প্রকাশিত :  ২০:২৪
০৪ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৩৫
০৪ জুন ২০২৬

এখন মোবাইলেই মিলছে কাজের সুযোগ, আলোচিত নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘কর্মী২৪’

এখন মোবাইলেই মিলছে কাজের সুযোগ, আলোচিত নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘কর্মী২৪’

বিশেষ প্রতিনিধি: সকাল সাতটা। ঢাকার কোনো এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন দিনমজুর। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ রংমিস্ত্রি, আবার কেউ প্লাম্বার। তাঁদের চোখে একটাই প্রশ্ন—আজ কী কাজ মিলবে?

অন্যদিকে, রাজধানীর একটি পরিবার সকাল থেকে একজন দক্ষ প্লাম্বার খুঁজছে। একটি অফিস অভিজ্ঞ চালক খুঁজছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান আইটি বিশেষজ্ঞ চাইছে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় উপযুক্ত কর্মী খুঁজে পাওয়াই যেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই পুরোনো সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিনির্ভর একটি নতুন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘কর্মী২৪’ (Kormi24) দাবি করছে যে তারা কর্মী ও নিয়োগদাতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে চায়।

‘কর্মসংস্থানই দেশপ্রেম’—এই স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্ল্যাটফর্মটি ইতিমধ্যে তরুণ উদ্যোক্তা, শ্রমবাজার বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তি খাতের অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

দালাল ছাড়া কাজ, কমিশন ছাড়া আয়

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালনির্ভর ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে একজন শ্রমিক যে পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা, তার একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে কেটে নেওয়া হয়।

‘কর্মী২৪’-এর অন্যতম আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ‘জিরো কমিশন’ মডেল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হওয়া কাজের জন্য কর্মী কিংবা নিয়োগদাতার কাছ থেকে কোনো কমিশন নেওয়া হয় না। ফলে একজন শ্রমিক তাঁর উপার্জনের পুরো অর্থ সরাসরি পেয়ে যান।

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মডেল কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে তা অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজমিস্ত্রি থেকে চিকিৎসক—এক অ্যাপেই হাজারো দক্ষতা

‘কর্মী২৪’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বিস্তৃত সেবার পরিধি। একই প্ল্যাটফর্মে যেমন রাজমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান ও রংমিস্ত্রিদের খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি রয়েছেন ব্যক্তিগত গাড়িচালক, ডেলিভারি কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স চালক এবং হোম শিফটিং কর্মীরাও।

শুধু শ্রমিকই নন; স্থপতি, প্রকৌশলী, আইন পরামর্শক, গৃহশিক্ষক, চিকিৎসক এবং কৃষি ও ছাদবাগান বিশেষজ্ঞরাও এখানে নিজেদের সেবা যুক্ত করতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এর ফলে এটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

নিরাপত্তা ও আস্থার ওপর জোর

অনলাইনে কর্মী নিয়োগ বা কাজ খোঁজার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘কর্মী২৪’ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই, ব্যবহারকারী রেটিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কর্মীদের পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের দক্ষতা ও কাজের অভিজ্ঞতাও মূল্যায়ন করা হয়। পূর্ববর্তী গ্রাহকদের মতামতের ভিত্তিতে রেটিং প্রোফাইল তৈরি করা হয়। এর ফলে কোনো নতুন গ্রাহক একজন কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার আগে তাঁর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করতে পারেন।

প্রযুক্তির পেছনে দেশীয় প্রতিষ্ঠান

‘কর্মী২৪’-এর প্রযুক্তিগত সহযোগী হিসেবে কাজ করছে কোডওয়্যার লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত সেবার মানোন্নয়ন এবং নতুন ফিচার যুক্ত করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের নজর কেন এই খাতে?

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত। কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল বাজারকে প্রযুক্তির আওতায় আনা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আয়বৈষম্য হ্রাসের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

‘কর্মী২৪’-এর সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক আয় মডেল এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অনেকের নজর কেড়েছে। পাশাপাশি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কিংবা ইমপ্যাক্ট বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও তৈরি হতে পারে।

পরিবর্তনের পথে কী বাংলাদেশের শ্রমবাজার?

একসময় কাজ খুঁজতে মানুষের ঘুরতে হতো হাটে, বাজারে কিংবা বিভিন্ন মোড়ে। এখন সেই কাজ যদি মোবাইল ফোনের একটি অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া যায়, তবে শ্রমবাজারের চিত্র বদলে যেতে পারে।

‘কর্মী২৪’ সেই পরিবর্তনেরই একটি নতুন উদ্যোগ। এটি কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের চাহিদা বাড়ছে, আর সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ।

মানুষ কাজ খুঁজছে, আবার নিয়োগদাতারাও কর্মী খুঁজছেন। এই দুই প্রান্তকে যত দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছভাবে যুক্ত করা যাবে, দেশের কর্মসংস্থানের ভিত্তি ততই শক্তিশালী হবে।


Leave Your Comments




চাকরি এর আরও খবর