প্রকাশিত : ১৭:১৭
০২ জুন ২০২৬
সোমবার (১ জুন) সকালেই মনে হচ্ছিল, ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নড়বড়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। কারণ ছিল দুটি, বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার হুমকি এবং ইসরায়েলের দিকে মিলিশিয়াদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ।
হঠাৎ এই উত্তেজনা এমন এক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা ট্রাম্পের হতাশাকেই প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাত জুনে গড়িয়েছে, অথচ দ্রুত ও সুস্পষ্ট বিজয়ের যে আশা তিনি করেছিলেন, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইরান দাবি করেছিল, লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করেছে। এ বিষয়ে সিএনবিসিকে ট্রাম্প বলেন, আমি সত্যিই এসব পরোয়া করি না। একেবারেই পরোয়া করি না। আলোচনাগুলো এখন অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।
তবে কথার পর বাস্তবে তিনি জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতায় নেমে পড়েন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। সেই আলোচনা এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, লেবাননে পরিকল্পিত সামরিক অভিযানের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অশালীন ভাষাও ব্যবহার করেন বলে জানা যায়।
শুধু তাই নয়, ট্রাম্প উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।
এরপর তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন, উভয় পক্ষ গোলাগুলি বন্ধে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনা আবারও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
পরে ওয়াশিংটনে লেবাননের দূতাবাস জানায়, ইসরায়েল বৈরুতে হামলা বন্ধ করলে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে বলে নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল জানায়, তারা দক্ষিণ লেবাননে অভিযান চালিয়ে যাবে, তবে অন্তত আপাতত বৈরুতে হামলা করবে না।
ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপ হয়তো তার ইরান-কেন্দ্রিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আপাতত বাঁচিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে জীবিত রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার আশা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দ্রুত বাড়তে থাকা চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সোমবারের এই নাটকীয়তা ইরানকেও হয়তো দেখিয়েছে যে, নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা এখনও ট্রাম্পের রয়েছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কোনো সমঝোতা হলে, যা ইসরায়েলের অপছন্দ হতে পারে, তার টিকে থাকার জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বিষয়ক গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আলি ফাতহুল্লাহ-নেজাদ সিএনএনকে বলেন, এই ফোনালাপ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার প্রকৃত ক্ষমতার সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
পরে এবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, আজ সামান্য একটি সমস্যা হয়েছিল। তবে আমি খুব দ্রুত সেটি ঠিক করে ফেলেছি, যেমনটি আপনারা দেখেছেন।
কিন্তু ইতিহাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, এই কূটনৈতিক অগ্নিনির্বাপণ হয়তো কেবল সাময়িক সমাধান।
ইসরায়েল ও ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থ আবারও সামনে আসবে। একইভাবে অবিশ্বাসও ফিরে আসবে, যা অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি উদ্যোগগুলোকে ধ্বংস করেছে। এসব জটিল ও অনমনীয় বাস্তবতা ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পথকে কঠিন করে তুলছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনার জন্য লেবানন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সরু ভূখণ্ড লেবানন, হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে। অথচ সেই লেবাননই এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, লেবাননের উত্তেজনা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে তাদের বিরোধ আলাদা বিষয়। তাই পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এর কোনো প্রভাব পড়া উচিত নয়।
কিন্তু ইরান বিষয়টিকে এভাবে দেখে না। ইসরায়েলের উত্তরে অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরেই লেবানন ইরানের প্রক্সি শক্তিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। তেহরান চায়, হিজবুল্লাহ একটি কার্যকর শক্তি হিসেবে টিকে থাকুক। কারণ কয়েক দশক ধরে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সংগঠনটিকে অর্থ ও সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি হামলায় দুর্বল হয়ে পড়লেও, শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে হিজবুল্লাহ এখনো লেবাননের গভীরে প্রোথিত। একই সঙ্গে এটি ইরানের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ইরানের আশা, যুদ্ধের পর ইসরায়েলকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা পুনর্গঠনে হিজবুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়াশিংটনের বিপরীতে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। বর্তমান যুদ্ধের সূচনায় দুই দেশের যৌথ বোমাবর্ষণ এবং ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষক এবং দ্য বৈরুত বেনিয়ান পডকাস্টের উপস্থাপক রনি শাতাহ বলেন, গত সাড়ে চার দশকে লেবাননে যা গড়ে তুলেছে, ইরান মরিয়া হয়ে তা রক্ষা করতে চায়।
সোমবার ট্রাম্প হয়তো লেবাননে নতুন উত্তেজনা ঠেকিয়েছেন, কিন্তু ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ভাবনায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।
ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে। তারা সংগঠনটির সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ চায় এবং সেই দায়িত্ব লেবানন সরকারের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
তবে বহু বিশ্লেষকের মতে, বিভক্ত ও দুর্বল লেবানন সরকারের সেই সক্ষমতা নেই। ম্যারোনাইট খ্রিস্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের নিয়ে গঠিত জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের ক্ষমতা সীমিত।
লেবাননের নেতারা হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে হলেও তাদের মতে, এটি অবশ্যই একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হতে হবে। আর সেই সমঝোতায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে।
ততদিন পর্যন্ত ইসরায়েল হিজবুল্লাহর শক্তি দমন করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে লেবাননের সংঘাত যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাকে ভণ্ডুল করতে পারে।
এটিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের আরেকটি উদাহরণ।
ইসরায়েলের কাছে নিরাপত্তা রক্ষা একটি অবিরাম মিশন, যার অংশ হিসেবে সময়ে সময়েই যুদ্ধ প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প একটি চূড়ান্ত সমাধান চান এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন এই ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের মধ্যে শান্তি আলোচনা আয়োজন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু সীমান্তে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের বিষয়ে সেই আলোচনা খুব সামান্য অগ্রগতি অর্জন করে। ইতোমধ্যে নতুন ঘটনাপ্রবাহ সেটিকেও প্রায় অকার্যকর করে ফেলেছে। ফলে গত অর্ধশতাব্দীর মতো এখনো লেবানন মানবিক বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতের বলি হয়ে আছে।
ইসরায়েল, ইরান, সিরিয়া এবং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্রসফায়ারে আটকে থাকা দেশটি এখনো পনেরো বছরের গৃহযুদ্ধ এবং ১৯৮২ সালের ইসরায়েলি আগ্রাসনের ক্ষত বহন করছে।
সোমবার ট্রাম্প হয়তো পরিস্থিতি সামলেছেন, কিন্তু লেবাননে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো রাজনৈতিক আগ্রহ বা সক্ষমতার কোনও ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ জন্য প্রয়োজন একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতা।
ট্রাম্প তার আব্রাহাম চুক্তি সম্প্রসারণ করে সব আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রকে ইসরায়েলের স্বীকৃতির কাঠামোয় আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নসহ নানা জটিলতা সেই লক্ষ্যকে এখনও অধরা করে রেখেছে।
ফলে লেবানন এমন একটি অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবেই থেকে যাবে, যা তার ইরান-কেন্দ্রিক কূটনীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
আর লেবাননই একমাত্র ঝুঁকি নয়। ইরানের অনড় অবস্থানও দেশে ট্রাম্পের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং যুদ্ধ নিয়ে তার বিভিন্ন দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ইরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায়।
কিন্তু তেহরানের আচরণ ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, ইরান বিশ্বাস করে যে ট্রাম্পকে চাপ দেওয়া সম্ভব এবং প্রকৃতপক্ষে সমঝোতার জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহী পক্ষ তিনিই।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক অঙ্গীকার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি সংশোধন করে একটি প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়েছিল। তবু অগ্রগতির আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ প্রচারণার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েরই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তিতে স্বার্থ রয়েছে।
জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছেন। অন্যদিকে ইরানের অধিকাংশ আমদানি সমুদ্রপথে আসে এবং মার্কিন অবরোধ দেশটির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বলছে, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। অন্যদিকে তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে রাজি নয়।
গত বছর মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনও দেশটির ভেতরেই রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল থাকলেও দুই পক্ষই তা পরীক্ষা করে দেখছে।
তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোর দূরবর্তী সংঘাতের আরেকটি ফ্রন্ট যদি পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে, তাহলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ট্রাম্প হয়তো তাৎক্ষণিক ক্ষতি ঠেকাতে পেরেছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য তাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে; এ অঞ্চলে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য উদ্যোগ শুরু করা সহজ, কিন্তু সেখান থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।