তাল সমুদ্র। রাজনীতি, সংস্কৃতি আর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর তরুণ-তরুণীদের মেলা।
নূরজাহান ভর্তি হলেন বাংলা সাহিত্য বিভাগে এবং বরাদ্দ পেলেন শামসুন্নাহার হল। তার সাধারণ সুতির শাড়ি, তেল দেওয়া টানটান করে বাঁধা চুল আর চোখের সেই কৌতূহল তাকে সবার চেয়ে আলাদা করে রাখত। লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত নিজেকে সমৃদ্ধ করতে। প্রতি সপ্তাহে বাবার চিঠির উত্তর লিখত। মফিজুদ্দিন সাহেব লিখতেন, "মা নূর, তুই শুধু নিজের জন্য পড়ছিস না, তুই আমাদের গ্রামের শত শত মেয়ের মুক্তির পথ তৈরি করছিস।" কথাটি নূরজাহানের বুকে এক অলৌকিক শক্তির মতো কাজ করত।
স্বর্ণপদক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে যখন সে বেরোল, তখন তার সামনে সুবর্ণ সুযোগের দরজা উন্মুক্ত। দেশের বড় বড় করপোরেট কিংবা সরকারি নামি দপ্তরে বিলাসবহুল চাকরি বেছে নেওয়া ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। সহপাঠীরা যখন ছুটছিল দামি চাকরি আর গাড়ি-বাড়ির পেছনে, নূরজাহান তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বেছে নিল পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় এক সাধারণ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার পদ। ঢাকার এক কোণায় জরাজীর্ণ সেই স্কুলের বেতন ছিল অতি সামান্য।
বান্ধবীরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করত, "পাগল হলি নাকি? এই সামান্য বেতনে এই ভাঙা স্কুলে কেন?" নূরজাহান হাসত তার স্বভাবসুলভ স্মিত হাসিতে। বলত, "টাকা তো দুনিয়ায় অনেকেই রোজগার করে, কিন্তু মানুষ গড়ার কারিগর কজন হতে পারে? আমার বাবা বলতেন, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে বড় পুণ্য আর নেই।"
নূরজাহানের এই আদর্শ আর সততার প্রতিই যেন আকৃষ্ট হয়েছিলেন মোতাহের হোসেন। অত্যন্ত নীতিবান, আদর্শবাদী ও স্বল্পভাষী এক সরকারি কর্মচারী। তাঁর ডেস্কে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার ঘুষের ফাইল আসত, কিন্তু কখনো একটি অবৈধ পয়সাও তিনি ছুঁয়েও দেখেননি। পুরস্কার হিসেবে জুটেছিল সহকর্মীদের টিটকারি আর অবহেলা—তবু তিনি ছিলেন অটল।
মফিজুদ্দিন সাহেব নিজেই পছন্দ করেছিলেন মোতাহেরকে। মেয়েকে বলেছিলেন, "টাকার পাহাড় নয় মা, এই সৎ মানুষটিই তোকে শান্তি দেবে।" ১৯৭৮ সালের এক বৃষ্টিস্নাত দিনে—জাঁকজমকহীন, একেবারে সাদামাটা আয়োজনে—বিয়ে হয়ে গেল নূরজাহান আর মোতাহেরের।
বিয়ের পর শুরু হলো টানাপোড়েনের সংসার। পুরান ঢাকার এক ঘিঞ্জি গলির জরাজীর্ণ ভাড়া বাসা, একটা কাঠের আলমারি আর দুটো পুরোনো খাট—এই নিয়েই গড়ে উঠল দাম্পত্যের ছোট্ট নীড়। ঘর ছোট হলেও তাতে ছিল অপার্থিব স্নিগ্ধতা। জানালায় ঝুলত নূরজাহানের নিজের হাতে সেলাই করা পর্দা।
মাসের শুরুতে মোতাহের বেতনের সামান্য টাকা এনে হাতে দিলে নূরজাহান এক জাদুকরী দক্ষতায় চালিয়ে নিত পুরো মাসের খরচ। চাল-ডাল-তেলের হিসাব এমনভাবে করত যেন অভাব কখনো প্রকাশ না পায়। মোতাহের অবসন্ন হয়ে অফিস থেকে ফিরলে সে এক কাপ চা বানিয়ে পাশে বসত। মোতাহের বলতেন, "নূর, তোমাকে আমি কোনো সুখ দিতে পারলাম না।" নূরজাহান হাত ধরে বলত, "এই যে আপনি সৎ পথে আছেন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় সুখ। আমাদের ঘরে অসৎ উপায়ের অন্ন ঢুকছে না, এর চেয়ে শান্তি আর কী হতে পারে?"
একে একে এল চার সন্তান—বড় আসিফ, মেজো আরিফ, একমাত্র মেয়ে নাজিয়া আর সবার ছোট চঞ্চল নাবিল। সন্তান আসার পর ব্যস্ততা বেড়ে গেল হাজার গুণ। সকালে রান্নাবান্না, সন্তানদের স্কুলের জন্য তৈরি করা, তারপর নিজে স্কুলে দৌড়ানো—সব একা হাতে সামলাত সে।
নূরজাহানের সমস্ত পৃথিবী এখন ঘুরতে লাগল সন্তানদের কেন্দ্র করে। সে চেয়েছিল তাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। রাতে চার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে সে কোনো রাজা-রানির গল্প শোনাত না; শোনাত বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি, ক্ষুদিরামের দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া আর বাবা মফিজুদ্দিনের সততার গল্প। সন্তানদের মনের জমিতে সে বুনে দিচ্ছিল মূল্যবোধের বীজ।
কিন্তু নিয়তি নির্মম। মানুষের সুখের দিনগুলো কেন যেন খুব দ্রুত ফুরায়। নূরজাহানের বয়স তখন মাত্র পঁয়ত্রিশ। বড় ছেলে আসিফের বয়স বারো, ছোট নাবিলের চার। তখনই প্রলয়ঙ্করী কালবৈশাখী ঝড় ধেয়ে এল তাদের সাজানো সংসারে।
১৯৮৯ সালের এক অমাবস্যার রাত। অঝোরে বৃষ্টি আর তীব্র বজ্রপাত হচ্ছে। মোতাহেরের অফিস থেকে ফেরার সময় পেরিয়ে গেছে দুঘণ্টা। নূরজাহান জানালায় দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন। ঠিক রাত এগারোটায় দরজায় করাঘাত। দরজা খুলতেই দেখে মোতাহেরের এক সহকর্মী দাঁড়িয়ে আছেন, মুখ ফ্যাকাশে। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "ভাবি, মোতাহের সাহেব আর নেই। ফেরার পথে হৃদরোগে..."
হাসপাতালে মোতাহেরের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে নূরজাহানের পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। মোতাহেরের পকেটে পড়ে ছিল সন্তানদের জন্য কেনা সামান্য লজেন্স আর বেতনের অবশিষ্ট টাকা। ভিজে যাওয়া কাগজের ঠোঙাটা জবজব করছিল। নূরজাহান কাঁদেনি, শুধু মোতাহেরের বরফশীতল কপালে হাত রেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
মাথার ওপরের নীল আকাশটা যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ল। স্বামী মারা যাওয়ার পর ঢাকার নিষ্ঠুর শহর দেখাল নিজের আসল রূপ। আত্মীয়স্বজনরা প্রথম দুই দিন এসে সান্ত্বনা দিয়ে গেল বটে, কিন্তু সাহায্যের হাত কেউ বাড়াল না। উল্টো কুৎসিত পরামর্শ দিতে লাগল।
মোতাহেরের দূরসম্পর্কের এক চাচা এসে বলল, "একা মেয়েমানুষ, চার নাবালক বাচ্চা নিয়ে টিকতে পারবে না। গ্রামে ফিরে যা। বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ করে কোনো দোকানে কাজে লাগিয়ে দে।" নূরজাহান শক্ত গলায় বলল, "আমি বেঁচে থাকতে আমার সন্তানেরা পড়াশোনা বন্ধ করবে না। ওদের বাবা সততার যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তা আমি বৃথা যেতে দেব না।"
স্বামী হারানোর সেই কালরাত্রিতে সে ঘরের কোণে বসে অনেক কেঁদেছিল। কিন্তু পরদিন ভোরে সূর্যের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে আসতেই নূরজাহান চোখের জল মুছে দাঁড়াল। মেরুদণ্ড সোজা করে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—সন্তানদের সামনে কখনো নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবে না। মায়েরা ভেঙে পড়লে সন্তানেরা আর কখনো উঠে দাঁড়াতে শিখবে না।
এরপর শুরু হলো সন্তানদের মানুষ করার এক দীর্ঘ, একাকী ও নীরব সংগ্রাম। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয় না এসব গল্প। একজন বিধবা স্কুলশিক্ষিকার সামান্য বেতনে চার সন্তানের পড়ালেখা, খাওয়া আর ঘরভাড়া চালানো ছিল এক অসম্ভব যুদ্ধ।
মাসের শেষে চালের ড্রাম শূন্য হয়ে যেত। কত রাত নূরজাহান নিজে শুধু পানি খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে, সন্তানদের পাতে যাতে ভাতের কমতি না হয়। বাচ্চারা জিজ্ঞেস করত, "মা, তুমি খাবে না?" সে পেটের ক্ষুধার জ্বালা লুকিয়ে হেসে বলত, "তোরা খাও বাবা, আমি স্কুল থেকে খেয়ে এসেছি। পেট ভরা।" সন্তানেরা সব ভাত খেয়ে নিত, আর নূরজাহান রান্নাঘরে গিয়ে আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছত। তার জন্য রাতের অন্ধকার ছিল ঈশ্বরের আশীর্বাদ—যা তার চোখের জল আর ক্ষুধার কষ্টকে ঢেকে রাখত।
নতুন বছর এলে বাচ্চাদের আনন্দের সীমা থাকত না—নতুন বই, খাতা, জামা কেনার ধুম। কিন্তু নূরজাহানের বুকে কাঁপন ধরত। চার সন্তানের জন্য সব কিনতে গিয়ে বেতন শেষ হয়ে যেত, অথচ বাড়িওয়ালার তাগাদা থাকত। কতবার সে নিজের ছেঁড়া সুতির শাড়ি সুই-সুতো দিয়ে যত্নে সেলাই করে গায়ে জড়িয়েছে! স্কুলের সহকর্মীরা আড়ালে বলত, "ম্যাডাম এত কৃপণ কেন? সবসময় একই ছেঁড়া শাড়ি পরে আসেন।" নূরজাহান শুনত, কিন্তু কিছু বলত না। ভাবত, তার শাড়ি ছেঁড়া হলে কিছু যায়-আসে না, কিন্তু সন্তানদের স্বপ্ন যেন ছিঁড়ে না যায়; তাদের খাতা যেন ধবধবে সাদা থাকে।
গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টি—কোনো কিছুই নূরজাহানকে থামাতে পারত না। স্কুল থেকে ফেরার পথে বাসের ভাড়া বাঁচাতে মাইলের পর মাইল হেঁটে ফিরত। পিচঢালা রাস্তা থেকে আগুনের তাপ উঠত, চটি জুতো গলে যাওয়ার উপক্রম হতো। ছাতাটা ছিল ফুটো, বৃষ্টিতে ভিজে যেত শরীর। কিন্তু হেঁটে ফিরেও তার মনে থাকত এক অদ্ভুত আনন্দ—বাঁচানো পাঁচ-দশ টাকা দিয়ে নাবিলের জন্য মিষ্টি কিংবা আরিফের জন্য একটা জ্যামিতি বাক্স কেনা যেত। সন্তানেরা উপহার পেয়ে লাফিয়ে উঠলে পায়ের সমস্ত ক্লান্তি কর্পূরের মতো উড়ে যেত। একটাই ধ্যান—সন্তানদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে হবে, মানুষের মতো মানুষ করতে হবে।
বড় ছেলে আসিফ দেশের নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। খবর শুনে নূরজাহান সেদিন টিচার্স কমনরুমে বসে একা একা কেঁদে ফেলল। সহকর্মীরা ভেবেছিল ওটা আনন্দের কান্না, কিন্তু নূরজাহান জানত এই কান্নার পেছনে কত বড় হাহাকার লুকিয়ে আছে।
ভর্তি, হোস্টেল, বইপত্র—সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা দরকার। শেষ তারিখের বাকি মাত্র দুই দিন। নূরজাহানের হাতে কোনো উদ্বৃত্ত টাকা নেই। আসিফ ঘরের কোণে চুপচাপ বসে আছে, চোখে স্বপ্নভঙ্গের জল। সে তাদের আর্থিক অবস্থা জানে, তাই মাকে কিছু বলতে পারছে না।
সেদিন রাতে নূরজাহান খুলল তার কাঠের জরাজীর্ণ আলমারি। ভেতরের টিনের কৌটো থেকে বের করল এক গাছা সোনার চুড়ি—বিয়ের সময় মায়ের দেওয়া শেষ স্মৃতি। সংসারের সংকটে আর সন্তানদের অসুখে বাকি সব গহনা আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, শুধু এই চুড়িটা বুকের ভেতর আগলে রেখেছিল। পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে সে ওটা বিক্রি করে দিল। আসিফের ভর্তির পুরো টাকা জোগাড় হলো। রাতে আসিফ যখন জানতে পারল মায়ের খালি হাতের কথা, জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল, "মা, আমি তোমার শেষ স্মৃতিটাও শেষ করে দিলাম? বড় হয়ে তোমাকে অনেক সোনার চুড়ি বানিয়ে দেব, কথা দিলাম।"
নূরজাহান ছেলের চোখের জল মুছে মৃদু হাসল, "পাগল ছেলে! সোনার চুড়ি থাকলে কী হবে? ওগুলো মাটির তলার জড় ধাতু মাত্র। আমার চার সন্তানই আমার আসল অলংকার। তোরা যখন সমাজে মানুষ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবি, সেটাই হবে এই মায়ের সবচেয়ে বড় গয়না।"
সময় নদীর স্রোতের চেয়েও দ্রুত বয়ে যায়। চোখের পলকেই যেন সন্তানেরা বড় হয়ে গেল। মায়ের রক্ত-ঘামের ত্যাগ আর রাত জেগে হাতপাখা চালানোর সেই দিনগুলো পেরিয়ে চারজনই স্পর্শ করল সাফল্যের চূড়া। ঘরের দেয়ালে জমা হলো দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট।
আসিফ এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যুগ্ম সচিব, বেতন লাখ টাকার ওপরে। আরিফ বুয়েটের শিক্ষক ও প্রকৌশলী। নাজিয়া ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রভাষক। আর নাবিল—সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে আদরের যে—সে স্কলারশিপ নিয়ে কানাডায় প্রবাসী বিজ্ঞানী। নূরজাহানের সেই ছোট কাঠের আলমারি আর ছেঁড়া শাড়ির দিনগুলো যেন রূপকথার মতো হারিয়ে গেল।
সমাজে এখন নূরজাহান বেগমের অন্যরকম মর্যাদা। যে গ্রামের মানুষ তাকে একসময় টিটকারি দিত, তারা এখন তাকে দেখলে উঠে দাঁড়ায়। রাস্তায় আঙুল উঁচিয়ে দেখায়, "ওই বৃদ্ধা ভদ্রমহিলাকে দেখছেন—ওনার চার ছেলেমেয়ে সোনার টুকরো। ভাগ্যটা ঈর্ষা করার মতো।"
নূরজাহান বেগম এসব কথা শুনে গর্বে ও শান্তিতে বুক ভরে নেন। স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলেন, "দেখেছ? তোমার সন্তানেরা আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আমাদের কষ্ট বৃথা যায়নি।"
কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, জীবনের সবচেয়ে বড় বিয়োগান্তক ঘটনা কখনো কখনো এই অন্ধ সাফল্যের ঝলমলে ছায়াতেই জন্ম নেয়। তিনি সন্তানদের বড় বড় শিক্ষাগত যোগ্যতা আর জাঁকজমকপূর্ণ ডিগ্রি দিতে পেরেছিলেন বটে, কিন্তু যে মানবিকতা, মূল্যবোধ আর পারিবারিক বন্ধনের অমোঘ শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন—তা আধুনিক যান্ত্রিক শহরের তীব্র প্রতিযোগিতায় কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
সন্তানেরা এখন শুধু সময় আর টাকার পেছনে ছোটে। তাদের ডায়রিতে মায়ের জন্য বরাদ্দ কোনো পাতা নেই। তারা সফল, কিন্তু তাদের মাঝে হৃদ্যতা নেই। উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু আচরণে এক অদ্ভুত শীতলতা। নূরজাহান বেগম প্রথম প্রথম বুঝতে পারেননি; যখন বুঝতে পারলেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
সন্তানদের রাজকীয় বিয়ের পর স্কুলের চাকরি থেকে অবসর নিলেন নূরজাহান বেগম। সন্তানদের ইচ্ছায় তিনি উঠে এলেন বড় ছেলে আসিফের গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট, ইতালীয় মার্বেল, বার্মাটিক সেগুন কাঠের ফার্নিচার, ঝাড়বাতি—সবই আছে, কিন্তু সেই রাজকীয় প্রাসাদে তাঁর জন্য যেন কোনো অক্সিজেন ছিল না।
বয়সের ভারে দৃষ্টি ঝাপসা, বাতের ব্যথায় একা হাঁটতেও কষ্ট হয়। তার চেয়েও বেশি তাকে তিলে তিলে খাচ্ছিল এক দমবন্ধ করা একাকিত্ব। আসিফ আর তার উচ্চাভিলাষী স্ত্রী সকাল আটটায় বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান, ফেরেন রাত নয়-দশটায়। তাদের ছেলেটাও ইংরেজি মাধ্যমের পড়া আর ভিডিও গেমসে মগ্ন। দাদির ঘরে সে আসে না—দাদির মুখের বাংলা উচ্চারণ নাকি তার 'স্মার্ট' বন্ধুদের সামনে ভালো শোনায় না!
একদিন দুপুরে খাবারের টেবিলে বসে একা একা খাচ্ছিলেন নূরজাহান। ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় খাবার, কিন্তু একসঙ্গে খাওয়ার কেউ নেই। কাজের মেয়ে খাবার দিয়ে চলে গেছে। হঠাৎ তার মনে হলো—গত তিন দিনে এই বাড়ির কেউ তার সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করেনি। আসিফ রাতে ফিরে, "মা, আসি" বলে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। পুত্রবধূ শুধু দূর থেকে একটা সৌজন্যমূলক হাসি দেয়।
নূরজাহান চামচটা নামিয়ে রাখলেন। অন্ন গলায় আটকে গেল। ধীর পায়ে জানালার পাশে গিয়ে বসলেন। বাইরে তপ্ত রোদ, ধূলিধূসর আকাশে একটা পাখি একা একা ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো—পাখিরাও তো সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরে, কিচিরমিচির শব্দে বাসা ভালোবাসায় ভরিয়ে তোলে। শুধু মানুষই কেন জীবনের এক প্রান্তে এসে এত একা, এত অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে যায়? এই চার দেওয়ালের রাজকীয় খাঁচায় তিনি যেন এক অনাহূত অতিথি।
কিছুদিন আগের ঘটনা। আসিফের বাসায় বড় একটা প্রাতিষ্ঠানিক নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। দেশের নামি-দামি ব্যাংকার, আমলা ও ব্যবসায়ীরা এসেছেন। নূরজাহান বেগম সাধারণ একটা সুতির শাড়ি পরে ড্রইং রুমের এক কোণে বসেছিলেন। চেয়েছিলেন ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করতে; মাতৃত্বের আবেগে জানাতে—আসিফ ছোটবেলায় কেমন দুষ্টু আর মেধাবী ছিল। কিন্তু আসিফ বারবার বিরক্ত চোখে তাকাচ্ছিল। একপর্যায়ে আসিফের স্ত্রী আড়ালে গিয়ে স্বামীকে বলল, "তোমার আম্মাকে ভেতরে যেতে বলো না। পুরোনো ধাঁচের সস্তা শাড়ি পরে বসে আছেন, ইংরেজিও বলতে পারেন না। অতিথিদের সামনে কেমন 'অসংস্কৃত' দেখায়!"
কথাটা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা নূরজাহানের কানে তীরের মতো বিদ্ধ হলো। বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিঃশব্দে চোখের জল আড়াল করে তিনি তার অন্ধকার ছোট ঘরটিতে চলে গেলেন। সেদিন প্রথম তিনি তীব্রভাবে অনুভব করলেন—এই আধুনিক, প্রগতিশীল পরিবারে তিনি আর কোনো প্রয়োজনীয় সত্তা নন; বরং এক বোঝা, যা সামাজিক মর্যাদার খাতিরে লুকিয়ে রাখতে হয়।
পরদিন সকালেই আসিফকে ডেকে পাঠালেন। গলা কাঁপছিল না, কিন্তু চোখের কোণে ছিল গভীর অভিমান। শান্ত গলায় বললেন, "আমি মিরপুর-১১ নম্বরে একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আলাদা থাকব। তোদের সংসারে আমার জন্য অনেক সমস্যা হয়। আমারও এখন একা নিজের মতো থাকতে ইচ্ছে করে।"
আসিফ মাকে বাধা দিল না। একবারও বলল না, "মা, তুমি কেন যাবে?" বরং যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "আচ্ছা, তুমি যা ভালো মনে করো, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।" কোনো ঝগড়া নেই, চিৎকার নেই—শুধু আটলান্টিক মহাসাগরের মতো এক অদৃশ্য, সুগভীর দূরত্ব। নূরজাহান বেগম সামান্য কিছু পুরোনো কাপড় আর স্বামীর বাঁধানো ছবিটি বুকে নিয়ে চলে এলেন নতুন ছোট ফ্ল্যাটে।
মিরপুরের এই ফ্ল্যাটের জীবন কেবলই এক অন্তহীন অপেক্ষা। প্রতিদিন সকালে বারান্দার গ্রিল ধরে বসে থাকেন। রাস্তায় গাড়ির শব্দ হলে ঝুঁকে দেখেন—যদি কোনো চেনা গাড়ি এসে দাঁড়ায়! যদি আসিফ, আরিফ বা নাজিয়া কেউ আসে!
কিন্তু দরজা খোলার শব্দ মানে ময়লা নেওয়ার লোক, কিংবা বিদ্যুতের বিলের কাগজ। সস্তা মোবাইলটা সবসময় বালিশের পাশে রেখে দেন। সুতো দিয়ে বেঁধে রাখেন যাতে মেঝেতে পড়ে না যায়। রিংটোন সর্বোচ্চ করে রাখেন, যেন রান্নাঘর থেকেও শব্দ মিস না হয়। হয়তো নাবিল কানাডা থেকে ফোন করবে, হয়তো নাজিয়া বলবে, "মা, আজ আসছি।"
কিন্তু ফোন বাজে না। দিন যায়, সপ্তাহ যায়—ফোনটা নীরব পাথরের মতো পড়ে থাকে। চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতেন শুধু একটি প্রশ্নের জন্য—"মা, তুমি কেমন আছ? শরীর ভালো তো?" ব্যস্ত সন্তানদের সেই দুই সেকেন্ডের সময়টুকুও ছিল না।
২০২৬ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ। ঢাকায় তীব্র দাবদাহ। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছে। লোডশেডিংয়ে মিরপুরের ছোট ফ্ল্যাটটি জ্বলন্ত চুল্লি হয়ে উঠেছে। নূরজাহান বেগমের বয়স আশির কোঠায়। জীর্ণ শরীর এই গরমে আরও ভেঙে পড়ল।
৩০ মে, বিকেলে হঠাৎ খুব খারাপ লাগল তাঁর। বুকে তীব্র, অসহ্য ব্যথা। রান্নাঘর পর্যন্ত গিয়ে এক গ্লাস পানি খাওয়ার শক্তিটুকুও নেই। দেয়ালে হাত দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন—সেখানে টাঙানো সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের ফ্রেম। সেই ফ্রেমে ভর দিয়ে কোনোমতে শোবার ঘরের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। হাত কাঁপছে, কপাল বেয়ে ঝরছে ঠান্ডা ঘাম।
রাত গভীর হয়। জানালার বাইরে আধুনিক শহরের নিয়ন আলো। রাস্তায় বিলাসবহুল এসি গাড়ির দ্রুতগতি। মানুষ রেস্তোরাঁয় খাচ্ছে, ক্লাবে নাচছে, প্রগতির চরম শিখরে বসে উৎসব করছে। আর এই আলো-ঝলমলে শহরের এক অন্ধকার, নিঃসঙ্গ কক্ষে একজন মা একাকী এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। কোনো ডাক্তার নেই, কোনো সন্তান নেই, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতোও কেউ নেই।
শেষ মুহূর্তে, যখন চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল, তখনো নূরজাহান বেগম সন্তানদের অভিশাপ দেননি। কাঁপা কাঁপা দুটি হাত কোনোমতে আকাশের দিকে তুলে শেষ মোনাজাত করলেন—"আল্লাহ, আমার সন্তানদের ভালো রেখো। ওরা বড় দায়িত্ব পালন করে, দেশের কাজ করে, তাই আসতে পারেনি। ওদের কোনো দোষ দিও না।"
তারপর... এক ক্লান্ত, সংগ্রামী, সুদীর্ঘকাল ধরে বিলিয়ে দেওয়া হৃদস্পন্দন চিরতরে থেমে গেল। নদীর মতো যে জীবন শুধু দিতেই চেয়েছিল, সে আজ শান্ত।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর কয়েক দিন পর তীব্র পচা গন্ধ করিডোরে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা টের পায়। ৪ জুন সকালে কাঠমিস্ত্রি এসে দরজা কুড়াল দিয়ে ভাঙে। ভেতরের দৃশ্য দেখে সবার বুক কেঁপে ওঠে।
বিছানায় পড়ে থাকা দেহটি প্রকৃতির নিয়মে বিকৃত হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য—তার ডান হাতটি তখনও শক্ত করে বুকের ওপর রাখা, যেন মৃত্যুর পরও সন্তানদের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করছেন। চোখ দুটি জানালার দিকে খোলা, যেন শেষ মুহূর্তেও কারও আসার পথ চেয়েছিলেন। আর দেয়ালে সন্তানদের সার্টিফিকেটগুলো ধুলোবালির মাঝে তখনও জ্বলজ্বল করছে; প্রমাণ করছে যে এই মৃত নারী একজন সফল মা ছিলেন।
আসিফ, আরিফ ও নাজিয়া খবর পেয়ে ছুটে এল। পরনে দামি পোশাক, চোখে ব্র্যান্ডের সানগ্লাস। ঘরে ঢুকে গন্ধে রুমাল দিয়ে নাক চেপে ধরল তারা। সানগ্লাসের আড়াল থেকে কিছু নোনা জল ফেলল, প্রতিবেশীদের সামনে আহাজারি করল। কিন্তু সেই জল কি মায়ের বিয়োগব্যথার জন্য আন্তরিক ছিল, নাকি লোকদেখানো অপরাধবোধ ঢাকার নাটক—সে প্রশ্ন চিরকাল অধরাই রইল।
কানাডা থেকে নাবিল ফোন করে বলল, "ভাইয়া, আমি এখন আসতে পারছি না। ইম্পর্ট্যান্ট প্রজেক্টের সাবমিশন আছে। তোমরা দাফন করে দাও।" নূরজাহানের নিথর দেহ যখন খাটিয়ায় তোলা হলো, স্বামীর পুরোনো বাঁধানো ছবিটা তখনো ঘরের মেঝেতে পড়ে রইল।
আজ আজিমপুর গোরস্থানের এক কোণে নীরব, ঘাসফড়িং-ওড়া মাটির কবর। তার ওপর বুনো ঘাস। বাতাস যখন ঘাসগুলো ছুঁয়ে যায়, মনে হয় কবরটি আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করছে:
"তোমরা যারা প্রাতিষ্ঠানিক দুনিয়ায় চরম সফল, নামি ব্র্যান্ডের গাড়ি হাঁকাও, বড় ডিগ্রি নিয়ে অহংকার করো—তোমরা কি আজ তোমাদের বৃদ্ধ মায়ের একটুখানি খবর নিয়েছ? নাকি তোমরাও এক-একটি জীবন্ত রোবট হয়ে গেছ?"
মনে রাখবেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিইও হওয়া নয়, কিংবা বিদেশি ব্যাংকে অঢেল অর্থ জমানো নয়। কোনো ডিগ্রিই সার্থক নয়, কোনো গোল্ড মেডেলই মূল্যবান নয়, যদি না একজন বৃদ্ধ মা বা বাবা মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে এইটুকু শান্তি আর স্বস্তি নিয়ে চোখ বুজতে পারেন—"আমার সন্তানেরা আমাকে ভুলে যায়নি, তারা আমার পাশে আছে।"
নূরজাহান বেগমরা মরে যান না, তারা আমাদের সভ্যতার বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখে যান। দরজার ওপাশে যেন আর কোনো মায়ের জীবন এমন নির্মম, নিঃসঙ্গ ও করুণভাবে শেষ না হয়। সভ্যতার বাহ্যিক আলো যেন আমাদের মনের ভেতরের এই আদিম, স্বার্থপর অন্ধকারকে গ্রাস করতে পারে—সেই বোধ, সেই তীব্র অনুশোচনা আর মানবিকতা ফিরে আসুক প্রতিটি হৃদয়ে, প্রতিটি সন্তানের ঘরে। তবেই মানুষের এই পৃথিবী মানুষের থাকবে, যন্ত্রের নয়।