প্রকাশিত : ১০:৫৭
০৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:০২
০৫ জুন ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার যেন দীর্ঘদিন ধরে এক অনিশ্চয়তার উপাখ্যান বহন করে চলেছে। এখানে প্রত্যাশা ও হতাশা, লাভ ও লোকসান, উত্থান ও পতন—সবকিছুই পাশাপাশি হাঁটে। কখনো বাজারের পর্দাজুড়ে সবুজের উল্লাস, আবার কখনো লাল সংকেতের দীর্ঘ ছায়া। কিন্তু ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার শিখিয়েছে—পুঁজিবাজারের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোই অনেক সময় নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাজারের আচরণ দেখে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হতাশ হয়েছেন। কেউ কেউ বছরের পর বছর ধরে ধরে রাখা শেয়ার লোকসানে বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি বাজারচক্রেই এমন একটি সময় আসে, যখন আতঙ্ক যুক্তিকে পরাজিত করে। তখন বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের সম্ভাবনার চেয়ে বর্তমানের ক্ষতিকে বেশি গুরুত্ব দেন।
কিন্তু অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—বাজার কখনো স্থির থাকে না। যেমন নদীর পানি একই জায়গায় চিরকাল থেমে থাকে না, তেমনি পুঁজিবাজারও দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমুখী অবস্থায় আটকে থাকে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নীতিগত পরিবর্তন, বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব এবং সামষ্টিক পরিস্থিতির সমন্বয়ে একসময় বাজার নতুন গতিপথ খুঁজে নেয়।
আজকের বাস্তবতায় সেই পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত কী দেখা যাচ্ছে?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজারের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর একটি নতুন প্রত্যাশা ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে। আর্থিক খাতে সংস্কারের আলোচনা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার দাবি, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বিভিন্ন উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করছে।
পুঁজিবাজার মূলত আস্থার বাজার। এখানে কেবল টাকা বিনিয়োগ হয় না, বিনিয়োগ হয় ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস যখন ক্ষয়ে যায়, তখন বাজার দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার যখন আস্থা ফিরে আসে, তখন বাজার এমন গতিতে এগোয়, যা অনেক সময় বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে যায়।
বর্তমানে যাঁরা আতঙ্কিত হয়ে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করছেন, তাঁদের সিদ্ধান্তের পেছনে হয়তো ব্যক্তিগত বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু বাজারের ইতিহাস বলে, অধিকাংশ বড় ক্ষতি হয় মূল্যপতনের সময় নয়; বরং আতঙ্কের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে। কারণ বাজারের নিম্নমুখী সময়ে যে সম্পদকে মূল্যহীন মনে হয়, অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক বছর পর সেই সম্পদই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, অন্ধভাবে যেকোনো শেয়ার ধরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। পুঁজিবাজারে ধৈর্যের পাশাপাশি প্রয়োজন বিচক্ষণতা। দুর্বল ও অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নয়, বরং শক্তিশালী মৌলভিত্তি, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ক্ষমতা রয়েছে—এমন কোম্পানিগুলোকেই গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত বাজারের উত্থান-পতনের ঊর্ধ্বে টিকে থাকে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোই।
একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের অন্যতম লক্ষণ হলো লেনদেনের প্রবাহ বৃদ্ধি। যখন বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ে, তখন তারল্য ফিরে আসে। তারল্য ফিরে এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও শক্তিশালী হয়। অর্থনীতির চাকা যখন ঘুরতে শুরু করে, তখন সেই ইতিবাচক প্রভাব একসময় পুঁজিবাজারেও প্রতিফলিত হয়।
সূচক কোনো বাজারের চূড়ান্ত সত্য নয়, কিন্তু এটি বাজারের সামগ্রিক মনোভাবের একটি প্রতীক। তাই সূচকের ঊর্ধ্বগতি কেবল সংখ্যার বৃদ্ধি নয়; এটি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিফলন। একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ বাজারের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। এসব উপাদান একত্রিত হলে বাজারের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
পুঁজিবাজারে সাফল্যের গল্পগুলো সাধারণত দ্রুত ধনী হওয়ার গল্প নয়। সেগুলো ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির গল্প। যাঁরা বাজারকে প্রতিদিনের উত্থান-পতনের বাইরে গিয়ে দেখেন, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি রাখেন।
প্রকৃতির নিয়মেই রাতের শেষে ভোর আসে। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও আশাবাদের জায়গাটি সেখানেই। বর্তমানের স্থবিরতা হয়তো চিরস্থায়ী নয়; বরং এটি হতে পারে একটি নতুন অধ্যায়ের পূর্বভূমিকা। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা। গুজব নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য—কারণ পুঁজিবাজারে অনেক সময় ধৈর্যই সবচেয়ে বড় মূলধন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সম্ভাবনাও কম নয়। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারী—সবার সম্মিলিত আস্থা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। কারণ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীর লাভের বিষয় নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতেরও প্রতিচ্ছবি।