প্রকাশিত :  ১৬:২৮
০২ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:৪১
০২ জুন ২০২৬

আস্থার আলো কি ফিরছে পুঁজিবাজারে?

আস্থার আলো কি ফিরছে পুঁজিবাজারে?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

অনেক দিন পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং স্ক্রিনে সবুজ রঙের এমন আধিপত্য দেখা গেল, যা শুধু সংখ্যার হিসাবই নয়, মানুষের মনেও এক ধরনের আলোড়ন তুলেছে। যে বাজারকে ঘিরে গত কয়েক বছর ধরে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার গল্পই বেশি শোনা গেছে, সেই বাজার যেন হঠাৎ করেই নতুন করে আশার কথা বলতে শুরু করেছে।

পুঁজিবাজার আসলে অর্থনীতির আয়না হওয়ার পাশাপাশি মানুষের প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি। এখানে কেবল কোম্পানির হিসাব-নিকাশ বা সূচকের ওঠানামাই কাজ করে না; কাজ করে বিশ্বাস, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের ধারণা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে অনেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠনের ঘোষণা বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মনে করে আসছেন যে, বাজারের স্থিতিশীলতা ও সুস্থ বিকাশের জন্য একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো বিকল্প নেই। তাই নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনাকে তাঁরা কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না; বরং দেখছেন একটি সম্ভাবনাময় নতুন সূচনার পূর্বাভাস হিসেবে।

সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে প্রধান সূচকের ৩৪ পয়েন্টের উত্থান কিংবা এক হাজার কোটির বেশি টাকার লেনদেন—এসব নিছক পরিসংখ্যান নয়। সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে মানুষের মনোভাবের গল্প। বাজারে যখন ক্রেতারা ফিরে আসেন, যখন দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা বিনিয়োগকারীরা আবার নতুন করে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বোঝা যায় যে কোথাও না কোথাও আস্থার বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে।

আরও উৎসাহব্যঞ্জক বিষয় হলো, এই ইতিবাচকতা কোনো একক খাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যাংক, টেক্সটাইল, প্রকৌশল, বীমা, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি—প্রায় সব খাতেই ছিল ক্রয় আগ্রহের স্পষ্ট ছাপ। যেন বাজারের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই বার্তা ভেসে আসছিল—“আমরা এখনও সম্ভাবনায় বিশ্বাস করি।”

বিশেষ করে ব্যাংক খাতের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়াকে অনেক বিশ্লেষক ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। কারণ, পুঁজিবাজারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই খাত। একই সঙ্গে টেক্সটাইল ও প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা দেশের উৎপাদনমুখী অর্থনীতির প্রতিও আস্থার ইঙ্গিত বহন করে।

পুঁজিবাজারের ইতিহাস বলে, বড় উত্থান শুরু হওয়ার আগে সাধারণত মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে। সূচক পরে বাড়ে, লেনদেন পরে বৃদ্ধি পায়; কিন্তু আশাবাদের জন্ম হয় আরও আগে। বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছেই সেই পরিবর্তনের প্রাথমিক লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে।

এ কারণেই বাজারসংশ্লিষ্ট মহলে এখন একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—ডিএসইএক্স কি আবার ৬ হাজার পয়েন্টের পথে এগোচ্ছে?

অবশ্য কোনো সূচকই নিজে নিজে অর্থবহ নয়। ৬ হাজার একটি সংখ্যা মাত্র। তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এটি এমন একটি স্তর, যা বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। যে বাজার একসময় ৭ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, তার জন্য ৬ হাজার পয়েন্ট কোনো অলীক স্বপ্ন নয়।

তবে আশার পাশাপাশি দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। আস্থা অর্জন কঠিন, কিন্তু তা ধরে রাখা আরও কঠিন। তাই নতুন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ন্যায়সংগত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা।

কারণ, পুঁজিবাজার শেষ পর্যন্ত শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এটি বিশ্বাসের একটি প্রতিষ্ঠান। মানুষ যখন বিশ্বাস করে, তখন অর্থ আসে। অর্থ এলে গতি আসে। আর গতি এলে সৃষ্টি হয় নতুন সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি এখনও দৃঢ়। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন উদ্যোক্তার উত্থান এবং প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে সম্ভাবনার গল্প এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং সেই গল্পের নতুন অধ্যায় লেখা হতে পারে পুঁজিবাজারকে ঘিরেই।

দিন শেষে তাই ট্রেডিং স্ক্রিনে ছড়িয়ে থাকা সবুজ রঙকে শুধু একটি দিনের উত্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে আরও বড় একটি বার্তা—দীর্ঘ অন্ধকারের পর দিগন্তে আবারও আলোর রেখা ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

সেই আলো কতটা উজ্জ্বল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ আর শুধু হতাশার গল্প বলছে না; বরং আবারও নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস সঞ্চয় করতে শুরু করেছে।


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর