প্রকাশিত :  ১৩:৫১
০৩ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:২৮
০৩ জুন ২০২৬

দরজার ওপাশে একজন মা

(নগর সভ্যতার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক জীবনের উপাখ্যান)

দরজার ওপাশে একজন মা
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকা শহর আসলে কখনো ঘুমায় না।
রাত তিনটাতেও এই নগরের কোথাও না কোথাও নিয়ন আলো তীব্র হয়ে জ্বলতে থাকে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ক্লান্ত চিকিৎসকের হাতের ফাইলের খসখস শব্দ, ভোরের পত্রিকার জন্য শেষ মুহূর্তের খবর গোছানো সংবাদকর্মীর কীবোর্ডের আওয়াজ, কিংবা কফির কাপে চুমুক দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এই শহর এক অনন্ত ঘূর্ণাবর্ত। কেউ আবার দূর শহরের প্রিয়তমার কথা ভেবে ডায়েরির পাতায় শব্দ বুনে চলে। কোটি মানুষের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর টিকে থাকার এই চাক্ষুষ লড়াই, এটাই যেন এই যান্ত্রিক শহরের ফুসফুস।

কিন্তু এই রূপালি আলোর ঝলমলে শহরটাই আবার কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে বধির হয়ে যায়। সে শুনতে পায় না—চার দেয়ালের বন্ধ দরজার ওপাশে জমে থাকা কোনো নীরব মৃত্যুর হিমশীতল শব্দ। সফলতার ইঁদুর-দৌড়ে ছুটতে ছুটতে এই নগরী এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে, তার নিজের পায়ের শব্দেই ঢেকে যায় রক্তের সম্পর্কের অন্তিম আকুতি।

৩১ মে, ২০২৬। মধ্যরাত।

মিরপুর-১১ নম্বরের একটি বহুতল আবাসিক ভবনের সামনে হঠাৎ করেই মানুষের জটলা। ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। সাধারণ দিনে এই সময়ে চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে, কিন্তু আজ পরিস্থিতি থমথমে। পাঁচতলার একটি ফ্ল্যাটের সামনের করিডোরে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ।

ভিড়ের মধ্যে কারও মুখে আতঙ্ক, কারও চোখে সস্তা কৌতূহল।

"ভাই, গন্ধটা কি আজকেই প্রথম?" একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক নাক রুমাল দিয়ে চেপে ধরে পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলেন।

"না, গত দুদিন ধরেই হালকা লাগছিল। ভেবেছিলাম ড্রেনের ময়লা বা মরা ইঁদুর হবে। কিন্তু আজ সন্ধ্যা থেকে গন্ধটা এতটাই অসহ্য যে ঘরে টেকা যাচ্ছে না," প্রতিবেশীর নিচু কণ্ঠের উত্তর।

সেখানে পুলিশ এসেছে। মিরপুর থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ফ্ল্যাটটি ভেতর থেকে শক্ত করে আটকানো। বারবার কলিংবেল বাজিয়ে, দরজায় করাঘাত করেও কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।

অবশেষে একজন কাঠমিস্ত্রিকে ডাকা হলো। তার ভারী হাতুড়ি আর ছেনির আঘাত যখন লোহার লকের ওপর পড়ছিল, তখন সেই ধাতব শব্দটা পুরো করিডোরে এক ভীতিকর প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল। প্রতিবার আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত লোকজনের বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠছিল।

ভিড়ের এক কোণ থেকে এক তরুণী ফিসফিস করে বলল, "ভেতরে খালা একা থাকতেন। ওনার চার ছেলেমেয়েই সমাজে বড় বড় পজিশনে আছে। ওনার মতো মানুষের এই অবস্থা কেন হবে?"

পাশের এক বয়স্ক নারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে টিপ্পনী কাটলেন, "আরে রাখো তোমার চাকরি! খোঁজ নিলে জানা যাবে শেষ কবে কেউ এই বুড়ি মাকে দেখতে এসেছিল।"

কাঠমিস্ত্রির শেষ আঘাতে দরজার ভেতরের লকটি মড়মড় করে ভেঙে গেল। ছিটকিনিটা আলগা হতেই দরজাটা সামান্য ফাঁক হলো। আর ঠিক তখনই ভেতর থেকে এক তীব্র, পচা, ভ্যাপসা গন্ধ হুড়মুড় করে করিডোরে বেরিয়ে এলো। উপস্থিত অনেকেই বমি সামলাতে না পেরে নাক-মুখ চেপে ধরে পিছিয়ে গেলেন। সাব-ইন্সপেক্টর নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখে চেপে ধরে সাবধানে ভেতরে ঢুকলেন। টর্চের আলোটা অন্ধকার ড্রইংরুম পেরিয়ে সোজা গিয়ে পড়ল ভেতরের শোবার ঘরের বিছানার ওপর।

সেদিন রাতে ওই ভবনের কেউ তখনও জানত না, সেই বন্ধ দরজার ওপাশে শুধু একটি পচনশীল শরীর পড়ে নেই—সেখানে পড়ে আছে একটি আস্ত যুগের বিবেক, একটা গোটা সভ্যতার নির্মম পরাজয়।

নূরজাহান বেগমের শিকড় ছিল এক নদীমাতৃক গ্রামে।

ষাট বা সত্তরের দশকের সেই গ্রামটি ছিল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে। শৈশবে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন তিনি দেখতেন কীভাবে বিশাল জলরাশি সমস্ত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে নিজের পথ তৈরি করে এগিয়ে যায়, তখন তাঁর কিশোরী মনে এক অদ্ভুত দোলা লাগত। তিনি প্রায়ই বাবার হাত ধরে বলতেন, "বাবা, আমি বড় হয়ে এই নদীর মতো হতে চাই।"

বাবা হাসতেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, "নদীর মতো হওয়া খুব কঠিন রে মা। নদীকে অনেক কিছু সইতে হয়। দুপাড়ের মানুষ তার বুক চিরে নৌকা চালায়, খরায় সে শুকিয়ে যায়, আবার বর্ষায় তাকেই সবাই দোষ দেয়। তবু নদী তার পথচলা থামায় না।"

ছোট্ট নূরজাহান জেদ ধরে বলতেন, "আমিও থামব না বাবা। নিজের পথ নিজেই তৈরি করব।"

নূরজাহান ছিলেন তাঁর গ্রামের প্রথম মেয়ে, যিনি সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতেন। রক্ষণশীল সমাজের চোখরাঙানি বা প্রতিবেশীদের বাঁকা কথা—কোনো কিছুই তাঁর অদম্য ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিলেন। চাইলে কোনো করপোরেট বা সরকারি বড় দপ্তরে কাজ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন একটি সাধারণ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার পদ।

তিনি বলতেন, "টাকা তো অনেকেই রোজগার করে। কিন্তু মানুষ গড়ার কারিগর কজন হতে পারে?"

বেতন ছিল সামান্য। মাসের শুরুতে যে টাকাটা হাতে আসত, তা দিয়ে সংসার চালানোই ছিল এক বড় পরীক্ষা। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি তাঁর ক্লাসের ছাত্রীদের বলতেন, "মানুষকে উত্তরাধিকার হিসেবে তোমরা হয়তো জমি দিতে পারো, সোনা-দানা বা অঢেল টাকা দিতে পারো; কিন্তু মনে রাখবে, শিক্ষার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই। জমি একদিন নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে, টাকা চুরি হতে পারে, কিন্তু ভেতরের জ্ঞান আর শিক্ষা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।"

এই আদর্শ নিয়েই তিনি নিজের সংসার শুরু করেছিলেন। তাঁর স্বামী মোতাহার হোসেন ছিলেন একজন সৎ, স্বল্পভাষী সরকারি কেরানি। দুজনের আয়ে সংসার চলত টেনেটুনে। তাঁদের ঘরে যখন একে একে চার সন্তানের জন্ম হলো—আসিফ, আরিফ, নাজিয়া এবং ছোট ছেলে নাবিল—তখন নূরজাহানের পৃথিবীটা সন্তানদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে লাগল। তিনি তাদের শুধু বড় করতে চাননি, চেয়েছিলেন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।

কিন্তু সুখের দিনগুলো খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। নূরজাহানের বয়স যখন মাত্র পঁয়ত্রিশ, চার সন্তানের বড়টার বয়স তখন সবে বারো আর ছোটটার চার, ঠিক তখনই এক কালবৈশাখী ঝড় ধেয়ে এলো তাঁর জীবনে। এক রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মোতাহার হোসেন হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

হঠাৎ করে মাথার ওপরের আকাশটা ভেঙে পড়ল নূরজাহানের। আত্মীয়-স্বজনরা এসে সান্ত্বনা দিল বটে, কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়াল না কেউ। অনেকেই পরামর্শ দিল, "নূরজাহান, একা মেয়েমানুষ, চারটা বাচ্চা নিয়ে এই শহরে টিকতে পারবে না। গ্রামে ফিরে যাও। বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ করে কোনো কাজে লাগিয়ে দাও।"

স্বামী মারা যাওয়ার সেদিন রাতে নূরজাহান ঘরের এক কোণে বসে অনেক কেঁদেছিলেন। চোখের জলে শাড়ির আঁচল ভিজে গিয়েছিল। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো আর পারবেন না। এই চারটি ক্ষুধার্ত মুখ, তাদের পড়াশোনা, এই বিশাল শহরের খরচ—সব কীভাবে সামলাবেন তিনি?

কিন্তু পরদিন ভোরে যখন প্রথম সূর্যের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকল, নূরজাহান উঠে দাঁড়ালেন। চোখের জল মুছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শক্ত করলেন। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে প্রতিদিনের মতো হাসিমুখে সন্তানদের সামনে নাস্তা পরিবেশন করলেন।

বড় ছেলে আসিফ মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, "মা, তোমার চোখ এত লাল কেন? তুমি কেঁদেছ?"

নূরজাহান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো হেসে বলেছিলেন, "না রে বাবা, রাতে চোখে কী যেন পড়েছিল। তোরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, স্কুলে যেতে হবে তো।"

তিনি সেদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তাঁর সন্তানদের সামনে তিনি কখনো নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবেন না। কারণ তিনি জানতেন, একজন মায়ের চোখের জল সন্তানের ভেতরের সাহসটাকে এক নিমেষে কেড়ে নেয়। মায়েরা যদি ভেঙে পড়ে, তবে সন্তানরা দাঁড়াতে শেখে না।

সন্তানদের বড় করার এই যে দীর্ঘ, একাকী সংগ্রাম—এগুলো কখনো ইতিহাসের পাতায় লেখা হয় না। কেউ কোনো দিন জানতে পারেনি, মাসের শেষে যখন চালের ড্রামটা খালি হয়ে যেত, তখন কত রাত নূরজাহান নিজে শুধু জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন, যাতে সন্তানদের পাতে ভাতের কমতি না হয়। কেউ জানে না, নতুন বছর এলে যখন চার সন্তানের নতুন জামা আর বই কিনতে গিয়ে বেতনের সব টাকা শেষ হয়ে যেত, তখন কতবার তিনি নিজের ছেঁড়া শাড়িটাকেই সুঁই-সুতো দিয়ে সেলাই করে পরেছেন। সহকর্মীরা যখন নতুন শাড়ি পরে স্কুলে আসত, নূরজাহান তখন এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসতেন। তাঁর কোনো ক্ষোভ ছিল না।

কত দিন এমন হয়েছে, স্কুল থেকে ফেরার পথে তীব্র রোদ বা বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও তিনি বাসভাড়া বাঁচানোর জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে বাসায় ফিরেছেন। সেই বাঁচানো পাঁচ টাকা দিয়ে তিনি বিকেলে ছোট ছেলে নাবিলের জন্য একটা ললিপপ বা মেজো ছেলের জন্য একটা কলম কিনে এনেছেন। তাঁর একটাই ধ্যান-জ্ঞান ছিল—সন্তানদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে হবে।

দিন গড়িয়ে বছর যায়। নূরজাহানের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হয়, কিন্তু তাঁর মেহনত বৃথা যায়নি।

একবার বড় ছেলে আসিফ দেশের সবচেয়ে নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। খবরটা শুনে নূরজাহান সেদিন স্কুলেই কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্তটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, হোস্টেলের খরচ, বইপত্র কেনা—সব মিলিয়ে এককালীন বেশ বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন ছিল। নূরজাহান অনেকের কাছে হাত পাতলেন, কিন্তু এক স্কুলশিক্ষিকাকে ধার দেওয়ার মতো উদারতা কেউ দেখাল না। ভর্তির শেষ তারিখের আর মাত্র দুদিন বাকি। আসিফ ঘরে চুপচাপ বসে আছে, তার চোখে জল।

সেদিন রাতে নূরজাহান তাঁর শোবার ঘরের কাঠের পুরোনো আলমারিটা খুললেন। ভেতরের একটা ছোট টিনের কৌটো থেকে বের করলেন একটি সোনার চুড়ি। এটি ছিল তাঁর বিয়ের সময় তাঁর মায়ের দেওয়া শেষ স্মৃতি। সংসারের নানাবিধ সংকটে বাকি সব গহনা একে একে আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, শুধু এই একটা চুড়ি তিনি বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলেন।

পরদিন সকালে তিনি চুড়িটি বিক্রি করে আসিফের ভর্তির পুরো টাকাটা পরিশোধ করলেন। রাতে যখন সব সন্তান ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন নূরজাহান ড্রেসিং টেবিলের ভাঙা আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি তাঁর খালি হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। যে হাতে একসময় মায়ের দেওয়া সোনার চুড়ি জ্বলজ্বল করত, আজ সেই হাত দুটো রুক্ষ এবং সম্পূর্ণ খালি।

ঠিক তখন আসিফ পানি খাওয়ার জন্য উঠে মায়ের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে মায়ের খালি হাতের দিকে তাকিয়ে সব বুঝতে পারল। তার গলা বুজে এলো। সে পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "মা, আমি তোমার শেষ স্মৃতিটাও শেষ করে দিলাম? আমি বড় হয়ে তোমাকে অনেক সোনার চুড়ি বানিয়ে দেব, মা।"

নূরজাহান ঘুরে দাঁড়ালেন। ছেলের চোখের জল মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বললেন—

“পাগল ছেলে! সোনার চুড়ি থাকলে কী হবে? ওগুলো তো মাটির তলার ধাতু মাত্র। আমার চার সন্তানই তো আমার আসল অলংকার। তোরা যখন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবি, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় গয়না।”

সময় সত্যিই দ্রুত বয়ে যায়। সন্তানরা একে একে পড়াশোনা শেষ করল।

বড় ছেলে আসিফ একটি বহুজাতিক ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলো। মেজো ছেলে আরিফ ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটি বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ে নাজিয়া বিয়ে করল এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীকে, সে নিজেও একটি নামি কলেজের লেকচারার। আর ছোট ছেলে নাবিল স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেল আমেরিকায়, সেখানেই স্থায়ী হলো।

সমাজে এখন নূরজাহান বেগমের অন্য রকম খাতির। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবেশীরা আঙুল উঁচিয়ে দেখায়, "ওই যে দেখছেন ভদ্রমহিলাকে, ওনার চার ছেলেমেয়েই একদম সোনার টুকরো। ওনার ভাগ্যটা সত্যিই ঈর্ষা করার মতো।"

নূরজাহান বেগম যখন এসব শুনতেন, গর্বে তাঁর বুকটা ভরে উঠত। তিনি ভাবতেন, জীবনের সেই না-খাওয়া রাতগুলো, পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল চলা—সব কিছু আজ সার্থক হয়েছে।

কিন্তু নূরজাহান বেগম তখনো বুঝতে পারেননি, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কখনো কখনো এই অন্ধ সাফল্যের ছায়াতেই জন্ম নেয়। তিনি তাঁর সন্তানদের বড় ডিগ্রি দিতে পেরেছিলেন, কিন্তু যে মানবিকতা আর পারিবারিক বন্ধনের শিক্ষা তিনি দিতে চেয়েছিলেন, তা হয়তো এই আধুনিক শহরের প্রতিযোগিতার ইঁদুর-দৌড়ে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল।

সন্তানদের বিয়ের পর নূরজাহান বেগমের জায়গা হলো বড় ছেলে আসিফের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। মিরপুরের বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট, ড্রইংরুমে দামি সোফা, পায়ে নরম কার্পেট, ডাইনিং টেবিলে হরেক রকমের খাবার। কিন্তু সেই রাজকীয় প্রাসাদে নূরজাহান বেগমের জন্য যেন কোনো বাতাস ছিল না।

বয়স বাড়তে শুরু করেছিল তাঁর। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, বাতের ব্যথায় হাঁটতে কষ্ট হতো। কিন্তু এসব শারীরিক কষ্টের চেয়েও তাঁকে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি কুরে কুরে খাচ্ছিল, তা হলো—তীব্র একাকীত্ব।

বিশাল সেই ফ্ল্যাটে আসিফ আর তার স্ত্রী করপোরেট লাইফ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সকাল আটটায় তারা দুজনেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়, ফেরে রাত নয়টা বা দশটায়। তাদের সন্তানও ইংলিশ মিডিয়ামের পড়া আর ভিডিও গেমসে মগ্ন। ঘরের কাজের মেয়েটি খাবারটা টেবিলে দিয়ে চলে যেত, ব্যস।

একদিন দুপুরে নূরজাহান ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, গত তিন দিন ধরে তাঁর সঙ্গে ঘরের কেউ একটি কথাও বলেনি। না ছেলে আসিফ, না তার স্ত্রী, না ওদেশ থেকে ফোনে মেজো বা ছোট ছেলে। তিনি চামচটা নামিয়ে রাখলেন। বুকটা কেমন যেন খালি খালি ঠেকল। তিনি ধীর পায়ে হেঁটে জানালার পাশে গিয়ে বসলেন। বাইরে তপ্ত রোদ, আকাশে একটা পাখি একাকী উড়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ বৃদ্ধার মনে হলো, পাখিরাও তো সন্ধ্যা হলে নীড়ে ফেরে, কিচিরমিচির শব্দে পুরো বাসা ভরিয়ে তোলে। শুধু সৃষ্টির সেরা জীব মানুষই কেন একসময় জীবনের কোনো এক প্রান্তে এসে এতটা একা হয়ে যায়? আজ চার দেয়ালের মাঝে তিনি যেন একজন অনাহূত অতিথি।

আজ থেকে প্রায় দেড় বছর আগের কথা। আসিফের বাসায় সেদিন একটা বড় করপোরেট পার্টি ছিল। ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসেছিলেন। নূরজাহান বেগম তাঁর সাধারণ একটা শাড়ি পরে ড্রইংরুমের এক কোণে বসেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে একটু আলাপ করতে, জানাতে যে আসিফ ছোটবেলায় কেমন দুষ্টু ছিল। কিন্তু আসিফ বারবার মাকে ইশারায় বলছিল নিজের ঘরে চলে যাওয়ার জন্য। একপর্যায়ে আসিফের স্ত্রী মৃদু কণ্ঠে তার স্বামীকে বলল, "তোমার আম্মাকে ভেতরে যেতে বলো না। কেমন পুরোনো ধাঁচের শাড়ি পরে বসে আছেন, অতিথিদের সামনে কেমন দেখায়!"

কথাটা নূরজাহানের কানে গিয়েছিল। তিনি কোনো প্রতিবাদ করলেন না। তিনি নিঃশব্দে উঠে নিজের অন্ধকার ঘরটিতে চলে গিয়েছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, এই পরিবারে তিনি আর প্রয়োজনীয় নন। যেখানে একসময় তিনি ছিলেন পুরো সংসারের কেন্দ্রবিন্দু, আজ সেখানে তিনি কেবলই এক অতিরিক্ত আসবাবপত্র।

পরদিন সকালেই নূরজাহান আসিফকে ডেকে বললেন, "বাবা, আমি ভাবছি মিরপুরে একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আলাদা থাকব। তোদের অনেক সমস্যা হয় আমার জন্য।"

আসিফ একবারের জন্যও বলল না, "না মা, তুমি কেন আলাদা থাকবে?" বরং সে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "আচ্ছা মা, তুমি যদি শান্তিতে থাকতে চাও, আমি মিরপুর-১১-এ একটা ছোট ফ্ল্যাট দেখে দিচ্ছি। খরচের টাকা আমি প্রতি মাসে পাঠিয়ে দেব।"

কোনো ঝগড়া ছিল না, কোনো চিৎকার ছিল না। শুধু ছিল এক চরম দূরত্ব। এক অদৃশ্য দেয়াল, যা ইট-পাথরের দেয়ালের চেয়েও অনেক বেশি শক্ত।

নূরজাহান বেগম তাঁর সামান্য কিছু কাপড় আর স্বামীর একটা পুরোনো বাঁধানো ছবি নিয়ে সেই নতুন ফ্ল্যাটে চলে এলেন। কাউকে কোনো দোষ দিলেন না। কিন্তু এই নতুন ফ্ল্যাটের জীবন ছিল কেবলই এক অন্তহীন অপেক্ষা।

তিনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে বসতেন। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, যদি কোনো চেনা গাড়ি এসে দাঁড়ায়। প্রতিবার দরজার বেল বাজলে তাঁর বৃদ্ধ বুকটা ধক করে উঠত—এই বুঝি আসিফ এলো, এই বুঝি আরিফ বা নাজিয়া এলো! কিন্তু প্রতিবারই দেখা যেত হয় ময়লা নেওয়ার লোক, নয়তো বিদ্যুৎ বিলের কাগজ দিতে এসেছে কেউ।

তিনি মোবাইল ফোনটা সবসময় নিজের বালিশের পাশে রেখে দিতেন। রিংটোনটা ফুল ভলিউম করে রাখতেন। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, কিন্তু ফোনটা বাজে না। তিনি শুধু একটি প্রশ্নের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতেন—“মা, তুমি কেমন আছো? আজ কী খেয়েছ?” ব্যস্ত সন্তানদের সেই সময়টুকু ছিল না। তারা ভাবত, প্রতি মাসে ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ।

নূরজাহান বেগমের এই ছোট ফ্ল্যাটের ড্রইংরুমের দেয়ালে কোনো দামি পেইন্টিং ছিল না। সেখানে সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে টাঙানো ছিল তাঁর চার সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রির কপি। আসিফের এমবিএ সার্টিফিকেট, আরিফের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি, নাজিয়ার গোল্ড মেডেলের ছবি। প্রতিদিন বিকেলে তিনি এক কাপ চা হাতে নিয়ে সেই দেয়ালটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে প্রতিটি সার্টিফিকেটের ওপর হাত বুলাতেন। তাঁর মনে হতো, তিনি যেন তাঁর সন্তানদের গা ছুঁয়ে দেখছেন।

একদিন পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, "খালা, ঘরের দেয়ালে এত পুরোনো কাগজ কেন ফ্রেমে বেঁধে রেখেছেন? দেখতে তো কেমন দেখায়।"

নূরজাহান বেগম মৃদু হেসে বললেন—

“এগুলো তো শুধু কাগজ না মা, এগুলো আমার আস্ত জীবনের গল্প। আমার যৌবনের সব ত্যাগ, আমার চোখের জল এই কাগজগুলোর ভেতরে জমা হয়ে আছে। আমার সন্তানরা যখন এই ডিগ্রিগুলো পেয়েছিল, সেদিন মনে হয়েছিল আমি দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষ।”

শেষের দিনগুলোতে নূরজাহান বেগম খুব কম কথা বলতেন। কথা বলার মানুষই বা কোথায়? মাঝে মাঝে বিষণ্ণতা যখন খুব বেশি গ্রাস করত, তিনি আলমারি থেকে একটা পুরোনো ফটো অ্যালবাম খুলে বসতেন। সেখানে একটা সাদা-কালো ছবিতে দেখা যাচ্ছে—ছোট্ট আসিফ মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে চকলেটের জন্য বায়না করছে। ছবিগুলোর ওপর দিয়ে নূরজাহান বেগম তাঁর কাঁপতি আঙুলগুলো বুলাতেন। তিনি শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতেন—

“তোরা আবার ছোট হয়ে যা না বাবা... তোরা এত বড় কেন হয়ে গেলি? তোরা যখন ছোট ছিলি, তখন তো তোদের সমস্ত পৃথিবীটাই ভরা ছিল শুধু আমি দিয়ে। এখন তোদের এত বড় পৃথিবীতে আমার জন্য একটুও জায়গা নেই?”

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ।

ঢাকা শহরের ওপর দিয়ে তখন এক তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল। কংক্রিটের দেয়ালগুলো যেন আগুনের চুল্লির মতো গরম। ৩০ মে, বিকেলের দিকে নূরজাহান বেগমের শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ লাগতে শুরু করল। বুকের বাম পাশে একটা তীব্র ব্যথা আস্তে আস্তে পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর প্রচণ্ড তৃষ্ণা পাচ্ছিল, কিন্তু রান্নাঘর পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে খাওয়ার মতো শক্তিও তাঁর শরীরে ছিল না।

তিনি কোনোমতে দেওয়াল ধরে ধরে শোবার ঘরের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। টেবিলের ওপর পানির ফ্লাস্ক ছিল। ঘরের ড্রয়ারে ওষুধও ছিল। কিন্তু সেই ওষুধটা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো মানুষ সেখানে ছিল না।

সন্ধ্যার পর চারপাশ যখন অন্ধকারে ছেয়ে গেল, তখন নূরজাহানের বুকের ব্যথাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে তাঁর মনে হচ্ছিল বুকটা ফেটে যাবে। তিনি হয়তো কয়েকবার চিৎকার করে ডাকতে চেয়েছিলেন, "আসিফ! আরিফ! আমাকে একটু পানি দে বাবা..." কিন্তু তাঁর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না।

রাত গভীর হলো। জানালার বাইরে মিরপুর শহরের হাজারো নিয়ন আলো জ্বলছিল। রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে যাচ্ছিল বিলাসবহুল গাড়ি। এই আলো-ঝলমলে শহরের এক অন্ধকার, নিঃসঙ্গ কক্ষে একজন মা একাকী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষ মুহূর্তে, যখন তাঁর দৃষ্টি একদম ঝাপসা হয়ে আসছিল, তখনো নূরজাহান বেগম তাঁর সন্তানদের কোনো অভিশাপ দেননি। তিনি তাঁর ক্ষীণ হাত দুটো কোনোমতে বুকের ওপর জোড় করে শেষবারের মতো আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন—

“আল্লাহ, আমার সন্তানদের তুমি ভালো রেখো। ওরা খুব ব্যস্ত, তাই আসতে পারেনি। ওদের কোনো দোষ দিও না।”

মায়েরা বোধহয় এমনই হন। মৃত্যুর অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মুহূর্তেও তারা সন্তানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে পারেন না।

তারপর... একটি ক্লান্ত হৃদস্পন্দন চিরতরে থেমে গেল। অবসান হলো একটি দীর্ঘ, সংগ্রামী জীবনের।

নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর পরও এই পৃথিবী থেমে থাকেনি। পরদিন যথানিয়মে পূর্ব আকাশে সূর্য উঠল। ঢাকা শহরের চিরচেনা জ্যাম, মানুষের কোলাহল শুরু হলো। আসিফ যথানিয়মে এসি গাড়িতে করে অফিসে গেল, বড় একটা ফাইন্যান্সিয়াল ডিল সাইন করল। নাজিয়া তার কলেজে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের নৈতিকতার ওপর লেকচার দিল।

আর মিরপুরের সেই বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতরের কক্ষে, তীব্র গরমের মাঝে নিথর পড়ে রইলেন একজন মা।

একদিন গেল... কেউ জানতে পারল না।
দুইদিন গেল... ঘরের ভেতরের শরীরটি আস্তে আস্তে নিথর, শক্ত হয়ে এলো।
তিনদিন গেল... প্রকৃতির নিয়মে পচন ধরতে শুরু করল।

পাঁচদিন পর যখন সেই গন্ধ দেয়ালের ফাটল আর দরজার নিচের ফাঁক গলে করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল, তখন প্রতিবেশীদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে ভেতরে মারাত্মক কিছু ঘটেছে।

যখন কাঠমিস্ত্রি দরজাটি ভাঙল, এবং সাব-ইন্সপেক্টর টর্চের আলো ফেলে শোবার ঘরে ঢুকলেন, তখন বিছানার ওপর নূরজাহান বেগমের দেহটি আর চেনার উপায় ছিল না। কিন্তু তাঁর ডান হাতটি তখনও বুকের ওপর রাখা ছিল, যেন মৃত্যুর পরও তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য দোয়া করছেন। আর দেয়ালের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল—সেই সন্তানদের বড় বড় ডিগ্রির সার্টিফিকেটগুলো তখনও জ্বলজ্বল করছে।

সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেশীরা শুধু একটি পচনশীল শরীর দেখেনি। তারা দেখেছিল তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ। তারা দেখেছিল একটি আধুনিক, তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত সমাজের চরম নৈতিক পতন।

পুলিশের মাধ্যমে খবর পেয়ে পরদিন সকালে আসিফ, আরিফ এবং নাজিয়া মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটে এসে হাজির হলো। তাদের পরনে দামি পোশাক, চোখে সানগ্লাস। তারা হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে একে অপরকে দোষারোপ করতে লাগল। তাদের চোখে জল ছিল, কিন্তু সেই জল মায়ের জন্য কতটা, আর সমাজের মানুষের সামনে নিজেদের অপরাধবোধ ঢাকার জন্য কতটা—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নূরজাহান বেগমকে আজ আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। চারপাশের কোলাহল থেকে দূরে, মাটির নিচে তিনি এখন পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। সেখানে কোনো একাকীত্ব নেই, সেখানে কোনো ফোনের রিংটোনের জন্য অন্তহীন অপেক্ষা নেই।

কিন্তু নূরজাহান বেগমের গল্পটি কি এখানেই শেষ?

না, তাঁর এই নির্মম মৃত্যু আমাদের এই আধুনিক সমাজের বুকে কিছু তীব্র, ধারালো প্রশ্ন রেখে গেছে।

আমরা কি আসলেই উন্নত হচ্ছি? নাকি আমাদের বহুতল ভবনের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনের পরিধি ছোট হয়ে আসছে? আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি? নাকি কেবল কিছু কাগজের ডিগ্রি আর সার্টিফিকেটের অহংকারে অন্ধ হয়ে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছি?

আজ আজিমপুরের সেই নীরব কবর যেন এখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞেস করে—

“তোমরা যারা আজ করপোরেট দুনিয়ায় সফল, তোমরা কি আজ তোমাদের বৃদ্ধ মায়ের একটু খবর নিয়েছ? আজ অফিস থেকে ফেরার পথে কি বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে অন্তত দুটো মিনিট কথা বলেছ?”

মনে রাখবেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিইও হওয়া নয়, কিংবা বড় ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হওয়া নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেও কোনো সার্থকতা নেই, যদি না একজন বৃদ্ধ মা বা বাবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা নিয়ে যেতে পারেন—‘আমার সন্তানরা আমাকে ভুলে যায়নি।’

দরজার ওপাশে যেন আর কোনো মায়ের গল্প এভাবে শেষ না হয়। সভ্যতার আলো যেন মনের ভেতরের এই অন্ধকারগুলোকে গ্রাস করতে পারে, সেই বোধ ফিরে আসুক আমাদের মাঝে।

Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর